এক.
প্রায় ৩৭ বসন্ত দেখনের ভাগ্য হইলো আমার। ভ্যালেন্টাইন দিবস আমার জীবনে খুব বেশী সময় গুরুত্ববহ হইছে কীনা তা মনে করতে পারতেছিনা। তয় এইবারের ভ্যালেন্টাইন দিবসের আগেই আমি কেরম সংকুচিত হইয়া যাই। কেরম অন্যরম সব উপলব্ধি তৈরী হইতে শুরু করে। যেই কারণে বিকাল থেইকাই শরীর খারাপ বুঝতে পারলেও গা করি নাই। ভাবছি মন খারাপের সাথে শরীর খারাপের হয়তো যোগসূত্র আছে। কিন্তু রাত বাড়তে থাকলে বুঝি এইবার হয়তো নতুন কোন সিম্পটম বাসা বাঁধে শরীরের কুঠরীতে।
আমার জীবন খুব বেশী দিনের হয়তো নয়। মানুষ আরো বহুদূর যায়। তবু বুঝি বার্ধক্য আসে চুপিসারে। রাতের সাথে গভীর হইতে শুরু করে স্টমাক পেইন। সাধারণ ধারণা মতোই বুঝি এই ব্যথা মন খারাপজাত নয়। এই ব্যথা বয়স্ক আর অনভ্যস্ত পাকস্থলীতে হঠাৎ ভারী খাবারের যন্ত্রণা। উদ্ভট সব শব্দে গ্যাস নির্গত হইতে শুরু করে পেট থেইকা। পাক খাইয়া খাইয়া অসম্ভব ব্যথা। রাত যখন ২টা তখন বুঝি এই ব্যথা হয়তো রাত ফুরাইলেও শেষ হইবার নয়।
রাত যখন আড়াইটা তখন ফোন দিলাম বেশ কয়েকজন বন্ধু আর পরিচিতরে তারা যদি জানে এই বেদনার উপশম। কিন্তু কেউ ফোন ধরেনা। একজন অতঃপর ধইরা কয় পেইন কিলার খাইতে পারেন এন্টাসিড সহযোগে। আমি সারা বাড়ি তন্ন কইরা কোন এন্টাসিড উদ্ধার করতে পারি না। তখন সে আবার ফোন করে। কয় দাদা হাসপাতালে যান। এই ব্যথা অনেক সময় কম্প্লিকেসী তৈরী করে। আমি রীতিমতোই আসলে ভয় খাই।
এতো রাইতে, মানে পৌনে তিনটার সময় হাসপাতালে কেমনে যামু। বাসায় বৃদ্ধ বাপ-মায়েরে জাগাইতে ইচ্ছা করেনা। অতঃপর একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই ভয়ে। আমার মনে পড়ে মান্না ভাইয়ের কথা তিনিও নাকি একা গাড়ি ড্রাইভ কইরা হাসপাতাল গেছিলেন। সেই হাসপাতাল থেইকা তিনি আর ফেরেন নাই। একা থাকনে কোন সাক্ষীও নাই যে হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করবার পারে। আমি তবু বাইর হই। কিন্তু নিজেরে কেরম অক্ষম মনে হয়। পেট চাইপা ধইরা ডানের রাস্তায় যাই। সেইখানে অবস্থানরত চৌকিদার কয় বামের পথে কিছু রিকসা পাইবেন। আমি তার কাছ থেইকা পানি চাইয়া পান করি। কিন্তু ব্যথা কমে না। উপরন্তু আবারো বমি হয়, পেট আবারো খালি হয়। একটা মোটর বাইকে একজন ভদ্রলোক আসেন...আমি তারে অনুরোধ করি,"ভাই আমারে একটু হাসপাতালে নামাইয়া দিয়া আসেন।" সে ভয় পায় প্রত্যাশিত মতেই। আমি আর কিছু কইতে পারি না। কেবল ভাবি হয়তো আমিও একই আচরণ করতাম এই পরিস্থিতিতে। সামাজিক সম্পর্কের ধরণতো এখন এইরমই...
বামের রাতা ধইরা এইবার হাটি। পথ আর ফুরাইতে চায় না। একসময় পৌছাইলে বামের রাস্তার চৌকিদারের কাছ থেইকা পানি খাই আর পরিনতিতে আবার বমি। কিন্তু এইবার একটা রিকসার মুখ দেখি। তিনজন কর্মজীবী কোনখান থেইকা বাড়ি আসতেছে। আমি তাদের কাছে গিয়া অনুরোধ করতেই তারা রিকসা থেইকা নামে। তাগো মহানুভবতা আমারে মুগ্ধ করে। কিন্তু পেটের ব্যথায় তার প্রকাশেও মনে হয় ঘাটতি রয়ে যায়!
আমি একা একাই হাসপাতালে পৌছাই। ইমার্জেন্সীতে যোগাযোগ করি। চিকিৎসা শেষে বাড়িতে পৌছাই একই রিকশায়। রিকশাওয়ালা ভাইয়ের সচেতনতা আমারে মুগ্ধ করে। আহা শ্রেণীর ঐক্য!
দুই.
ভোররাতে ঘুমাইতে যাওনের কারণে ঘুম ভাঙে প্রায়ে দুপুর বেলা। এর মধ্যেই মৌসুমের বাবা'র ফোন। যদি তাদের কোনভাবে সহযোগিতা করতে পারি একটা পারিবারিক কাজে। আমি নিজের অবস্থার কথা জানাইলে তারাও আমারে বিশ্রাম নিতেই বলেন। কিন্তু নিজেরে আসলে দায়বদ্ধ'ই লাগে। তাই বিকালে বের হই হাতিরপুলের পথে।
তখন মাথায় আসে ব্লগীয় বন্ধুগো আড্ডায় যাইনা কেনো এর পর...তাই কাজ শেষ হইলে একলাই রওনা দেই ধানমন্ডি ৫ নম্বরের দিকে। সেইখানে প্রায় সাড়ে আটটা পর্যন্ত গপসপ। কিন্তু বিমারে নিয়া বাড়ি ফেরার পথে বুঝি বাঙালি সংস্কৃতি এক নতুন উপপাদ্যে আছে। সারা ঢাকা শহরের ট্যাক্সি ক্যাব আর সিএনজি অটো রিকশা আজকে ভ্যালেন্টাইন দিবসে একলা মানুষের সেবা বর্জন করছে। প্রেমিক-প্রেমিকা যূগল না হইলে এই ঢাকায় আজকে কোন যানবাহনেই ওঠা সম্ভব নয়।
আমি হাটতে শুরু করি। শুক্রাবাদ থেইকা ফার্মগেইট। ফার্মগেইট থেইকা মহাখালি। পথরে আমার ভ্যালেন্টাইন মনে হয়। পথের সাথে জোড় বেধে আমি হাটতে থাকি। আমার শ্লথগতিরে কেরম অন্যরম লাগে চারপাশের বাড়ি ফেরতা যূগলগো পাশে। শো শো কইরা তারা আমারে অতিক্রম করে। গাড়ি পায়...আমি হাটি।
একটা বাস পাই শেষে মহাখালিতে পৌছাইয়া। এবং অবাক করা বিষয়, প্রায় খালি একটা বাস। যেনো পথরেও আমার থেইকা দূরে সরানের চক্রান্ত। আমার তখন আর কেউ থাকে না। আমি একলা হই বাসভর্তি মানুষের ভীরে। বাড়ি ফিরি। একলা ঘরে বন্দি হই। আমার ভ্যালেন্টাইন হয়ে বাঁচে আমার চিন্তারা...স্মৃতি...আর একাকীত্ব...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

