নতুন দেশে এসেছি বেশিদিন হয়নি। প্রথম এসে প্রতিদিন কান্না পেত। বাবা, মা, ভাই, বন্ধুদের জন্য। এখনও খারাপ লাগে, কিন্তু আগের মত কান্না পায়না। মন মনে হয় টের পেয়েছে যে কেঁদে কোন লাভ নেই।
বন্ধুদের কথা ভেবে মন খারাপ হয়। জানি Facebook, MSN, Skype আছে কিন্তু তারপরও ঘন্টার পর ঘন্টা মুখোমুখি আড্ডা, অথবা কারো কাছ থেকে কষ্ট উপহার পেয়ে প্রিয় বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কান্না এসব তো আর কম্পিউটারের তৈরী অদৃশ্য জালের ভেতর করা যায়না।
এখন চাইলেও কোন বন্ধুর মুখ সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পারিনা, আর জড়িয়ে ধরে কান্না? সেটাতো স্বপ্নের চাইতেও অবাস্তব এই পরবাসে। তবুও ভাল লাগে ভেবে যে মা, বাবাদের সময় বন্ধুত্বের পাট অনেকটুকুই চুকে যেত কোন বন্ধু বিদেশ পাড়ি জমালে। মায়ের কাছে শুনেছি চিঠি আদান-প্রদানই ছিল তখন যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু কিছু মাস চিঠি চালাচালির পর সেটি অনেক্ষেত্রেই বন্ধ হয়ে যেত। হয়তো সবাই ব্যস্ত হয়ে যেত নিজেদের জীবন নিয়ে।
এখানে হাতেগোনা বন্ধুদের মধ্যে বেশিরভাগই আমেরিকার বাইরের বিভিন্ন দেশের – ইন্দোনেশিয়া, চীন, নাইজেরিয়া, একোয়াদর (Ecuador), মালি...। এখন পড়ালেখার পাট চুকে গেছে, সাথে সাথে আসলে বন্ধুত্বেরও। মাঝে মাঝে Facebook এ হাই/হ্যালো আর জন্মদিনে Facebook এর notification দেখে একটু শুভকামনা জানানো। এর বাইরে সুখ-দুঃখের কথা বলা হয় না এসব নতুন বন্ধুদের সাথে। এদের মাঝেও একটি ভাল বন্ধু হয়েছিল চীনের। কিন্তু সেই বন্ধু এখন চলে যাচ্ছে শিকাগোতে চাকুরীর সন্ধানে। তিনদিন পরই চলে যাবে চেন। ফের একাকী হয়ে যাব। কোন এক বিমূর্ষ দিনে চাইলেও কোন বন্ধুর সাথে বৃষ্টির গান শুনবোনা রেঁস্তোরায় বসে কফির পেয়ালা হাতে। বিদেশে ভাল বন্ধু পাওয়াটা আসলেই একটি ভাগ্যের ব্যাপার।
একা একা ঘুরতে মাঝে মাঝে ভাল লাগে কিন্তু সবসময় না। কোন কিছু কিনতে গেলে প্রায়শই মনে হয় সাথে একটি মেয়েবন্ধু থাকলে ওকে জিজ্ঞেস করা যেত এই জামার রঙ আমাকে আসলেই মানাবে কিনা অথবা এই হাতব্যাগটা ঐ জামার সাথে জুতসই হবে কিনা। জীবনের ছোটখাট অনেক প্রয়োজনে দরকার পরে ভাল বন্ধুর, একটি হলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু এই পরবাসে একটিও ভাল বন্ধু জুটেনা, জুটলেও সহজে জুটেনা। আর জুটলেও থেকে যায় ভাষাগত সমস্যা আর সাংস্কৃতিক কিছু পার্থক্য। নিজ ভাষায় মন খুলে কথা বলতে পারাটা যে কতবড় আনন্দের ব্যপার সেটি এখানে না আসলে টের পেতাম না।
Facebook, MSN এ অনেক কথাই বলতে পারি। কিন্তু এই যে হঠাৎ করে কথা বলতে চাওয়া অথবা জিজ্ঞেস করতে চাওয়ার ব্যপারটি পূরণ করা যায় না। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটি যদি থাকে অস্ট্রেলিয়া অথবা বাংলাদেশে তাহলে তার সাথে থেকে যায় রাত-দিনের পার্থক্য। তাকে ভোর ৩টায় ঘুম থেকে ডেকে তুলে প্রশ্ন করাটা অনুচিতই মনে হয়। বেচারী হয়তো সারাদিন কাজ করে ঘরে ফিরে ঘুমোচ্ছে একটু।
যাই হোক, সবশেষে যেটি বলতে চাচ্ছি সেটি হচ্ছে, পরবাসে ভাল একটি বন্ধু না থাকলে জীবনটা নিরামিষ মনে হয়, একাকীত্ব তখন জাপ্টে ধরে, আর বিষাদগ্রস্ত করে এই মনটাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



