ঐ যে একটা সময় ছিল না যখন ছোট ছেলেমেয়েরা দুপুরে ঘুমোতে যেত সাথে গল্পের কোন বই নিয়ে? আমি আগে যে বাড়ীর শেলফে থাকতাম, সেই বাড়ীতে ছিল দু’টি ছেলে আর একটি মেয়ে, তারাও এমনি বইয়ে চোখ বুলোতে বুলোতে ঘুমিয়ে পড়তো। আমাকে তাদের কেউ একজন প্রায়ই নিয়ে যেত সাথে করে। তাদের বাবা, মাও আমার পাতা উল্টে পাল্টে দেখত নানা সময়। কিন্তু ঐ বাড়ীতে আমি এখন আর থাকি না। আমার নতুন ঠিকানা ওদের এক বন্ধুর বাড়ী। ওদের এই বন্ধুটি আমায় ধার করে এনেছিল, কিন্তু আর কখনও ফেরত দেয়নি। যতবার এই কথাটি মনে হয়, আমার বুক হুহু করে উঠে।
অনেকদিন আমাকে কেউ এই শেলফ থেকে নামাইনি, বুলোয়নি আমার মলাটে হাত, পড়েনি আমার পাতা থেকে একটি লাইন। এমনকি এই বাড়ীর কেউ এই শেলফটি ঝাড়পোচও করেনি গত তিনমাস। আর কতকাল এভাবে থাকা যায়? মাঝে মাঝে রাতে তেলাপোকারাও উৎপাত করে।
আমার দু’পাশে আরো দু’টি বই। দু’টোই বেশ ভারী, তাদের চাপে আমার জীবন ওষ্ঠাগত, মাঝে মাঝে নিশ্বাস নেবার বাতাসটুকু পর্যন্ত পাইনা। আমার ডান পাশে দাঁড়িয়ে সন্দেশসমগ্র, তার বয়স অনেক। তার দশটি পাতা উইপোকারা কেটেছে, সেই যন্ত্রণায় বুড়ো বই প্রায় রাতেই কাঁদে। আমার খারাপ লাগে, ঘুমোতে পারিনা কিন্তু কি আর করা। জানি এমন দিন আমারও আসবে। ডানপাশে দাঁড়ানো জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসসমগ্র, আমার এই পড়শীর মন-মেজাজ সাধারণত ভালই থাকে, গুনগুন করে প্রায়শই সে গান ভাজে। বই পড়ার এই আকালের দিনেও এই বাড়ীর লোকজন আর তাদের মেহমানেরা তাকে নাড়াচাড়া করে। মাঝে মাঝে হিংসেই হয়।
আমার মনে পড়ে ছাপাখানায় আমার প্রথমদিকের কথা। বড় বড় কালো মেশিন থেকে শুধু মনে আছে দ্রুত বেগে পাতা বের হত আর লুটিয়ে পড়তো মেঝেতে। বুঝেছিলাম আমাকেই তৈরী করা হচ্ছে কিন্তু আমি তখনো জানিনা আমার মলাটের রঙ কি হবে, প্রচ্ছদ আঁকবে কোন শিল্পী।
নিউ মার্কেটের পরশ পাবলিশার্সে হয়েছিল প্রথম ঠাঁই। নিউ মার্কেটের অল্প ক’দিনের জীবন কিন্তু দারুন ছিল। প্রতিদিন আসত নতুন পাঠক, আমাকে তুলে নিয়ে পাতা উল্টাতো পরম যত্নে। পরিচয় হয়েছিল অনেক জাতভাইয়ের সাথে। তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় সুন্দর কেটে যেত। প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিষ জানা হতো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল আবার ইংরেজ। কয়েকজনের নাম এখনো মনে আছে, অলিভার টুইস্ট, লিট্ল উইম্যান এবং এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ। তাদের কাছ থেকে দেশের বাইরের অনেক গল্প শুনেছি।
এখন আর নতুন গল্প শুনিনা। শুনি শুধু আমার এক পড়শীর কষ্টময় গোঙ্গানী এবং আরেক পড়শীর গুনগুন করে গাওয়া হারানো দিনের গান। অপেক্ষায় আছি কবে আমায় কে হাতে তুলে নিবে আবার। উল্টোবে আমার প্রায় ধূসর হয়ে যাওয়া পাতা, আর আউড়াবে আমার দেহ থেকে সুন্দর কিছু পংক্তি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


