ব্লগের আমি ব্লগের তুমি ব্লগ দিয়ে যায় চেনা

চন্দ্রবিন্দুরা সব গেলো কোথায়?

২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১০:৩৬

শেয়ার করুন:                   Facebook

অভাবের দেশ আমাদের। এটা নেই, ওটা নেই শুনতে শুনতে আমরা বড়ো হয়ে উঠেছি, অভ্যস্ত হতে শিখেছি। একদা সবচেয়ে বড়ো অভাব ছিলো খাদ্যের, তা এখন আর আগের মতো অতো তীব্র নয় বলে শুনতে পাই। তবু আকাল এখনো আছে, কিছু পুরনো, কিছু নতুন। মানুষের নিরাপত্তার আকাল আমাদের দেশে চিরকাল ছিলো এবং সে বিষয়ে কোনো উন্নতির আশা আজকাল কেউ করে বলে মনে হয় না। সামপ্রতিক আকাল বিদু্যতের, পানির, জ্বালানি তেলের, সারের। খবরের কাগজ খুললে এইসব আকালের খবর প্রতিদিন পাওয়া যায়। এর সঙ্গে প্রায় নিঃশব্দে আরেকটি জিনিস ক্রমে উধাও হয়ে যাচ্ছে _ আমাদের বাংলা বর্ণমালার চন্দ্রবিন্দু। দেশের দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজগুলির ইন্টারনেট সংস্করণে এবং মুদ্রিত পত্রিকা যা কালেভদ্রে হাতে আসে তাতে এই সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে যে বাংলা ভাষায় চন্দ্রবিন্দুর আকাল দারুণ আকাল পড়ে গেছে। হয়তো অবিলম্বে তা দুর্ভিক্ষের চেহারা ধারণ করে বসবে।

আশ্চর্য হয়ে ভাবি, হচ্ছেটা কি? যতোদূর জানি, চন্দ্রবিন্দু এখনো বাংলাভাষার বর্ণমালার সর্বশেষ অক্ষর এবং ব্যাকরণ ও বানানরীতি থেকে তা বাতিল হয়েও যায়নি। আমাদের জানা আছে, কোটি কোটি মানুষ যে ভাষা প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহার করেন, সেই ভাষায় সর্বজনগ্রাহ্য কোনো বানানপদ্ধতি নেই। সেসব দেখাশোনার কাজ করে কে? এই দায়িত্বে কেউ আছে বলে মনে হয় না, তা মান্য করার প্রশ্ন সুতরাং অবান্তর। ফলে, একই অর্থে একটি শব্দ একাধিক বানানে লেখার চল আছে। গেলো, গেল, গ্যালো _ এই তিন প্রকারেই শব্দটি লেখা চলে। এর মধ্যে কোনটি অশুদ্ধ, কে বলবে? আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য শব্দগুলি থেকে এরকম উদাহরণ অসংখ্য দেওয়া সম্ভব।

অন্য সব ভাষার কথা জানা নেই, কিন্তু পৃথিবীর সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা ইংরেজিতে কিন্তু এই ধরনের ব্যাপক অরাজকতা নেই। সত্য বটে যে মার্কিন ও বৃটিশ ইংরেজির বানান ও উচ্চারণ কিছু আলাদা। যেমন কালার বা লেবার শব্দ দুটি থেকে মার্কিনীরা বৃটিশ বানান পদ্ধতির ইউ অক্ষরটি বাদ দিয়ে ব্যবহার করে। এই ধরনের পার্থক্য জাতিগত বা রাষ্ট্রীয় কারণে ঘটে থাকতে পারে। বৃটিশ ও মার্কিনীরা সর্বদাই নিজেদের গৃহীত ও স্বীকৃত বানানরীতিটিই অনুসরণ করে থাকে। একই শব্দ একাধিক উপায়ে লেখার চল নেই। এই ধরনের পার্থক্য পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের বাংলা বানানে থাকলে তা মানা চলে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে চালু 'খেলাধুলো' শব্দটিকে আমাদের মুখের ভাষার কাছাকাছি 'খেলাধুলা' বলে লিখি আমরা। তা-ই কিন্তু হওয়া উচিত।

কিন্তু চন্দ্রবিন্দু নিয়ে এই খেয়ালখুশির সর্বশেষ নিদর্শন কিছু আশংকা জাগায়। প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্র ও সাময়িকী পড়লে মনে হবে অক্ষরের মজুত যথেষ্ট নেই, আগে হাতে কম্পোজের যুগে সীসার টাইপে মাঝেমধ্যে যেমন টান পড়তো কোনো কোনো হরফের। অথচ আজকাল কমপিউটার এসে পড়েছে, আগের মতো টাইপ/হরফ আর কিনতে হয় না। যে কোনো হরফেরই টান পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কমপিউটার কখনোই বলবে না যে অমুক অক্ষরটি আর স্টকে নেই। তবু 'তিনি জানান, তার নিজের কথা ভাবার সময় নেই' ধরনের বাক্য পাইকারিভাবে লেখা হচ্ছে। ব্যাকরণ বলছে, এই বাক্যটিতে শব্দটি 'তার' না হয়ে হওয়ার কথা 'তাঁর'। এটি রীতিমতো অনুচিত ও অশুদ্ধ, এই বাক্যে 'তিনি জানায়' বললে তা যেমন অশুদ্ধ হতো। এখানে 'তাঁর' শব্দটিতে চন্দ্রবিন্দুটি ব্যবহার না করার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। দু'একটি ক্ষেত্রে হলে তা প্রুফ রীডিং-এর ত্রুটি বা অমনোযোগ বলে ধরে নেওয়া চলে। কিন্তু ঘটনাটি হরহামেশার এবং প্রায় প্রতিটি কাগজে। সুতরাং একে চন্দ্রবিন্দুর আকাল বলা যেতেই পারে।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত সাপ্তাহিক এবং অধুনা দৈনিক একটি কাগজ তো মনে হয় আরেক মার্গে চলে গেছে চন্দ্রবিন্দুকে পুরোপুরি পরিহার করে ('অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা!')। এই বর্জনের পক্ষে যুক্তি কী, তা আমার জানা নেই। কিন্তু এর কতকগুলি সম্ভাব্য বিপদ আমি দেখতে পাই। যে কোনো দুঃখেই আমার পক্ষে আর 'কাঁদা' সম্ভব হবে না, কেননা তা 'কাদা' হয়ে যাবে। চন্দ্রবিন্দু ছাড়া 'কাদতে' হবে ভাবতেই কান্না পেয়ে যাচ্ছে। ক্রন্দন অর্থে 'কাঁদা' আর প্যাচপেচে 'কাদা'-র পার্থক্য তাহলে কীভাবে করা যাবে? ভাত 'রাঁধা' হবে না আর, কারণ সেখানে 'রাধা' এসে উপস্থিত হয়ে যাচ্ছে। 'ছিরিছাঁদ' বলতে তা বাড়ির 'ছাদ'-এ উঠে যাচ্ছে। আমি আর কিছুতেই 'বাঁধা' পড়তে পারবো না, কারণ তা হয়ে যাবে 'বাধা'। চন্দ্রবিন্দু বিহনে 'চাঁদ' হয়ে থাকছে 'চাদ'। 'বাঁদর' হবে 'বাদর' ('এ ভরা বাদরে তুমি কোথা...')। চন্দ্রবিন্দু বাদ দিয়ে 'বাঁশ' কীভাবে লেখা যাবে, বা 'বাঁশি'? 'বাশি'-তে সুর উঠবে কি? 'গাঁয়ে' আর ফেরা হবে না, হবে 'গায়ে' ফেরা । 'গোঁয়ারগোবিন্দ'-র অবস্থা কী হবে ভাবা যায়? গোলাপের 'কাঁটা' পড়বে 'কাটা'। আর ভূতের গল্পের কী হবে? চন্দ্রবিন্দু বাদ দিয়ে ভূতেরা কথা বলতে পারে না বলে জেনে এসেছি এতোদিন।

ব্যবহার না থাকার ফলে বাংলা স্বরবর্ণ থেকে একটি অক্ষর বিলীন হয়ে গেছে আমাদের চোখের সামনে। ছোটোবেলায় আমরা বর্ণমালা শেখার কালে একটি অক্ষর চিনেছিলাম, যার নাম ছিলো 'লি'। লেজ উঁচিয়ে বসে থাকা কাঠবেড়ালির মতো দেখতে অক্ষরটি একেবারে নেই হয়ে গেলো। কোনো কাজেই লাগতো না বলে। কিন্তু চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার এবং উপযোগিতা এখনো কিছুমাত্র কম নয়। তাকে আমরা উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছি কেন? আর এই করতে গিয়ে আজকের শিক্ষার্থীদেরই বা আমরা কী শেখাচ্ছি? এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে আমাদের দেশের অধিকাংশ লেখাপড়া জানা মানুষও খুব শুদ্ধ বাংলা লিখতে পারেন না। আমার এক বন্ধু রসিকতা করে একটি নিদারুণ সত্য কথা বলেন, 'আমরা ইংরেজিতে 'উইক' এবং বাংলায় 'দুর্বল'। এই অরাজকতা সেই দুর্বলতা বা উইকনেসের উপশম ঘটাবে না।

পঞ্চাশের দশকে একটি জনপ্রিয় বাংলা ছবিতে ছবি বিশ্বাসের আবেগমথিত কণ্ঠে বলা 'ফিরিয়ে দাও আমার বারোটি বছর' সংলাপটি খুব বিখ্যাত হয়েছিলো। বয়স্করা ঠাট্টাচ্ছলে এখনো তা মাঝেমধ্যে উদ্ধৃত করে থাকেন। ওই সংলাপের অনুকরণে আমার এখন বলতে ইচ্ছে করে, ফিরিয়ে দাও আমার হারানো চন্দ্রবিন্দুগুলি!

 

প্রকাশ করা হয়েছে: বিবিধ রচনা  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১২:৩০

 

  • ১৩ টি মন্তব্য
  • ৩০৭ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৪:৪৮
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: দারুন পর্যবেক্ষন শক্তি !
আমিও লক্ষ্য করেছি কিন্তু গায়ে লাগাইনি।
২. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:০২
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লেগেছে।
৩. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:৩৪
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লেখা।
আচ্ছা এ লেখাটি কি আগে কোথাও ছাপা হয়েছিল? মনে হচ্ছে, কোথায় যেন পড়েছিলাম!
৪. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:৪৮
comment by: অতিথি বলেছেন: subject দেখে হঠাৎ ধাক্কা খেলাম।
আমি আবার কোথায় যাব? যদিও অনেকদিন পর ব্লগে এলাম তারপরেও.......
তবে আপনার বক্তব্যরে ভিতর সময়োচিত সঠিক ও সুপ্ত একটি বিষয় উঠে এসেছে।
৫. ৩০ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১১:৩০
comment by: অতিথি বলেছেন: ভাষার প্রাকৃত রূপ।
৬. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৩৯
comment by: অতিথি বলেছেন: আনোয়ার সাদাত শিমুল, আমার লেখা কাগজে ছাপা হলে কেউ পড়ে না বলে আমার ধারণা। আপনি ভুল প্রমাণ করলেন। লেখাটি যুগান্তরে ছাপা হয়েছিলো বছরখানেক আগে। প্রসঙ্গটি পুরনো হয়নি ভেবে ব্ল্লগে দেওয়া।

আর সবার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ।
৭. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:০৭
comment by: অতিথি বলেছেন: রাইট, যুগান্তরে পড়েছিলাম।
আপনার আরো কিছু লেখাও আমি পড়েছি। কোন একটা বিষয়ে মন্তব্য প্রতিক্রিয়া ও ছিল। ঠিক মনে পড়ছে এখন...।
৮. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:২৩
comment by: অতিথি বলেছেন: শিমুল, আপনার সরণশক্তি ভালো। এই লেখাটি নিয়েই খোন্দকার আলী আশরাফ একটি প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন। দুঃখের বিষয়, তিনি কী বলতে চেয়েছেন আমি তার কিছুই বুঝিনি, সব মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিলো।
৯. ৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:০১
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: আয় হায় , আপনি দেখি ঝানু লেখক ! আমার মতো নোভিস ব্লগারের এখন থেকে সমঝে কমেন্ট করতে হবে। সাধু সাবধান ( হুঁশিয়ার টা আমার জন্য )। তবে আপনার লেখা আমি অনেক পছন্দ করি( তোশামোদ না, সত্য ) (চামাহাসি)
১০. ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৩৭
comment by: অতিথি বলেছেন: আপনার ক্রমাগত প্রশংসায় লজ্জা পেয়ে যাচ্ছি, সুমন!
১১. ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:৪৬
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: ভালো লাগছে তাই প্রশংসা করছি, খারাপ লাগলে সমালোচনাও করব।
১২. ০৪ ঠা মার্চ, ২০০৭ সকাল ১০:৫৯
comment by: কনফুসিয়াস বলেছেন: আপনার লেখা পড়ে আবারো মুগ্ধ হলাম।
ব্যাপারটা ক্রমশ নিয়মিত হয়ে পড়ছে! :-))
১৩. ০৫ ই মার্চ, ২০০৭ ভোর ৬:২৬
comment by: অতিথি বলেছেন: কনফুসিয়াস, আপনার উদার মন্তব্যে বেদম খুশি আমি। বাঁধিয়ে রাখার মতো মন্তব্য।

 

 

comment by:
এখানটা শূন্যই থাক
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ