somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ কাদরী বললেন : 'দুর, লিখে কী হবে!' (পর্ব ২)

০৮ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৩.

"না, শহীদ সে তো নেই; গোধূলিতে তাকে
কখনও বাসায় কেউ কোনদিন পায়নি, পাবে না।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
সভয়ে দরোজা খুলিÑ- এইভাবে দেখা পাই তার - মাঝরাতে;
জানি না কোথায় যায়, কি করে, কেমন করে দিনরাত কাটে
... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
না, না, তার কথা আর নয়, সেই
বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো - শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।" (অগ্রজের উত্তর)

ষাট দশকের পুরোটা এবং সত্তর দশকের শেষে দেশত্যাগ করার আগে পর্যন্ত এই ছিলেন শহীদ কাদরী। ঢাকায় বিউটি বোর্ডিং ও রেক্স-এর, বা আর কোথায় নয়, সাহিত্যঘটিত আড্ডায় অপরিহার্য একজন হিসেবে তাঁর খ্যাতি প্রবাদতুল্য। এইসব ঠেক-এ বন্ধুদের সঙ্গে দিনমান হৈ-হুল্লোড়ে সময় কাটে। যেন এই-ই জীবনের একমাত্র ব্রত ও করণীয়।

মাঝেমধ্যে একটি-দুটি কবিতা রচনা। তা-ও, তাঁর নিজের ভাষায়, অনেকটা খেলাচ্ছলে। একদিন বলছিলেন, “খসড়া খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আল মাহমুদ আমার অনেক কবিতা ছেপে দিয়েছে এখানে-ওখানে। করেছিলো বন্ধুত্বের টানেই।”

এক অর্থে 'শহীদ কাদরী বাড়ি নেই' তো সেই কবে থেকে! গুনে গুনে ২৯ বছর। দেশ ছাড়া আর বাড়ি ছাড়া তো পৃথক কোনো অর্থ বহন করে না, বিশেষত একজন সৃষ্টিশীল লেখকের জন্যে। সব ছেড়েছুড়ে Ñ- অগণন বন্ধুবান্ধব, প্রকাশিত তিনটি কাব্যগ্রন্থ, মেধাবী কবি হিসেবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি -Ñ দেশের বাইরে উড়াল দিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড-জার্মানি পেরিয়ে আমেরিকায়, বস্টন হয়ে নিউ ইয়র্ক।

অথচ আজ এই পরবাসে 'শহীদ কাদরী বাড়ি নেই' আর বলবে কে? তিনি এখন বাড়িতেই থাকেন, দিন কাটে এ-ঘরে ও-ঘরে শুয়ে-বসে। স্ত্রী কর্মক্ষেত্রে, হাতের কাছে সেলফোনসহ দুটি ফোন, জরুরি দরকার হলে যেন খবর দেওয়া যায়। আর থাকে বাংলা-ইংরেজি বই ও পত্রপত্রিকা।

শরীর অনুমোদন করলে পড়েন। না হলে শুয়ে থাকেন একা বিছানায়, সিগারেট বা পাইপ সেবন করেন। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, ধূমপান বা গোমাংস ত্যাগ না করার পরামর্শ চিকিৎসকরাই দিয়েছেন তাঁর শরীরঘটিত জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে। গৃহের বাইরে একমাত্র গন্তব্য হাসপাতাল, যন্ত্রণার অফুরান সরবরাহকারী। রাতে ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম নেই।

"... এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা ...
আর আমি শুধু আঁধার নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে রক্তাক্ত জবার মতো
বিপদ-সংকেত জ্বেলে একজোড়া মূল্যহীন চোখে
পড়ে আছি মাঝরাতে কম্পমান কম্পাসের মতো
অনিদ্রায়।" (উত্তরাধিকার)

এই অপরিসীম নিঃসঙ্গতা ও রোগযন্ত্রণা সহনীয় হয় নীরা ভাবীর কারণে। শহীদ ভাইয়ের জীবনে এখন তিনি শুধু স্ত্রী নন, ধৈর্য ও যত্নের প্রতিমূর্তি। যেন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে নেমে আসা মমতাময়ী এক নারীচরিত্র তিনি।

৪.

নিউ ইয়র্কে তাঁর গৃহে পৌঁছে দেখা গেলো, বসার ঘরে সোফায় বসে আছেন তিনি। কফি টেবিলের ওপরে, নিচে ও পাশে বইপত্রের স্তূপ। সামনে টিভি, তার পর্দা নির্বাপিত। কিছুটা যেন ম্রিয়মাণ ও বিষণœতিনি। শরীর ভেঙেছে, কিছু ক্ষীণকায়, মাথায় চুল কমে গেছে। চোখে চিরচেনা সেই চশমা দেখি না, সে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয় না। আগের দিন ডায়ালিসিস থেকে ফিরেছেন, তার রেশ হয়তো তখনো কাটেনি, কাল আবার যেতে হবে।

যে শহীদ ভাইকে সর্বশেষ দেখেছি ঢাকায়, তিনি এই শহীদ ভাই নন। হাসলেন, সেই গমগমে স্বরের হা হা হাসি নয়। কথা বললেন, তাতে উচ্ছ্বাস ও প্রাণশক্তির প্রাচুর্য নেই। বয়স মানুষকে বদলায়, তাতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই, রোগের আক্রমণ তো একেবারে ভেঙেচুরে দেয়।

দীর্ঘকাল তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আমার ছিলো না, তিনি নিউ ইয়র্কে আসার পর থেকে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। তখন প্রায়ই তাঁকে কথাবার্তায় আগের মতো শোনায়, দৃঢ় জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর, পরিহাসপ্রিয়। স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অটুট, বহুকাল আগে পড়া কবিতার পংক্তি বা গদ্যের উদ্ধৃতি অনায়াসে দিয়ে যান বাংলা, ইংরেজি ও ঊর্দু ভাষায়।

মনে পড়ে, শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়, কী আশ্চর্য, তাঁর রোগশয্যাতেই। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পিঠের ব্যথায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে। সেই ক্যাবিনে দর্শনার্থীর আনাগোনার শেষ নেই, যেন তিনি নিজে যেতে পারছেন না বলে রেক্স-কেই উঠে এসে জায়গা করে নিতে হয়েছে হাসপাতালের কক্ষে। ঠিক মনে নেই কার সঙ্গে গিয়েছিলাম সেখানে, তবে হাসপাতালে কোনো রোগীকে অতো উচ্চকণ্ঠে হাসতে আমি কখনো দেখিনি। মনে না থেকে উপায় আছে?

এর কিছুকাল পরে আজিমপুর এলাকায় ছোটো একটি ট্রেডল মেশিন নিয়ে 'ত্রিকাল' নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিন কবির যৌথ মালিকানা এই ছাপাখানার। শহীদ ভাই ত্রিকালের একজন, বাকি দুই কাল আবিদ আজাদ ও মাহবুব হাসান। ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন-তেমন, ধুম আড্ডা চলে সেখানে। শহীদ ভাইয়ের মতো আড্ডাধারী মজুত থাকলে এর বাইরে কিছু হওয়া একরকম অসম্ভবই।

আমার আবাস তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল। আড্ডার টানে প্রায়ই যাওয়া হয় ক্ষুদ্রপরিসর সেই ছাপাখানায়, পকেটে রিকশাভাড়া না থাকলে হেঁটে যেতেও অসুবিধা নেই। প্রচুর ডালপুরি-চা-সিগারেট উড়ে গেছে, ছাপাখানার আয় এবং ব্যয় সম্ভবত সমান করে দিয়ে। ক্রমে ব্যয়টিই বেশি ওজনদার হয়। ব্যবসাবুদ্ধির জন্যে কবিদের খ্যাতি কোনোকালে ছিলো না, এই তিন কবির 'ত্রিকাল'-ও বেশিকাল টেকেনি।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০০৭ রাত ১১:৫৭
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×