৫.
বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হলেও আমার পিতা রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী কবিতার অনুরাগী ছিলেন না। তাঁর ভাষায় ‘আধুনিক কবিতা’ দুরূহ ও দুর্বোধ্য। তবু কোন রহস্যবলে কে জানে, ষাটের দশকের শেষদিকে দুটি কবিতার বই আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হয় - শামসুর রাহমানের ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ এবং শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার'’।
তখন আমি স্কুলে পড়ি। ‘উত্তরাধিকার’ বইটি সাধারণ বইয়ের আকারের চেয়ে আলাদা ছিলো মনে আছে। প্রকাশক চট্টগ্রামের ‘বইঘর'।
বইটি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম কি না, মনে নেই। করলেও কিছু বুঝেছিলাম, এমন দাবি করতে পারি না। আমাদের বগুড়ার বাড়িতে এই বইয়ের কপিটি এখনো থাকার কথা। বইটির কথা মনে পড়লো শহীদ ভাইয়ের বাসা থেকে ফিরে আসার পথে।
শহীদ কাদরীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ প্রকাশিত হলো স্বাধীনতার পরে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন ছাত্র আমি, এই প্রথম মুগ্ধ হয়ে শহীদ কাদরী পড়া। অনেকগুলো কবিতা মুখস্থ হয়ে গেলো। তখন পড়া হলো ‘উত্তরাধিকার'’। তখনো তিনি দূরের মানুষ, চাক্ষুষ দেখিনি। শেষ গ্রন্থ ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই'। ক্রন্দন তো আসলে ছিলো, তা কবিরই, গ্রন্থের শিরোনামে সেই সঙ্গোপন ক্রন্দনের ঘোষণা। এটি প্রকাশিত হলো ১৯৭৮-এ, তখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত। তিনি যে দেশে নেই, তা-ও জেনেছি বিলম্বে।
পরবাসী হওয়া বিষয়ে গত বছর কলকাতা থেকে প্র্রকাশিত একটি কাগজে সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যাখ্যাটি এরকম : “নানান ব্যক্তিগত কারণে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশত্যাগ করেছিলাম। লেখকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, আত্মপ্রচারের ঢক্কানিনাদ, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ইত্যাদির ফলে এমনই বিবমিষা আমাকে দখল করেছিলো যে শুধুমাত্র স্বস্তি ও শান্তির জন্য শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে সব ধরনের সংযোগ ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিই। ... নিজেকে নির্বাসিত না বললেও পলাতক বলা যেতে পারে। পরশ্রীকাতর, পরচর্চালিপ্ত, রন্ধ্রসন্ধানী আমার চেনা ভুখণ্ড থেকে পালিয়ে এসেছিলাম।”
গল্পটি চেনা চেনা লাগে না? এই কাহিনী আজও সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
তাঁর রচনার সংখ্যা বেশি নয়। তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ। আর আছে ছড়ানো অগ্রন্থিত কিছু কবিতা, তারাও সংখ্যায় বড়ো নয়। তাঁর নিজের জবানীতে সেই স্বীকারোক্তি পাওয়া যাচ্ছে : “আমার ধারণায় আমি সত্যি খুব কম লিখেছি। এবং এও সত্যি যে আমার তৃতীয় গ্রন্থ বেরুবার পর আমার মনে হয়েছিল যে আমার আর কিছু বলার নেই। উপরন্তু প্রবাসে আসার পর, দেশের সঙ্গে সম্পর্করহিত অবস্থায়, আমার মন নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। এবং এখনও আমার মানসে নতুন কোনো কথা জোগায় না।”
প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে কী হলো তাহলে পরবাসে এসে? একদা তিনি নিজেই লিখেছিলেন :
“আমার মত ভীরু সাঁতার-না-জানা লোক
পার হলো নদী -
এটাই নিয়তি।
অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়
- সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপটেন এক জাহাজসুদ্ধ ডুবে গেল
- ঊর্ধ্বাকাশ থেকে বোয়িং-৭০৭ অজগ্রামে পুকুরে তলালো
কিন্তু নদী পার হয়ে আমি গন্তব্যে পৌঁছুলাম?” (গাধা-টুপি প’রে)
এ কথা সত্যি যে, পরবাসী হওয়ার পর তাঁর লেখালেখি আশংকাজনকভাবে কম। তবু এর মধ্যেও উজ্জ্বল কিছু কবিতা তিনি রচনা করেছেন। তাঁর স¤প্রতি প্রকাশিত কবিতার কয়েকটি ছত্র উদ্ধৃত করা যাক :
“যাচ্ছি কোথায়, কেউ জানে না,
পাগলা হাওয়া বাধ মানে না,
রাতের কালো জলে আমার
কথা ছিল একটু থামার।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
একা-একা একলা অন্ধকারে
ক্ষান্তিবিহীন চলছে নৌকা বাওয়া,
তবুও আজ তিনপুরুষের বসতবাটির দাওয়া ...
মাঝে মাঝে বলছে হেঁকে -
এ তোমার কেমন চলে যাওয়া,
এ তোমার কেমন চলে যাওয়া।” (যাত্রা)
শহীদ কাদরীর কাব্যবিচারের ক্ষমতা আমার নেই। শুধু জানি, আমি তাঁর মুগ্ধ পাঠক।
৬.
প্রতিবার ফোনে কথা বলার সময় শহীদ ভাইকে নতুন কিছু লিখছেন কি না জিজ্ঞেস করি, অনেকটা নিয়ম করেই। বেশিরভাগ সময় জবাব আসে, ভাবছি।
সাক্ষাতের সময়ও জিজ্ঞেস করলাম। হাত তুলে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, “দুর, লিখে কী হবে?”
জানি, শরীর সক্ষম না থাকলে লেখালেখির চিন্তা মাথায় এলেও লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। নীরা ভাবীও পরে জানালেন, একটু ভালো থাকলে হয়তো কিছু একটা লেখার কথা ভাবে। কিন্তু পরদিন যখন ডায়ালিসিস থেকে ফিরে আসে, তখন সেই ভাবনা কোথায় হারিয়ে যায়। শরীরের যন্ত্রণা আর সবকিছুকে ঢেকে ফেলে।
দুর লিখে কী হবে-র উত্তরে বলি, “তা তো বুঝলাম শহীদ ভাই। কিন্তু বলতে পারেন, না লিখে কী হবে? সারাজীবন তো লিখতেই চেয়েছেন, তাই না?”
কবি নিরুত্তর থাকেন। তিনি কি সম্মতি জানালেন? আমরা অপেক্ষায় থাকবো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

