somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ কাদরী বললেন 'দুর, লিখে কী হবে!' (শেষ পর্ব)

০৯ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৫.

বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হলেও আমার পিতা রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী কবিতার অনুরাগী ছিলেন না। তাঁর ভাষায় ‘আধুনিক কবিতা’ দুরূহ ও দুর্বোধ্য। তবু কোন রহস্যবলে কে জানে, ষাটের দশকের শেষদিকে দুটি কবিতার বই আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হয় - শামসুর রাহমানের ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ এবং শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার'’।

তখন আমি স্কুলে পড়ি। ‘উত্তরাধিকার’ বইটি সাধারণ বইয়ের আকারের চেয়ে আলাদা ছিলো মনে আছে। প্রকাশক চট্টগ্রামের ‘বইঘর'।

বইটি পড়ার চেষ্টা করেছিলাম কি না, মনে নেই। করলেও কিছু বুঝেছিলাম, এমন দাবি করতে পারি না। আমাদের বগুড়ার বাড়িতে এই বইয়ের কপিটি এখনো থাকার কথা। বইটির কথা মনে পড়লো শহীদ ভাইয়ের বাসা থেকে ফিরে আসার পথে।

শহীদ কাদরীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ প্রকাশিত হলো স্বাধীনতার পরে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন ছাত্র আমি, এই প্রথম মুগ্ধ হয়ে শহীদ কাদরী পড়া। অনেকগুলো কবিতা মুখস্থ হয়ে গেলো। তখন পড়া হলো ‘উত্তরাধিকার'’। তখনো তিনি দূরের মানুষ, চাক্ষুষ দেখিনি। শেষ গ্রন্থ ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই'। ক্রন্দন তো আসলে ছিলো, তা কবিরই, গ্রন্থের শিরোনামে সেই সঙ্গোপন ক্রন্দনের ঘোষণা। এটি প্রকাশিত হলো ১৯৭৮-এ, তখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত। তিনি যে দেশে নেই, তা-ও জেনেছি বিলম্বে।

পরবাসী হওয়া বিষয়ে গত বছর কলকাতা থেকে প্র্রকাশিত একটি কাগজে সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যাখ্যাটি এরকম : “নানান ব্যক্তিগত কারণে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশত্যাগ করেছিলাম। লেখকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, আত্মপ্রচারের ঢক্কানিনাদ, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ইত্যাদির ফলে এমনই বিবমিষা আমাকে দখল করেছিলো যে শুধুমাত্র স্বস্তি ও শান্তির জন্য শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে সব ধরনের সংযোগ ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিই। ... নিজেকে নির্বাসিত না বললেও পলাতক বলা যেতে পারে। পরশ্রীকাতর, পরচর্চালিপ্ত, রন্ধ্রসন্ধানী আমার চেনা ভুখণ্ড থেকে পালিয়ে এসেছিলাম।”

গল্পটি চেনা চেনা লাগে না? এই কাহিনী আজও সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।

তাঁর রচনার সংখ্যা বেশি নয়। তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ। আর আছে ছড়ানো অগ্রন্থিত কিছু কবিতা, তারাও সংখ্যায় বড়ো নয়। তাঁর নিজের জবানীতে সেই স্বীকারোক্তি পাওয়া যাচ্ছে : “আমার ধারণায় আমি সত্যি খুব কম লিখেছি। এবং এও সত্যি যে আমার তৃতীয় গ্রন্থ বেরুবার পর আমার মনে হয়েছিল যে আমার আর কিছু বলার নেই। উপরন্তু প্রবাসে আসার পর, দেশের সঙ্গে সম্পর্করহিত অবস্থায়, আমার মন নিঃসাড় হয়ে গিয়েছিল। এবং এখনও আমার মানসে নতুন কোনো কথা জোগায় না।”

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে কী হলো তাহলে পরবাসে এসে? একদা তিনি নিজেই লিখেছিলেন :

“আমার মত ভীরু সাঁতার-না-জানা লোক
পার হলো নদী -
এটাই নিয়তি।
অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়
- সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপটেন এক জাহাজসুদ্ধ ডুবে গেল
- ঊর্ধ্বাকাশ থেকে বোয়িং-৭০৭ অজগ্রামে পুকুরে তলালো
কিন্তু নদী পার হয়ে আমি গন্তব্যে পৌঁছুলাম?” (গাধা-টুপি প’রে)

এ কথা সত্যি যে, পরবাসী হওয়ার পর তাঁর লেখালেখি আশংকাজনকভাবে কম। তবু এর মধ্যেও উজ্জ্বল কিছু কবিতা তিনি রচনা করেছেন। তাঁর স¤প্রতি প্রকাশিত কবিতার কয়েকটি ছত্র উদ্ধৃত করা যাক :

“যাচ্ছি কোথায়, কেউ জানে না,
পাগলা হাওয়া বাধ মানে না,
রাতের কালো জলে আমার
কথা ছিল একটু থামার।
... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
একা-একা একলা অন্ধকারে
ক্ষান্তিবিহীন চলছে নৌকা বাওয়া,
তবুও আজ তিনপুরুষের বসতবাটির দাওয়া ...
মাঝে মাঝে বলছে হেঁকে -
এ তোমার কেমন চলে যাওয়া,
এ তোমার কেমন চলে যাওয়া।” (যাত্রা)

শহীদ কাদরীর কাব্যবিচারের ক্ষমতা আমার নেই। শুধু জানি, আমি তাঁর মুগ্ধ পাঠক।


৬.

প্রতিবার ফোনে কথা বলার সময় শহীদ ভাইকে নতুন কিছু লিখছেন কি না জিজ্ঞেস করি, অনেকটা নিয়ম করেই। বেশিরভাগ সময় জবাব আসে, ভাবছি।

সাক্ষাতের সময়ও জিজ্ঞেস করলাম। হাত তুলে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, “দুর, লিখে কী হবে?”

জানি, শরীর সক্ষম না থাকলে লেখালেখির চিন্তা মাথায় এলেও লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। নীরা ভাবীও পরে জানালেন, একটু ভালো থাকলে হয়তো কিছু একটা লেখার কথা ভাবে। কিন্তু পরদিন যখন ডায়ালিসিস থেকে ফিরে আসে, তখন সেই ভাবনা কোথায় হারিয়ে যায়। শরীরের যন্ত্রণা আর সবকিছুকে ঢেকে ফেলে।

দুর লিখে কী হবে-র উত্তরে বলি, “তা তো বুঝলাম শহীদ ভাই। কিন্তু বলতে পারেন, না লিখে কী হবে? সারাজীবন তো লিখতেই চেয়েছেন, তাই না?”

কবি নিরুত্তর থাকেন। তিনি কি সম্মতি জানালেন? আমরা অপেক্ষায় থাকবো।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৭ রাত ১১:৩১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×