somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : যাই (কিস্তি ৭)

২১ শে জুন, ২০০৭ সকাল ৯:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


২.৪

এক জীবনে কতোকিছু প্রত্যক্ষ করা হলো! কতো আলো-আঁধারি এই পৃথিবীর! বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে পেয়েছিলেন পৃথিবীর সর্বশেষ বড়ো যুদ্ধ। পতিত জাপান-জার্মানী। হিরোশিমা-নাগাসাকি। বৃটিশ তাড়াও। এরই মধ্যে দেশে অন্নের অনটন, অনাহারী মানুষের এমনই অবস্থা যে অবস্থাপন্নের দুয়ারে ভাত চাওয়ারও সাহস নেই, ভাতের ফ্যান চায়! হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। বিভক্ত ভারতবর্ষ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ এলো। লাল চীন। পাকিস্তানী তাড়াও। শেখ মুজিব। ১৯৭১। যুদ্ধ। নদীতে নদীতে ভেসে আসা অচেনা মানুষের লাশ। বাংলাদেশ। জয় বাংলা। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। সোভিয়েত-মার্কিন ঠাণ্ডা লড়াই। চিৎপাত পরাক্রান্ত সোভিয়েত। চীনে সামরিক শাসন। সৌভাগ্যবশে বাংলার নতুন শতাব্দী আর ইংরেজি নতুন সহস্রাব্দের শুরু দেখাও হলো।

কাচের ওপর দিয়ে ছবিগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে যাচ্ছিলেন এবারক হোসেন। ‘বুঝি তৃষ্ণার শেষ নেই, নেই...’।' তাঁর মনে হলো, কাচের নিচের হাসিমুখগুলোকে ছোঁয়া যায় না। সত্যিই আর যাবে না!

সব প্রিয় মানুষের ছবি সামনে নেই, অ্যালবামে তোলা আছে। অনেকগুলো মুখের ছবি কোনোদিনই ছিলো না, মনের ভেতরে আছে। তাঁর বাবার মৃত্যুর সময় বয়স হয়েছিলো একশোর ওপরে। বাপজান চলে গেছেন ছাব্বিশ বছর হয়, তখন তাঁর নিজেরই বয়স পঞ্চাশ। মা-কে হারিয়েছিলেন তিনি অনেক অল্প বয়সে, মায়ের স্মৃতি খুব বেশি নেই। ‘মাকে আমার পড়ে না মনে। ... / কোলের ’পরে ধ'রে কবে দেখত আমায় চেয়ে, / সেই চাহনি রেখে গেছে সারা আকাশ ছেয়ে...’।'

সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোটো। চার ভাইয়ের বড়ো দু’জন চলে গেছে, তিন বোনের একজনও আর নেই। ওদের সবার সারাজীবন গ্রামে কাটলো, এক তিনিই লেখাপড়া শিখে শহরবাসী হয়েছিলেন। বাপজান আর ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না হলে তাঁর এ পর্যন্ত আসা হতো না। দূরের শহরে যাননি বলে যাওয়া-আসাও ছিলো। বড়ো ভাইদের ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি ছোটোবাবা। ওদের কাছেও তিনি একজন সফল মানুষ, ওদের কেউ কেউ ছোটোবাবার মতো হয়ে উঠতেও চেয়েছে।

বোনদের কারো ছবি নেই তাঁর কাছে। এখন মনে হলো, নেই কেন? কোনোদিন ওদের কারো ছবি রাখার কথা মনে হয়নি! যে মুখগুলো হারিয়ে গেছে, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। দুটি অস্পষ্ট সুদূর মুখ তাঁর আচমকা মনে পড়ে। বিয়ের দু’বছরের মাথায় তাঁদের একটি মেয়ে হয়েছিলো, বেঁচেছিলো মাত্র কয়েকদিন। দুটি ছেলেমেয়ের পরে এসেছিলো আরেকটি ছেলে, নাম রেখেছিলেন ফারুক, মারা যায় দেড় বছর বয়সে। ওদের কোনো ছবি কোথাও নেই। আজ এখন ওদের জন্যে বুক হু হু করে।

বাপজান আর ভাইদের ছবি অ্যালবামে আছে। কোথায় আছে, তিনি জানেন না। জোহরা বেগমকে ডেকে বললে ঠিক বের করে দেবে, ওসব তার হেফাজতে থাকে। এখন হঠাৎ অ্যালবাম বের করার জন্যে তো এখন ওপর থেকে ডেকে আনা যায় না, কী ভেবে বসবে, কে জানে!

জ্যোৎস্নার কথা মনে আসে, জ্যোৎস্নাময় কুণ্ডু। খঞ্জনপুর হাই স্কুলে এবারক হোসেনের সহপাঠী-বন্ধু। কলেজের পড়াও শুরু হয়েছিলো একসঙ্গে, দেশভাগ জ্যোৎস্নাকে নিয়ে গিয়েছিলো অন্য এক দেশে। বহুবছর পর তার খোঁজ পাওয়া যায়, মাঝেমধ্যে চিঠিপত্র লেখালেখি হতো। দেখা হলো সেবার কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে গিয়ে। আগেই চিঠিতে জানিয়েছিলেন, জ্যোৎস্না সস্ত্রীক এয়ারপোর্টে উপস্থিত। কিছুতেই হোটেলে উঠতে দেবে না, নিজেদের বাড়িতে নিয়ে তুলেছিলো। জ্যোৎস্না আর্মিতে কর্নেল হয়ে রিটায়ার করেছে বেশ ক’বছর আগে। তাদের তিনটি মেয়ে, সবাই ডাক্তার। জ্যোৎস্না পুরনো বন্ধুদের কথা জানতে চেয়েছিলো, দেওয়ান মহসীন আলী এখন কোথায়?

ও তো নেই।

জ্যোৎস্না বলে, কী হয়েছিলো?

যুদ্ধের সময় মিলিটারিরা গুলি করে মেরে ফেলে, একটা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলো তখন ও।

একটু চুপ করে থেকে জ্যোৎস্না জিজ্ঞেস করে, আর আমাদের মুজিবর?

ওর এখনকার খবর ঠিক জানি না। ও পাগল হয়ে গিয়েছিলো। ঠিক পুরোপুরি পাগল নয়। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলো পড়তে। ওর সাবজেক্ট অঙ্ক। ফিরে এসে করাচি ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করে। তারপরে চলে আসে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে। মাঝে মাঝে আসতো, চিঠিপত্রেও যোগাযোগ ছিলো। আমি রাজশাহীতে কোনো কাজে গেলে দেখা হতো। শিক্ষক হিসেবে খুবই ভালো করছিলো। বিয়ে-টিয়ে করেনি। হঠাৎ করে সে আবোল-তাবোল কথা বলতে শুরু করলো। পাকিস্তান আমলের শেষদিকের কথা। মাথায় কী ঢুকলো কে জানে, সে নিজের নাম ঘোষণা করে বসলো - দেবদাস। আগে-পিছে কিছু নেই, শুধু দেবদাস। মুসলমানের ছেলে দেবদাস হয় কী করে? এই নিয়ে শুধু ইউনিভার্সিটি নয়, সারা রাজশাহীতে হৈচৈ। ওর তখন জীবনসংশয়, মোল্লারা ওকে মেরে ফেলবে বলে শাসাচ্ছে। রাজশাহী ছেড়ে যেতে হলো ওকে। হঠাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিনকয়েক আগে ধুম জ্বর নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। দিনকয়েক থেকে একটু সুস্থ হয়ে চলে গেলো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আর্মি ওর ভবঘুরে ভাবভঙ্গি দেখে ধরে নিয়ে যায়। নাম জিজ্ঞেস করলে বলে, দেবদাস। নাটোর জেলে ছিলো মাসকয়েক, তারপর ওকে ওরা ছেড়ে দেয় বোধহয় পাগল ভেবেই। পরে মাঝেমধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দিনকয়েকের জন্যে আসতো আমাদের বাড়িতে। চাকরি-বাকরি তো গেছে কবেই, কোথায় থাকে, কী করে বললে কোনো জবাব দেয় না। এমন অবস্থা যে, ও নিজে থেকে দেখা না দিলে ওর ভালোমন্দ জানারও কোনো উপায় নেই। অনেকদিন হয়ে গেলো, কোনো খবর নেই। বেঁচে আছে কি না, তা-ও জানি না।

জ্যোৎস্না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কী ব্রিলিয়ান্ট ছিলো ও।

রাতে খাওয়ার পরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে জানতে চেয়েছিলো খঞ্জনপুরের কথা। স্কুলটা কি আগের মতো আছে? কাছে ছোটো নদীটা এখন আর খেয়া নৌকায় পারাপার করতে হয় না, তার ওপরে পাকা ব্রীজ হয়ে গেছে শুনে বলেছিলো, যে রাতে আমরা দেশ ছেড়ে চলে আসি, খেয়ানৌকার মাঝি আমাদের কাছে কোনো পয়সা নেয়নি। শুধু বলেছিলো, সাবধানে যাবেন, বাবারা!

জ্যোৎস্না তাদের বাড়িটির কথা জিজ্ঞেস করেনি। একবার বলেছিলো, জানিস, এই শেষ বয়সে পৌঁছে আমার খুব ইচ্ছে করে সেই গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাই। মরে গেলে যেন আমার দাহ করা হয় খঞ্জনপুরে ওই নদীর ধারের শ্মশানে। কিন্তু সে তো আর হবার নয়। নিজের গ্রামেই আমি এখন বিদেশী...

জ্যোৎøার জন্যে তাঁর সেদিন কষ্ট হয়েছিলো। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ মানুষের ছোটো ছোটো ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেও কতো অসম্ভব অবাস্তব করে দেয়! জ্যোৎস্নার তুলনায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিলো। এখন মনে মনে বললেন, আমার সময় হলো, জ্যোৎস্না। আমি ফিরে যাচ্ছি দোগাছীতে। সবাইকে বলা আছে, আমার বাবা আর ভাইদের পাশে আমার জায়গা হবে। যাত্রাশুরুর জায়গায় ফিরে যেতে পারলে তবেই তো যাত্রা সম্পূর্ণ হয়, তাই না? কিন্তু তোরটা যে সম্পূর্ণ হওয়ার নয় রে, জ্যোৎস্না! রাষ্ট্রের দম্ভের কাছে, শক্তির কাছে তোর-আমার ক্ষমতা যে কিছুই নয়!

পড়ার টেবিল থেকে উঠে আবার ইজিচেয়ারে এসে বসলেন এবারক হোসেন। আলো জ্বালতে ইচ্ছে করেনি, অন্ধকারেই চোখ বন্ধ করে ছিলেন। বুকের ব্যথা এখন আর ততো তীব্র নয়, কিন্তু চাপ ধরা ভাবটা একটুও কমেনি। এই শীতের সন্ধ্যায় এই ঘরের ভেতরের দিকের দরজা-জানালাগুলো এখনো খোলা, তবু তাঁর একটুও শীত করছে না। বন্ধ চোখের সামনে দিয়ে চলচ্চিত্রের ছবির মতো একেকটা মুখ, একেকটা ছবি মুহূর্তের জন্যে আসে, মিলিয়ে যায়। অনেক দিনের ভুলে যাওয়া কতো মুখ আসছে। তিনি বোধহীন দর্শকের মতো শুধু দেখে যাচ্ছেন...
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×