ফোনে সিন্ডির গলার স্বর অস্থির। কিছু তাড়াও আছে বলে মনে হয়। কিন্তু তার উচ্চারণ ঘন ও একাগ্র, কথা স্পষ্ট। সাওকাট, আই নীড টু স্পীক টু ইউ। তোমার কি সময় আছে? ইট’স ভেরি ইমপর্ট্যান্ট।
শওকত বলে, বেশ তো, বলো।
ফোনে নয়, সামনাসামনি বলতে চাই।
কখন, কবে বলো।
তোমার সময় থাকলে আজ রাতেই, এখনই।
আমার কোনো সমস্যা নেই।
তাহলে আমি তোমার ওখানে চলে আসতে পারি? আই মীন, তোমার যদি অসুবিধা না থাকে।
চলে এসো, কোনো অসুবিধা নেই।
আধঘণ্টার মধ্যে আসছি আমি।
ফোন রেখে শওকত কিঞ্চিৎ কৌতুক বোধ করে। এক হিসেবে সিন্ডিও এই অ্যাপার্টমেন্টের ভাগীদার, লীজের চুক্তিতে শওকতের সঙ্গে তার নাম আছে। তবু আসার জন্যে তাকে অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়! হাস্যকর বটে। লীজের কাগজে স্বাক্ষর থাকলেও সিন্ডি এখানে বসবাস করে না। কখনো করেনি, কথাও ছিলো না। কিন্তু কী কথা বলতে আসছে সিন্ডি? রাত এখন প্রায় এগারোটা, অসময় তো বটেই। সামান্য অস্বস্তি লাগে। উদ্বেগ হয়। ভালো খবর নিয়ে সে আসছে না, তা অনুমান করা যায় নিশ্চিন্তে। জরুরি কিছু হবে নিশ্চয়ই যা কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না, ফোনেও বলা যায় না। বিষয়টা কি?
কাজ থেকে শওকত ফিরেছে সাড়ে ন’টায়। টিভিতে ডেভিড লেটারম্যানের লেট নাইট শো দেখছিলো সে। লেটারম্যান মজার লোক, মুচকি হাসি থেকে হো হো দমফাটানো হাসি-হাসানো সবই পারে সে। সেলিব্রিটিদের ইন্টারভিউ করতে গিয়ে উদ্ভট প্রশ্নে তাদের নাস্তানাবুদ করা লেটারম্যানের প্রিয় কীর্তি। তারপরেও তারা, বিশেষ করে উঠতি সেলিব্রিটিরা, এই অনুষ্ঠানে হাজির হওয়াকে গৌরবময় অর্জন বলে মনে করে। জানে, ভালোমন্দ যা-ই হোক, পরিচিতি কিছু বাড়াবে লেটারম্যান, যা শেষ পর্যন্ত কাজেই লাগবে তাদের। শো-বিজনেসে নেগেটিভ পাবলিসিটিও এক ধরনের পাবলিসিটি বটে, তাকে তুমি কীভাবে ভাঙিয়ে খেতে পারবে তা তোমার ব্যাপার।
ক্লাস এবং কাজের পরে দিনশেষে টিভি দেখা শওকতের একমাত্র আয়েশ। সাত বছর আগে এ দেশে এসেই টিভিতে আটকে গিয়েছিলো সে। দেশে থাকার কালে টিভি চ্যানেল ছিলো মোটে একখানা, তা-ও মাত্র কয়েকঘণ্টার। এখন তো দেশে নতুন নতুন চ্যানেল চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ দেশে বসেও স্যাটেলাইটে অনেকগুলো দেশী চ্যানেল দেখা যায়, অনেক বাড়িতে সে দেখেছে। তার আগ্রহ হয় না।
এ দেশে টিভি চ্যানেলের গোনা-গুনতি নেই, তার বেশিরভাগ দিবারাত্র চালু। একটি জিনিস শওকত বুঝে গিয়েছিলো, মার্কিনি ধাঁচের উচ্চারণে ও টানে ইংরেজি শিখে নেওয়ার সবচেয়ে সোজা পথ হলো প্রচুর টিভি এবং হলিউডি ছবি দেখা। বাক্যগুলো কীভাবে গঠিত হচ্ছে, একেকটা শব্দ উচ্চারণের সময় ঝোঁকটা কোথায় পড়ছে, মার্কিনি উচ্চারণের ধরণ - এইসব খেয়াল করা। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজে শেখা বৃটিশ ইংরেজির থেকে এখানকার ইংরেজি একেবারে অন্যরকম। প্রথম প্রথম বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গেলে কোনো ঝামেলা নেই, কিছু বানানের পার্থক্য ছাড়া ব্যাকরণ সেই একই। মুখে বলার ধরণ ও উচ্চারণ খুবই আলাদা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকাতরে টিভি দেখা তাকে মার্কিনি ইংরেজিতে অভ্যস্ত করে তুলেছে। এ দেশীয়দের কায়দায় প্রায় নিখুঁতভাবে ইংরেজি বলা এখন পুরোপুরি শওকতের আয়ত্বে। এমনকি, কথা বলার সময় দরকারমতো কাঁধ ঝাঁকানো-টাকানোসহ।
ঢাকায় তাদের বসবাসের দুই পুরুষ চলছে, শওকত আর তার বড়ো দুই ভাইবোনের জন্মও ঢাকায়। অথচ বাড়িতে সামান্য ঢাকাইয়া মিশেল সহযোগে সিলেটের মৌলভীবাজার অঞ্চলের ভাষাই চলে। দেশের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা এলে তাদের ঢাকার বাড়ি এখনো মৌলভীবাজার হয়ে যায়।
শওকতের পিতা সেনাবাহিনীতে ডাক্তার ছিলেন, কর্নেল হয়ে অবসর নিয়েছেন দু’বছর আগে। এখন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, ফার্মগেটে নিজস্ব চেম্বারসহ ওষুধের দোকান। পশার ভালোই, বাংলাদেশে রোগীর অভাব কোনোকালে হওয়ার নয়। ফলে শওকতের পড়াশোনার খরচ দেশ থেকে পাঠাতে অসুবিধা কিছু হয় না। থাকা-খাওয়া বা আনুষঙ্গিক খরচও পাঠাতে ইচ্ছুক বাবা, যাতে তার পড়াশোনার ব্যাঘাত না ঘটে। শওকতের সংকোচ হয়। এ দেশের একেকটি ডলারের জন্যে বাংলাদেশের প্রায় সত্তর টাকা লাগে। জানে, বাবার সঙ্গতি আছে এবং চাওয়ামাত্র তিনি সানন্দে সে ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু শওকত নেবে কেন?
আমেরিকায় আসার পর থেকেই নিজে কাজ করে সে। টানাটানি হয় মাঝেমধ্যে, সেমেস্টার বাদ পড়ে যায়, তবু নিজের রোজগারে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিও আছে। আর বছরখানেকের মধ্যে পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এরপরে দেশে গিয়ে সে স্থিত হবে, বাবা-মা দু’জনেরই বাসনা তাই। বড়ো ভাই আর্মিতে, তার পোস্টিং ঢাকার বাইরে। বোনটিরও বিয়ে হয়ে গেলো বলে। সুতরাং ঢাকার বাড়িতে অচিরে বাসিন্দা বলতে বাবা-মা ছাড়া আর কেউ থাকছে না। শওকতকে তাঁরা কাছাকাছি চান, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কর্তব্যপরায়ণ ও বাধ্য ছেলে হিসেবে প্রথম কয়েক বছর তার সম্পূর্ণ ইচ্ছে সেরকমই ছিলো। এখন আর সে ততো নিশ্চিত নয়।
ডেভিড লেটারম্যান শেষ হলে শওকত রিমোট চেপে চ্যানেল বদলাতে থাকে। হিস্ট্রি চ্যানেলে বার্লিন দেওয়াল নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। বার্লিনের দেওয়াল ভাঙার উৎসব। ধারাভাষ্যকার বলে যায়, দুই জার্মানির মধ্যে মানুষজনের যাতায়াত বন্ধের জন্যে এই দেওয়াল তোলা হয়েছিলো। পরিহাসের বিষয়, ইতিহাসের চক্রে ২৮ বছর পর তা ভাঙা হলো সেই যাতায়াতের সুবিধার জন্যেই।
আজ তার ক্লাস ছিলো না। কাজে গিয়েছিলো দুপুর একটায়, শেষ করে ফিরেছে একটু আগে। বেনিগ্যান’স নামের একটি আইরিশ-আমেরিকান রেস্টুরেন্টের কিচেন তার কর্মস্থল। এ দেশে আসার আগে সে রান্নাঘরে কোনোদিন ঢোকেনি। দরকার হলে বড়োজোর গরম পানি রান্না করার ক্ষমতা ছিলো বলে তার ধারণা, তা-ও করে দেখা হয়নি কখনো।
আমেরিকায় সে এখন ছাত্র এবং রন্ধনশালার কর্মী। মূল রন্ধনকর্মের জন্যে আছে শেফরা, তার কাজ প্রেপ করা। শওকত লক্ষ্য করেছে, আমেরিকানরা যে কোনো শব্দ সংক্ষেপ করায় খুবই পারদর্শী। প্রেপারেশনকে বানানো হয়েছে প্রেপ। সেদ্ধ করা মুরগির হাড় ছাড়িয়ে মাংস কুচি করে বা চৌকো করে কাটো, গোমাংসের কিমা পরিমাণমতো নিয়ে গোলাকৃতি চ্যাপ্টা প্যাটি বানাও স্টেক বা বারগারের জন্যে, আলু-পেঁয়াজ কেটে দাও, সালাদের জন্যে ফল-সবজি ও আনুষঙ্গিক সব তৈরি রাখো - শওকতের কাজ বলতে এই। সে একা নয়, ছ’সাত জোড়া হাত এই কাজ একনাগাড়ে করে যায়।
রেস্টুরেন্টে বাঙালি আরেকজন আছে, টিংকু। শেফের কাজ করে, সে-ই শওকতের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। ঠিক চাকরি দেওয়া নয়, বদলি করিয়ে আনা। চেইন রেস্টুরেন্ট বেনিগ্যান’স-এর যেটাতে শওকত প্রথম ঢুকেছিলো, বাসা থেকে সেখানে যেতে-আসতে ড্রাইভ করতে হতো ষাট-সত্তর মাইল। এখন যাওয়া-আসা মিলিয়ে পনেরো-ষোলো। অনেকটা সময় ও অধুনা দুর্মূল্য গ্যাসের খরচ বাঁচে। গাড়ির আয়ুও। তার টয়োটা করোলার বয়স তার এ দেশে বসবাসের বয়সের সমান, যদিও এর মালিকানা পেয়েছে সে বছর দুয়েক হয়। এর আগেরটা ছিলো নিসান সেন্ট্রা। বারো বছর বয়সী বুড়ো সেন্ট্রাকে এক সকালে আর ঘুম থেকে জাগানো গেলো না, ট্রান্সমিশন বসে গিয়েছিলো। সারানোর খরচ গাড়ির বাজারদরের সমান। পাঁচ বছর মেয়াদী মাসিক কিস্তিতে তখন শওকত অন্য কারো ব্যবহৃত এই করোলা কিনেছিলো। ব্যবহৃত অবস্থায় কেনা হলেও নির্ভরযোগ্য এখনো, শওকত গাড়ির যতœও করে, তবু বয়স হয়ে যাওয়া গাড়ির ভরসা নেই। যে কোনো সময় হয়তো বসে যাবে, এবং তাকে পথে বসাবে।
টিংকু আরেকটি কাজ করেছিলো শওকতের জন্যে। সিন্ডির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সিন্ডি এখানকার হোস্টেস। খেতে আসা মানুষজনকে প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে বেনিগ্যান'স-এ স্বাগত জানানো এবং তাদের টেবিলে নিয়ে বসানোর কাজ তার। সিন্ডির বান্ধবী মিশেলকে বিয়ে করেছে টিংকু, তাদের এক বছর বয়সী একটি বাচ্চাও আছে। শওকত নিজে কখনো এদেশীয় মেয়েকে বিয়ে করবে না। তবু করতে হয়েছে, চুক্তির বিয়ে। টিংকুর মধ্যস্থতায় সিন্ডি দু’বছরের চুক্তিতে কাগজের বিয়ে করতে সম্মত হয় শওকতকে গ্রীনকার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। দীর্ঘকালের বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সিন্ডির সম্প্রতি তখন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে তাদের জানাশোনা, বাগদানও হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ের ঠিক আগে সিন্ডি বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করে তার বয়ফ্রেন্ডটি অবিশ্বস্ত, একাধিক মেয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক রাখার প্রতিভাসম্পন্ন। এই আবিষ্কারে সিন্ডি বড়ো রকমের একটি ধাক্কা খায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় কখনো বিয়েই করবে না সে।
টিংকু আর মিশেল দূতিয়ালির কাজটি করে, দু’জনে সিন্ডিকে বুঝিয়ে বলেছিলো, এটা সত্যিকারের বিয়ে নয়, শুধুই কাগজপত্রে। একসঙ্গে বসবাসের প্রশ্নও নেই, আর শওকত যে ধরনের লাজুক ছেলে, সে কোনোদিন হাতটিও ধরতে চাইবে না। গ্রীন কার্ডের জন্যে কেবলমাত্র কাগজপত্রে দেখাতে হবে যে তারা বিবাহিত, তাদের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে এবং অ্যাপার্টমেন্টের লীজ কনট্রাক্টে দু’জনের নাম আছে। কাউন্টি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে যে বিয়েটি হবে তা শুধুই একটি কাগজে সই করার বেশি কিছু নয়। আর ইমিগ্রেশন অফিসে বার দুয়েক যেতে হবে ইন্টারভিউয়ের জন্যে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ১২:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


