সহকর্মী হিসেবে শওকতের সঙ্গে সিন্ডির খানিকটা বন্ধুত্বমতো আগেই ছিলো। সিন্ডি রাজি হয় বন্ধুর উপকারটি করতে। টাকাপয়সা বা অন্য কোনো লেনদেনের ব্যাপার নেই। তার নিজের কিছু এসে যায় না। কোনো লোকসান কিছু নেই, শওকতের এ দেশে থাকার কাগপত্রের যদি একটা গতি হয়ে যায়, ক্ষতি কি? আর সে নিজে বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছে। মাত্র বছর দুয়েকের ব্যাপার, শওকতের গ্রীনকার্ড হয়ে গেলে কাগজে সই করে ছাড়াছাড়ি করে নিলেই হলো। কাগজের বিয়ে কাগজেই শেষ। সিন্ডি একটিমাত্র শর্ত, এই খবর যেন আর কারো কানে না ওঠে। সামাজিকভাবে তা ভালো দেখায় না। আর ইমিগ্রেশন ঘুণাক্ষরেও টের পেলে শওকতকে বড়োজোর ডিপোর্ট করবে, কিন্তু তাকে জেলে যেতে হবে।
চুক্তি অনুযায়ী বছর দেড়েক আগে কাগজে-কলমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ইমিগ্রেশনে শওকতের জন্যে আবেদনও করে আসে সিন্ডি। শওকতের অস্থায়ী গ্রীনকার্ড হয়ে আছে। আর মাস ছয়েকের মধ্যে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের জন্যে ডাকবে, ইমিগ্রেশন মামু সন্তুষ্ট হলে তবে স্থায়ী গ্রীনকার্ড।
টিভিতে চোখ থাকলেও শওকতের অস্বস্তি বাড়ে। ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এরকম উদ্বিগ্ন গলায় ফোন আগে কোনোদিন করেনি সিন্ডি। এমনিতে কাজের বাইরে কথাবার্তা তেমন হয়ও না, হঠাৎ কোনো কারণে সিন্ডি বারকয়েক ফোন করেছে, এ বাসায় এসেছেও। এই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়ার সময় লীজের কাগজে সই করতে এসেছিলো, আগের বাসা থেকে এখান উঠে আসার সময় শওকতের জিনিসপত্র টানাটানির সময় টিংকু-মিশেলের সঙ্গে সে-ও হাত লাগিয়েছে। শওকতের জন্মদিনে টিংকু আর মিশেলের সঙ্গে এসেছিলো সর্বশেষ। সেদিন তাদের দু’জনের একত্রে কিছু ছবি তুলে দিয়েছিলো টিংকু। বলেছিলো, ছবিগুলো রাখিস, বড়ো মামুর লগে তোর ইন্টারভিউয়ের সময় কামে লাগবো। টিপুর পরামর্শে একটি ছবিতে শওকতকে সিন্ডির কাঁধে হাত রেখে গালে গাল লাগাতে হয়। অস্বস্তি হয়েছিলো, এই প্রথম কোনো অনাত্মীয় মেয়ের শরীরের এতো ঘনিষ্ঠ হওয়া তার। কাগজে-কলমে হলেও সিন্ডি তো সত্যি সত্যি তার বউ নয়। কোনো দুর্বলতা জন্মায়নি, এই মেয়েটি তার সত্যিকারের বউ হলে কেমন হতো, তা-ও মনে আসেনি। বিয়ে করা বউ হলেও সিন্ডি বাইরের মানুষ, বউ নয়।
দরজায় টোকা পড়ার আগে বসার ঘরটি একটু ভদ্রস্থ করবে ভেবেছিলো। টিভিতে বার্লিনের দেওয়াল দেখতে দেখতে ভুলেই গেলো। ঘর গোছানোর দরকার খুব একটা ছিলো, তা নয়। ব্যাচেলর একটি ছেলের ঘর ছবির মতো গোছানো হওয়া সম্ভব নয়। কেউ হয়তো তা আশাও করে না। এককালে নাকি মেয়েরা - মা, ভাবী-বউদি, এমনকি প্রেমিকা - মৃদু অনুযোগ ও কপট বকুনিসহ ব্যাচেলরদের ঘরটর গোছানোর কাজটি সম্পন্ন করে দিয়ে যেতো। কিন্তু কাগজের বিয়ে মানে সংসারী হওয়া নয়, এই বউয়ের কাছে সেসব আশা করা চলে না। বউ নিজের ঘরে আসছে ফোন করে অনুমতি নিয়ে - তা-ও শুধু কাগজের বিয়েতেই হওয়া সম্ভব।
ঘরে ঢুকে সিন্ডি হাতব্যাগটি পাশে রেখে সোফার ওপরে ধপ করে বসে। কে জানে কেন এই প্রথম শওকত অনুভব করে, মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী। আগে এরকম মনে হয়নি কেন? পায়ের গোড়ালি পর্যšত নামানো সাদা স্কার্টের সঙ্গে পরেছে লাল রঙের ব্লাউজ। কাঁধ পর্যন্ত নামানো সোনালি চুলগুলি সামান্য এলোমেলো। তার মুখচোখ খানিকটা বিপর্যস্ত। শওকত সাবধানে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছো, সিন্ডি?
ভালো না।
তোমাকে খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে, কী হয়েছে?
সেটা বলতেই আসা। গলাটা শুকিয়ে আছে, একটু পানি পেতে পারি?
নিশ্চয়ই। পানি খাবে, নাকি কোক?
সিন্ডি একটু ম্লান হাসে, যে কোনো একটা হলেই চলে।
শওকত গ্লাসের আধাআধি পর্যন্ত ভরে ফেলে বরফের টুকরো দিয়ে। ফ্রিজ থেকে কোকের ক্যান বের করে গ্লাসে ঢালে। খানিকটা ঢেলে থামতে হয়, ক্যানে আবদ্ধ কোকের বুদবুদ গ্লাস ভরিয়ে দিয়েছে। তাকিয়ে বুদবুদগুলোকে মিলিয়ে যেতে দেখে সে। তারপর আবার ঢালে।
গ্লাসে ছোটো চুমুক দিয়ে সিন্ডি বলে, আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু তোমার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিটা আমি রাখতে পারছি না, সাওকাট।
শওকত জানে, সিন্ডি কোন প্রতিশ্রুতির কথা বলছে। ওই কাগজের বিয়ে ছাড়া আর কোনো দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার নেই তাদের। সে চুপ করে থাকে।
আরেক চুমুক কোক গলায় নামিয়ে সিন্ডি বলে, আমি জানি ব্যাপারটা তোমার জন্যে ভালো হচ্ছে না। তোমার কাগজপত্রের ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু আশা করি তুমি বিশ্বাস করবে যে আমার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু সিন্ডি, ব্যাপারটা আর মাত্র মাস ছয়েকের। তুমি খুবই বন্ধুর মতো আমার উপকার করতে চেয়েছিলে, তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। এতোদূর পর্যন্ত এসে সামান্য সময়ের জন্যে সব ওলটপালট করে দেওয়াটা কেমন অর্থহীন হয়ে যায় না?
জানি সাওকাট। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ব্যাপারটা চুকে যেতো। কিন্তু আমি সত্যিই অপারগ।
শওকত একটু চুপ করে থেকে বলে, বেশ তো, তাহলে কী করতে চাও বলো।
বিয়েটা অ্যানালমেন্ট করাতে হবে। ডিভোর্স নয়, অ্যানালমেন্ট।
মানে?
ডিভোর্স হলে সেটা সারাজীবন আমার রেকর্ডে থেকে যাবে। যদিও এটা কোনো বিয়ে ছিলো না এবং শুধু একজন বন্ধুকে সাহায্য করতে যাওয়া ছাড়া যে আর কিছু নয়, এই কথা কেউ বুঝবে না। আসলে জানানোও যাবে না। কাকে বলবো, কীভাবে ব্যাখ্যা করবো? বললে কে বিশ্বাস করবে? যদি তোমার সঙ্গে আমার সেরকম একটা ভালোবাসার সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যেতো, আমরা সত্যিকারের দম্পতির মতো ঘরসংসার করতাম, তাহলে না হয় কথা ছিলো। তখন তাকে আর মুছে ফেলার কথা উঠতো না। হয়তো আমরা চাইতাম না, চাইলেও পারা যেতো না। তা তো হয়নি। এখন অ্যানালমেন্ট করলে ভবিষ্যতের এই যন্ত্রণা আমাকে পোয়াতে হয় না। শুধু আমি কেন, তুমি এ দেশে বাস করতে চাইলে ওই ডিভোর্স তোমাকেও সারাজীবন ভোগাবে।
কফি টেবিলে রাখা সিন্ডির কোকের গ্লাস দেখে শওকত। সেখানে আর কোনো বুদবুদ উঠতে দেখা যায় না। অর্ধেক গ্লাস নিরেট কোক। চুপ করে থাকে সে। কী বলবে? কী বলা যায়?
সিন্ডি বলে, অ্যানালমেন্টটা সেরে ফেলতে হবে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু তুমি জানতে চাও না কী এমন হলো যে আর ছ’টা মাস আমি অপেক্ষা করতে পারছি না?
কারণ নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, তোমার কাছে তার ব্যাখ্যাও আছে। ইচ্ছে হলে বলবে, না হলে নয়। পুরোটাই তোমার ব্যাপার।
বন্ধু হিসেবেও জানতে চাইতে পারতে।
তা পারতাম। কিন্তু তুমি জানো, আমি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনো কৌতূহল দেখাই না। উচিতও মনে করি না। ইচ্ছে হলে বলতে পারো, আমার শুনতে আপত্তি নেই।
তুমি কি খুব রেগে যাচ্ছো?
শওকত মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ফলাফল যা হয় তাকে মলিন মুখের হাসি বলা চলে বড়োজোর। বলে, যা হওয়ার তা হবে, রাগ করবো কেন?
এক চুমুক কোক খায় সিন্ডি। বলে, তোমাকে বলবো বলেই এসেছি। না হলে ফোনেই আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারতাম। বললে আশা করি তুমি বুঝবে, সিদ্ধান্তটা আমাকে কেন নিতে হলো।
বলো, শুনি।
তিন মাস আগে এক পার্টিতে একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। আমরা দেখা করতে শুরু করি। পরস্পরকে পছন্দের ব্যাপার ঘটে। প্রেমও। স্টিভ আমাকে বিয়ে করতে চায়। তোমার ব্যাপারটা ভেবে বিয়ে পিছিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলাম। ওকে বলেছি, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। স্টিভ নাছোড়বান্দা, একটুও অপেক্ষা করতে চায় না। একদিন অবুঝের মতো বলতে লাগলো, আমাকে ভালোবাসলে বিয়ে করতে চাও না কেন? আর আমাকে নিয়ে স্টিভ এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে বলেও মনে হয়, আমাকে সে হারাতে চায় না। আমিও ওকে খুবই ভালোবাসি।
একটু থেমে সিন্ডি কোকের গ্লাসে ছোটো একটা চুমুক দেয়। শওকতের বলতে ইচ্ছে হয়, এই তুমিই কখনো সংসার পাতবে না ঠিক করেছিলে, তার কী হলো? বলে আর কী লাভ! সে চুপ করে থাকে।
সিন্ডি নিজেই তার ব্যাখ্যা দেয়, আমার আগের বয়ফ্রেন্ডের কথা তুমি জানো। তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বিয়ে সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমি সেই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি, সত্যি বলতে কি স্টিভের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। এখনকার এই বিশ্বাস, এই অনুভূতিটাও আমি আর হারাতে চাই না। ওকে আমি সত্যিই খুব ভালোবাসি। আশা করি তুমি বুঝতে পারছো, সাওকাট।
শওকতের অনেক প্রশ্ন মনে আসছে। ইমিগ্রেশনের কাজ মিটিয়ে তখন কি অ্যানালমেন্ট করার উপায় থাকতো? ঝামেলা নিশ্চয়ই হতো। অ্যানালমেন্ট করা বিয়ের সুবাদে পাওয়া গ্রীন কার্ডও বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। গত দুই বছর বিবাহিত দম্পতি হিসেবে দুজনের একত্রে ট্যাক্স ফাইল করা হয়েছে, ইমিগ্রেশনের কাছে বিয়েটা আরো বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে। তার কী হবে? অ্যানালমেন্টে তা মুছবে না। এখন এসব বলার কোনো মানে নেই আর, শওকত জানে।
সে আস্তে করে বলে, বুঝতে পারছি। মিশেল-টিংকু জানে?
না, ওদের সঙ্গে এখনো কথা বলিনি। ওরা খুবই আশ্চর্য হবে আমি জানি। তাতে কিছু এসে যায় না। ক্ষতি যা হওয়ার, তা তোমারই। আশা করি তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না। তোমাকে সাহায্য করতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু হলো না। আমাকে ক্ষমা করো, সাওকাট।
মন খারাপ কোরো না, সিন্ডি। তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা তুমি করেছো। বন্ধুরা তাই করে। তোমার জীবন, তোমার ভবিষ্যতের চিন্তা তোমাকেই করতে হবে। নিজের জন্যে যেটা সবচেয়ে ভালো হয়, তাই তোমার করা উচিত।
আমি শুধু ভাবছি, তোমার এখন কী উপায় হবে?
একটা কিছু হয়ে যাবে, ভেবো না। না হলে দেশে ফিরবো। ফিরে যাওয়ার রাস্তা তো খোলা আছেই।
সিন্ডি কোকের গ্লাসে শেষ চুমুক দেয়। বলে, কিন্তু তুমি এ দেশে থাকতে চেয়েছিলে। এখন আমি কি তোমার জন্যে অন্য কোনো মেয়েকে খুঁজবো?
না, ধন্যবাদ। তার দরকার নেই।
সিন্ডি উঠে দাঁড়ায়। শওকতও। সিন্ডি বলে, তোমার সময় হলে পরশু আ্যনালমেন্টের সই-সাবুদের ব্যাপারটা সেরে ফেলতে চাই।
ঠিক আছে, তাই হবে।
কখন কোথায় আসতে হবে, আমি তোমাকে কাল ফোন করে জানিয়ে দেবো।
কাল সন্ধ্যায় ফোন কোরো, তখন ঘরে থাকবো।
সিন্ডি করমর্দনের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আমরা কি এখনো বন্ধু থাকতে পারি?
শওকত সিন্ডির বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে, নিশ্চয়ই।
সিন্ডি এগিয়ে এসে শওকতকে আলতো আলিঙ্গন করে। দরজা খুলে বাইরের ল্যান্ডিং-এ দাঁড়ায়। বলে, একটা কথা বলি। ইচ্ছে হলে বিশ্বাস করতে পারো, না-ও পারো।
বলো।
সাওকাট, তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি। তুমি একটিবার চাইলে স্টিভ কেন, আর কাউকেই আমার দরকার ছিলো না। তুমি কোনোদিন ফিরেও দেখলে না, আমি কিন্তু অপেক্ষায় ছিলাম। শুধু কাগজে নয়, তুমি একবার চাইলে আমি সত্যি সত্যিই তোমার হতে পারতাম।
সিন্ডি বিদায় নেওয়ার অনেক পরে একা ঘরে শওকতের মনে হলো, বার্লিনের দেওয়াল উঠেছিলো কেন? ভেঙে ফেলা হবে বলেই তো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


