বঙ্গভবনের দিনগুলি - ৫
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী
একজন কলামিস্ট যিনি আগে পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, বঙ্গভবনে আমি যোগ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে এক গ্রন্থ লিখলেন। এতে কোন কোন সাংবাদিকের ইন্ধন ছিল এবং একজন সাংবাদিক ও বঙ্গভবনে তার ভাই এ লেখার সঙ্গে জড়িত বলে কয়েকজন সাংবাদিক আমাকে জানান। অবশ্য কলামিস্টটি আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ইতিপূর্বেও লিখেছেন এবং বঙ্গববনে প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দেয়ার পর লিখে এক কূটনৈতিক রিসিপশনে বন্ধুদের বললেন, বিরুদ্ধে লিখলেই দেখি তার আরও প্রমোশন হয়। এরপর আল্লাহ আমাকে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বানিয়েছেন। এর আগে আমি ওকাবে থাকাকালে তিনি লেখার পর আমি ওকাবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই। ব্যাক্তিগত পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরেও আওয়ামীলীগ আমলে আমার বিরুদ্ধে পাচ পাতার দরখাস্ত দিয়েছিলেন এবং তাতে লিখেছেন, বিষয়: মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। আব্বা যখন চাকরীকালে অধীনস্তদের বস ছিলেন তখন তারা যে আড়ালে ষড়যন্ত্র ও হিংসা করতেন তা তিনি বুঝতেন। আব্বা বলতেন আল্লাহ চুল ধরে টানলে বান্দা পায়ে ধরে টেনে কিছু করতে পারবে না। আমার বিরুদ্ধে লোকজনের ষড়যন্ত্রের সময় পিতার কথাই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে।
পরবর্তীখালে বঙ্গববনে একটা টিমের মত কাজ করেছি। দেশ ও প্রেসিডেন্টের মান-মর্যাদা ইমেজ তুলে ধরতে আমাদের কার্যক্রম স্মৃতিপটে এখনও জ্বলজ্বল করে ভাসে। পরে সেই কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, প্রথমে তারা আমাকে আন্ডার এস্টিমেট বা আন্ডারমাইন করেছিলেন। জাতীয় স্বার্থ ছিল আমাদের কাছে সবোর্চ্চ অগ্রাধিকার। অনেক পদস্থ লোকজন খুশি করতে গিয়ে আমাকে সেলফ মেইড ম্যান আখ্যা দিলেন। আর অনেকে বললেন, আপনার দেশে বিদেশে যে ক্রেডেনশিয়াল হয়েছে তা শত্রুতা ছাপিয়ে গেছে।
বঙ্গভবনে আগে প্রেস সেক্রেটারীর কোন অনার বোর্ড ছিল না। ফলে আগে কে কে প্রেস সচিব ছিলেন তা এ অফিসে যারা আসতেন তারা জানতে পারতেন না। আমি সেখানে যোগ দিয়েই স্বাধীনতার পর থেকে সচিবদের যোগদান ও বিদায়ের নথিপত্রের দিন তারিখ ঘেটে এবং সংশ্লিস্টদের সাথে যোগাযোগ করে আপডেট বা হালনাগাদ তালিকা তৈরী করে প্রেস সচিবের রুমে অনার বোর্ড স্থাপন করি। দিনরাত কাজ করার কারনে রুমের মধ্যে একটি বোর্ড স্থাপন করি, যেটি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রেসিডেন্ট থাকাকালে রোগী দেখার কাজে ব্যবহার করতেন। ১১ জানুয়ারী ২০০৭ যারা বঙ্গভবনে গেছেন তারা দেখেছেন এই বোর্ডেই আমার ব্যাক্তিগত চিকিৎসক আমার ইসিজি ইকো ইত্যাদি করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের উপদেস্টা হিসেবে এ রুমেই আমার নেমপ্লেট লাগানো ছিল। উপদেষ্টা হিসেবে আমার পিএস, যিনি সরকারের উপসচিব, তার ও আমার এপিএস এর জন্য বঙ্গভবনের দোতালায় সাদা কাচ দ্বারা দুটি দৃষ্টি নন্দন বড় রুম করা হয়েছিল। এখনো যারা বঙ্গভবনে যান তাদের কাছে এগুলো আমার স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
বঙ্গভবনে প্রেস উইং ছিল সবচেয়ে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। বঙ্গভবন ডায়েরীতে প্রেস উইংকে প্রেস শাখা লেখা হয়েছিল। এ নিয়ে সরকারী কর্মকর্তাদের উপর সঙ্গত কারনেই আমি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলাম। তারা বললেন স্যার আমরা তো ডায়রীতে এভাবেই লিখে আসছিলাম। আগেতো স্যাররা কেউ এভাবে বলেননি। আমি বললাম কোন পদস্থ কর্মকর্তা কোন উইং কিংবা বিভাগ এবং সবোর্পরি যার যা প্রাপ্য তা থেকে বঞ্চিত ও অমর্যাদা করা চলবে না। ডায়রী সংশোধীত হলো, কর্মকর্তারা ক্ষমা চাইলেন। প্রেস সচিব ছাড়াও উপ-প্রেস সচিব ও সহকারী প্রেস সচিব নামে প্রথম শ্রেণীর দুটি পদ আছে প্রেসিডেন্টের প্রেস উইং এ। অথচ প্রেসিডেন্টের প্রেস উইং এ গিয়ে দেখি দুজন পিয়ন। প্রেস সচিবের জন্য একজন নির্ধারিত। এরপর বাকী দুজন কর্মকর্তা, অফিস সাপ্তাহিক ছুটির দুদিন সহ প্রতিদিন প্রেস ক্লিপিং করা এসব মিলিয়ে একজন পিয়ন বরাদ্দ। দেশের সবোর্চ্চ অফিসে এ ব্যবস্থা কল্পনা করাই যায় না। উপজেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তার কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া অমাদের সহকারী প্রেস সচিবও উইএনও সম মানের। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার চালু হলে বঙ্গভবনকে এভাবে প্রাপ্য সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমলারা এ কাজ করলেও তার দায় পলিটিশিয়ানদের নিতে হয়েছে। প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ছাড়াও আগে য্রেস উইংয়ে তিনজন উপ-প্রেস সচিব ও তিনজন সহকারী প্রেস সচিব দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সেটআপ প্রধানমন্ত্র অফিসে চলে গেল। আর প্রেসিডেন্ট অফিসে ডিপিএস ও এপিএসের সংখ্যা একজন করে কবে হলো। আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার এমনই হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট অফিসে প্রেস উইংয়ের পরিবর্তে পিআরও বা জনসংযোগ কর্মকর্তা দেয়ার চিন্তা পর্যন্ত হয়েছিল।কিন্তু সর্বোচ্চ অফিস হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্টকে টিটুলার হেড দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত সেটআপ এভাবে সংকাচিত করা হয়।
যা হোক, এরপর প্রেস উইংয়ের পিয়নের সংখ্যা চারজনে উন্নীত করি। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায় অনুযায়ী দিনে দু’বার প্রেস ক্লিপিংও চালু করতে হয়েছিল। পরে প্রেসিডেন্টের অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর কাজ আরো বেড়ে গেলে কিপ্লিং যথা পূর্বং তথা পরং তথা আগের মতোই একবার হয়ে যায়। আমি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হলে মন্ত্রীর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আমার আাদা স্টাফ আসেন।তাদেরকেও আমি প্রেসিডেন্টের কার্যক্রম ও প্রেস উইংয়ের কাজে নিয়োজিত করি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রে অফিসটি সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে। সবাইকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে কঠোর নির্দেশ জারি করি। আমি চলে আসার পর প্রেস সচিবের রুম থেকে বেডটি৫ সরিয়ে ফেলা হয়। পিয়নও একজন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আমার পিএস ও এপিএসের দুটি দৃষ্টিনন্দন রুম করে দেয়ায় এখন ডেপুটেশনে আতরাসহ অন্যরা এরবং অফিসের জরুরি কাগজপত্র রাখা ইত্যাদি কারণে এগুলো ব্যবহার করতে পারছেন। বঙ্গভবন যেহেতু রাষ্ট্রীয় হেরিটেজ বিল্ডিং, সেজন্য এত কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংস্কার আমরা করিনি। এর হেরিটেজ ক্যারেক্টার ঠিক রেখে ওই রুম দুটি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। উপ-প্রেস সচিবকে অফিসে আনা নেয়ার জবন্য অন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। আমি অফিসের প্রয়োজনে তার সার্বক্ষণিক গাড়িরও ব্যবস্থা করেছিলাম। প্রেস সেক্রেটারিকে বলা হয় রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা। তিনি প্রেস উইংয়ের কর্ণধর। কোরআনে আল্রাহ তা’লা নেতা বা বসের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে এসব বিষয় নির্দেশ আকারে থাকে। এইচএম এরশাদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার রুমে প্রেসিডেন্টের চেয়ারের পেছনে লেখা ছিল-‘ফলো টু ইনস্ট্রাকশন। নাম্বার ওয়ান- বস ইজ অলওয়েস রাইট। নাম্বার টু-ফলো নাম্বার ওয়ান ইনস্ট্রাকশন।’
অর্থাৎ ঘুরে ফিরে দেয়ালে ফ্রেমবন্দি একই নির্দেশ অনুসরণ করতে হয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান কোই পদ ধরে রাখতে পারেন না। তাদের পদকে যথাযথ করে রাখার জন্যই তাদের সহযোগিতার জন্য সর্বোচ্চ র্যায়ের কর্মকর্তা এখানে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের এইড বা সহযোগীরা হচ্ছেন এসব পদের এক্সটেনশন। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও ভিাগ থেকে সিনিয়র কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ভবনে নিয়োগ নজির রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে সর্বোচ্চ ভবনের সিকিউরিটি ও মর্যাদা ধরে রাখা সম্ভব হয়। বঙ্গভবনে জুনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে তাকে বঙ্গভবনের অধিনস্থ অন্য অফিসগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাকে উল্টো স্যার কলতে হবে। এতে কাজ করদেও অসুবিধা হয়। আমাদের দেশে এই অসুবিধার ঘটনাও দীর্ঘকাল ধরে হয়ে আসছে। এদেশে সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনকারলে প্রেসিডেন্টের প্রেস উইংকে কেবল সংকুচিত করা হয়নি, সরকারী ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিবের নূন্যতম মর্যাদা করা হয়েছে যগ্ন সচিব পর্যায়ের। অবশ্য বাইরে থেকে নিয়োগদান কালে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পদমর্যাদা দেয়া হয়। বলা হয়, চেয়ার মেকস এ ম্যান পারফেক্ট তো রয়েছেই। বঙ্গভবনে বিভিন্ন সময়ে সচিব ও উপমন্ত্রি মর্যাদা দিয়ে প্রেস সচিবের দ্বায়িত্ব যথাক্রমে প্রেস সচিব, প্রেস কলসালটেন্ট ও প্রেস এডভাইজেরের ওপর ন্যস্ত করা হয়। আমি প্রেস এডভাইজর বা তথ্য উপদেষ্টা এবং এর আওতায় কেবল প্রেসই নয়, রাষ্ট্রীয় সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রেসিডেন্টকে সার্বিকভাবে উপদেশ দেয়া, নীতিনির্ধারণে সহযোগীতা ও সকল রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্ব পালন ছিল আমার আওতাভুক্ত। অন্য কথায়, চন্ডিপাঠ থেকে জুতা সেলাই সবই ছিল দায়িত্বের আওতাভুক্ত। মোদ্দা কথায়, পরম করুনাময় আল্রাহ তালা আমাকে সমগ্র দেশের একটি ফোরাম দিয়েছেন। ফোরামের আমার সামনে রয়ে গেছে। দেশ ও দেশ ছাড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশী, বাঙ্গালীও বাংলাভাষী জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সম্পর্কিত কূটনৈতিক ও অন্যান্য মহলের যে যোগসূত্র আমার জন্য তৈরি হয়েছে তা আমার জন্য এক বিরাট সম্পদ। দীর্ঘকাল পেশাগত জীবনে অর্জিত আমার সেই সম্পদও রয়ে গেছে।
দায়িত্ব দেখে পেছনে চলে যাওয়পা নয়, সমুদ্রে ঝাপ দেয়ার মতো সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠি। বঙ্গভবনে হাটাচলা, খাওয়া, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিটিং-অনুষ্ঠান ইত্যাদীতে প্রটোকল সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ছোটবেলা থেকেই ফরমাল লাইফ লিড করেছি লোকজনের সঙ্গ। কোথাও যেন পান থেকে চুন খসে না পড়ে সেজন্য ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স, রুলস অব বিজনের, রেড বুক ইত্যাদি বেশ আগেই রজ্ত করে নিয়েছিলম। আগে দীর্ঘকাল সংসদ বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সংবিধান, রুলস অব প্রসিডিউর, সাংবিধানিক, সংশোধনী বিল, সাধারণ বিল ও সংসদীয় অন্যান্য বিধানবলীতে এভাবেই ব্যুৎপত্তি অর্জন করি। আইনজীবী হওয়ার জন্যে নয়, আইন সম্পর্কে সচেতন হতে ল’-এর দুটি পার্ট কমপ্লিট করেছিলাম। আমার লেখা দুটি বই ‘প্রটোকলের নিগড় ও সমকালীন সাংবাদিকতা’য় প্রটোকল এবং সাংবাদকতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ বই দুচোর প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। প্রটোকলের নিগড় ইতিমধ্যে দ্বিতীয় দফায়ও প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এগুলো পড়ানো হয়। এছাড়া স্টেটক্রাফট, গভর্নেন্স, গভর্নমেন্ট এন্ড পলিটিক্স, কমউনিকেশন্স, জার্নালিজম, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স, ডিপ্লোমেসি ও কনটেমপরারি ওয়ার্ল্ড নিয়ে আমি উচ্চ শিক্ষার্থীদের পড়াই। জার্নালিজমে মাস্টার্স এবং সাংবাদিকতায় জাতীয় আন্তর্জাতিক অনেক ট্রেনিং নেয়ার পর নব্বই দশক থেকে আমি সিনিয়র সাংবাদিকদেরও ক্লাস নিয়ে আসছি।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



