somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোহাম্মদ রফিক মাটি ও মানুষের কবি

২০ শে নভেম্বর, ২০১৯ রাত ১১:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জলসিক্ত মাটি ও মানুষের চেতনা, জীবন-জীবিকা, লোককথা ও পুরাণকে মোহাম্মদ রফিক কবিতায় দিয়েছেন এক আধুনিক মাত্রা। তাঁর আধুনিকতা নিঃসন্দেহে তিরিশ দশকের কবিদের চেয়ে ভিন্নতর ভাবে অভিযোজিত হয়েছে বাংলা কবিতায়। তিরিশের আধুনিকতার প্রবাহ এসেছিল ইউরোপ থেকে। তাঁদের চেতনাতে ছিল নাগরিক প্রবাহের উত্তাপ। বোধে-চিন্তনে স্বদেশের ভৌগলিক ইতিহাস ছিল উপেক্ষিত। ষাটের দশকে কবি মোহাম্মদ রফিক কবিতায় ধারণ করলেন স্বাদেশিক ইতিহাস ঐতিহ্যকে। লোক-সংস্কৃতির অমূল্য রত্ন-ভাণ্ডারে তিনি খুঁজে পেলেন আত্মস্বর ও স্বকীয়তা।
 
চিরায়ত বাংলাই তাঁর কবিতার রসদ। চিরবঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষ ও সমাজ-বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে তিনি কবিতায় উপস্থাপন করেছেন নতুন বিন্যাসে।। তবে কবিতায় লোকজ ঐতিহ্যের রূপকার হিসেবে জসিম উদ্দিন ছিলেন প্রতিকৃত। কিন্তু কাব্যভাষাগত পাশ্চাৎপদতায় ও আঙ্গিক বিনির্মাণে তিনি যথেষ্ট আধুনিক কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক আছে। চল্লিশের দশকে আহসান হাবিবও লোকজ উপাদান নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। পঞ্চাশ দশকের মধ্য দিকে আল মাহমুদের কাব্যচিন্তায়ও গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কথা প্রতিফলিত হয়েছে। 'সোনালি কাবিন' পর্যন্ত তাঁর সেই ধারা বজায় থাকলেও পরবর্তী রচনাগুলোতে তিনি হয়ে পড়েন ভিন্ন পথের পথিক। কিন্তু রফিক ছিলেন আপাদমস্তক লোক ঐতিহ্যের ধারক। তাঁর কবিতার শেকড় জলসিক্ত কাদা মাটির গভীরে প্রোথিত। তাই তিনি আরও অনেক কবির মতো শেকড় সন্ধানে মগ্ন চৈতন্যে প্রহর কাটান না। বরং তাঁর মগ্নতা শেকড়কে হৃষ্টপুষ্ট করে সোনার ফসল ফলানোর দিকে। মূলত এখান থেকেই তিনি সূচনা করেন নান্দনিক যাত্রা।
 
বিভিন্ন কবিরা স্বদেশকে রূপায়িত করেছেন বিভিন্নভাবে। রফিকের কাছে স্বদেশ ধরা পড়ে বেহুলার প্রতিরূপ হয়ে। এই দেশ যেন তাঁর কাছে বেহুলা বাংলা। তাই তার বেহুলা জীবনানন্দের বেহুলা থেকে এক ভিন্নতর রূপ লাভ করে। জীবনানন্দের বেহুলা সন্তপ্তা, ভেলা নিয়ে ভাসে গাঙুড়ের জলে। বিষাদমাখা চোখে দেখে নদীর চড়ায় দ্বাদশীর মৃত জোছনা, অসংখ্য অশ্বত্থ বট আর শুনে শ্যামার নরম গান। কিন্তু রফিক গাঙুড়ের জলে ভাসান লখিন্দরকে। আর লখিন্দর জানে এই দুখিনী বাংলাই তার বেহুলা। তাই তাকে বলতে দেখি-"মিশে যাব স্বদেশের বেহুলা শরীরে,/ভেসে যাব গাঙুড়ের জলে।"(কবিতা-উতলা)
আমরা জানি পুরাণের প্রতি রফিকের রয়েছে সহজাত আকর্ষণ। মহাভারতে দক্ষের কন্যা হল কপিলা। এই পৌরাণিক নামটি নিয়ে ১৯৮৩ সালে রচনা করলেন 'কপিলা' কাব্য। তিনি অসাধারণ দক্ষতায় পুরাণ থেকে কপিলাকে নামিয়ে আনলেন সাধারণ মানুষের কাতারে। সে হয়ে উঠে প্রতিমা থেকে নারী, এক অনন্য শক্তির আধার। বাংলার নিপীড়িত-নির্যাতিত-শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির প্রতীক। এখানে কপিলা কেবল একা নয়; তার জীবন-যৌবনের স্তরে স্তরে এসে যুক্ত হয় বাঙালির বীরত্বগাঁথার সখিনা, হীরামনের মতো পতিতারাও। তাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় থাকলেও একটা সাধারণ পরিচয় হল, তারা শ্রমজীবী। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা, ঘাম ও ক্লেদ-কাদামাখা জীবনের পরিপূর্ণ রূপান্তর হল কপিলা। এই কাব্যে প্রচলিত তিনটি ছন্দের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গের ব্যবহার, বিভিন্ন মানুষের মুখের ভাষা ও বাক্য গঠনের ধরণ একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষার জন্ম দিয়েছে। আর প্রতীক নির্মাণে রফিক অসাধারণ। সত্যিকার অর্থে প্রতীক তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠে। এই প্রসঙ্গে সনৎকুমার সাহার মূল্যায়ন ছিল এরকম-"আগেও দেখেছি প্রতীক তাঁর কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করে। এমনকি প্রায় নিয়ন্তার ভূমিকায় চলে আসে। এটা কিন্তু আমাদের জীবনাচারে মিশে আছে। যৌথ চেতনাতেও তা আকার পায়। তবে রফিক তাতে বৈচিত্র্য আনেন।"
কবিরা এই সমাজেরই মানুষ। তবে চিন্তা-চেতনায় সাধারণের চেয়ে অগ্রগামী তো বটেই। যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর নেমে আসে শোষকের নিপীড়ন, তখনই জেগে উঠে কোন না কোন কবির দ্রোহী সত্তা। নজরুল যেমন স্বাধীনতার জন্য কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন উপনিবেশিক শাসকের ভিত, তেমনি দেখি বায়ান্নে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি' বলে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। ভুভুক্ষ মানুষের করুণ মৃত্যুতে বিচলিত রফিক আজাদও গর্জে উঠে বলেন-'ভাত দে হারামজাদা'। তাঁদের পাশপাশি আশির দশকে স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আরও একটি কবিকন্ঠ ইতিহাস হয়ে উঠেন। তিনি মোহাম্মদ রফিক। কবি গোপনে প্রকাশ করেন ১৬ পৃষ্টার দীর্ঘ এক কবিতা। যার নাম 'খোলা কবিতা'। সেখানে কবি লিখেন-"সব শালা কবি হবে,/পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই,/দাঁতাল শুঁয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।" নিমিষেই এই কবিতা সারাদেশে তোলপাড় তোলেছিল। কবির বিরুদ্ধে জারী হয়েছিল হুলিয়া। এখানে রফিককে মনে হয় না শুধুমাত্র জল-কাদামাখা মানুষের প্রতিনিধি, এমন কি নাগরিক সমাজেরও নয়। কেবল তাঁকে মনে হয় সমগ্র বাংলার মানুষের কন্ঠস্বর, বিশ্বের সকল স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দৃষ্টান্তও।
 
কবিতা কোন অলীক ব্যাপার নয়। জীবন থেকেই কবিতা উৎসারিত। আর তা যদি হয় কবির যাপিত জীবনের প্রতিলিপি তবে তাও আলাদা গুরুত্ববহ হয়ে উঠে পাঠকের কাছে। ঠিক তেমনই মোহাম্মদ রফিকের জীবনাখ্যানের কাব্যিক রূপান্তর হল 'এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো' গ্রন্থটি। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর থেকে আজ অবধি আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি-ধর্মনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অস্থিরতা প্রবাহমান, তাকে ধারণ করেই রফিক বেড়ে উঠেছেন। তার জীবন-প্রবাহের বৈচিত্র ঘটনাবলীর সফল রূপায়ণ ঘটেছে এই কাব্যে। মূলত এই কাব্যে ফুটে উঠেছে কবি মানসের স্বরূপ। তিনি এখানে ব্যবহার করেছেন প্রচুর চিত্রকল্প যা মুহূর্তে খুলে দেয় পাঠকের ভাবনার জানালা। কবি বলেন-"এই রাস্তা হেঁটে গেছে, তবে বহু দূর নয়,/থমকে আছে, মোড়ের ওধারে, গাঢ় আস্তরণে, বালুতে-কাদায়,/যেন অজগর, এইবার নিজেকে গুটিয়ে নেবে ঝোপেঝাড়ে/খাদ্যলোভে, প্রতীক্ষায়, পড়ে রইবে, দিন, মাস, বৎসর-বৎসর;"(গ্রন্থ-এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো)।
বাগেরহাটে শৈশব-কৈশোর কেটেছে রফিকের। ছিলেন নৌপথের নিয়মিত যাত্রী। ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন নদীর দু'পারের মানুষের জীবনযাত্রা। জল ও কাদায় মাখামাখি করে মানুষের বেড়ে উঠা, পূর্ণতালাভ, নদী ও নৌকা, মাঝিদের জীবন-জীবিকা এবং সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নদীকেন্দ্রিক ইতিহাস তাঁর বোধের গভীরে স্থান করে নিয়েছিল সহজেই। 'এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো' কাব্যে কবি নৌ-যাত্রার বর্ণনা করেছেন এভাবে-"খাল ছেড়ে এইমাত্র নদীতে পড়েছি/জোয়ারি স্রোতের ধাক্কা, দুলে ওঠে নাও।/গ্রামগুচ্ছ, খেয়াঘাট, দু-ক্রোশ পেরিয়ে, বাঁয়ে রেখে/শহর বাগেরহাট, ডানে, দু-একটা গ্রাম, খেত, বেমরতার/খাল, এই যাত্রা দীর্ঘ নয়, তবু যেন সকাল পেরিয়ে/ ছুঁয়ে যায় দুপুরের রোদ।" যদিও এই কাব্যে কবি-জীবনের খুঁটিনাটি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার সমাবেশ দেখা যায়, কিন্তু তার আড়ালে বাংলা ও বাঙালির জীবনআলেখ্যই মূর্ত হয়ে উঠে।
 
মোহাম্মদ রফিক কাব্য নির্মাণে স্বকীয় ধারায় প্রবাহমান। সংযত কথনভঙ্গি ও লোকজ শব্দের সফল প্রয়োগ, বিশেষ করে স্তূলশব্দ পরিহার এবং শব্দ থেকে অতিরিক্ত মেদ-চর্বি বিয়োজিত করে কবিতায় স্থাপন আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁর শব্দ নির্বাচন ও প্রায়োগিক কৌশল অভিনব। কবিতার দর্পণে বিম্বিত শব্দাবলীতে দ্রষ্টব্য হয়ে উঠে বহুমাত্রিক ব্যাঞ্জনাও। কালের গর্ভ থেকে লোক ঐতিহ্যকে কবিতায় তোলে এনে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এক নতুন বাংলাদেশের সাথে। ১৯৭০ সালে 'বৈশাখী পূর্ণিমা" কাব্য দিয়ে তিনি এই বাংলার ধুলোমাখা পথে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, 'মানব পদাবলী' পর্যন্ত তাঁর বিশাল কাব্য পরিসরে নবরূপে চিত্রিত হয়েছে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ।
জলসিক্ত মাটি ও মানুষের চেতনা, জীবন-জীবিকা, লোককথা ও পুরাণকে মোহাম্মদ রফিক কবিতায় দিয়েছেন এক আধুনিক মাত্রা। তাঁর আধুনিকতা নিঃসন্দেহে তিরিশ দশকের কবিদের চেয়ে ভিন্নতর ভাবে অভিযোজিত হয়েছে বাংলা কবিতায়। তিরিশের আধুনিকতার প্রবাহ এসেছিল ইউরোপ থেকে। তাঁদের চেতনাতে ছিল নাগরিক প্রবাহের উত্তাপ। বোধে-চিন্তনে স্বদেশের ভৌগলিক ইতিহাস ছিল উপেক্ষিত। ষাটের দশকে কবি মোহাম্মদ রফিক কবিতায় ধারণ করলেন স্বাদেশিক ইতিহাস ঐতিহ্যকে। লোক-সংস্কৃতির অমূল্য রত্ন-ভাণ্ডারে তিনি খুঁজে পেলেন আত্মস্বর ও স্বকীয়তা।
 
চিরায়ত বাংলাই তাঁর কবিতার রসদ। চিরবঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষ ও সমাজ-বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে তিনি কবিতায় উপস্থাপন করেছেন নতুন বিন্যাসে।। তবে কবিতায় লোকজ ঐতিহ্যের রূপকার হিসেবে জসিম উদ্দিন ছিলেন প্রতিকৃত। কিন্তু কাব্যভাষাগত পাশ্চাৎপদতায় ও আঙ্গিক বিনির্মাণে তিনি যথেষ্ট আধুনিক কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক আছে। চল্লিশের দশকে আহসান হাবিবও লোকজ উপাদান নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। পঞ্চাশ দশকের মধ্য দিকে আল মাহমুদের কাব্যচিন্তায়ও গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কথা প্রতিফলিত হয়েছে। 'সোনালি কাবিন' পর্যন্ত তাঁর সেই ধারা বজায় থাকলেও পরবর্তী রচনাগুলোতে তিনি হয়ে পড়েন ভিন্ন পথের পথিক। কিন্তু রফিক ছিলেন আপাদমস্তক লোক ঐতিহ্যের ধারক। তাঁর কবিতার শেকড় জলসিক্ত কাদা মাটির গভীরে প্রোথিত। তাই তিনি আরও অনেক কবির মতো শেকড় সন্ধানে মগ্ন চৈতন্যে প্রহর কাটান না। বরং তাঁর মগ্নতা শেকড়কে হৃষ্টপুষ্ট করে সোনার ফসল ফলানোর দিকে। মূলত এখান থেকেই তিনি সূচনা করেন নান্দনিক যাত্রা।
 
বিভিন্ন কবিরা স্বদেশকে রূপায়িত করেছেন বিভিন্নভাবে। রফিকের কাছে স্বদেশ ধরা পড়ে বেহুলার প্রতিরূপ হয়ে। এই দেশ যেন তাঁর কাছে বেহুলা বাংলা। তাই তার বেহুলা জীবনানন্দের বেহুলা থেকে এক ভিন্নতর রূপ লাভ করে। জীবনানন্দের বেহুলা সন্তপ্তা, ভেলা নিয়ে ভাসে গাঙুড়ের জলে। বিষাদমাখা চোখে দেখে নদীর চড়ায় দ্বাদশীর মৃত জোছনা, অসংখ্য অশ্বত্থ বট আর শুনে শ্যামার নরম গান। কিন্তু রফিক গাঙুড়ের জলে ভাসান লখিন্দরকে। আর লখিন্দর জানে এই দুখিনী বাংলাই তার বেহুলা। তাই তাকে বলতে দেখি-"মিশে যাব স্বদেশের বেহুলা শরীরে,/ভেসে যাব গাঙুড়ের জলে।"(কবিতা-উতলা)
আমরা জানি পুরাণের প্রতি রফিকের রয়েছে সহজাত আকর্ষণ। মহাভারতে দক্ষের কন্যা হল কপিলা। এই পৌরাণিক নামটি নিয়ে ১৯৮৩ সালে রচনা করলেন 'কপিলা' কাব্য। তিনি অসাধারণ দক্ষতায় পুরাণ থেকে কপিলাকে নামিয়ে আনলেন সাধারণ মানুষের কাতারে। সে হয়ে উঠে প্রতিমা থেকে নারী, এক অনন্য শক্তির আধার। বাংলার নিপীড়িত-নির্যাতিত-শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির প্রতীক। এখানে কপিলা কেবল একা নয়; তার জীবন-যৌবনের স্তরে স্তরে এসে যুক্ত হয় বাঙালির বীরত্বগাঁথার সখিনা, হীরামনের মতো পতিতারাও। তাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় থাকলেও একটা সাধারণ পরিচয় হল, তারা শ্রমজীবী। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা, ঘাম ও ক্লেদ-কাদামাখা জীবনের পরিপূর্ণ রূপান্তর হল কপিলা। এই কাব্যে প্রচলিত তিনটি ছন্দের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গের ব্যবহার, বিভিন্ন মানুষের মুখের ভাষা ও বাক্য গঠনের ধরণ একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষার জন্ম দিয়েছে। আর প্রতীক নির্মাণে রফিক অসাধারণ। সত্যিকার অর্থে প্রতীক তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠে। এই প্রসঙ্গে সনৎকুমার সাহার মূল্যায়ন ছিল এরকম-"আগেও দেখেছি প্রতীক তাঁর কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করে। এমনকি প্রায় নিয়ন্তার ভূমিকায় চলে আসে। এটা কিন্তু আমাদের জীবনাচারে মিশে আছে। যৌথ চেতনাতেও তা আকার পায়। তবে রফিক তাতে বৈচিত্র্য আনেন।"
কবিরা এই সমাজেরই মানুষ। তবে চিন্তা-চেতনায় সাধারণের চেয়ে অগ্রগামী তো বটেই। যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর নেমে আসে শোষকের নিপীড়ন, তখনই জেগে উঠে কোন না কোন কবির দ্রোহী সত্তা। নজরুল যেমন স্বাধীনতার জন্য কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন উপনিবেশিক শাসকের ভিত, তেমনি দেখি বায়ান্নে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি' বলে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন মাহবুব উল আলম চৌধুরী। ভুভুক্ষ মানুষের করুণ মৃত্যুতে বিচলিত রফিক আজাদও গর্জে উঠে বলেন-'ভাত দে হারামজাদা'। তাঁদের পাশপাশি আশির দশকে স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আরও একটি কবিকন্ঠ ইতিহাস হয়ে উঠেন। তিনি মোহাম্মদ রফিক। কবি গোপনে প্রকাশ করেন ১৬ পৃষ্টার দীর্ঘ এক কবিতা। যার নাম 'খোলা কবিতা'। সেখানে কবি লিখেন-"সব শালা কবি হবে,/পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই,/দাঁতাল শুঁয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।" নিমিষেই এই কবিতা সারাদেশে তোলপাড় তোলেছিল। কবির বিরুদ্ধে জারী হয়েছিল হুলিয়া। এখানে রফিককে মনে হয় না শুধুমাত্র জল-কাদামাখা মানুষের প্রতিনিধি, এমন কি নাগরিক সমাজেরও নয়। কেবল তাঁকে মনে হয় সমগ্র বাংলার মানুষের কন্ঠস্বর, বিশ্বের সকল স্বৈর-শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দৃষ্টান্তও।
 
কবিতা কোন অলীক ব্যাপার নয়। জীবন থেকেই কবিতা উৎসারিত। আর তা যদি হয় কবির যাপিত জীবনের প্রতিলিপি তবে তাও আলাদা গুরুত্ববহ হয়ে উঠে পাঠকের কাছে। ঠিক তেমনই মোহাম্মদ রফিকের জীবনাখ্যানের কাব্যিক রূপান্তর হল 'এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো' গ্রন্থটি। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর থেকে আজ অবধি আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি-ধর্মনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অস্থিরতা প্রবাহমান, তাকে ধারণ করেই রফিক বেড়ে উঠেছেন। তার জীবন-প্রবাহের বৈচিত্র ঘটনাবলীর সফল রূপায়ণ ঘটেছে এই কাব্যে। মূলত এই কাব্যে ফুটে উঠেছে কবি মানসের স্বরূপ। তিনি এখানে ব্যবহার করেছেন প্রচুর চিত্রকল্প যা মুহূর্তে খুলে দেয় পাঠকের ভাবনার জানালা। কবি বলেন-"এই রাস্তা হেঁটে গেছে, তবে বহু দূর নয়,/থমকে আছে, মোড়ের ওধারে, গাঢ় আস্তরণে, বালুতে-কাদায়,/যেন অজগর, এইবার নিজেকে গুটিয়ে নেবে ঝোপেঝাড়ে/খাদ্যলোভে, প্রতীক্ষায়, পড়ে রইবে, দিন, মাস, বৎসর-বৎসর;"(গ্রন্থ-এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো)।
বাগেরহাটে শৈশব-কৈশোর কেটেছে রফিকের। ছিলেন নৌপথের নিয়মিত যাত্রী। ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন নদীর দু'পারের মানুষের জীবনযাত্রা। জল ও কাদায় মাখামাখি করে মানুষের বেড়ে উঠা, পূর্ণতালাভ, নদী ও নৌকা, মাঝিদের জীবন-জীবিকা এবং সেইসব প্রান্তিক মানুষদের নদীকেন্দ্রিক ইতিহাস তাঁর বোধের গভীরে স্থান করে নিয়েছিল সহজেই। 'এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো' কাব্যে কবি নৌ-যাত্রার বর্ণনা করেছেন এভাবে-"খাল ছেড়ে এইমাত্র নদীতে পড়েছি/জোয়ারি স্রোতের ধাক্কা, দুলে ওঠে নাও।/গ্রামগুচ্ছ, খেয়াঘাট, দু-ক্রোশ পেরিয়ে, বাঁয়ে রেখে/শহর বাগেরহাট, ডানে, দু-একটা গ্রাম, খেত, বেমরতার/খাল, এই যাত্রা দীর্ঘ নয়, তবু যেন সকাল পেরিয়ে/ ছুঁয়ে যায় দুপুরের রোদ।" যদিও এই কাব্যে কবি-জীবনের খুঁটিনাটি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার সমাবেশ দেখা যায়, কিন্তু তার আড়ালে বাংলা ও বাঙালির জীবনআলেখ্যই মূর্ত হয়ে উঠে।
 
মোহাম্মদ রফিক কাব্য নির্মাণে স্বকীয় ধারায় প্রবাহমান। সংযত কথনভঙ্গি ও লোকজ শব্দের সফল প্রয়োগ, বিশেষ করে স্তূলশব্দ পরিহার এবং শব্দ থেকে অতিরিক্ত মেদ-চর্বি বিয়োজিত করে কবিতায় স্থাপন আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁর শব্দ নির্বাচন ও প্রায়োগিক কৌশল অভিনব। কবিতার দর্পণে বিম্বিত শব্দাবলীতে দ্রষ্টব্য হয়ে উঠে বহুমাত্রিক ব্যাঞ্জনাও। কালের গর্ভ থেকে লোক ঐতিহ্যকে কবিতায় তোলে এনে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এক নতুন বাংলাদেশের সাথে। ১৯৭০ সালে 'বৈশাখী পূর্ণিমা" কাব্য দিয়ে তিনি এই বাংলার ধুলোমাখা পথে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, 'মানব পদাবলী' পর্যন্ত তাঁর বিশাল কাব্য পরিসরে নবরূপে চিত্রিত হয়েছে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক আবহ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ৭:৪৬
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাসাগরের ধারের সেই ছোট্ট দ্বীপ সামোয়া এবং বিশ্বকাপ ফুটবল

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিশ্বকাপের এই মৌসুমে ফুটবল নিয়ে একটা দারুণ হার্ট লিফটিং মুভি দেখে ফেললাম - "Next Goal Wins"
গল্পটা আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩১-০ গোলে হেরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাস্তায় পড়ে থাকা একপাটি জুতো

লিখেছেন সাব্বির আহমেদ সাকিল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫২



রাস্তায় চলার পথে এমন দৃশ্য আমার মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে। আজও বাসায় ফেরার সময় ঠিক এমনই একটা দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালাম—রাস্তার একপাশে নিথর হয়ে পড়ে আছে একটি শিশুর একপাটি জুতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×