somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নাজকা লাইনস, দ্য লাইনস উইথ মিষ্ট্রি ......

২৫ শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দক্ষিন পেরুর নাজকা মরুভূমির উপর দিয়ে আকাশ পথে যেতে যেতে অদ্ভুত কিছু লাইনের দেখা মিললো পল কোসক এর । লং-আয়ল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগ থেকে, প্রাচীন যুগে জমিতে সেচের ধরন ধারন খুঁজতে এসেছেন তিনি , এই পেরুতে । সময়টা ১৯৪০ সাল । এগুলেন আকাশপথে দেখতে পাওয়া লাইনগুলো ধরে ধরে । বিস্ময়ে অবাক হয়ে দেখলেন , অনেকগুলি লাইন মিলেমিশে একটি পাখির ছবি দেখাচ্ছে । আরো অবাক কান্ড, কিভাবে যেন লাইনগুলি একত্রিত হয়ে দক্ষিন অয়নান্তের দিকে মুখ করে আছে যে স্থানে সূর্য্য অস্ত যাচ্ছে। পল কোসক লেগে পড়লেন , কিভাবে এসব দীর্ঘ লাইন বানানো হয়েছে আর এর উদ্দেশ্যই বা কি তা খুঁজতে । সাথে যোগ দিলেন জার্মান গনিত ও প্রত্নতত্ত্ববিদ মারিয়া রিচি । এইসব রেখাচিত্র এখানে আঁকা হয়েছে কেন সে সম্পর্কে তারা ধারনা দিলেন, সূর্য্য আর অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুসমূহ দিগন্ত রেখায় কোথা থেকে উঠে আসে, এইসব চিত্র তারই নির্দেশিকা । ধারনাটি খারাপ নয় মোটেও । একটি মানমন্দিরের ধারনা ?

ছবি - নাজকার ভূ-রেখাচিত্র । কিছু বলে কি ?

১৯৩৯ সালে এক সন্মেলনে পেরুভিয়ান আর্কিওলোজিষ্ট টোরিবিও ম্যাজিয়া সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন যে, ১৯২৭ সালে ঐ উপত্যকায় হাইকিং করতে গিয়ে তিনি অসংখ্য অদ্ভুত কিম্ভুত কিমাকার সব দীর্ঘ রেখা দেখতে পান । যদিও রেখাচিত্রগুলি মাটির সমান্তরালে থেকে ভালো করে দেখতে পাননি তিনি । তার ধারনা আকাশপথ ছাড়া এসব চিত্র পরিষ্কার ভাবে দেখা সম্ভব নয় । কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করলেন ম্যাজিয়া । পেরুভিয়ান সেনাবাহিনীর বিমানগুলো আকাশ পথে উড়াল দিলো । আর তাতেই সাধারণ্যে একটা “মিথ” জন্ম হলো - আকাশ থেকে দেখা ছাড়া এই লাইনগুলো দেখা কিছুতেই সম্ভব নয় । টোরিবিও ম্যাজিয়ার এই বর্ণনা থেকেই মানুষের কৌতুহলের শুরু। কৌতুহল ঠেকলো গিয়ে গ্রহান্তরের আগন্তুক থিওরীতে। কারন যেহেতু আকাশে ওঠা ছাড়া এসব চিত্র দেখা যায়না আর এতো বিশাল বিশাল রেখা মাটিতে আঁকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় তাই এসব ভীনগ্রহবাসীদের কাজ না হয়েই যায়না। ধারনাটা জেঁকে বসলো এমন করেই ।

অথচ বইপুস্তকে এই নাজকা লাইনের প্রথম উল্লেখ আপনি দেখতে পাবেন পেদ্রো সিঁয়েজা ডি লিয়ন এর লেখা ১৯৫৫ সালের একটি বইয়ে । তিনি প্রথমে ভুল করে রেখাগুলিকে ট্রেইল মার্কারস হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন । কিন্তু পেরুভিয়ান মিলিটারী আর সিভিলিয়ান বৈমানিকেরাই প্রথম যারা সেগুলিকে আলাদা কিছু হিসাবেই চিহ্ণিত করেছেন ।

নাজকা লাইন সম্পর্কে ইতিহাসের এইসব তথ্যগুলো নাজকা লাইনের মতোই মনে হয় জটিল । পল কোসক সম্ভবত এ্‌ই জটিলতাকে আরও জটিল করে দিয়েছেন এই বলে - ৩১০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে থাকা নাজকা লাইন হলো “the largest astronomy book in the world” ।

ছবি - জটিল কিছু !

দক্ষিন পেরুর নাজকা মরুভূমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বিশালাকৃতির লাইনগুলো যাকে আপনি জিয়োগ্লিফস বা ভূ-রেখাচিত্র বলবেন, তাদের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য হাযারো হাইপোথিসিসের পরেও আজ পর্যন্ত রয়েছে ধোঁয়াশায় ভরা ।
১০০০ থেকে ১২০০ ফুটের মতো লম্বা লম্বা একেকটি রেখা পড়ে রয়েছে ৫০ মাইল ব্যাপী শুষ্ক আর উষর মরুভূমি সদৃশ্য এক উপত্যকায় , নাজকা ও পালপা শহর দুটির মাঝখানে । রাজধানী লিমা থেকে ৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই তবে দেখা মিলবে এই সব অদ্ভুত সব রেখাচিত্রের । গবেষকরা বলছেন , খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রীষ্ট পরবর্তী ৫০০ সালের নাজকা সভ্যতার সময়কালে এগুলো আঁকা বা বানানো হয়েছে । অবশ্য নাজকা সভ্যতার সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যেও রয়েছে মতভেদ ।

শত শত ছোটবড় সাধারন লাইন টেনে টেনে আর জ্যামিতিক আকৃতি দিয়ে আঁকা হয়েছে “জ্যুমর্ফিক” পাখি, মাছ, জাগুয়ার, বাঁদর এসবের ছবি । আছে কিছু মনুষ্যাকৃতিও । আবার “ফাইটোমর্ফিক” আকৃতিতে আঁকা হয়েছে গাছপালা , ফুলও । প্রায় ৮০০টি লম্বা লম্বা রেখা টানা হয়েছে এখানে যার কিছু কিছু আবার ৩০ মাইল পর্যন্ত দীর্ঘ । রয়েছে ৩০০র মতো জ্যামিতিক চিত্র আর ৭০টির মতো প্রানী ও গাছের ছবি । যতোই দিন যাচ্ছে গবেষকরা ততোই নতুন নতুন লাইন আর চিত্রের দেখা পাচ্ছেন । বাড়ছে হাইপোথিসিসের সংখ্যাও ।

ছবি - পৌরানিক প্রানী ।

ছবি -উপরের ছবির ব্যাখ্যা > জিভ বের করা, গায়ে ফুটকুঁড়ি আর অনেকগুলি পা নিয়ে সেই পৌরানিক প্রানী ।

জাপানীজ গবেষকরা আবার তাতে খানিকটা ধোঁয়াশা মিশিয়েছেন । বলছেন আবার আরেক কথা - মিলছেনা ! ২০১১ সালে ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক যখন মানুষের মাথার মতো দেখতে এবং আর একটি পৌরানিক প্রানীর চিত্র খুঁজে পেলেন যা নাজকার রেখাচিত্রের আয়তনের তুলনায় বেশ ক্ষুদ্র ; তখন আকার আকৃতির আর ছবির বিষয়বস্তুর বৈসাদৃশ্যই তাদের চিন্তার কারণ হয়ে উঠলো । যেগুলোর সময়কাল আবার নাজকা সভ্যতা শুরুর দিকের এমনকি তারও আগের হতে পারে বলে তাদের ধারনা । প্রানীর চিত্রটির নির্মানশৈলী আবার ‘প্যারাকাস’ সভ্যতার নির্মানশৈলীর মতোই । তাই ২০১২ সালেই ইয়ামাগাতা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষনা দিলেন নাজকায় একটি গবেষনা কেন্দ্র খোলা হবে যা ২০২৭ পর্যন্ত চালু থাকবে । যদিও তারা ২০০৬ সাল থেকেই নাজকা এলাকায় মাঠ পর্যায়ের কাজ করে যাচ্ছেন ।
১০০টির মতো এধরনের রেখাচিত্র খুঁজে পেয়েছেন তারা এ পর্যন্ত ।

ছবি - ৩১০ ফুট লম্বা আর ১৯০ ফুট প্রস্থ নিয়ে বাদর ।

অগভীর এই লাইনগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে উপত্যকার লাল লাল নুড়ি পাথর সরিয়ে সরিয়ে নীচের সাদা-ধূসর জমিনকে অবারিত করে করে । গবেষকরা এইসব রেখাচিত্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে বাক-বিতন্ডায় মেতে থাকলেও একটা বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত যে, এগুলো সম্ভবত ধর্মীয় গুরুত্ব বহনকারী কিছু ।
সম্ভবত এলাকাটি একান্ত নিভৃতে থাকাতে আর জনবিরল হওয়াতে সাথে এর মাটি শুষ্ক , বাতাসের প্রবাহহীন স্থায়ী আবহাওয়া আর বছরে ১ইঞ্চিরও কম বৃষ্টিপাতের কারনে প্রাকৃতিক ভাবেই একই রকম থেকে গেছে রেখাগুলি । নড়েচড়েনি খুব একটা । তবে ২০১২ সালে মনে হলো রেখাগুলো একটু একটু ক্ষয়ে যাচ্ছে । কারনটাও বোঝা গেলো, ভূমি দখলকারীদের আনাগোনা ।
৮০ বছর ধরে সাধারণ্যে প্রচলিত শক্ত ধারনা এমনটাই যে , আকাশপথ ছাড়া রেখাগুলো দেখা সম্ভব নয় । অথচ সত্যটা এই , আশেপাশের উঁচু পাহাড়ী টিলাগুলো থেকেও রেখাগুলো দেখা যায় ।
মাটিতে কেন এসব আঁকিবুকি করা হয়েছে তার রহস্য বের করার চেয়ে , কি করে এসব আঁকা হয়েছে তা বের করা ঢের সহজ ছিলো গবেষকদের কাছে । খুব সাধারন যন্ত্রপাতি আর সার্ভেয়িং ইক্যুইপমেন্ট দিয়ে এগুলো আঁকা হয়েছে বলে তাদের ধারনা । কারন অনেক রেখার শেষ প্রান্তের মাটিতে কাঠের খুঁটি পোঁতা রয়েছে । রেখাগুলো আসলে এক একটা পরিখার মতো যার বেশির ভাগই ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি গভীর আর তা করা হয়েছে নাজকা মরুভূমির উপরে থাকা লাল রংয়ের আয়রন-অক্সাইডে আচ্ছাদিত নুড়ি পাথর সরিয়ে । এতে নীচের সাদা-ধূসর মাটি উন্মুক্ত হয়ে এক একটা সাদা রেখার আকৃতি দিয়েছে যা আকাশপথে দেখলে আশেপাশের বালু-পাথর আর মাটি থেকে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় । সবকিছু হিসেবে নিয়ে তারা বলছেন , খুব সতর্কতার সাথে প্লান করে এগুলে একদল মানুষের পক্ষে আকাশপথের সাহায্য ছাড়াই এর চেয়েও বড় রেখাচিত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আঁকা সম্ভব । অবশ্য এই অল্প গভীরতার পরিখার তলদেশে প্রচুর চুন ( লাইম) থাকার কারনে আর তা সকালের শিশিরের সাথে মিশে গিয়ে তলদেশে শক্ত আবরন তৈরী হয়েছে যা বাতাসের ঝাঁপটা থেকে রেখাগুলোর ক্ষয় রোধ করছে ।

ছবি - ৩১০ ফুট লম্বা হামিংবার্ড এর প্রতিকৃতি ।

ছবি - কুকুরের রেখা চিত্র ।

ছবি - বিশালাকৃতির গাছে ফুল ।

প্রানী, গাছপালা আর মানুষের প্রতিকৃতি নিয়ে বিশাল এই রেখাচিত্রগুলি ছড়িয়ে আছে ৩১০ বর্গমাইল জুড়ে । আর তা সবই টানা হয়েছে আয়রন-অক্সাইডে আচ্ছাদিত নুড়ি পাথর সরিয়ে সরিয়ে । সবচেয়ে ছোট্টপাখি হামিংবার্ড এর প্রতিকৃতিই ৩১০ ফুট লম্বা । আবার বানরগুলোও প্রায় ৩১০ ফুট লম্বা আর ১৯০ ফুট প্রস্থ নিয়ে হয়ে চিত্রিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখলে , এই কাজগুলিকে বিশাল আর জটিল বলেই মনে হবে ।
গ্রহান্তরের কোনও আগন্তুকদের কাজ ? হতেও পারে ! কারন, রেখাচিত্রে একজন মহাকাশচারীর চেহারা ফুটে রয়েছে যে ! সুইস বিজ্ঞান লেখক এরিখ ফন দেনিকেন (Erich von Däniken) যিনি ভীনগ্রহবাসীদের নিয়ে বৈজ্ঞানিক লেখা লিখেছেন প্রচুর , তিনি ও যোগ দিয়েছেন এই বিতর্কে । তার ধারনা এটা ভীনগ্রহবাসীদেরই কাজ ।

ছবি - গ্রহান্তরের আগন্তুক ! ভীনগ্রহের মহাকাশচারী ?

পৃথিবীতে থাকা সবচেয়ে শুকনো ধাঁচের সবগুলো মরুভূমির মধ্যে এই নাজকা মরুভূমির মাটিও বেশ শুকনো আর শক্তপোক্ত । বছর জুড়ে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রীতেই থাকা আর বাতাসের প্রবাহের অনুপস্থিতির কারনে রেখাচিত্রগুলি উন্মুক্ত থেকে পরিষ্কার দৃশ্যমান ।

ছবি - সুদূরে বয়ে যাওয়া লাইন...

এইসব রেখাচিত্র আর প্রতিকৃতি কেন যে আঁকা হয়েছে প্রত্নতত্ত্ববিদ , জাতিবিজ্ঞানী আর নৃবিজ্ঞানীরা তার খোঁজে প্রাচীন নাজকা সংস্কৃতিকে উল্টেপাল্টে দেখেছেন । অনুমান, আকাশ থেকে দেবতারা যেন এ্গুলো দেখতে পান তাই এত্তোবড় করে এসব রেখাচিত্র এঁকেছে প্রাচীন নাজকা সভ্যতার লোকেরা । লং-আয়ল্যান্ড ইউনিভার্সিটির পল কোসক আর জার্মান গনিত ও প্রত্নতত্ত্ববিদ মারিয়া রিচি অবশ্য এমনটা মনে করেন না । তাদের ধারনা , এসবই জ্যোতির্বিদ্যা আর সৃষ্টিতত্ত্ব সংক্রান্ত । রেখাগুলো সম্ভবত একরকমের মানমন্দির হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে আঁকা হয়েছে যেখানে রেখাগুলি নিরক্ষীয় রেখার অনুপাতে সুদূর দিগন্তের ওপার থেকে সূর্য্য আর মহাশুন্যের অন্যান্য বস্তুরাজির উদয় ও অস্তগামীতার নির্দেশক । রিচির অনুমান, এগুলোর কিছু কিছু কিম্বা সবটাই কোনও না কোনও নক্ষত্রপুঞ্জের প্রতীক ।

ছবি - নাজকার মাকড়সা । ওরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জ ?

১৯৯৮ সালে শিকাগোর এ্যাডলার প্লানেটরিয়ামের সিনিয়র জ্যোতির্বিদ এবং রিচির গবেষনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিলিস বি. পিটলুগাও রিচির মতো প্রানীগুলোকে মহাকাশে স্বর্গীয় কিছু আকৃতির প্রতিভূ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন । কম্পিউটারের সাহায্যে নক্ষত্রদের সারি নিয়ে গবেষনা চালিয়ে তিনি ধারনা করেন যে , বিশালাকৃতির মাকড়সাটি আসলে ওরিয়ন নক্ষত্রপুঞ্জের ( কন্সটিলেশন ) এ্যানামর্ফিক চিত্র । চিত্রটি থেকে যে তিনটি সোজা রেখা উঠে এসেছে তা ওরিয়ন বেল্টের তিনটি নক্ষত্রের স্থান পরিবর্তন খুঁজে বের করার জন্যে ব্যবহৃত হতো।
অদ্ভুত বটে ।
পল কোসক আর মারিয়া রিচির এই এ্যাষ্ট্রোনমী তথ্য ১৯৭০ সাল পর্যন্ত মানুষ সত্য বলেই ধরে নিয়েছিলো কিন্তু বাঁধ সেধেছে একদল আমেরিকান গবেষকরা । তারা এই এ্যাষ্ট্রোনমী থিওরী আর প্রচলিত এলিয়েন থিওরীর ভেতর ফুঁটোফাঁটা খুঁজে বের করছেন ।
আমেরিকা কিম্বা অন্যত্র, অনেক প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতায়ও আপনি জ্যোতির্বিদ্যা আর সৃষ্টিত্ত্বের সংযোগে করা এরকমের কিম্ভুত কিমাকার কাজ দেখতে পাবেন যেমনটা ইংল্যান্ডের ষ্টোনহেঞ্জ । কেবল ইংল্যান্ড বা পেরুই নয় ; এমন রহস্যময় রেখাচিত্র রয়েছে বলিভিয়া, চিলি, মিশর, মাল্টা, মিসিসিপি এবং ক্যালিফোর্নিয়া সহ নানান দেশে। হাজার হাজার বছর আগে কোড ম্যাট্রিক্স সিস্টেমে স্থাপিত এই রেখাগুলো।
বলিভিয়ার সাজামা রেখা ( Sajama Lines ) পৃথিবীর আর একটি অন্যতম রহস্য। পশ্চিমের আগ্নেয়গিরির দুর্গম এলাকায় রয়েছে হাজার খানেক নিখুঁত রেখা। এতগুলো রেখা কে তৈরি করল তা যেমন জানা যায়নি, কেনই বা করল সেটিও এক রহস্য।
প্রত্নতাত্বিকদের মতে, এই অঞ্চলে ৩ হাজারেরও বেশি বছর আগে মানুষের বসতি ছিল। তবে সরল রেখাগুলো তারাই নির্মাণ করেছে কিনা, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিক কোনো তথ্য নেই। বিজ্ঞানীদের ধারণা, একে অপরকে অতিক্রম করা রেখাচিত্রগুলো নিশ্চয় বিশেষ উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি সাজামা অঞ্চলের স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
তিন থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত রেখাগুলো ১৮ কিলোমিটার বা তারচেয়েও দীর্ঘ। প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে রেখাগুলো অনেকটা নাজকা রেখার মতোই।

ছবি - সাজামা লাইনস, বলিভিয়া ( স্যাটেলাইট ছবি )

ছবি - সাজামা লাইনস, বলিভিয়া ( স্যাটেলাইট ছবি )

আপনাদের পরিচিত ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ এর গবেষক প্রত্নতত্ত্ববিদ জোহান রেইনহার্ড এর ১৯৮৫ সালে দেয়া ব্যাখ্যাটিও কিন্তু ফেলে দেয়ার মতো নয় । রেইনহার্ড অঙুলি নির্দেশ করলেন ঐ সময়ের নাজকা এলাকার প্রানী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকে । তার বক্তব্য , যে এলাকায় সারাবছরে ২০ সেন্টিমিটারও বৃষ্টিপাত হয়না সেখানে অবশ্য অবশ্যই জল একটি মহার্ঘ্যবস্তু । আর তাই ঐসব রেখাচিত্রের অধিকাংশ আদপেই কোনও ভৌগলিক কিম্বা মহাজাগতিক বস্তুর দিকনির্দেশক হবার কথা নয়। তার মতে এসব রেখা ও আকৃতিগুলো হলো, ফসল উৎপাদনে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরনে দেবদেবীর পুজোয় ধর্মীয় আচার আচরণের নির্ঘন্ট মাত্র, কোনও অলৌকিক কিছু নয়। তার ব্যাখ্যা - রেখাগুলো পুত -পবিত্র এক একটি পথ যা নির্দেশ করে কোথায় কোন জায়গাতে কোন দেবদেবীদের পুজো দিতে হবে ।
‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ এর প্রাক্তন গবেষক এ্যান্থনী এ্যাভেনীও বলেছেন প্রায় একই কথা -নাজকার জ্যামিতিক রেখাচিত্রগুলো এতো বিশাল আয়তনের যে সম্ভবত সেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে জড়ো হয়ে নাজকার মানুষেরা জলের জন্যে দেবতাদের কাছে ধর্ণা দিতেন কিম্বা নৈবেদ্য নিবেদন করতেন । হয়তো এটাও একটা ধর্মীয় বিশ্বাস !

মিশর এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ , সুইস আর্ট হিষ্টোরিয়ান হেনরী স্টিয়ারলিন ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত একটি বইতে বলেছেন বেশ মজার কথা । নাজকা লাইনকে তিনি জুড়ে দিয়েছেন মমি বানানোর প্রক্রিয়ার সাথে । প্রত্নতত্ত্ববিদরা খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ থেকে ১০০ সাল পর্যন্ত টিকে থাকা পেরুর “প্যারাকাস সভ্যতা” (এই সময়কালটা আবার নাজকা সভ্যতার সময়কালের সাথেও জড়িয়ে গেছে । কোনও প্রাচীন সভ্যতার ব্যাপ্তিকাল নিয়ে ইতিহাসবিদ আর গবেষকদের মতভিন্নতা নতুন কিছু নয় । ) সময়ের প্রাপ্ত মমিতে জড়ানো যে কাপড় পেয়েছেন তা সম্ভবত নাজকা লাইন নামের তাঁতযন্ত্রে বোনা । তার ধারনা, এইসব লম্বা লম্বা লাইন আর জ্যামিতিক রেখাগুলো মূলত বিশাল এক একটি প্রাগৈতিহাসিক তাঁত । কারন , মমিতে ব্যবহৃত যে কাপড় তার সুতোগুলো অসম্ভব লম্বা লম্বা এবং কাপড়গুলো প্রস্থেও বিশাল । একমাত্র বিশালাকৃতির কোনও তাঁতযন্ত্র ছাড়া তা বয়ন করা সম্ভব নয় এবং তা নাজকা লাইনগুলোর ধরনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ । একই সাথে তার ধারনা , ছোট ছোট আর অসচরাচর দেখা যাওয়া আকৃতিগুলো শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠান সংক্রান্ত কাজের উদ্দেশ্যই করা।
বুঝুন , ঠ্যালা ! বিশ্বাস করবেন কোনটা ?
তার এই থিওরী যদিও সর্বগ্রাহ্য হয়নি তবুও গবেষকরা মমিতে ব্যবহৃত কাপড়ের বয়নের ধরন এবং নাজকা রেখাচিত্রগুলির সাজানোর মধ্যে মিল খুঁজে পেয়েছেন ।
গবেষকরা যা বলে বলুক , কিন্তু ইতিহাসবিদরা যে বলে গেছেন , প্যারাকাস সভ্যতার
মানুষজনদের ছিলো জলসেচ, জল ব্যবস্থাপনা আর বয়ন শিল্পে প্রভূত জ্ঞান, তার কি হবে ? নাজকার মানুষও যে সেই ধারা বহন করবে, এটাই স্বাভাবিক ।

ছবি - চক্রাকারে পাথরবেষ্টিত কূপ বা puquios

রোজা লাসাপোনারার নেতৃত্বে ইটালির “ইন্সটিটিউট অব মেথোডলজিজ ফর এনভারনমেন্টাল এ্যানালিসিস” এর গবেষকরা স্যাটেলাইট টেকনোলোজী ব্যবহার করে সেই জল ব্যবস্থাপনারই অনেকটা তুলে এনেছেন । চক্রাকারে পাথরবেষ্টিত কূপের অস্তিত্ব পেয়েছেন তারা । ধারনা, নাজকার মানুষেরা নাজকার জলশূণ্য প্রান্তরে এমনি করেই মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে জলধারনের ব্যবস্থা তৈরী করে নিয়েছিলো একদিন ।
আর যে সব থিওরী রয়েছে তারাও বলছে , এই সব অগভীর রেখাগুলো আসলে জলের ধারা কোনদিকে তারই নির্দেশক কিম্বা জলসেচ প্রকল্প অথবা জলপ্রাপ্তির জন্যে দেবতাদের দৃষ্টি আকর্ষনের শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানের উপকরণ। এখানের মাকড়সা, পাখি এবং গাছগাছালির চিত্র হয়তো “উর্বরতা”র প্রতীক। আবার কেউ কেউ বলেন, এসবই হয়তো এ্যাষ্ট্রনোমিক্যাল ক্যালেন্ডার।
১৯৯০ সালে আর্কিওএ্যাষ্ট্রোনমি বিশেষজ্ঞ জেরাল্ড হকিন্স আর এ্যান্থনী এ্যাভেনি সকলের এমন ধারনাকে হটিয়ে দিয়ে বলেছেন, এ যাবত প্রাপ্ত প্রমানাদি, এমন সব ব্যাখ্যার জন্যে পর্যাপ্ত নয়।
ধোঁয়াশা ভরা এই সব বিশাল বিশাল জিয়োগ্লিফস যেন পৃথিবী কিম্বা ইতিহাস থেকে মুছে না যায় তাই ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে নাজকা লাইনকে “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” হিসেবে ঘোষনা করেছেন ।

সৃষ্ট পৃথিবীতে এরকম যে হাযারো রহস্যময়তা রয়ে গেছে তা দেখে আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা অবাক হই। সীমিত জ্ঞান, চিন্তার অনগ্রসরতা, বোঝার দৈন্যতা, কুসংস্কার নিয়ে এসব কিছুকেই ঐশ্বরিক বলে ভাবি । অলৌকিক হয়তো বটে , কিন্তু মানুষের অগ্রযাত্রা এসব রহস্যকে একে একে জ্ঞানের পরিসীমায় নিয়ে আসছে । বোধগম্য করে তুলছে সব রহস্যকে।
শুধু আমরা “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া , ঘরের বাইরে দুইপা ফেলিয়া...”র মতোই জ্ঞানের চক্ষু মেলে দেখিনে, হয়তো দেখতেও চাইনে কিছুই ......................



তথ্য কৃতজ্ঞতা সূত্র -
১. Wikipedia, the free encyclopedia
২. Click This Link
৩. Drone discovers New Nazca Lines in Peru
৪. Click This Link
৫. Click This Link
৬. Nazca Lines: Mysterious Geoglyphs in Peru
৭. National Geographic
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ১১:৪৭
৬১টি মন্তব্য ৬১টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দু'টি ছোট গল্প বলতে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:২৫



১। গ্রামের নাম রসুলপুর।
একেবারে সুন্দরবনের কাছে। অন্যসব গ্রামের মতোই একটি সহজ সরল সুন্দর গ্রাম। এই রসুলপুর গ্রামই আমাকে শিখিয়েছে কি করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে হয়। মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এই গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলফোর রোড টু কাশ্মীর ! : সভ্যতার ব্লাকহোলে সত্য, বিবেক, মানবতা!

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ১:৪০

ফিলিস্তিন আর কাশ্মীর! যেন আয়নার একই পিঠ!
একটার ভাগ্য নিধ্যারিত হয়েছিল একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে; আর অন্যটি অতি সম্প্রতি ২০১৯ এ!
বর্তমানকে বুঝতেই তাই অতীতের সিড়িঘরে উঁকি দেয়া। পুরানো পত্রিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চামড়ার মূল্য- মানুষ ভার্সেস গরু

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৪


২০১০ সালের কথা; তখন পূর্ব লন্ডনের ক্যানরি ওয়ার্ফ (Canory Wharf) এর একটি বাসায় ক্লাস নাইনে পড়া একটি ছাত্রীকে ম্যাথমেটিকস্ পড়াতাম। মেয়েটির আঙ্কেল সময়-সুযোগ পেলে আমার সাথে গল্পগুজব করতেন। একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দাদীজান ও হ্যাজাক লাইট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০০



সময় ১৯৮০ এর দশক, প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমার দাদাজানের মৃত্যুবার্ষিকী’তে বড় চাচা, আব্বা বেশ খরচ করে গ্রামবাসী ও আত্মীয় পরিজনদের খাবারের একটা ব্যাবস্থা করতেন, বড় চাচা আর আব্বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত কিছু সময়ে সামুতে যা যা হয়েছে, ব্লগারদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে, সেসকল কিছু স্টেজ বাই স্টেজ বর্ণনা!

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১৮ ই আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৪



কনফিউশন: ধুর! কি হলো! ব্লগে কেন ঢুকতে পারছিনা? কোন সমস্যা হয়েছে মনে হয়, পরের বেলায় চেক করে যাব। বেলার পর বেলা পার হলো, সামুতে ঢোকা যাচ্ছে না! কি সমস্যা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

×