somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাচীন যুগের শয়তান উপাসনা।

২৮ শে জুলাই, ২০১২ রাত ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



অতি প্রাকৃত শক্তির উপাসনা করা মানুষের প্রাচীনতম আচারের অংশ। মানুষ যখন থেকে মানুষ হয়ে উঠেছে তখন থেকেই অলৌকিক সত্বার কল্পনা করা তার প্রতি পুর্ন অনুগত্য প্রদর্শন মানুষের জীবনের অংশ। খুব সম্ভবত নিজের অন্তর্নিহিত ভয়ের বহির্প্রকাশ থেকেই যাবতীয় আধিভৌতিক চর্চার জন্ম। মানুষের যাপিত জীবিনের একটা বড় অংশ জুরে আছে এই প্রথা। কখনো শুভ কখনো অশুভ রুপে ।
আধিভৌতিক শক্তির এই উপাসনা মানুষ করে গেছে ।তার সভ্যতার অজস্র অগ্রগতির পাশে হাত ধরেই চলেছে ব্যাখ্যার অতীত কিছু মানবীয় আবেগ। মানুষের অশুভ শক্তি উপাসনার কিছু কথা আজকে বলব।

প্রকৃতির মতই মানুষেরও দ্বৈত আছে। সে সত্বার প্রবল্যই জন্ম দিয়েছে ভালো মন্দ, আলো অন্ধকার, ঈশ্বর শয়তানের। শয়তান উপাসনা বা স্যাটানিজম এমন একটি শব্দ যা মানুষের আদিম বিশ্বাসের সাথে জড়িত। যাতে সাধারণভাবে শয়তানের ওপর ভক্তি বা প্রশংসাকে বোঝানো হয়ে থাকে। হিব্রু বাইবেল অনুসারে যে মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত করে সেই শয়তান। গ্রিক নিউ টেস্টামেন্টে আরো বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়, যেখানে যিশুর প্রলুদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে বুঝানো হয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মে শয়তানকে তুলনা করা হয়েছে বিপথগামী দেবদূত বা দানব হিসেবে যে মানুষকে খারাপ কাজ বা পাপ করতে অনুপ্রেরণা যোগায়। মানুষ শয়তান এবং ঈশ্বরের ধারনা সৃষ্টি করেছে মূলতঃ নিজেকে দায়মুক্তি দেয়ার উদ্দেশে।

হায়ারোগ্লিফিক্স এ সেটের উপাসনাঃ


প্রাচীন মিশরে খৃস্টপুর্ব ৫০০০ অব্দে থেকে শয়তান উপাসনার কথা পাওয়া যায়। শয়তানের প্রতিভু সেট/সেথ ছিলো মৃত্যু, জ্বলন্ত সুর্য। ক্ষুধা,তৃষনা, বিশৃ্ংখলা, হিংস্রতা ঘৃনা আর অশুভের দেবতা। মিশরীয় পুরানে সেট একজন ক্রোধ সম্পন্ন শক্তিমান ভীতিকর দেবতা যিনি দক্ষিনের থিবস নগরীর রক্ষক। রুক্ষতা খরা অজন্মার প্রতীক সেট ছিল এক ভয়ের চরিত্র। ধংশ আর মানুষের ক্ষতির প্রধান কারন হিসাবে দায়ি করা হয় সেটকে। থীবসে সেটের মন্দিরে উপাসনায় কুখ্যাত পুরোহিত্রা ডেকে আনতে পারতো ভয়াবহ বিপর্যয়। মিশরের তানিশ শহরে সেটের প্রকান্ড মন্দিরে যুদ্ধ দেবতা রুপে তাকে পুজা করা হতো। সেথ এর অশুভত্ব সত্ত্বেও প্রাচীন মিশরের ফারাওগন সেথ- এর উপাধি গ্রহন করতেন। মজার ব্যাপার মিশরীয় অশুভের প্রতীক সেটের সাথে ইহুদী একেশ্বরবাদের জীহোভার অনেক স্থানে মিল রয়েছে।


উপরের ছবিতে মধ্যে জন নারগেল।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় শয়তানের উপাসনাঃ ৪০০০ খৃস্টপুর্বাব্দে মেসপটেমিয়ায় ধারবাহিক ভাবে সর্ব প্রথম বসতি গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেয়া সুমেরিয়রা।সুমেরিয়দের ধারাবাহিকতায় খৃস্টপুর্ব ৩০০০ অব্দে আক্কদিয়রা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় এসে মেসোপটেমিয়ায় এসে বসতি গাড়ে। এরাই ব্যাবিলনিয়ান,আশিরিয়ান পরবর্তিতে ইহুদী ও আরবদের পুর্ব পুরুষ। এনলিল ইয়া অন্যন্য ভালো দেবতার পাশাপাসি মেসপটেমিয়ার শয়তান উপাসকরা উপাসনা করতো প্লেগ আর মৃত্যুর অশুভ দেবতা নারগালের। নারগল দেখতে ছিলো কুকুরের মাথা,মানুষের দেহ, ঈগলের পা আর সিঙ্ঘের থাবার সংমিস্রনে তৈরি বিকট এক দানব। প্রাচীন নিনেভ,ব্যাবিলন আর আশুর নগরের ধংসাবশেষে এখনো অসংখ্য ভীতিকর মুর্তি দেখা যায়। মেসোপটেমিয়া মানুষ হর্ডস নামের এক অপদেবতারও উপাসনা করতো। সুমেরীয়রা লামেসতু নামের একটি খারাপ দেবতার উপাসনা করতো যার সাহায্যে সদ্য প্রসুত শিশুদের মৃত্যু কামনা করা হতো।

কিউনিফর্মে পাওয়া লামাশতুর মুর্তিঃ


প্রাচীন ফিনিশিয়রা (লেবানন) উপাসনা করতো “ম্যামন ” এর। হিব্রু বাইবেলে “ম্যামন” হচ্ছে ধন সম্পদ আর প্রাচুর্য নিয়ন্ত্রকারি শয়তান।

হিব্রুদের শয়তানঃ
সেমেটিক জাতিদের মধ্যে মানব ইতিহাসে হিব্রুদের অবদান অনেক। বিশেষ করে নৈতিকতা ও ধর্ম সংক্রান্ত ব্যাপারে। তবে ওল্ড টেস্টামেন্টের যুগের প্রারম্ভিক দিকেও ধর্মে শয়তানের কোন ভুমিকা নেই। এখানে ঈশ্বরই সর্বেসর্বা অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছা কর্ম। সে যুগের মানুষের চেষ্টা ছিল ঈশ্বরকে সব সময় তুষ্ট রাখার অপ্রাণ চেষ্টা করা। ঈশ্বর প্রসন্ন থাকলেই দেশ সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে কেবল ভালো বা শুভ পরিস্থিতি বিরাজ করবে আর কোন কারনে ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হলেই মানুষের উপর ঈশ্বরের অভিশাপ ধেয়ে আসে এটাই ছিল সে যুগের প্রচলিত বিশ্বাস।

সেসময় শয়তান হিসাবে যাকে মোটামুটি গুরুত্ব দেয়া যায় সে হচ্ছে বাআল হাবাদ। ক্যানানাইটদের বেশির ভাগ এই উর্বরতার দেবতা বাল এর উপাসক ছিলো আর হিব্রু দেবতা জিহোভা প্রধান প্রতিদ্বন্দী হওয়ায় বাআল কে ইহুদি ও খৃস্টান ধর্মে শয়তানের একজন অন্যতম প্রতিভু আখ্যা দেয়া হয়। যা পরে ইসলামও গ্রহন করে। বাইবেল মতে বিল জীবাব নামের শয়তান যার নামের অর্থ “মাছির রাজা” বাআল হিসাবে প্রাচীন প্যালেস্টাইনে উপাসিত হত।

আধুনিক যুগে শয়তান উপাসনাঃ
আধুনিক স্যাটানিজম প্রথম সবার নজরে আসে ১৯৬৬ সালে শয়তানের চার্চ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।আধুনিক শয়তানের দলগুলো নানা ভাগে বিভক্ত হলেও প্রধান দু’টি ধারা হচ্ছে আস্তিক স্যাটানিজম ও নাস্তিক স্যাটানিজম। আস্তিক শয়তানের দলগুলো শয়তানকে পূজা করে একটি অতিপ্রাকৃতিক দেবতা হিসেবে যিনি প্রকৃতই দয়ালু।অন্যদিকে নাস্তিক শয়তানের দলগুলো নিজেদের নাস্তিক মনে করে এবং শয়তানকে মনে করে মানুষের খারাপ বৈশিষ্ট্যের একটি প্রতীক হিসাবে।

আস্তিক স্যাটানিজমঃ আস্তিক স্যাটানিজম-এ যা প্রাচীনপন্থী বা আধ্যাত্বিক স্যাটানিজম নামেও পরিচিত, শয়তানকে দেবতা হিসেবে উপাসনা করা হয়।আস্তিক স্যাটানিজমকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যাতে কালো যাদুর উপর বিশ্বাস স্থাপন যা শয়তানকে পূজার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। আস্তিক স্যাটানিজমে শিথিলায়নের রীতি এবং আত্নার উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্ত। আস্তিক স্যাটানিজম প্রাচীন সূত্রগুলো থেকেও অনুপ্রেরণা লাভ করে (১৯৬০ সালের স্যাটানিক বাইবেল-এর আগের সূত্র) যেমন ১৮৬২ সালের বই ’’স্যাটানিজম ও ডাকিনীবিদ্যা’’। আরেকটি দলকে আস্তিক স্যাটানিজম ভাগে ফেলা যায়, যাদের নাম ’’বিপরীত খ্রিস্টান’’।এই শব্দটি একটি খারাপ শব্দ হিসাবে করে অন্যান্য আস্তিক শয়তানের দলগুলো। খ্রিস্টানরা অভি্যোগ করে যে বিপরীত খ্রিস্টানরা ব্ল্যাক মাস-এর চর্চা করে থাকে ।

নাস্তিক স্যাটানিজমঃ
নাস্তিক স্যাটানিজম একটি ধর্ম যা লাভেয়ান স্যাটানিজম নামেও পরিচিত।১৯৬৬ সালে আন্তন লাভেয়ান এই ধর্ম প্রচার শুরু করে। এর শিক্ষা গুলো আত্নকেন্দ্রিকতা, স্বভোগ ও চোখের জন্য চোখ নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আন্তন লাভেয়ান শয়তানের দলেরা নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদ-এ বিশ্বাসী, যারা শয়তানকে মানুষের সহজাত সুপ্ত প্রবৃত্তির প্রতীক মনে করে। নাস্তিক শয়তানের দল একটি ছোট ধর্মীয় দল যারা কোন ধরণের বিশ্বাসের সাথে জড়িত নয় এবং যার সদস্যরা নিজের ইচ্ছা পূরণে সচেষ্ট থাকে, বন্ধুদের প্রতি সদয় থাকে ও তাদের শত্রুদের আক্রমণ করে।তাদের বিশ্বাসগুলো স্যাটানিক বাইবেল-এ লিপিবদ্ধ যা শয়তানের চার্চ দেখাশোনা করে।


শয়তানকে র‍্যাংকিং অনুযায়ি বিভিন্ন নামে ডাকা হয় যেমনঃ- লুসিফার, বিল জীবাব, মোলোখ, ম্যামন, আজাজেল, অ্যাস্মোডিয়াস এরা নিউ টেস্টামেন্টের বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতা অনুযায়ি শয়তান।

ইসলামে শয়তানের নাম রাখা হয়েছে “ইবলিশ”,ইসলামে “ইবলিশ” চিত্রিত হয়েছে ঈশ্বরের পরে সব চেয়ে বেশী শক্তিশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তি চরিত্রে। প্রাচীন আরবের উর্বরতারর ও ভাগ্যের দেবী ত্রয় লাত উজ্জা মানত ইসলাম ধর্ম অনুযায়ি শয়তানের অংশ। শয়তান এদের মাধ্যমেই একবার ইসলামের পয়গম্বরকে বিভ্রান্ত করেছিলো।

পরবর্তিতে মধ্যযুগে এক সময় নাইট টেম্পলারদের বিরুদ্ধে সলোমনের প্রথম মন্দিরের নীচে আবিস্কৃত ধংশাবশেষ এর কাছে শয়তান উপাসনার অভিযোগ ছিলো।

তথ্যসুত্রঃ
THE HISTORY OF THE DEVIL AND THE
IDEA OF EVIL
FROM THE EARLIEST TIMES TO THE PRESENT DAY
by
PAUL CARUS
ও অন্যান্য


উৎসর্গ ব্লগার রেজোওয়ানা।
আমার দেয় কোন পোস্ট আপনাকে হার্ট করে থাকলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। সত্যি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১২ রাত ১:০৫
৪২টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিলেকোঠার প্রেম- ১৩

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৫


দিন দিন শুভ্র যেন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা শেষ। পড়ালেখাও নেই, চাকুরীও নেই আর চাকুরীর জন্য তাড়াও নেই তার মাঝে। যদি বলি শুভ্র কি করবে এবার? সে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন দেহের অপূর্ব সৌন্দর্যতা বুঝেন না! বলাৎকার বুঝেন?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩৫


শৈল্পিক প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নগ্নতাকে৷ ইউরোপে অন্ধকার যুগ কাটিয়ে রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল আধুনিক ও সভ্য ইউরোপ৷ রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা দেদারছেই এঁকেছেন শৈল্পিক নগ্ন ছবি৷... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নবীকে ব্যঙ্গ করার সঠিক শাস্তি সে ফরাসি শিক্ষক কি পেয়েছে?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩



গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সে কি হয়েছিল? একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাদের নবীর ব্যঙ্গচিত্র দেখিয়েছিলেন, বলা হয়েছিল তার উদ্দেশ্যে ছিল বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে বুঝানো। এটার পর এক মুসলিম যুবক তার ধর্মীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবি ও পাঠক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৩১

কবিদের কাজ কবিরা করেন
কবিতা লেখেন তাই
ভেতরে হয়ত মানিক রতন
কিবা ধুলোবালিছাই

জহু্রি চেনেন জহর, তেমনি
সোনার পাঠক হলে
ধুলোবালিছাই ছড়ানো পথেও
মাটি ফুঁড়ে সোনা ফলে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

***

স্বরচিত কবিতাটির ছন্দ-বিশ্লেষণ

শুরুতেই সংক্ষেপে ছন্দের প্রকারভেদ জেনে নিই। ছন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার সমূহ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:৩৪



আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নবীজি (সা.) মোরগ, লাউ, জলপাই, সামুদ্রিক মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×