somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পৈশাচিক

০৮ ই মে, ২০১৮ রাত ১০:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



অধ্যায়ঃ ১

গুলিস্তানে পা রেখে সোলেমান কিছুটা ভড়কে গেলো। কৌতুহলী চোখে মাথা ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে আরম্ভ করলো। যতোদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। সাথে যানবাহন তো রয়েছে। একসাথে এতো মানুষ আর গাড়ি সোলেমান কখনো দেখেনি। দেখার কথাও নয়। ঢাকা শহরে প্রথমবারের মতো এলো সে। আসার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট কারন আছে বটে। কারনটা পরে বলছি। তার আগে সোলেমান সম্পর্কে ধারনা দেয়া যাক।

খুলনার এক মফস্বল এলাকায় নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সোলেমান নিজের প্রচেষ্টায় অনার্স পাশ করেছে। বাবা মা গত হয়েছে বছর তিনেক আগে। প্রথমে বাবা মারা যায়। তারপর স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না পেরে পরের বছরই ঘুমের ভেতর মারা যায় মা। একটা ছোট বোন আছে। বছর খানেক আগে এক স্কুল মাস্টারের সাথে পালিয়ে গিয়েছে। কোথায় আছে সেটা জানে না। প্রথম প্রথম অনেক খোঁজাখুজি করলেও পরে আশা ছেড়ে দেয়।

অনার্স পাশ করে চাকরি না পেয়ে হতাশায় পড়ে যায় সোলেমান। টিউশনি করে যা আয় হয় তাতে একার পেট মোটামুটিভাবে চলে গেলেও ভবিষ্যৎ নেই। তেমন কেউ পরিচিত নেই যে তাকে একটা চাকরি দিয়ে উপকার করবে। একদিন হঠাৎ ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করতে গিয়ে হঠাৎ একটি খবর দেখে চোখ আটকে গেলো। কেউ একজন একটি খবর শেয়ার করেছে। তাতে লেখা- 'গুলশানে মধ্যরাতে এসে পুরুষ সঙ্গী ভাড়া করছে উচ্চবিত্ত নারীরা। এতে বেকার ছেলেদের ভালো আয়ের সাথে জৈবিক চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। এক কাজে দুই কাজ।’

সোলেমান যেনো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো এই পেশায় নিজেকে জড়াবে। অন্তত যতোদিন চাকরি না হয়। এই জীবনে টাকা ছাড়া যে দুনিয়া অচল সেটা সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। এই সুযোগ হাত ছাড়া করা যাবে না। রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রয়েল মোড় থেকে বাসে উঠে রওয়ানা হয় ঢাকার উদ্দেশ্য।

এটাই মূলত ঢাকা আসার কারন সোলেমানের। কিন্তু সারাদিন পড়ে আছে। এই সময়টা কি করবে কোথায় যাবে বুঝতে পারছে না। গুলশান এলাকায় যাওয়া দরকার। তারপর ওখানে সারাদিন কাটিয়ে রাতে কাজে নেমে পড়া যাবে। সমস্যা হলো গুলশান কিভাবে যাবে সেটাই বুঝতে পারছে না। সামনে পিছনে অনেক রাস্তা,কোন রাস্তায় গেলে গুলশান পৌছানো যাবে ভাবতে লাগলো। কয়েক পা হেঁটে ফুটপাতের এক দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করতেই সে ঠিকানা বলে দিলো। কিছু বুঝলো বলে মনে হলো না। এক সিনজি চালককে জিজ্ঞেস করতেই সে পাঁচশো টাকার বিনিময়ে গুলশান পৌছে দেয়ার প্রস্তাব দিলো। সোলেমান অনেকটা বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে সিএনজিতে উঠে বসলো। সিএনজি চলতে আরম্ভ করলো। সোলেমান সিএনজির দুইপাশ দিয়ে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে শহর দেখছে। এমন সময় চালক বললো,

'ভাইজান নতুন নাকি ঢাকায়?'
'হ ভাই। কেমনে বুঝলেন?'
'সবই অভিজ্ঞতা। তা গুলশান কই যাইবেন?'
'নাভানা টাওয়ার।'
'ঐখানে কেন? কেউ নিতে আইবো নাকি?'

সোলেমান আর কোন কথা বললো না। মনে মনে ভয় লাগতে আরম্ভ করলো। খবরে অনেক পড়েছে ঢাকায় অনেক সিএনজি চালক ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। নিজের সাথে যদি এমন হয় তাহলে কি করবে? বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোন উপায় থাকবে না। ব্যাগ থেকে টাকা বের করে হাতে নিয়ে প্যান্টের নীচে আন্ডারওয়্যারে রাখলো। ড্রাইভার না দেখলেই হলো। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়তে আরম্ভ করলো। একদিকে ভয় অন্যদিকে গরম। প্রচন্ড রকমের ঘামছে সোলেমান।

'আরো কতোদূর ভাই?'
'ঐ তো সামনে আমতলির মোড় দিয়ে ঢুকবো। তারপর সোজা গেলেই নাভানা টাওয়ার।’

সোলেমান মাথা নাড়লো। সিএনজি জ্যাম ছাড়িয়ে আমতলি মোড় ঘুরলো। এই রাস্তায় আজ জ্যাম কম। একটানে নাভানা টাওয়ারের সামনে এসে সিএনজি দাঁড়ালো। সোলেমান সিএনজি থেকে নেমে আড়ালে গিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে আন্ডারওয়্যার থেকে টাকা বের করে ড্রাইভারকে দিলো। ড্রাইভার টাকা হাতে নিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো,

'টাকাটা ওখানে না রাখলেও পারতেন। টাকা হলো লক্ষি। লক্ষিকে ওখানে রাখতে নেই।'

ড্রাইভার সিএনজি স্টার্ট দিলো। একটান দিয়ে উল্টোপথ ধরলো। সোলেমান নাভানা টাওয়ারের একপাশে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। মোবাইল বের করে ঘড়ি দেখলো। বেলা ১২ টা বাজে। এখনো অনেক সময়। মোবাইলের ক্যামেরায় একটি সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিলো। তাতে ক্যাপশন লিখলো,'নতুন জীবনের শুরু।' সাথে সাথে দু'চারটা লাইক পড়ে গেলো। কেউ একজন সম্ভবত কমেন্ট টাইপ করছে। সেটা দেখার জন্য মোবাইলের স্ক্রীনে তাকিয়ে রইলো। ফেসবুক বন্ধু ডানাকাটা পরি লিখেছে-'শুভ কামনা।' সোলেমান দারুণ খুশী হলো। কমেন্ট রিপ্লে দিতে গিয়ে দেখে মেগাবাইট নেই। মেজাজ গরম করে মোবাইল পকেটে রেখে দিলো।

এতো সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। দুপুরও হয়ে গিয়েছে। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। কোথায় খাবে সেটাই বুঝছে না। সব বড় বড় হোটেল। ফুটপাতের ভাতের হোটেল খুঁজতে আরম্ভ করলো। একজন পথচারীর কাছে খোঁজ জানতে চাইলে এই এলাকায় পাবে না বলে জানিয়ে দেয়। যেতে হবে মহাখালী রেলগেট। রাস্তার ওপারে একটা বিরিয়ানির দোকান চোখে পড়লো। দেখেই লোভ সামলাতে পারলো না। শেষ কবে বিরিয়ানি খেয়েছে মনে নেই। বাবা বেঁচে থাকতে মা প্রায়ই বিরিয়ানি রান্না করতো। মা মুখে তুলে খাওয়াতো। আজ বাবা মা বেঁচে থাকলে! একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সোলেমান। রাস্তা পার হয়। বিরিয়ানির দোকানের ভিতরে ঢুকতেই হোটেল বয় এগিয়ে আসে।

'কি দিমু কন মামা? তেহারি নাকি বিরিয়ানি?'
'দাম কতো ভাই?'
'তেহারি হাফ ৫০ টাকা,বিরিয়ানি হাফ ৮০ টাকা।'

এক প্লেট হাফ তেহারি দিতে বললো সোলেমান। বেশী খরচ করা যাবে না। এমনিতে বাস ভাড়া,সিএনজি ভাড়াতে অনেক টাকা চলে গেছে। রাতে যদি আজ কেউ ভাড়া না নেয় তাহলে কাল আবার খরচ বাড়বে। এভাবে রাস্তায় তো থাকা যাবে না। একটা মেসে থাকা দরকার। অচেনা শহরে কেইবা মেস খুঁজে দেবে?

হোটেল বয় তেহারি এনে সামনে রাখলো। সোলেমান প্লেট টেনে নিয়ে একবারেই পুরো প্লেট সাবাড় করে দেয়। এতোটুকুতে তার পেট ভরে নি। আরো এক প্লেট হলে ভালো হতো। কিন্তু টাকার কথা চিন্তা করে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে পেট ভরে নিলো। খাওয়া শেষে আবার নাভানা টাওয়ারের সামনে এসে দাঁড়ালো। সময় মোটে যাচ্ছে না। আশেপাশে কোথাও পা বাড়াচ্ছে না,যদি পরে না চিনতে পারে জায়গা। সোলেমান অপেক্ষা করছে রাতের জন্য। গভীর রাত।

অধ্যায়ঃ ২

গত তিন রাত ধরে ফারজানা রুপা একই ধরনের স্বপ্ন দেখছেন। মধ্যরাত। ঘন জঙ্গল। জোসনা রাত। সুঠাম দেহের কেউ একজন তার স্তন কেটে চিবিয়ে খাচ্ছে। তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

মধ্যবয়সী অপরুপা সুন্দরী ফারজানা রুপা এই আলিশান বাড়িটাতে একাই থাকেন। স্বামী নেই। নেই বললে ভুল হবে। ছিলো। সাংসারিক বনিবনা না হওয়ায় বিচ্ছেদ হয়েছে। তা প্রায় দুই বছর আগের কথা। দুই বছরের এই সময়টা একাই কাটিয়েছেন। এখনো কাটাচ্ছেন। তার মতো সুন্দরী মহিলা চাইলেই শত শত যুবক এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। শুধু সুন্দরী নন। পুরো বাড়িটার মালিক তিনি। কোন অংশীদার নেই। এরমধ্যে কেউ তাকে বিয়ে করতে চায়নি তা নয়। বন্ধুদের পার্টিতে হোক বা ব্যবসার পার্টনার-অনেকেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তিনি রাজি হন নি। বিয়ে নামক মায়ার বাধনে তিনি জড়াতে চান না নিজেকে। বাকী জীবনটা উপভোগ করে কাটাতে চান।

গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে তাতে চুমুক দিয়ে ব্যালকনিতে ইজি চেয়ারটায় হেলান দিলেন ফারজানা রুপা। হাতের অর্ধেক পুড়ে যাওয়া সিগারেটর ধোঁয়া মুখের ভেতর পুরে নিয়ে নাক দিয়ে ছাড়লেন। রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়লো। এমন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখার কারন বুঝতে পারছেন না তিনি। আগে কখনো এমন স্বপ্ন দেখেন নি তিনি। তাহলে হঠাৎ কেনো এমন স্বপ্ন? কোন বিপদ কি সামনে আসছে? নিজেকে প্রশ্ন করলেন ফারজানা রুপা। উত্তর পেলেন না।

কলিংবেলের শব্দে ধ্যান ভাঙলো তার। দুপুরবেলা সাধারণত কেউ আসেনা। দরজা খুলতে মন চাইছে না। যে আসে আসুক। মদের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে আরো একটি সিগারেট ধরালেন। কিছুসময় পর আবার কলিংবেল বাজলো। অনিচ্ছা থাকা সত্বেও চেয়ার ছেড়ে উঠে ব্যালকনি থেকে দেখার চেষ্টা করলেন। না কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি আবার চেয়ারে বসে হেলান দিলেন। সিগারেটে আবার টান দিয়ে গ্লাসে মদ ঢালতে গিয়ে থেমে যাবে। আজ ফারজানা রুপার বিয়ের প্রথম রাতের কথা মনে পড়ছে। ফুলশয্যার রাত। নারীদের কাঙ্খিত রাত।

বাবা মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছিলো সে। ছেলে পাইলট। দেশ বিদেশে উড়ে বেড়ায়। তার সাথে বিয়ে হলে মেয়ে নিশ্চয়ই সুখে থাকবে। বহুদেশ ঘুরতে পারবে। এমন ভাবনাতেই মহা ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিলো তাকে। ফুলশয্যার রাতে স্বামী তাকে ছিঁড়ে খায়। অস্বাভাবিক যৌনতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ফারজানা। তিনি জানতেন না বাসর রাতে মদ আর যৌন উত্তেজক ঔষধ খেয়ে ঘরে ঢুকেছিলো স্বামী। সে আরো জানতো না স্বামী শারিরীকভাবে অক্ষম। ধীরে ধীরে সে বিষয়টি আঁচ করতে পারে। তবে মেনে নিয়েছিলো। সহ্য করেছিলো। কিন্তু সহ্যর সীমা অতিক্রম করে সেদিন যেদি দেখে মাঝরাতে বাড়ির কাজের ছেলেটির সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয়েছে তারই স্বামী।

আর ভাবতে পারেন না তিনি। বমি চলে আসে। দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমে কমোডে মুখ দিয়ে বমি করে। সেদিনও স্বামীর সেই দৃশ্য দেখে বমি করেছিলো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি। পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছিলো তার।
ফোন বাজছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে খাটের উপর রাখা মোবাইল হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বান্ধবী জেসমিনের কন্ঠ,

'কিরে কোথায় ছিলি তুই? তোর বাসায় গেলাম। কলিংবেল বাজালাম। দরজা খুললি না।'
'ফোন দিতে পারতিস।'
'ব্যালেন্স ছিলো না। বিকালে ফ্রি আছিস?'
'কেনো?'
'আমার এক বন্ধু ইংল্যান্ড থেকে এসেছে। পার্টির থ্রো করেছি। চলে আসিস।'
'কথা দিতে পারছিনারে।'
'শোন তুই আসবি মানে আসবি। আমার বন্ধুকে তোর কথা বলেছি। সে তোর সাথে মিট করার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে।'
'ইংল্যান্ডে তোর কোন বন্ধু থাকে আগে বলিস নি তো।'
'সারপ্রাইজ দেবো তাই। চলে আসিস। আমার বন্ধু কিন্তু সেই হট এন্ড হ্যান্ডসাম। দেখলেই উত্তেজিত হয়ে যাবি।'

ফারজানা রুপা হাসলেন। তারপর ফোন কেটে বিছানায় ছুঁড়ে মেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। সব পার্টিতে খুব সেজেগুজে যান ফারজানা রুপা। সাজতে তার খুব ভালো লাগে। শাড়ি পরে পার্টিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নগ্ন হয়ে শাড়ি পরছেন। হঠাৎ স্তন যুগলের দিকে চোখ যেতেই আলতো করে ধরলেন। স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। ঠিক এমন সময় তার মনে হলো কেউ একজন উঁকি দিয়ে তার কাপড় পাল্টানো দেখছে। গাড়ির ড্রাইভার। প্রায়ই ও এভাবে উঁকি মেরে দেখে। ফারজানা রুপা জানেন। কিছু বলেন না। কেউ যদি লুকিয়ে তার শরীর দেখার পৈশাচিক আনন্দ পয় তাহলে ক্ষতি কিসের! নারী শরীর এমন জিনিস যা চুম্বকের মতো পুরুষদের টানে। সৃষ্টিকর্তার লোভনীয় এক সৃষ্টি।

কালো শাড়ি,হাতা কাটা ম্যাচিং ব্লাউজ পরে ফারজানা রুপা গাড়িতে করে মিরপুর ডিওএইচএস এর দিকে রওয়ানা হলেন। ড্রাইভার হিন্দী গান ছেড়ে দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে আড়চোখে লুকিং গ্লাসের ভেতর দিয়ে পিছনে তাকাচ্ছে। ফারজানা রুপা সেটা খেয়াল করে কিছু বললেন না। ভাবতে লাগলেন,এই ছেলেটা কি চায়? আমাকে? আমার শরীর? তাহলে বলছে না কেনো? ভয়ে? কিসের ভয়? আমি কি বাঘ? আচ্ছা ড্রাইভার যদি কখনো আমাকে শারীরিক সম্পর্কের অফার করে তাহলে আমি কি রাজি হবো? নাকি চাকরি থেকে বিদায় করে দেবো? এরকম নানান রকম প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো। ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে জেসমিনকে ফোন করলো,

‘আয়োজন কতোদূর?’
‘আয়োজন শেষ। তুই এলে পূর্ণতা পাবে। কতোক্ষন লাগবে তোর?’
‘এই তো চলে এসেছি। জ্যাম না থাকলে বড়জোর দশ মিনিট।’
‘ওকে আয়। রাখছি।’
দশ মিনিট না। ত্রিশ মিনিট লাগলো জেসমিনের বাসার সামনে পৌছাতে। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে জেসমিনের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঢুকতেই তাকে দেখে জেসমিন এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘এই তোর দশ মিনিট?’
‘ঢাকার জ্যামের কথা তো জানিস। ‘
‘বুঝেছি বুঝেছি। চল তোকে আমার বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ‘
জেসমিন তাকে একরকম টেনে নিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গেলো। দীর্ঘাকৃতির ফর্সা সুঠাম দেহের এক লোককে দেখিয়ে জেসমিন বললো,
‘আমার ফ্রেন্ড শাফায়েত । ইংল্যান্ডে থাকে। আর ও ফারাজান। আমার জানে জিগার ফ্রেন্ড। ’

শাফায়েত হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো ফারজানার দিকে। ফারজানাও হাত বাড়িয়ে দিলেন। দু’জনে পরিচয় হওয়ার পর্বটা সারলেন।

‘তোরা গল্প কর। আমি ওদিকটায় দেখছি।’ কথাটি বলে জেসমিন ওদের একা রেখে চলে গেলো। সোফায় দু’জন মুখোমুখি। কেউ কোন কথা বলছে না। কিছুসময় পর নীরবতা ভেঙে ফারজানা জিজ্ঞেস করলেন,

‘ইংল্যান্ডে কি একা থাকা হয় নাকি ওয়াইফ আছে?’
‘একাই থাকছি। ওয়াইফ নেই। ছিলো। ডিভোর্স।’
‘তারমানে একা?’
‘বলতে পারেন। তবে কাউকে ভালো লাগলে দোকা হয়ে যেতে পারি।’
‘কেনো একা জীবন এনজয় করছেন না?’
‘করছিনা তা বলবো না। করছি। তবুও এক ধরনের শূণ্যতা অনুভব করি। মনে হয় কি যেন নেই।’
‘শূণ্যতা! কেমন ধরনের? নারীর শূণ্যতা নাকি নারী শরীরের শূণ্যতা? সরি আমি মনে হয় বেশী প্রশ্ন করে ফেলছি।’
‘আরে না না। আসলে বলতে পারেন দু’টোরই শূণ্যতা। এবার আপনার কথা বলুন।’
‘আমার তো মনে হয় জেসমিন সব বলেছে। ’
‘বলেছে। তবু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।’
‘ওর মুখ থেকে যেটা শুনেছেন সেটাই সত্য। আমার মুখ থেকে নতুন কিছু বলার নেই।’

কথা বলতে বলতে জেসমিনের প্রবেশ। কিছুটা মজা করেই বললো,

‘প্রথম দেখায় এতো কথা! আরো তো দিন পড়ে আছে। এবার খেতে চলো। ’
খাবার টেবিলে ফারজানা আর শাফায়েত পাশাপাশি বসলো। জেসমিন খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললো,
‘তোমার দু’জন কিন্তু আজ রাতে থেকে যেতে পারো।’
‘তোমার মাথা ঠিকাছে? দু’জন ডিভোর্সী নারীর সাথে একজন ডিভোর্সী পুরুষের রাত্রিযাপন। কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে তো।’ বললো শাফায়েত।

কথা শুনে তিনজনই একসাথে হেসে উঠলো। শাফায়েত নারীলোভী পুরুষ। এমন কোনরাত নেই সে নারী ছাড়া থেকেছে। আজ রাতে সে জেসমিনের সাথে থাকবে। এটা ফারজানা বেশ ভালোকরে বুঝতে পেরেছে শাফায়েতের কাছে কনডমের প্যাকেট দেখে। বুক পকেটের ফাঁকা থেকে উঁকি দিচ্ছিলো সেটি।

বাইরে প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস বইছে। মেঘ ডাকছে। খাওয়া শেষে ফারজানা চলে যেতে উদ্যোত হলো। বেশীক্ষন থাকা মানে ওদের দু’জনকে বিরক্ত করা। ফারজানার বেরিয়ে পড়লো।

অধ্যায়ঃ ৩
রাত এগারোটা। নাভানা টাওয়ারের সব দোকান এক এক ঘরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বেশ আগে। আশেপাশের কোন দোকানও খোলা নেই। কিছু মানুষ রাতের শেষ বাসে ঘরে ফিরছে। সোলেমানের ঘরে ফেরার তাড়া নেই। নাভানা টাওয়ারের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। থেকে থেকে মেঘ ডাকছে আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সোলেমানের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলায় বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চমকালে ভয় পেয়ে দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলের তলে লুকাতো। আজ যতোই বিদ্যুৎ চমকাক। ভয় পেয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। জীবন তাকে আজ এইখানে এনে দাঁড় করিয়েছে।
একটা সাদা রঙের গাড়ি এসে সোলেমানের সামনে এসে থামলো। এটা ফারাজানা রুপার গাড়ী। নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। ড্রাইভারকে জেসমিনের বাসায় থাকতেই ছুটি দিয়েছেন। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে হাতের ইশারায় সোলেমানকে ডাকলেন। সোলেমানের বুকটা ধক করে কেঁপে উঠলো। কেমন যেনো ভয় ভয় লাগছে। ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগোলো। ফারজানা গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে বললেন। সোলেমান গাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ফারজানা বুঝতে পারলেন ছেলেটির পা কাঁপছে। এখানে দুই কারনে পা কাপতে পারে। বৃষ্টির ঠান্ডা অথবা ভয়ে।

'নতুন?'
সোলেমান মুখের দিক না তাকিয়ে উত্তর দিলো,
'জ্বি।'
'নাম কি?'
'সো... সোলেমান।'

একটি টাওয়েল বের করে দিয়ে বললো,

'কাঁপছো কেনো? টাওয়েল দিয়ে মাথা মোছো। কোন ভয় নেই। তোমাকে কতো দিতে হবে? আই মিন পার নাইট রেট।'
সোলেমান মাথা মুছতে মুছতে বললো,
'আমি তো জানিনা। তবে দিয়েন যা মন চায়।'
'আচ্ছা। বুঝলাম। তিন হাজার পাবে। খুশী করতে পারলে পাঁচ হাজার। সাথে রাতের খাবার। রাজি?'

সোলেমান মাথা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। ফারজানা আর কোন কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

মেল এস্কোর্ট ভাড়া করা ফারাজানার কাছে নতুন কোন বিষয় নয়। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর প্রায় সময় এভাবে ভাড়া করে শারীরিক চাহিদা মেটায়। এক একদিন এক একটি ছেলে। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ। তার ভালো লাগে। একবার এক মেল এস্কোর্টের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন ফারজানা। গর্ভে তার সন্তানও এসেছিলো। কিন্তু তাকে গর্ভেই মেরে ফেলা হয়। ফারজানা চায়নি কোন মেল এস্কোর্টের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখুক। ছেলেটি খুব করে চেয়েছিলো ফারজানাকে বিয়ে করে এই জীবন ছেড়ে দিয়ে নতুন জীবন আরম্ভ করবে। পারে নি। সে এখন কলকাতা থাকে। সেখানেই নিজের মেল এস্কোর্ট এজেন্সি করেছে। ব্যবসা ভালোই চলছে। কলকাতা থেকে একবার ফোন করেছিলো সে ফারজানাকে। ঐ একবারই। আর কখনো ফোন দেয়নি। ফারজানাও কখনো ফোন দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি।
যাহোক। ড্রয়িং রুমে চুপচাপ বসে আছে সোলেমান। ফারজানা অনেকক্ষণ হলো তাকে বসিয়ে রেখে ভিতরে গিয়েছেন। অনেকটা সময় পার তিনি এলেন। হাতে মদের গ্লাস। সোলেমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘এসব খাওয়ার অভ্যাস আছে?’

সোলেমান মাথা তুলে তাকালো। ফারজানা গোলাপী রংয়ের নাইটি পরা। চুল এলোমেলো। সোলেমান হা করে তাকিয়ে রইলো। এমন সুন্দরী নারী সে আগে মাত্র একজনকেই দেখেছে। কলেজে যে মেয়েটাকে সে ভালোবাসতো সে। মেয়েটা এতোটাই সুন্দরী ছিলো যে কখনো সাহস করে বলতে পারেনি তাকে ভালোবাসার কথা। তাছাড়া মেয়েটি ধনী ঘরের ছিলো। গরীবের ছেলের দেয়া প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হতো না। তারপর হঠাৎ একদিন শুনতে পেলো প্রবাসী এক ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। খবরটি শুনে খুব কেঁদেছিলো সে। গরীব করে পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে অনেক গালিও দিয়েছিলো।
ফারজানা আবার বললেন,

‘কি দেখছো তাকিয়ে ওভাবে? সুন্দরী মেয়ে দেখোনি কখনো আগে?’
‘জ্বি… না মানে….! আমতা আমতা করতে লাগলো সোলেমান।’
‘বি কুল ম্যান। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ঘাবড়ালে তো সারারাত পার করতে পারবে না। এক কাজ করো সামনে গিয়ে ডান পাশটায় বাথরুম । গোসল করে আসো। তোমার শরীরে ঘামের গন্ধ। অপরিস্কার শরীরে এসব কাজ করতে নেই। ক্লায়েন্টের রুচিতে বাধে। তুমি নতুন ,তাই বুঝতে পারছো না। ‘

অনেকটা বাধ্যগত সন্তানের মতো সোলেমান বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। এতো সুন্দর বাথরুমে সে জীবনেও গোসল করেনি। বাথটাব,ঝর্ণা,কমোড,এসি-কি নেই বাথরুমে! ওদের শোবার ঘরের মতো বড় বাথরুম। নেহায়েত ভাগ্য ভালো বলেই আজ এতো সুন্দর বাথরুমে গোসল করতে পারছে।

প্রায় ত্রিশ মিনিটের মতো লাগলো গোসল করতে। শরীরটা বেশ সতেজ লাগছে। রাতের খাবারটা খেতে পারলেই শান্তি। তারপর....!
সাদা টাওয়েল পরে বাথরুম বেরিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেলো। ফারজানা রুপা নেই। মদের গ্লাসটা নীচে পড়ে আছে। ফ্লোর ম্যাট থাকায় গ্লাস পড়ার শব্দ তার কানে গিয়ে পৌছায় নি। একপাশ থেকে ভেঙে যাওয়া গ্লাসটি উঠিয়ে টেবিলে রাখলো। সোলেমান মৃদু কন্ঠে ডাকতে আরম্ভ করলো-'এই যে শুনছেন। কোথায় আপনি? একটু দরকার ছিলো।'

কোন সাড়া শব্দ নেই। ডাকতে ডাকতে ভিতরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। ফারজানার রুপার শোবার ঘর সম্ভবত। আস্তে করে দরজা খুলে ভিতরে তাকাতেই আঁতকে উঠলো। এটা কি করে সম্ভব? না এটা হতে পারে না। আমি নিশ্চয়ই ভুল দেখছি। সোলেমান আবার দরজা খুলে তাকালো। না সে ভুল দেখেনি। বিছানার পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন ফারজানা রুপা। মুখে স্কচটেপ লাগানো। হাত দড়ি দিয়ে বাধা। গোলাপি রংয়ের নাইটটি শরীরে নেই। উলঙ্গ। বাম পাশের স্তন কাটা।

অধ্যায়ঃ ৪

'তুমি আমাকে ভালোবাসো?'

প্রশ্নটি শুনে শাফায়েত কোন কথা বললো না। ঘুম ঘুম আসছে। রাত প্রায় শেষ। এখন একটু না ঘুমালে কাল বোর্ড মিটিংয়ে ঠিকঠাক কথা বলা সম্ভব হবে না। প্রশ্নের কোন উত্তর না পেয়ে জেসমিন বালিশের উপর থেকে মাথা সরিয়ে শাফায়েতের বুকে রেখে আবারো একই প্রশ্ন করলো। শাফায়েত ঘুম ঘুম চোখে উত্তর দিলো,

'ভালোবাসি বলেই শেষ রাত পর্যন্ত ভালোবাসলাম'
'তুমি আমার শরীরকে ভালোবেসেছো। আমাকে না।'
'তুমি আর তোমার শরীর কি আলাদা?'
'আমি এক জিনিস আর শরীর আর এক জিনিস। তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারো নি শাফায়েত?'
শাফায়েত চোখ খুললো। আলতো করে মাথায় চুমু খেয়ে বললো,
'ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি।'
'তাহলে আমাকে একটা বেবি দেবে তুমি?'
'মানে?'
'আমি কনসিভ করতে চাই।'
'আর ইউ ম্যাড?'
'মাথা ঠিকই আছে। আমাকে বেবি দিবে কিনা বলো।'

বুকের উপর থেকে জেসমিনের মাথা সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলো শাফায়েত। সিগারেট ধরালো। তারপর খুব শান্তস্বরে বললো,
'তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন। কাল আমার সাথে সাইকিয়াট্রিকের কাছে যাবা।'
'আমার কি অপরাধ বলো? আমার কি মা হওয়ার অধিকার নেই? ' কেঁদে ফেললো জেসমিন।

জেসমিনের কষ্টের আরো বড় কারন রয়েছে। সেটা জানতে ফিরে যেতে হবে কোন এক শীতের রাতে। যে রাতে প্রকৃতি শীতে জবুথবু থাকলেও জেসমিনের ঘর ছিলো উত্তপ্ত।

'আমার সাথে সংসার করতে হলে তোমাকে আমার কথা শুনতে হবে। আর যদি না শুনতে চাও তাহলে আমার ঘর তোমার জন্য নয়।'
'তার মানে কি বলতে চাইছো তুমি?'
'আমি কি চাইছি সেটা তুমি ভালো করে জানো। কাল সকালে নাসিং হোমে যাবা। অ্যাবোরশন করে আসবা। আমি চাইনা এখন কোন সন্তানের বাবা হতে।'
'এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশান?'
'ফাইনাল ডিসিশান অ্যান্ড ফাইনাল ডিসিশান।'
'বেশ তাহলে আমার ডিসিশান শুনে রাখো। আমার বাচ্চাকে আমি পৃথিবীর আলো দেখাবো। আর তোমার পরিচয়ে বড় হবে।'

জেসমিনের স্বামী জামশেদ কোন প্রতিউত্তর করলো না। মদের গ্লাসে মদ ঢেলে ঢক ঢক করে দুই পেগ খেয়ে নিলো। শরীর কাঁপছে। দাঁতের দুই পাটি এক হয়ে আসছে। রেগে গেলে যেমনটা হয়। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক হতে চাচ্ছেন। রাগটা পুষে রেখে সোফা থেকে উঠে হাসতে হাসতে জেসমিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। জেসমিনের মাথায় হাত দিয়ে বললো,

'এমন বোকামি করে না। দেখেছো তো ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। লস করেছি আগের প্রোজেক্ট। আর কয়েকটা বছর সময় দাও।'
জেসমিন মাথা থেকে এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,
'তোমার এই কথা বিয়ের দিন থেকে শুনে আসছি। আর শুনছি না আমি।'

জামশেদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ডান হাত দিয়ে পেটের উপর এমন জোরে একটা ঘুষি মারে যে কয়েক সেকেন্ডের ভেতর অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

সে যাত্রায় জেসমিন বেঁচে যায়। পেটের বাচ্চাটা বাঁচে নি। বাবার হাতে ভুমিষ্ঠ হওয়ার আগে গর্ভেই মৃত্যুবরন করতে হলো। ডাক্তার বলেছিলো দ্বিতীয় সন্তান নিতে চাইলে সেটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সন্তান না নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিলো।

'ঝুঁকি আছে জেনেও তোমার কনসিভ করা ঠিক হবেনা। বোঝার চেষ্টা করো।' বললো শাফায়েত।
'জীবনের একটা শেষ ঝুঁকি নিতে চাই।'
'এতে তোমার বাঁচার সম্ভাবনার ত্রিশ পার্সেন্ট। ভাবতে পারছো বিষয়টা?'
'আমি ত্রিশ পার্সেন্ট ও হাত ছাড়া করতে চাই না। তাছাড়া কোন গায়নোকোলজিস্টের তত্ত্ববধায়নে থাকলে সমস্যা হবে না। তুমি শুধু বলো রাজি কিনা!'
'বাবার পরিচয়? তাছাড়া আমরা বিবাহিত নই।'
'সো হোয়াট? সমস্যা নেই। ও আমাকে বাবা-মা হিসেবে জানবে। তোমাকে কোনদিন বাবা ডাকবে না। চিন্তা করো না।'

দু'জনেই চুপ। তাকিয়ে আছে দু'জন দু'জনের দিকে। জেসমিন বা হাত কিছুটা লম্বা করে টেবিল ল্যাম্পটা বন্ধ করে দিলো। পুরো ঘর অন্ধকার। শুধু দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ।

অধ্যায়ঃ ৫

ঘন্টা দেড়েক ধরে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে এগলি ওগলি হাঁটাহাঁটি করছে সোলেমান। কি করবে,কোথায় যাবে কিছু বুঝতে পারছে না। নিরুদ্দেশ হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যাচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছে না। ঢাকাতে এসে এমন একটা বিপদে পড়ে যাবে ভুলেও সে ভাবেনি। পুলিশ ধরতে পারলে খুন না করেও খুনের দায় নিয়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য কেউ উকিল ধরবে না। সরকার উকিল দিলেও সেটা হবে নামমাত্র। বেঁচে থাকতে হলে পালিয়ে থাকতে হবে।
প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। পা চলছে না আর। রাস্তার পাশে ফুটাপাতে শুয়ে পড়লো। সাথে সাথে যেনো নিন্দ্রাদেবী ভর করলো দু'চোখে। হঠাৎ কিছু সময় পর সে অনুভব করলো পেটে কেউ লাঠি দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। চোখ খুলতেই দেখে সামনে দু'জন টহল পুলিশ দাড়ানো। সোলেমান শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে পুলিশের পা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বললো,

'স্যার আমি কিছু করি নাই। আমাকে ধরে নিয়ে যাবেন না।'

দু’জন পুলিশ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে তারপর তাদের ভেতর থেকে একজন বললো,

'এখানে এতো রাতে কি? মতলব তো ভালো লাগছে না।'
'আমি কিছু করি নাই স্যার বিশ্বাস করেন '

একজন পুলিশ সোলেমানের পকেটে হাতাহাতি করা আরম্ভ করলো। কিছু সময় পর একটি ছোট পলিথিনের প্যাকেট বের করে বললো,

'ইয়াবার ব্যবসা করিস। চল থানায় চল।'
'কি বলেন স্যার! আমি এসব কিছু করি না।'
'জানি করিস না। কয় টাকা আছে সাথে?'
'এক হাজার চারশো পঞ্চাশ টাকা।'
'বাইর কর।'

সোলেমান টাকা বের করতেই এক পুলিশ খপ করে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতে নিলো। তারপর টাকা গুনে সেখান থেকে ১০০ টাকা বের করে সোলেমানকে দিয়ে বললো,

'সোজা নাক বরাবর হাঁটতে থাক। পিছনে তাকাবি না।'
'স্যার টাকা নিলে আমি না খেয়ে মরবো। ঢাকা শহরে আমি নতুন।'
'আর একটা কথা বললে ইয়াবা কেসে জেলে ঢুকিয়ে দেবো।'

আর কোন কথা না বলে সোলেমান সোজা হাঁটতে আরম্ভ করলো। বিপদ যখন আসে সব দিক থেকে আসে। নিরুপায় হয়ে আবারো হাঁটতে আরম্ভ করে। সামনে একটা পার্ক দেখে ভিতরে ঢোকে। নিরাপদ ভেবে একটি খালি বেঞ্চে শুয়ে পড়ে। ঘুম আসছে না। যে বিপদের সমুদ্রে সে হাবুডুবু খাচ্ছে সেখান থেকে কিভাবে উদ্ধার হবে সেটাই এখন বড় চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় সোলেমান খেয়াল করলো কেউ একজন এগিয়ে আসছে। একটি মেয়ে। অল্প বয়সী। তাকে দেখে বললো,

'লাগবে নাকি?'
'কি?'
'কি বোঝোনা? শুইবি আমার সাথে? এক শট ১০০ টাকা। রাজি হইলে চল।'
'না, আমি শোবো না। আপনি যান।'
'কেন,শুবি না কেন? তোর ঐডা নাই?'
সোলেমান কথা বলে না। মেয়েটিও কথা বাড়ালো না। ফিরে চলে গেলো।

মেয়েটির নাম বিউটি। এই ফার্মগেটের এই পার্কে যৌনকর্মীর কাজ করে। বয়স তেমন একটা নয়। চেহারা দেখে সর্বোসাকুল্যে পঁচিশ বছর হবে। এই বয়সে একটি মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা কিংবা সংসার করার কথা। অথচ বিউটির কপালে সেরকটা জোটেনি। ওর এই পেশায় আসার পিছনে করুন একটি কাহিনী আছে।
বরিশাল থেকে সেবার সৎ বোনের সাথে ঢাকায় আসে বিউটি। উদ্দেশ্য ঢাকার ভালো একটি কলেজে ভর্তি হবে। সৎ বোন সেরকম প্রতিশ্রতি দিয়েছিলো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে ভালো একটি কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয় ঠিকই। কয়েক মাস ভালোই চলছিল। তারপর থেকে বিউটির জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ও জানতো না সৎ বোন আর দুলাভাই যৌন ব্যবসায় জড়িত। একরাতে তার ঘরে লোক ঢুকিয়ে দেয়। লোকটি বিউটিকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে। প্রচুর রক্তপাত হয়েছিলো। লোকটি চলে যাওয়ার পর দুলাভাই ঘরে ঢুকে বলেছিলো,

‘এখন থেকে এসব করেই নিজের খরচ চালাতে হবে। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না।'

দুলাভাইয়ের কথা শুনে সে তার নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলো না। যে দুলাভাইকে সে বাবার মতো দেখে সে কিনা! সারারাত কেঁদেছিলো সে। বোন একটি বারের জন্য তাকে দেখতে আসেনি।

পরের রাতে এক মতাল তার ঘরে ঢুকেছিলো। কিরকম শারীরিক নির্যাতন করেছিলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। সিগারেট দিয়ে যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দিয়েছিলো। এভাবে প্রতিরাতে নির্যাতনের স্বীকার হতে হতে বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসে। কোথাও আশ্রয় ছিলোনা। ফার্মগেটের এই পার্কে আশ্রয় নিয়েছিলো। এখানেও পুরুষ খুবলে খেয়েছে তার শরীর।

রাতের শেষ খদ্দেরের অপেক্ষায় বিউটি। তারপর বাড়ি ফিরবে। অনেকক্ষন পার হয়ে গেলেও কোন খদ্দেরের দেখা নেই। সকাল হবে হবে এই সময়টায় খদ্দের তেমন পাওয়া যায় না। একপ্রকার নিরাশ হয়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকে পা বাড়াতেই এক খদ্দের এসে হাজির।

'কিরে যাবি নাকি?'
'আমি বাসায় যাইনা। এইখানে কাম করি।'
'বাসায় গেলে সমস্যা কি? বাড়ায় দিবানি। চল।'
'সমস্যা আছে।
'ঠিক আছে চল কই নিয়া যাবি?'

বিউটি খদ্দেরকে পার্কের ভেতরে এক কোনায় নিয়ে গেলো। সোলেমান সবকিছু খেয়াল করে দেখছিলো। এসব দেখে জীবনের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা জন্মাতে লাগলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদুকন্ঠে বললো,

'খোদা,কেনো যে তুমি মানুষ বানালে? আর বানালে যেহেতু সেহেতু সবাইকে এক বানাওনি কেনো? তোমার খামখেয়ালি বোঝা বড় দায়। তুমি একই সাথে সদয়,একই সাথে নির্দয়।'
এমন সময় সোলেমান খেয়াল করলো বিউটি চিৎকার করে তার খদ্দেরকে গালাগাল করছে।
'খবরদার একদম বুকে হাত দিবি না।'
'কেন তোর বুকের কি লাখ টাকা দাম?'
'হ,লাখ টাকা দাম।'
'মাগি বেশী কথা কইলে একদম কাইটা নিয়া যামু। চুপ থাক।'
সোলেমান শিউরে ওঠে। এখনি এখান থেকে চলে যাওয়া দরকার। নয়তো আবারো ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে পারি। ভাবতে ভাবতে শোয়া থেকে উঠে হাঁটা আরম্ভ করতেই পিছন থেকে বিউটির ডাক।
'কই যাস?'
'জানিনা।' পেছন ফিরে তাকিয়ে বললো সোলেমান।
'যাওয়ার জায়গা নাই?'
'না। আজকেই ঢাকা এসেছি। থাকার জায়গা পাইনি কোথাও।'
'দেখেই বুঝছি। চল আমার সাথে।'
'কোথায়?'
'আমার বাড়ি।'
'আপনার কাজ শেষ?'
'হ শেষ। আইজ রাইতে আর পারমু না। অনেক যন্ত্রণা দিছে হারামির বাচ্চারা। সব শালারা বেজন্মা। শরীর পাইলে খাইয়া ফেলতে চায়।'

বিউটির পেছন পেছন সোলেমান হাঁটতে লাগলো। ভীতি কাজ করছে মনের ভেতর। আবারও যদি কোন বিপদ সামনে এসে দাঁড়ায় তখন!
সরু গলির ভেতর ঢুকলো বিউটি। ডাদিকে মোড় নিয়ে বস্তির ভেতর ছোট একটা ঘরে ঢুকলো। সোলেমান পেছন পেছন ঢুকলো।

'তুই এখানে বয়। আমি আসতেছি।'

বাইরে মসজিদে আজান দিচ্ছে। সোলেমান হাই তুলছে। ঘুম আসছে। বিউটি গোসল করে এসে তাকের উপর থেকে জায়নামায বের করে নামাজে দাঁড়ালো। সোলেমান যেনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। একজন বেশ্ব্যা নামাজ পড়ে! অপলক তাকিয়ে দেখছে বিউটির নামায পড়া। মোনাজাতে বসে বিউটি অঝোর ধারায় কাঁদছে। প্রতিরাতে কাজ শেষে এসে এভাবে নামাজ পড়ে অঝোরে কাঁদে জায়নামাজে বসে। ক্ষমা চায়। পরিত্রাণ চায় এ জীবনের। বিউটি নামাজ শেষ করে খাবার নিয়ে আসলো সোলেমানের জন্য।

'চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না খেয়ে আছিস। খেয়ে নে।'
'আপনি নামাজ পড়েন?'
'কেন নামাজ পড়তে পারিনা আমি? বেশ্ব্যার কথা আল্লাহ শোনে না?'
'আমি তা বলিনি।'
'খেয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়। সকালে তোর সব কথা শুনবো।'
'আপনি?'
'আমি নীচে শোবো। সমস্যা হবে না।'

সোলেমানের ক্ষুধা মরে গেছে। পেটে খাবার ঢুকছে না। তবুও কোনরকম খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লো। শুয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে গেলো। যেনো কতোকাল সে ঘুমায় না।

..... (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০১৮ রাত ১০:৫২
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রহস্যোপন্যাসঃ মাকড়সার জাল - প্রথম পর্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ৯:৪০




(১)
অনেকটা সময় ধরে অভি কলিং বেলটা বাজাচ্ছে ।বেল বেজেই চলেছে কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। একসময় খানিকটা বিরক্ত হয়ে মনে মনে স্বগোতক্তি করল সে
-... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যস! আর কত?

লিখেছেন স্প্যানকড, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:০১

ছবি নেট ।

বাংলাদেশে যে কোন বড় আকাম হলে সরকারি আর বিরোধী দুইটা ই ফায়দা লুটার চেষ্টা করে। জনগন ভোদাই এর মতন এরটা শোনে কতক্ষণ ওর টা শোনে কতক্ষণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরতের শেষ অপরাহ্নে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ১০:৫৫

টান

লিখেছেন বৃষ্টি'র জল, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:০৩






কোথাও কোথাও আমাদের পছন্দগুলো ভীষণ একরকম,
কোথাও আবার ভাবনাগুলো একদম অমিল।
আমাদের বোঝাপড়াটা কখনো এক হলেও বিশ্বাস টা পুরোই আলাদা।
কখনো কখনো অনুভূতি মিলে গেলেও,
মতামতে যোজন যোজন পার্থক্য।
একবার যেমন মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফ্রিকায় টিকাও নেই, ভাতও নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২১ রাত ১০:৫৪



আফ্রিকার গ্রামগুলো মোটামুটি বেশ বিচ্ছিন্ন ও হাট-বাজারগুলোতে অন্য এলাকার লোকজন তেমন আসে না; ফলে, গ্রামগুলোতে করোনা বেশী ছড়ায়নি। বেশীরভাগ দেশের সরকার ওদের কত গ্রাম আছে তাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×