somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: একটি হাস্নাহেনা গাছের উপাখ্যান

১২ ই মার্চ, ২০২০ দুপুর ১২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সারারাত লণ্ডভণ্ড ঝড়ের পরে ভোর বেলা যেমন শান্ত অথচ বিপন্ন একটি পরিবেশ বিরাজ করে, রাহেলা বেগমের কাছে বছরের এই দিনটিও সেরকম।

তিনি ডুপ্লেক্স বাসাটির উপরতলার বেলকনিতে চেয়ারে বসা। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেখতে থাকেন পনের বছরের প্রাণোচ্ছল হরিণীর মতো চঞ্চলা একমাত্র নাতনি নিতুকে। বাড়ির পেছন দিকের লনে হাস্নাহেনা গাছের গোড়ায় চেয়ার পেতে ওর বান্ধবিদের সাথে আড্ডারত নিতুও লক্ষ্য করে বারান্দার আরাম কেদারায় বসা বৃদ্ধা দিদাকে।

নিতু নিচ থেকে চিৎকার করে দিদাকে ডাকে, ‘ওল্ড লেডি, নিচে আসো। জমিয়ে আড্ডা দেই আজ’।

রাহেলা বেগম বেদনাক্লিষ্ট হাসি মুখে ধরে পাশের হাস্নাহেনা গাছটির দিকে তাকায়। গাছটিও নিতুর বয়সী। উচ্ছল ও অপরূপ। নিটোল ও তরতাজা। সুগন্ধি ছড়িয়ে চলেছে গোটা বাড়ি। বিষন্ন মনে বেলকনি থেকে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দেয় এসে। বিশাল বাড়িতে বড় একা লাগে আজকাল নিজেকে তার।

নিতু দিদার উঠে যাওয়া লক্ষ্য করে। কিছুক্ষণ পরে বন্ধুদের বিদায় দিয়ে সে দিদার রুমে আসে। এই সন্ধ্যা রাতেও দিদাকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে। নিতুর পায়ের আওয়াজ পেয়ে শুয়ে থেকেই নিতুকে কাছে ডাকে রাহেলা বেগম।

নিতুও দিদার পাশে আলতো করে শুয়ে ফিসফিস করে জানতে চায়, ‘ওল্ড ফুল, আজকে কি বেশিই মন খারাপ? আমি লক্ষ্য করেছি প্রতি বছর আমার জন্মদিনে তুমি মন খারাপ করে থাক’।

রাহেলা বেগম কাষ্ঠল হাসি হেসে টেনে টেনে বলে, ‘কে বলল, মন খারাপ করি। আসলে ভাবি, আর কয় জন্মদিন পরেই তো তুই আমাকে ছেড়ে আরেকজনের পাশে এভাবে শুয়ে থাকবি’।

‘দিদা, ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আবার শুরু করেছ’- নিতু রাহেলা বেগমের পিঠে মৃদু চপেটাঘাত করে রূম থেকে বের হয়ে আসে। রাহেলা বেগম হো হো হেসে ওর চলে যাওয়া দেখে। ভাবে কত দ্রুত সময় চলে যায়।

আজকে সারাদিন নিতু ফুরফুরে মেজাজে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়িয়েছে। বাবা-মার একমাত্র আদুরে সন্তান হওয়ায় গোটা বাড়িতে তার এই রাজত্ব সে নিজেও বেশ উপভোগ করে। সে শুনেছে সে সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বেবি। দীর্ঘদিন তার বাবা-মার সন্তান না হওয়াতে সে এভাবেই পৃথিবীতে এসেছে। সে জন্য নিতু তার বাবা-মার কাছে আলাদা রকম আদর-ভালোবাসা পায়। সে সেটা উপভোগও করে।



কয়েক দিন পর ঘুরতে ফিরতে চিরাচরিতভাবে নিতু দিদার রুমে উঁকি দেয়। দেখে রাহেলা বেগম পত্রিকা খুলে রেখে কাঁদছে। নিতু দৌড়ে দিদার কাছে যায়। ভাবে আজকে মাসের তিন তারিখ। বিশেষ কোনো শোকের দিন নয়। তাহলে...।

উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘দিদা, কি হয়েছে তোমার। এভাবে কাঁদছ কেন?’

রাহেলা বেগম আঁচলে চোখ মুছে নিতুকে কাছে টেনে নেয়। নিতুর দিকে বাংলা খবরের কাগজটি এগিয়ে দেয়। নিতু দেখে বড় বড় করে হিডিং ‘ধর্ষিতা গৃহপরিচারিকার মৃত্যুরহস্য উৎঘাটন’। নিতু বাংলাতে কাঁচা হওয়ায় ‘উৎঘাটন’র মানে বুঝতে পারে না। দিদার দিকে তাকিয়ে উৎঘাটনের অর্থ জানতে চায়।

রাহেলা বেগম আস্তে করে বলে, ‘রিভিল করা, আনকভার, ডিভালজ’। নিতু আন্দাজ করতে পারে ঘটনার। এরকম ঘটনা এখন প্রায়শই ঘটে চলেছে। এর আগেও সে দিদাকে দেখেছে এসব নিউজ পড়ে মন খারাপ করে থাকতে। নিতু শুনেছে দিদার বাবার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ভীষণ সুন্দরীর জন্য দাদুভাই দিদাকে বিয়ে করে গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে এনে এই আলিশান বাড়িতে তোলে। লেখাপড়া শিখিয়েছে। নিতু ভাবে দিদা হয়ত এজন্যই গরীব মানুষের প্লাইট দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ে।

নিতু এবার রাহেলা বেগমের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভেতরে কি লিখেছে আমাকে খুলে বল। যার জন্য তুমি এভাবে কাঁদছ’।

রাহেলা বেগম নিতুর মুখের দিকে গভীরভাবে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠে, ‘অনেক করুণ কাহিনি। শুনে তুইও কেঁঁদে দিবি। এখন তুই যা’।

নিতু জেদ করে, ‘এখনই শুনব’। রাহেলা বেগম একটু অসহিষ্ণু হয়ে বলে,’তুই নিজেও তো পড়তে পারিস’।

নিতু গোঁ ধরে বলে উঠে, ‘আমার বাংলা পড়তে একদম ভালো লাগে না’।

রাহেলা বেগম বুঝে উঠে না আজকাল ছেলেমেয়েগুলো এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে তাই বলে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুকে বিসর্জন দিতে হবে।

নিতুর চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে বলে, ‘অনেক বড় কাহিনি লিখেছে। গোটাটায় শুনবি’। মাথা ঝাঁকায় নিতু। দিদার কন্ঠ স্বরের পরিবর্তন টের পায় ও।

রাহেলা বেগম বলে চলে, ‘এটি একটি দুঃখী মেয়ের গল্প। গ্রামের সুন্দরী মেয়েটি বখাটেদের…’
নিতু দিদাকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চায়, ‘বখাটে মানে কি?’

‘বখাটে হচ্ছে খারাপ ছেলে যারা মেয়েদের স্টকিং করে বা খারাপ খারাপ কথা বলে, বাজে ব্যবহার করে’।- রাহেলা বেগম উত্তর দেয়।

‘বখাটেদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানে ইম্প্যাশন্ট বা ডিসগাস্টেড ফিল করে মেয়েটির গরীব বাবা। মেয়েটির এক দূর সম্পর্কের মামা ঢাকাতে অনেক বিত্তশালী বা রিচ এক পরিবারে গাড়ির ড্রাইভার। মামা সবকিছু শুনে দুলাভাই মানে মেয়েটির বাবাকে প্রস্তাব দেয় মেয়েকে ঢাকা পাঠানোর’।

‘প্রস্তাব মানে কি?’-নিতু আবার জানতে চায়।

‘উফ, বড্ড জ্বালা হল। এত মানে মানে করলে ভালো লাগে। প্রস্তাব মানে তো আমিও জানি না। মানে মেয়েটির মামা মেয়েটির বাবার কাছে মেয়েকে ঢাকা পাঠানোর ব্যাপারে বলে’- রাহেলা বেগম অধৈর্য হয়ে বলে।

‘এরপর তার মামা সেই ধনী পরিবারকে বলে-কয়ে সেই বাসাতেই কাজে সহায়তাকারী হিসেবে থাকতে বলে। কথা হয়, দু-তিন বছরের মধ্যে মেয়েটিকে ঐ রিচ পরিবারটিই ভালো পাত্র দেখে বিয়ে পড়িয়ে দেবে’। এভাবে মেয়েটি সেই বাড়িতে ভালোই ছিল। পাশের একটি স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। পরিবারের দুই ছেলে। বড় ছেলে বউ সহ থাকে। তবে অনেক দিন বিয়ে হলেও বাচ্চা নেই। ছোট ছেলে ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করে। বেশ কিছুদিন পর ছোটছেলে ইংল্যান্ড থেকে আসে। কয়দিন থেকে চলেও যায়। এর কিছুদিন পরেই বাড়ির লোকজন জানতে পারে মেয়েটি প্রেগনেন্ট।’

নিতু উৎকন্ঠায় জানতে চায়, ‘এর আগে বাসার কেউ জানত না। কীভাবে এটা হল?’

‘ছেলের মা নাকি জানতে পেরেছিল অনেক পরে। ইংল্যান্ডে পড়ুয়া ছেলেটি জোরপূর্বক এই কাজটি করেছে। তারপরেই ছেলের মা ছেলেকে শাসিয়ে মারধোর করে আবার ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়। তবে ছেলেটির মা ভাবতে পারে নি মেয়েটি কনসিভ করবে’।-- রাহেলা বেগম বিষন্ন কন্ঠে বলে।

নিতু ঘৃণামিশ্রিত ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠে,‘ডিসগাস্টিং ফেমিলি’।

রাহেলা বেগম চমকে উঠে নিতুর দিকে তাকায়। নিতুকে সে কখনই এ রূপে দেখে নি।

নিতু বলে উঠে, ‘এরপর কি হল?’

‘এরপর পরিবারটির সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় মেয়েটির গর্ভপাত বা অ্যাবরসন করানোর। কিন্তু যে দিন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা তার আগেরদিন রাতে মেয়েটিকে নিয়ে তার ড্রাইভার মামা চলে যায় গোপনে…’
দিদাকে থামিয়ে দিয়ে নিতু বলে উঠে, ‘তারমানে আর অ্যাবরসন হয় নি’।

রাহেলা বেগম নিতুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘না, হয় নি। কারণ আপদ বিদায় হয়েছে ও নিজেদের মান-সন্মান রক্ষা পেয়েছে ভেবে তারা আর এ নিয়ে ভাবেও নি’।

নিতু বলে, ‘তাহলে মেয়েটি মারা গেল কীভাবে?’

রাহেলা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, ‘ঘটনা এখনও অনেক বাকী। বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার ঠিক তিন মাস পরে তার মামা একদিন ঢাকাতে আসে। এবং জানায় পেটের বাচ্চা বড় হচ্ছে টাকা পয়সা দিতে হবে। না হলে সবাইকে জানিয়ে দিবে।’

‘কিন্তু মেয়েটির বাচ্চা গ্রামে কী পরিচয়ে বড় হচ্ছে তাহলে’--নিতু জানতে চায়।

‘মামা গ্রামের লোকজনকে জানিয়েছে ঢাকাতে একজন ড্রাইভারের সাথে বিয়ে হয়েছিল। সে প্রেগনেন্ট হওয়ার পর ড্রাইভার পালিয়ে গেছে’--রাহেলা বেগম জানায়।

-তারপর।
-এরপর নিয়মিত মোটা অংকের টাকা নিতে থাকে মামা। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে সে টাকা মেয়েটির কাছে পৌঁছাতো না। মামা সেটা আত্নসাৎ করত।
-আত্নসাৎ মানে।
-টাকা মেরে দেওয়া, ইমবেজল করা।
-তাহলে তো গরীব মেয়েটি ভীষণ কষ্ট করেছে পেটের বাচ্চার জন্য।
-হুম।
-এরপর কী হল?

’এরপরই সেই সর্বনাশা রাত’--বলে রাহেলা বেগম কুঁকড়িয়ে উঠে।

-মানে কি মেয়েটি মারা যায়?

-’হুম, মেয়েটি চলে যাওয়ার প্রায় আট মাস পরে এক বৃষ্টিমুখর রাতে একাকী হাজির হয় সেই বিত্তশালীর বাড়িতে স্ফীত আকারের পেট নিয়ে। এদিকে তখন কুকর্মকারী ছেলেটিও ইংল্যান্ড থেকে দেশে। বাড়ির সবাই অবাক ও বিব্রত এবং অবশ্যই রাগান্বিত। ছেলের মা মেয়েটিকে ঘরে ডেকে আনে। সেই কেবলমাত্র মেয়েটির কষ্ট কিছুটা অনুধাবন করে। হঠাৎ এই আপদে ছেলের বাবা শয়তান ছেলেকে প্রচন্ড বকাবকি ও মারধর করে। বকা ও মারখেয়ে ছেলে উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো মায়ের ঘরে এসেই প্রচন্ড জোরে ধাক্কা দেয় কয়েকদিন পরেই সন্তানসম্ভবা দুঃখী মেয়েটিকে। আচমকা ধাক্কাতে মেয়েটি ছিটকে গিয়ে বাড়ি খায় খাটের এক কোণাতে। সাথে সাথে মাথা কেটে গিয়ে রক্তের ছড়াছড়ি। সাথে পেটে আঘাত পেয়ে প্রসব বেদনা, ব্লিডিং। গোঙানি। সে এক অবর্ণ্নীয় মানে ইনেক্সপ্লেইকেবল...’।

এই পর্যন্তু শোনার পর নিতু এই কষ্টের কাহিনি মেনে নিতে পারে না। এবং কখনই যা করে নি সেটি করে সে। কুৎসিত এক গালি দেয় ছেলেটির উদ্দেশ্যে।

নিতু কান্না জড়িত কন্ঠে জানতে চায়, ‘তারপর’।

-তারপর সেই বৃষ্টির রাতেই ঐ বাসাতেই একটি ফুটফুটে বাচ্চা প্রসব হয়। মেয়েটির আঘাতজনিত কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। আঘাত, রক্তস্বল্পতা ও প্রচুর ব্লিডিং এর কারনে দ্রুত মারা যায় অভাগী। বৃষ্টির মাঝেই সেই বাড়ির পেছন দিকে গোপনে মাটিচাপা দিয়ে চারাগাছ লাগিয়ে দেয় তারা। সাথে সেদিন রাতে বাড়িতে থাকা দুজন কাজের লোককে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়।

-আর বাচ্চাটি।
-সেটা নিয়ে তো তেমন কিছু লিখে নি। হয়ত ফলো আপ নিউজে সে নিয়েও লিখবে। তখন জানা যাবে বাচ্চার কি হল? হয়ত দেখা যাবে সে পরিবারেই মানুষ হচ্ছে অন্য পরিচয়ে।
-আর শয়তান ছেলেটির সাজা হয় নি।

‘হয়েছে। তবে মানুষের দ্বারা না। সৃষ্টিকর্তার সাজা’-- বেদনাভরা কন্ঠে জানায় রাহেলা বেগম।

-সেটা কেমন?
-কিছুদিন পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সে। পত্রিকায় লিখেছে তখন নাকি সে ওই কবরের উপরের লাগানো গাছটির কাছে গিয়ে দিনরাত চুপচাপ বসে থাকত। এরপর একদিন মেইন রোডে তাঁর লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এই পর্যন্ত বলে রাহেলা বেগম চোখের জল মুছেন শাড়ির আঁচলে। এতসব শুনে নিতুরও ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়।



কয়েক দিন পরে নিতুর স্ট্যান্ডার্ড টেনের মিডটার্মের ফলাফল প্রকাশ পায়। বরাবরের মতো অন্য সব বিষয়ে ভালো করলেও বাংলাতে অবস্থা খুবই খারাপ। নিতুর আম্মা নিতুকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, ‘নিতু তোমার টিচার আজকেও কমপ্লেন করেছে তুমি বাংলাতে পাশই করতে পার নি। আর কয় মাস পরে তোমার ‘ও’ লেভেল এক্সাম। এভাবে পড়াশুনা করলে তুমি বাংলায় কিন্তু খারাপ করবে মা মনি’।

‘দেখো, এরপর থেকে ভালো করব আম্মু’-- মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠে নিতু। বাবার দিকে ফিরে নিতু বলে উঠে, ‘আব্বু, তুমি আমাকে কিছু বাংলা ফিকশনের নাম বল তো। আমি কিন্তু কয়দিন থেকে বাংলা পড়ছি। বাংলা ভাষাটা আরো জানার চেষ্টা করছি’।

নিতুর বাবা হেসে মেয়েকে আদর করে কয়েকটি বইয়ের নাম জানায়। বিশেষভাবে একটি বইয়ের নাম উল্লেখ করে বলে, ‘আমাদের লাইব্রেরীতেই আছে। ওখান থেকে নিয়ে পড়’।

শীতের মিঠে রোদ খেয়ে ও চৈত্রের উদভ্রান্ত দিগবিদিক ছুটে চলা হাওয়ায় পত্রঝরা বৃক্ষের পাতা ঝরে যেমন কালান্তরে গাছে নতুন কুড়ির আবির্ভাব হয়, তেমনই নিতুর জীবনেও কিছু নয়া ভাবনার উদয় হয়েছে।

আসলে সেদিন দিদার কাছ থেকে পত্রিকার ঐ মন খারাপ করা খবরটি শুনার পর নিতুর মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন। এতদিন যে নিতু নিজের পোশাক-আশাক, চাল-চলন নিয়ে তটস্থ থাকত সেই কিনা এখন প্রচন্ড অনীহা দেখাচ্ছে এসবে। বাসার অন্য লোকেরাও তা অনুধাবন করতে পারছে। ঐ নিউজটির ফলো আপ নাকি এখনও আসে নি দিদা জানিয়েছে। ইদানিং নিতু নিজেও বাংলা খবরের কাগজ পড়ার চেষ্টা করছে। বাংলা গান শুনছে। কেন এসব করছে সে নিজেও জানে না?

ওদের একটি পারিবারিক লাইব্রেরী রয়েছে। প্রচুর বইয়ের সমাহার। নিতু শুনেছে ছোট চাচা বিদেশ থেকে আসার সময় প্রচুর বই নিয়ে আসত। দেশে এসেও অনেক বই কিনত। সেই পড়ুয়া ছোট চাচা নাকি ডিপ্রেশনে সুইসাইড করেছে। নিতু ভেবে পায় না পড়ুয়া মানুষগুলো যে কেন এত বোকা হয়।

নিতু র‍্যাকে সাজানো বইগুলো থেকে আগেও বেশ কিছু বই পড়েছে। সেগুলো ছিল সবই ইংরেজি ভাষার। কিন্তু বাংলা বই কখনও পড়ে নি সে। বাংলা বইয়ের তাকে নিতু এগিয়ে গিয়ে একটি একটি করে বই টেনে বের করে দেখে আবার ভিতরে ঢুকে রাখে। এবার বাবার রেকামেন্ড করা বেশ মোটা একটি বই বের করে-- সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘কাছের মানুষ’। পাতা উলটে ভূমিকা পড়ে।

হঠাৎ পাতার ফাঁক গলে টুপ করে কিছু একটা নিচে পড়ে। তাকিয়ে দেখে একটি সুশ্রী মেয়ের ছবি। কিছুটা জ্বলে যাওয়া হলেও ছবিটি হাতে নিয়েই ভূত দেখার মতো চমকে উঠে নিতু। মাথার দুই পাশে বেণী পেঁচানো প্রায় হুবুহু তার মতো দেখতে।

নিতুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কোনো মতে সেখান থেকে বের হয়ে সে গায়ের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে মায়ের রুমের দিকে দৌড় দেয়। তারপর চিৎকার করে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানতে চায়, ‘আম্মু, কার ছবি এটি?’

হঠাৎ কি মনে হয় যেন নিতুর। দৌড়ে চলে আসে স্টোর রূমে। এসেই বাসার জমানো পুরাতন পত্রিকাগুলো খুঁজতে থাকে। তারিখটি মনে আছে নিতুর তেসরা জুলাই। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে খুঁজে ফিরে সেই দিনের পত্রিকা। এবং পেয়েও যায়। দ্রুত চোখ বুলিয়ে যায় একটি নিউজের উপর ‘ধর্ষিতা গৃহপরিচারিকার মৃত্যুরহস্য উৎঘাটন’। এবং যা ভেবেছিল তাই। এই নিউজের সাথে দিদার বলা গল্পের কোনোই মিল নেই।

পত্রিকা হাতে নিয়েই সে দৌড়ে চলে আসে দিদার রুমে। এসে দেখে বেলকনির সেই আরাম কেদারায় বসে দিদা এক দৃষ্টিতে হাস্নাহেনা গাছটির দিকে তাকিয়ে আছে। আর তার কপোল বেয়ে অবিরাম অশ্রু বয়ে চলেছে।

রাহেলা বেগম তার পাশে ধুপ করে একটি পতনের শব্দ পান। না তাকিয়েও তিনি শতভাগ নিশ্চিত সেটা কিসের পতন। বড় ছেলের উদ্বিগ্ন কন্ঠ শুনতে পান। নতুন করে বাঁচার যে বীজ তিনি বুনেছেন তা কিছুতেই বৃথা হতে দিতে পারেন না।

আজও ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাহেলা বেগম ঝাঁপসা চোখে মৃদু আলোয় দেখতে পান বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটি পনের বছরের কিশোরী মেয়ে একটি পনের বছরের হাস্নাহেনা গাছকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে। পনের বছর আগেও তিনি এভাবেই ঝাঁপসা চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুধু তার দুচোখ নয় তিনি না তাকিয়েও অনুধাবন করেন পাশের বেলকনিতেও দু জোড়া চোখে অশ্রুর বান ডাকবে আজ।

পনের বছর আগেও তারা কেঁদেছিল। পনের বছর আগেও একইরূপ বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে সেই বৃষ্টি আর এই বৃষ্টির পার্থক্য হচ্ছে ঐটার সাথে মিশে ছিল রক্তের রং লাল ,আর এই বৃষ্টির সাথে মিশে আছে নিটোল শুভ্রতা!!!

***********************************************************************************
©আখেনাটেন/মার্চ-২০২০
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মার্চ, ২০২০ দুপুর ১২:৩৬
৩০টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্রগ্রাম যে ভাবে বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ৯:১২


আরাকান আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি ঘটলেও সে সময় দৌরাত্ম বেড়ে যায় পর্তুগীজ এবং মগ জলদস্যুদের। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশে সন্দ্বীপের মত দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট করত এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিভা

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৩



এক শকুনের বাচ্চা তার বাপের কাছে আবদার ধরলো-
বাবা, আমি মানুষের মাংস খেতে চাই, এনে দাও না প্লিজ!
শকুন বলল, ঠিক আছে ব্যাটা সন্ধ্যার সময় এনে দেব।

শকুন উড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরুর নাড়ি ভুরি খাওয়া নিয়ে দ্বিধা জায়েজ /না জায়েজ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৩৭


কোরবানী বা ঈদ-উদ-আযহা এলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা বিভিন্ন পশু কোরবানী করে থাকে। মাংস ও ভুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেকে আবার ভুড়ি খাননা বা খেতে চাননা কারণ খাওয়া ঠিক না বেঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আলোচিত খুন , আলোচিত গুম, আলোচিত ধর্ষণ ও আলোচিত খলনায়ক।

লিখেছেন নেওয়াজ আলি, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৪০

মেজর সিনহাকে চারটা নাকি ছয়টা গুলি করেছে তা নিয়ে বিতর্ক করে কি লাভ এখন। তাকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এটাই সত্য। আর এই হত্যা করেছে দেশের আইন শৃঙ্খলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ টি প্রয়োজনীয় ও বিনোদনমূলক ওয়েবসাইটের লিংক নিয়ে সামুপাগলা হাজির! (এক্কেরে ফ্রি, ট্রাই না করলে মিস! ;) )

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৪৬



করোনার সময়ে অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। বড়দের অফিস চললেও অপ্রয়োজনীয় কাজে সচেতন মানুষেরা বাইরে যাচ্ছেন না। ইচ্ছেমতো বাইরে গিয়ে শপিং, ইটিং, ট্র্যাভেলিং করে ছুটির দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×