somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্রিবিউট টু এ লেজেন্ডঃ আনাতলি কারপভ

০১ লা জুলাই, ২০১০ বিকাল ৪:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক আগে একবার বলেছিলাম, দাবায় হাতে খড়ি চার বছর বয়েসে হলেও ঐ পর্যন্তই। খেলতে শুরু করেছি আরও অনেক দেরীতে, এসএসসির পর থেক। ছেড়েও দিয়েছি, বছর দুই হতে চলল, সে অন্য কথা। খেলতাম, তবে সেটা ঠিক 'সিরিকাস' বলা যায় না। যদিও ধীরে ধীরে নেশার ব্যারোমিটার উপরের দিকেই উঠছিল। ডেইলিস্টারে শুক্রবারের ম্যাগাজিন স্টারে তখন patzer ছদ্মনামে time out শিরোনামে একটা কলাম থাকত। না! শিরোনামের সাথে সম্পর্কহীন কেচ্ছা-কাহানি গাওয়া আসলে ঠিক হচ্ছে না। তো, একদিন টাইম আউটে দেখি, ম্যারাডোনার শো তে অতিথি আনাতলি কারপভ। সেই কারপভ, ১২তম বিশ্বচাম্পিয়ন। এর অল্প কয়েকদিন আগেই যাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম। তারপর থেকেই উঠে পড়ে লাগলাম। বুঝলাম, খোলস ছেড়ে বের হতে হবে। সেই হিসেবে, কারপভই ছিল আমার চেস রাজ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট।

আনাতলি ইভগেনিয়েভিচ কারপভ। দাবার ১২তম বিশ্বচাম্পিয়ন। অসম্ভব মেধাবি এই খাঁটি রাশিয়ান(কেননা, কারপভের পর আরেকজন নেটিভ রাশিয়ান বিশ্বচাম্পিয়ন পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘদিন, মাঝে অবশ্য কাসপারভের মত কনভার্টেড! রাশান চাম্পিয়ন হয়েছে) গ্রান্ড মাস্টার যখন চাম্পিয়নশীপের খেতাব অর্জন করে পূণরায় সোভিয়েৎ হারানো গৌরব পূণঃপ্রতিষ্ঠা করেন, ততদিনে আমেরিকান ববি ফিশার ভাগ বসিয়েছে সোভিয়েৎ রাজত্বে। এই কারণেই উষ্ণ রক্তের অধিকারী রুশদের কাছে কারপভের আবেদন অন্যরকম।

হাইস্কুকে ঈর্ষনীয় সাফল্যের দরুন গোল্ড মেডেলিস্ট কারপভ যখন বটভিন্নিকের(সাবেক বিশ্বচাম্পিয়ন) চেস স্কুলে প্রশিক্ষন নিতে যান, তখন বটভিন্নিক বলেছিলেন, এই ছোঁকরার দাবায় কোনও ভবিষ্যৎ নাই! হয়ত এটাই হয়েছিল শাপে বর। এরপর থেকেই নিজেকে তৈরী করতে শুরু করেন কারপভ। ১৯৬৬তে মাত্র ১৫বছর বয়সেই হয়েযান কনিষ্ঠ সোভিয়েৎ চাম্পিয়ন। দাবা তে অধিক মনযোগ দেয়ায় প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রেও এর কিছু প্রভাব পড়েছিল অবশ্য। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গণিতে ভর্তি হয়েও পরবর্তীতে গ্রায়জুয়েশন সম্পন্ন করেন লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে।

যা হোক। ১৯৭৪ সাল। ফিশার তখন বিশ্বচাম্পিয়ন। যে কোনও মূল্যেই চাম্পিয়নশিপ এই আমেরিকানের হাত থেকে পূণরুদ্ধার করতে হবে। ক্যান্ডিডেট টুর্ণামেন্ট জিতে বাঘা বাঘা মাস্টারদের পেছনে ফেলে ফিশারের চ্যালেঞ্জার নির্বাচিত হন তরুন গ্রান্ড মাস্টার আনাতলি কারপভ। অপ্রতিরোধ্য ফিশার কে থামাতে পারবে তো এই তরুন তূর্কি? সব উত্তর মিলবে, আগামী বছরের ওয়ার্ল্ড চাম্পীয়নশিপ ম্যাচে।

মহেন্দ্রক্ষনও আসল যথা সময়ে। সকলেই নড়ে চড়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জমজমাট একটা সাপ-বেজি লড়াইয়ের জন্য। অপ্রতিরোধ্য, দুর্বার ফিশারের মুখোমুখি শান্ত, সৌম্য কারপভিয় মায়াজাল। পারবে তো আটকাতে? নাকি মায়াজাল চ্ছিন্ন করবে ফিশার? সময় যত এগুচ্ছে, ফিশারের ছেলেমানুষিও বাড়ছে সমান তালে। বলা বাহুল্য, ফিশারের দাবী দাওয়া; বেশীরভাগই ছিল অনেকটা মামাবাড়ির আবদার ধরনের। ফিশার তার অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত ওয়াক ওভার পেয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মত চাম্পিয়নশিপ ম্যাচ না খেলেই বিশ্বচাম্পিয়নের খেতাবে ভূষিত হন আনাতলি কারপভ। প্রত্যাশিত সোপ অপেরা আর অনুষ্ঠিত হল না। ফলাফল, সকলে বঞ্চিত হল একটা দুর্দান্ত দ্বৈরথ থেকে। এই ম্যাচ আর কখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। এই দুই গ্রেট ও কখনও আর পরস্পরের মুখোমুখি হন নি চেস বোর্ডে। কারপভ খেতাব পেলেন, যদিও কারও কারও ধারণা, সোভিয়েৎ ডার্লিং কারপভের মুকুট নিশ্চিৎ করতেই পুরোটা ফিদের খেলা(উল্লেখ্য, ফিদের উপর তখন সোভিয়েৎ কর্তৃপক্ষের বিস্তর প্রভাব ছিল, অনেকটা আইসিসির উপর বিসিসিআই এর মত), কারপভ আসলে ফিশারকে আটকাতে পারত না। যা হোক, বিনয়ী কারপভ তাই মেনে নিয়েছিলেন। ফাঁকা মাঠে গোল দেবার অতৃপ্তি ঘোচাতে তাই এর পরেই শক্ত কয়েকটা টুর্নামেন্ট জিতেই সমালোচকদের জবাবটা দিয়েছিলেন।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪, প্রথম ভাগে, টানা নয় বছর নিজের খেতাব ধরে রাখেন কারপভ(কাসপারভের কাছে হারানোর পূর্ব পর্যন্ত)। তার সময়ে ছিলেন এক কথায় অপ্রতিদ্বন্দী। এই দীর্ঘ সময়ে খুব কমই তাকে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে। কারপভের খেলার স্টাইলও ছিল অনন্য। এক ধরণের মোহনীয়, অথচ শান্ত ছন্দময়তা ছিল তার খেলার ধরণে। তাল, স্প্যাসকি কিংবা ফিশারের মত হয়ত আতশবাজির ঝলকা ছিলনা, ছিলনা কাসপারভের মত যান্ত্রিকতা। অনন্য ধাঁচের জন্যই দাবাভক্তদের কাছে দ্বিতীয় ক্যাপাব্লাঙ্কা উপাধি পেয়েছিলেন। কারপভ নিজেই বলেছেন, কেউ যদি আমাকে শার্প, ট্যাকটিকাল খেলা অফার করে, আমি আপত্তি করব না, তবে আমার পছন্দ শান্ত পজিশনাল গেম।

১৯৮৫তে চ্যালেঞ্জার গ্যারি কাসপারভের কাছে হারিয়ে বসেন খেতাব। এর আগে অবশ্য, ১৯৮৪তে দীর্ঘ চার মাসের হাড্ডাহাড্ডি একটা ম্যাচ টাই হয়েছিল। ক্যারিয়ারে কখনোই তিনি কাসপারভকে কোনও টাইটেল ম্যাচে হারাতে পারেন নি। '৯৩তে আবারও শিরোপা পূণরুদ্ধার করেন বটে, তবে কাসপারভের অনুপস্থি্তিতে(কাসপারভ তখন ফিদে থেকে বেরিয়ে নিজেই গঠন করেন বিকল্প নিয়ন্ত্রক সংস্থা পিসিএ)। হয়ত কাসপারভের অনুশীলন আর যান্ত্রিক খেলা কারপারভের সহজাত ছন্দ কে অতিক্রম করতে পেরেছে, তবু, কারপারভের খেলার সৌন্দর্য অনন্য। একারণেই কাসপারভ, আনান্দ কিংবা ক্রামনিকের চাল গুলো রুবকা বা ফ্রিজের মত চেস ইঞ্জিনের প্রথম, দ্বিতীয় লাইনের সাথে মিলে যেতে পারে, হয়ত তারা অনেক বেশি নিঁখুত, তবু অতি যান্ত্রিকতা হয়ত কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে আকর্ষণ। কাসপারভ যদি হয় ইউরোপের পাওয়ার ফুটবল, তাহলে কারপভের খেলা তূলনা করা যায় নিঃসন্দেহে লাতিন ছন্দময় সহজাত ফুটবলের সাথে।

ব্যাক্তিগত জীবনেও কারপভ একজন অমায়িক ব্যাক্তি। নির্বিবাদী কারপভ কখনও কোনও বিতর্কে জড়ান নি। তার স্পোর্টসম্যানশিপও অতূলনীয়।
১৮টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কক্সবাজার ভ্রমণ ২০২০ : যাত্রা শুরু

লিখেছেন পগলা জগাই, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১২:৫১




দীর্ঘ্য ৬ বছর পরে পরিবার নিয়ে বেরাতে যাওয়ার সুযোগ হলো আবার। এর মধ্যে ওদের নিয়ে বেরাতে গেলেও তা ছিলো ডে ট্রিপ, যেখানেই গেছি রাতের মধ্যে বাড়িতে ফিরতেই হয়েছে। স্ত্রী-কন্যকে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারী পাচার

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১:৫৯



এশিয়ার এক নম্বর নারী ও শিশু পাচার রুট বাংলাদেশ।
প্রতিদিন দেশ থেকে প্রচুর নারী ও শিশু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অথবা বিমান যোগে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারকৃত নারী ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিলেকোঠার প্রেম- ১২

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৩

প্রায় দেড় বছর! না না এক ফাল্গুন থেকে আরেক ফাল্গুন পেরিয়ে চৈত্রের শেষ। নাহ ঠিক দেড় বছর না, এক বছরের একটু বেশি সময় পর পা দিলাম আমার চিরচেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের প্রতি দয়ামায়া না থাকলে দেশে কি কি ঘটতে পারে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১০



ভারত খাদ্য রপ্তানী করে, বাংলাদেশের মতো ভারতে সকাল-বিকেল খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে না, আয়ের তুলনায় খাবারের দাম কম; খাবারে কেমিক্যাল, ফরমালিন মিশায় না; অনেক বছর এত বেশী খাদ্য উৎপাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিরু আলুমের সিনেমা বাহিরে চলিচ্ছে , ভিতরে খালি ক্যারে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৮


প্রাডো গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন হিরো আলম। ছুটছেন এক প্রেক্ষাগৃহ থেকে আরেক প্রেক্ষাগৃহে। তাঁকে ঘিরে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে আবার উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ করা গেলেও প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে আসন ফাঁকা। নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×