somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিনিভার জলরং

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৬ ভোর ৬:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সৈয়দ আলীর উসকানি দিয়েই শুরম্ন। দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন আমাদের এই ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী। তিনি লিখেছেন, কল্পনায় যখন খাবে তখন পোলাও-কোর্মা ভালো, আর মনে মনে যখন বেড়াতে যাবে তবে জিনিভা'র লেকেই চলো। লন্ডনে পড়তে এসেছিই মনে ইউরোপ ভ্রমণের ইচ্ছা পুষে রেখে। এবার এলো সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ। প্লেনে মাত্র ঘন্টাখানেকের দূরত্ব। যাওয়ার সময় যদিও বাড়তি একঘন্টা যোগ হয়ে গেল জীবনে, ফিরে আসার সময় একঘন্টা ফেরত পাবো ভেবে নিশ্চিন্ত হলাম। নতুবা আমলনামায় ঘাপলা লেগে যেত। নামলাম সরাসরি জিনিভাতেই। বিমানবন্দর থেকে জিনিভা শহর ট্রেনে মাত্র 6 মিনিট। শহরের এত কাছে বিমানবন্দর, কিভাবে সম্ভব?

মানিব্যাগটা একটু ভারী ছিল। রেলস্টেশনেই হালকা হয়ে গেল। ট্রেনে করে সুইজারল্যান্ড ঘুরে বেড়ানোর টিকেট কিনলাম। চারদিনের সুইস-পাস কিনতে 250 ফ্রাঁ লাগলো। এই পাস দিয়ে সব সরকারী যান-বাহন চড়া যায়; ট্রেন, বাস, ট্রাম ছাড়াও চড়া যাবে লেক বেড়ানোর নৌকাও। তবে পাহাড়ে যেসব বিশেষ ট্রেন যায় বা প্রাইভেট/টু্যরিস্ট যানবাহনে আবার ফ্রাঁ গুণতে হবে। বিদেশ ভ্রমণে এসে দরিদ্র মানিব্যাগের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর মানে হয় না। জিনিভা স্টেশনে নেমেই থাকার জায়গার খুঁজে ব্যাগ টেনে টেনে হাজির হলাম টু্যরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টারে। মিস্টিমাখানো মুখচ্ছবির দুই মেয়ে বসে। কোনো সাহায্য চাইলে তারা এমন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছে যেন আইবুড়ো বড়ো বোনটার বিয়ের আলাপ নিয়ে আমরা এসেছি। একেবারে জামাই আদর। কোনো ক্লান্তি নেই। মুখে হাসি। কথা বলছে চার-পাঁচটি ভাষায়। কোনো একটা জায়গার নাম বললে, সাথে সাথে সে জায়গার সব দর্শনীয় স্থান, হোটেল-রেস্টুরেন্টের ঠিকানাসহ নানা লিফলেট, ব্রশিউর ধরিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য কাগজপত্র বেশি হয়ে গেলে সুইস টু্যরিজমের চমৎকার ব্যাগও দিচ্ছে । আমার দরকার থাকার জায়গা। হাসিমুখে মেয়েটি ফোন ঘুরাতে শুরু করলো। লেকের কাছাকাছি একটা হোস্টেলের জন্য গোটাকয়েক ফোন করেই আমাদেরকে একটা রুমের সন্ধান দিলো মেয়েটি। দিনের আলো কমে যাবে। সিটি হোস্টেলে গিয়ে তাড়াতাড়ি ব্যাগ-বোচকা ফেলে লেকের পথ ধরতেই দেখি কিছু রাস্তা বন্ধ করে বসেছে হাট-বাজার। শনিবারের ফ্লি মার্কেট। পুরনো বই-পত্র, নানারকমের হাড়ি পাতিল, হস্তশিল্প আর চারচাকার ছোট্ট ছোট্ট দোকানে গরম গরম খাবারের ব্যবস্থা।

আবহাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। তাই তাড়াতাড়ি হেঁটেই চলে এলাম জিনিভা লেক। স্বচ্ছ পানির লেক। শান্ত সমাহিত পরিবেশ। এই লেকের ধারে বাড়ি নিয়ে রাঁধুনি রেখে কয়েকটা দিন কাটানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন সৈয়দ আলী। তবে তিনি একা নন। জিনিভা লেকের পারে বাড়ি নিয়ে থেকেছেন পৃথিবীর অনেক বড় বড় সাহিত্যিক-শিল্পীরা। প্রকৃতি উপভোগই তাদের একমাত্র লক্ষ ছিল না। বেশিরভাগই জায়গাটা বেছে নিয়েছিলেন তাদের শিল্পকর্ম শেষ করার স্থান হিসেবে।

রুশোতো জিনিভারই সন্তান। তার কথা বাদ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, গিবন, কিংবা ভলতেয়ার লেখার জন্য আস্তানা গাঁড়তেন এই লেকের পারে। ইংরেজ চিত্রকর টার্নার তার বিখ্যাত জলরংগুলো এঁকেছিলেন এখানে। কিন্তু মেরি শেলি কেন এখানে এসে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন' লিখলেন তা বুঝা কঠিন। পিবি শেলি আর বায়রন মিলে এই লেকে আট দিনের এক নৌকা ভ্রমণে এসেছিলেন। নৌকা ডুবে তারা সাঁতরে পাড়ে পৌঁছে দেখেন 'সাঁতো দ্য শিলন' - শিলনের দুর্গ। বায়রন এরপর হোটেলের রুমে বসেই লিখে ফেলেন 'দি প্রিজনার অব শিলন'। ভিক্টর হুগো, আলেঙ্ান্দার দু্যমা, চার্লস ডিকেন্স, টেনিসন সবাই এখানে বসে নতুন লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। লেক পাড়ের ছোট্ট শহর মন্ট্রোতে বসে 'দি আইস মেইডেন' লিখেছেন হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন। টলস্টয় আর দস্তয়ভস্কিও বাদ যাননি। দস্তয়ভস্কির 'ইডিয়ট' এখানে বসেই লেখা, লেকের পাড়ে 'ভেভে' শহরে বসে তিনি লিখেছেন 'দি গ্যাম্বলার'। গোগল তার 'ডেড সোলস্' শুরু করেছিলেন 'ভেভে'-তেই। এফ মেজরে ভায়োলিন কনসার্টো কম্পোজ করেছিলেন চাইকোভস্কি, এই জিনিভা লেকের পাড়ে। টি.এস ইলিয়ট 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড' লিখেছেন জিনিভা লেক পাড়ের শহর লোসানে (লোসানই তখন সবচে খ্যাত শহর ছিল। লেকটির নামও ছিল লেক লোসান)। হলিউডের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চার্লি চ্যাপলিন আসত্দানা গেঁড়েছিলেন 'ভেভে' শহরে এসে, মারাও যান এখানে। অড্রে হেপবার্ন বাড়ি কিনে থেকেছেন, ভ্লাদিমির নবোকভ শেষ জীবন কাটিয়েছেন এখানে, গ্রাহাম গ্রিন মারা যান এখানেই। আরো অনেক শিল্পী ও লেখক বাস করেছেন এই লেকের পাড়ে। সে দীর্ঘ তালিকা শুনতে হলে চড়ে বসুন জিনিভা লেকের বোটগুলোতে। সুইস-পাস থাকলে বাড়তি পয়সা লাগবে না।

দেশের তুলনায় লেকটা অনেক বড়। ক্রোয়াসোঁর (আমার প্রিয় নাস্তার উপকরণ) মত আকারের নীল জলের লেক। জিনিভা ছাড়াও এই লেকের পাশে রয়েছে আরো কয়েকটি বিখ্যাত শহর; লোসান, মন্ট্রো, ভেভে, নিওন। জিনিভা থেকে খুব কাছেই ফ্রান্স। ফ্রান্স হয়ে এই লেক ভূমধ্যসাগরে পৌঁছেছে। মোটামুটি সাগরের মতই চরিত্র এর যদিও দ'ু পাড়ের দূরত্ব সবচে চওড়া জায়গায় 14 কিলোমিটার। তবে লেকের মাঝে যন্ত্রদিয়ে পানি উপরে ছুঁড়ে মারার মরতবা বুঝতে পারলাম না। বোটচালক বলছিলো, এটি নাকি সুইজারল্যান্ডের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের মাপ।

জিনিভা লেকের বোটগুলো এক থেকে দু'ঘন্টা পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনে পর্যটকদের। লেকের শান্ত স্বচ্ছ জল আর দু' পাশে আল্পস আর ফ্রান্সের কিছু পাহাড়ের মুগ্ধকরা দৃশ্য দিনের সব ক্লান্তি মুছে দিয়ে ভাবুক করে তুলতে পারে যেকোনো লোককেই। কিন্তু আমি পারছিলাম না। ক্যামেরার ব্যাটারি হঠাৎই বিট্রে করে বসলো। অদ্ভুত সুন্দর সব দৃশ্যের ছবি তুলতে না পারার কষ্টটাই বড় হয়ে বুকে লাগছিলো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আর্মি এখনও ব্যারাকে ফিরে যাচ্ছেনা কেন?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৪৫

“শেখ হাসিনার পতনের মূল কারণ ছিল চীনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ভূরাজনৈতিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে, দেশের অভ্যন্তরে একটি পরিকল্পিত পরিবর্তন... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীর কোথাও কেন রাত নামে না, আবার কোথাও সূর্য ওঠে না

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:০৩

পৃথিবীর কোথাও কেন রাত নামে না, আবার কোথাও সূর্য ওঠে না

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, ভৌগোলিক প্রভাব এবং আধ্যাত্মিক প্রতিফলন

আমরা প্রতিদিন যে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি, সেটাকে এতটাই স্বাভাবিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাংবাদিক নারীরা কি টিপিক্যাল, চিন্তার গভীরতা কি ওদের কম??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০



সাংবাদিক নারী বা সাংবাদিকতার সাথে সম্পর্কিত পেশায় জড়িত মেয়েরা কি একটু টিপিক্যাল টাইপের হয়??
আমার তো তা-ই মনে হয়! এছাড়া, চিন্তার গভীরতা ওদের একটু কমও মনে হয়েছে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব দুনিয়ার আহার যোগাই, আমরা না পাই খাইতে

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:৩৪



সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরের বর্গাচাষি আলী আকবর। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি। কোনো লাভ নাই।’ হিসাব কষে বলেন, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×