---------------------------------------------------------
এরকম এক বিকালে ক্লাস শেষে কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছি। সিগারেটের ধোঁয়া আমাদের চারপাশে একটা কুয়াশার চাদর তৈরি করছে। সবাই নতুন বন্ধু, নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, জোর আড্ডা চলছে। রাজনীতি, খেলাধুলা, পরচর্চা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আমাদের সাবলীল হাঁটাচলা। নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করার জন্য গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচামেচিঁতেই যেন জীবনের গূঢ় আনন্দ। সেই আনন্দের সাগরে ডুব দিয়ে যখন রস পান করছি সেই মোক্ষম সময়েই পিঠে একটা থাবা দিয়ে আজাদ বললো,”কিরে শালা, সিগারেট খাওয়া হচ্ছে বুঝি”? ওর ন্যাকামি দেখে মাথায় রক্ত চড়ে গেল, বেশ বিরক্তির সাথে বললাম “হুঁ”।
আমার নতুন বন্ধুরা ওর এরকম অবাঞ্চিত আগমন মোটেই পছন্দ করতে পারলোনা। আমাদের কলেজের অন্যরা ওকে দেখেও না দেখার ভান করে কথা চালিয়ে যেতে লাগলো।
আমি বেশ শক্ত করেই বললাম,”কি চাস, তাড়াতাড়ি বল্”।খুব একচোট নেয়ার চেষ্টা করলাম ব্যাটাকে। মনে মনে গাল দিলাম, ব্যাটা ধড়িবাজ, কিসের এত ঢং, আমি কি তোর পেয়ারের নাগর লাগি! তাও দেখি ব্যাটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। এমন নির্লজ্জ কেউ হয় নাকি! গা কি গন্ডারের চামড়া দিয়ে মুড়ে রেখেছ নাকি বাছাধন! এবার ও বলে , “শফিক , একটু শুনে যা, একটা কথা আছে”। আমিও তেড়ে বলি, “ এত গরজ তো বাপ, এখানেই বলনা, আড়ালে নিয়ে কি এমন বলার আছে”?একথা শুনে বেশ একটা হাসাহাসি পরে যায়। আমারও ওকে দু’টো কথা শুনাতে পেরে দেমাগে বুকটা যেন ফুলে উঠে। কিন্তু ওর কোন ভাবান্তর চোখে পড়েনা। মিষ্টি হেসে বলে, “ সিগারেটের ধোঁয়ায় অসুবিধা হচ্ছিল বলে এখানে বলতে চাইনি। যাহোক; শোন, তুই কি আমার সাথে “চাকা” সিনেমাটা দেখতে যাবি? আরো অনেকে যাবে। যেতে চাইলে পাবলিক লাইব্রেরিতে বিকাল ৪টার সময় দেখা করিস। গেটে আমরা থাকব”। এবার আরো একটু বাহ্বা নেয়ার জন্য টিটকারি দিয়ে বলি, “ তোর সাথে যেতে হবে কেন? আমি কি একা যেতে পারিনা। নাকি আমাকে দেখে লুতুপুতু খোকা বলে মনে হয়, যে ডেকে নিয়ে যেতে হবে”!
অন্যরা এদিকে ধোঁয়া উড়িয়ে আরো একচোট হাসে। সবচেয়ে বেশি হাসি আমি আর আমার কলেজের বন্ধুরা। এতদিনে ব্যাটাকে একহাত নেয়া গেছে বলে আমরা খুশিতে আত্মহারা হই। তবুও যাবার সময় আজাদ আবার বলে, “ ইচ্ছা হলে চলে আসিস”। এই বলে আমাকে আরেকবার পিঠে থাবা দিয়ে ও ফিরে চললো। আমি ওকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সিগারেটে একটা টান দিয়ে আড্ডাতে জমে গেলাম।
হঠাৎ আড্ডার মাঝখানেই আমি নিজেই সিনেমাটা দেখার প্রস্তাব দিলাম। হাসির ঠেলায় যেন টেকা দায়! সোহরাব বললো, “ আরে, এইসব সিনেমা কেউ দেখে নাকি! একঘেঁয়ে একটানা আনন্দহীন বকবকানি”। মিলন তো একটা নতুন প্রস্তাবই দিয়ে বসল। বলে, “ তার চেয়ে চল নিজেরাই একটা ফেস্টিভাল করে ফেলি”। আমি বেশ কৌতুহলের সাথেই বলি, “ সেইটা কি রকম”? মিলন বলে, “ হলে আমার রুমে জবর একটা হিন্দি ডিভিডি আছে, নতুন সিনেমা। আর যা একখান আইটেম সং আছে না, দেখালেই বুঝবি”।
অনেকক্ষণ ধরে আলোচনার পরে তিনজন থাকতে রাজি হল। আমি এখনো দ্বিধার মধ্যে ছিলাম। মিলন বললো, “ আরে মামু, এমন আইটেম একলগে না দেইখ্যা মজা পাইবা না। চিন্তার কি আছে, লও হাঁটা দেই”। আসলে আমি যে এরকম সিনেমা দেখিনা তা না, খুব ভালমতই দেখি। আসলে আমি সবধরনের সিনেমাই দেখি। এখন কেন জানি এটা দেখতে যেতে ইচ্ছা করলো না, হঠাৎ করে “চাকা” দেখার ইচ্ছাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। ভাবলাম এটা তো পরেও দেখা যাবে, কিন্তু একসঙ্গে “চাকা” দেখার সুযোগ আর নাও হতে পারে। আর সিনেমা নিয়ে আলোচনাতে আমার কোন ক্লান্তি নাই। তাই গরম গরম আলোচনা, সমালোচনা, প্রতি-সমালোচনা করার লোভটা কিছুতে মন থেকে তাড়াতে পারছিলামনা। এত চিন্তা করছি দেখে মিলন তাগাদা দিয়ে বলে, “ এই রকম বাবাগো লাহান থম্ ধইরা বইসা থাকনের কাম নাই। তাড়াতাড়ি হাঁটা দেই চল”। আমি সিধান্ত নিয়ে নেই যে আমি “চাকা” দেখতেই যাব। একটা অজুহাত চিন্তা করে বলি, “ দোস্ত, আজকে থাক। বাসাতে যাই গিয়া। অন্যেরা বেড়াতে যাইবো, দেরি করাটা ঠিক হবে না। মনে কিছু নিস্ না। আরেকদিন দেখবো”।
মিলন চোখ টিপে বলে, “ মামু, বাসার কথা কও কেন? ডেটিং এ যাইবা এইটা হল গিয়া কথা। আমরা কি তোমারে মানা করুম। সেই সুখের কাছে এইটা তো পানি। যাও মামু, মামি কইলাম রাইগ্যা যাবোনে শ্যাষে”। আমি লজ্জায় লাল হয়ে বলি, “ কিসব যা-তা বলছিস। আমি আবার ডেটিং করব কার সাথে”? ওরা খুব হাসাহাসি করতে করতে বিদায় নিল।
আমি খাওয়া-দাওয়া করে একটু পরে রওনা দেবার সিধান্ত নিলাম।রিকশায় করে বিকালে যখন গেটের কাছে এসে পৌঁছালাম তখন একটু লজ্জাই লাগছিল।ভাবলাম ওকে এত অপমান করলাম, এখন আবার নির্লজ্জের মত এসে হাজির হলাম। কে কি ভাববে এটা চিন্তা করে রীতিমত একটা অস্বস্তি শুরু হয়ে গেল। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে গেটের দিকে তাকাতেই ওকে দেখতে পেলাম। কাছে এসে হাতটা ধরে বলল, “ তুই আসবি, এরকম একটা ধারণা করেছিলাম। সিনেমাটা দেখা যে ছাড়তে পারবিনা, সেইটা জেনেই টোপটা দিয়েছিলাম”। আমার এবার অবাক হবার পালা, বললাম; “অন্যরা কোথায়”? ও বললো, “ এইতো সামনে। চল হাঁটি। দেখলি তো কিভাবে তোকে আমাদের সাথে আড্ডা মারতে নিয়ে আসলাম”।
আমাকে কোন ধরণের টিটকারি না দেয়াতে আমি ওর প্রতি বেশ কৃতজ্ঞতা বোধ করতে থাকি। আমরা হাঁটতে থাকলে চার-পাঁচজনের একটা দল আমাদের কাছে আসে। ও সবার কাছে আমাকে এমনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় যে মনে হতে থাকে আমি যেন ওর বহুদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সংকোচে আমি একটা ক্ষুদ্র বিন্দুর মত হয়ে যাই। ওর সাথে সবধরণের অসভ্যতার কথা মনে পড়ে যেতে থাকে। এই প্রথমবারের আমি আমি সত্যিকার অর্থে ওর আকাশের মত হৃদয়ের খোঁজ পাই। সেই আকাশের এমন ব্যপ্তি যে আমার মত অসংখ্য দুষ্টু মেঘের অনায়াস ঠাঁই হয় সেখানে। ওর ভালবাসার ক্ষমতা আর যে কাউকে সহজভাবে গ্রহন করার সহজাত শক্তি দেখে নিজেকে খুবই তুচ্ছ বোধ হতে থাকে। মনে হতে থাকে আমার মত সংকীর্ন মনের মানুষের সাথে ওর এমন নিখাঁদ বুন্ধসুলভ আচরণ, যেন বন্ধুত্ব নামক শব্দটির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। তবুও এই আজাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হল, একেবারে আত্মার বন্ধুত্ব।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




