
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। গান দিয়ে যিনি দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনে নিজেকে পরিণত করেছেন উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীতে। যার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান সবসময়ই পেয়েছে অন্যরকম দ্যোতনা। তিনি তার ঘরানার সংগীতের একজন বহুমুখী প্রতিভা হিসাবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। শুধু নিজ দেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত। ভারতের কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিষ্যদের মধ্যে তাকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় গণ্য করা হয়। গান ছাড়াও রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা হারমোনিয়াম ও এস্রাজ বাজাতে পারেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কাজের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার "স্বাধীনতা পুরস্কার" অর্জন করেছেন। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৫৭ সালের আজকের দিনে বাংলাদেশের রংপুর জেলায় এক উপাধ্যক্ষ্যের পরিবারে এ গুণী শিল্পী জন্মগ্রহণ করেন। কিংবদন্তীতুল্য এই শিল্পীর আজ ৬৩তম জন্মবার্ষিকী। প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ১৯৫৭ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার গুনানুরাগীদের কাছে শুধু মাত্র ‘বন্যা’ নামেও পরিচিত। তার বাবা মাজহার উদ্দিন খান ও মাতা ইসমাত আরা খান। ইসমাত আরা খান এক সময় কাকলী উচ্চ বিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ ছিলেন। বন্যা প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশের ছায়ানট ও পরে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সেখানে শিক্ষক হিসেবে পান শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, এবং আশীষ বন্দ্যোপাধায়ের মতো শিক্ষকদের। তিনি বাংলাদেশে ফিরে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি তার অধ্যয়ন সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হন। শিক্ষাগ্রহণ সম্পন্ন হবার পর থেকেই তিনি তার সংগীতের প্রদর্শন, নির্ভুল উচ্চারণ এবং সবচেয়ে কঠিন ও অপ্রচলিত গানগুলোও গাইবার আগ্রহের কারণে বিশ্বভারতী ধারার একজন গুরু হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছেন । বন্যা রবীন্দ্র সংগীত ছাড়াও ধ্রুপদী, টপ্পা ও কীর্তন গানের ওপরও শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি সুরের ধারা নামের একটি সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। সঙ্গীত নিয়ে বন্যার বেশ কিছু গবেষণাও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ: গানের নানা দিক, গানের ভেলায় বেলা অবেলায়, ছোটদের নির্বাচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি তার লিখিত তিনটি বই। তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে, তার বহুসংখ্যক এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তম্মধ্যে ২০টি উল্লেখযোগ্য যথাঃ
১। স্বপ্নের আবেশে (২০১৪), ২। সকাল সাঝে, ৩। ভোরের আকাশে (২০১২), ৪। লাগুক হাওয়া (২০১২), ৫। আপন পানে চাহি, ৬। প্রাণ খোলা গান (২০১১), ৭। এলাম নতুন দেশে, ৮। সুদূরের মিতা, ৯। মাটির ডাক, ১০। কালের সাথী, ১১। গেঁথেছিনু অঞ্জলি, ১২। মনের মাঝে যে গান বাজে, ১৩। মোর দরদিয়া, ১৪। সুরের আসনখানি, ১৫। সুরের খেয়া, ১৬। পাতার ভলা ভাষাই, ১৭। শ্রাবণ তুমি,
১৮ ছিন্নপত্র (২০০৪), ১৯। কবি প্রণাম (২০০৪), ২০। বাজে রম্যবীণা।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কাজের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রেজওয়ান চৌধুরী বন্যা ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৭ সালে ভারত সরকার তাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘বঙ্গভূষণ’ পদক দিয়ে সম্মানিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক ট্রাস্ট ফান্ড’ কতৃক প্রদত্ত ‘ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক ও পুরস্কার ২০১৭’ পেয়েছেন এই প্রখ্যাত এই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। এছাড়াও ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আনন্দ সংগীত পুরস্কার এবং ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে সিটি ব্যাংক এনএ প্রদত্ত গানে গানে গুণীজন সংবর্ধনা পেয়েছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

ব্যক্তিগত জীবনে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা দুসন্তানের জননী। তার স্বামী জি এইচ চৌধুরী। বন্যা চলেন নিয়ম মেনে। সেই ১৭ বছর বয়স থেকেই শাড়ি তাঁর প্রিয় পোশাক। সব জায়গাতে পোশাক হিসেবে বেছে নেন শাড়ি। শাড়ি তাঁর প্রিয় পোশাক হওয়ার পেছনে শান্তিনিকেতনের একটা প্রভাব আছে। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, ‘আমার বয়স তখন ১৭ হবে। হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি। ভর্তিও হয়ে গেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। কিন্তু আমার ইচ্ছা শান্তিনিকেতনে পড়ার। আব্বাকে রাজি করিয়ে অর্থনীতি বাদ দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পড়তে গেলাম। সে সময় সালোয়ার-কামিজ পরতাম। শান্তিনিকেতনে গিয়ে দেখলাম, সব মেয়ে শাড়ি পরে। সেই থেকে আমারও শাড়ি পরা শুরু।’বন্যার মেয়ে প্রিয়দর্শিনী, ছেলে অর্ক দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে লেখাপড়া শেষ করে সেখানেই চাকরি করছেন। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানার সঙ্গে আছে তার অনেক দিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। কুড়িয়ে যাচ্ছেন শ্রোতা-দর্শকের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। দেশে-বিদেশে অসংখ্য খ্যাত বিদগ্ধজনের প্রশংসা পেয়েছে তাঁর সংগীত পরিবেশনা। কিংবদন্তীতুল্য এই শিল্পীর আজ ৬৩তম জন্মবার্ষিকী। প্রথিতযশা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
ফেসবুক লিংক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



