somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী সত্যেন সেনের ১১৩তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

২৮ শে মার্চ, ২০২০ দুপুর ১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘ, উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ও রাজনীতিবিদ সত্যেন সেন। এ দেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী এদেশে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার সংস্কৃতি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সত্যেন সেনের সৃষ্টিকর্ম ও সাহিত্য হলো সমাজ বাস্তবতার স্পষ্ট প্রকৃতি-স্বরূপের প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনের সকল কিছুতেই মৌলিক বিষয় হিসেবে কাজ করেছে মানুষের জীবন-সংগ্রাম ও শ্রম-সভ্যতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর তিনি উদীচী পুনর্গঠনের কাজ করেন। সাহিত্য চর্চাও অব্যহত রাখেন। গান মাধ্যমে মানুষকে জাগরিত করা সহজ। এই উপলব্দি নিয়ে গণমানুষের জন্য মানুষের জীবন বাস্তবতার গান রচনা করেছেন। তাঁর গানের মূল বিষয়বস্তু হলো অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, শোষণমুক্তির জন্য আন্দোলন ও সাম্য-সুন্দর মানুষের পৃথিবী নির্মাণ। গান রচনার মাধ্যমেই মূলত তাঁর লেখালেখি জগতে আশা। পাশাপাশি গানের সুর করা ও গান শেখানোর কাজও তিনি করেছেন। শ্রমিকদের নিয়ে তিনি তাঁদের নিয়ে গান এবং পালা রচনা করতেন। গানের দল গঠন করে শ্রমিকদের এ কবিগান তিনি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পরিবেশন করতেন। তার লেখা ১১টি গানের মধ্যে ‘চাষি দে তোর লাল সেলাম/তোর লাল নিশানারে’ গানটি তখন চাষিদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বিক্রমপুরের ষোলঘরে কৃষক সমিতির সম্মেলনে প্রথম তারই নেতৃত্বে গানটি গাওয়া হয়। এছাড়া সত্যেন সেন গানের মাধ্যমে বরিশালে মনোরমা বসু মাসিমার ‘মাতৃমন্দিরের’ জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। সত্যেন সেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের বাঁকে তিনি কোথাও আপোষ করেননি। যারা করেছে, তাঁদেরকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি মূলত কোনো লেখাই লেখার জন্য লিখতেন না। তিনি লিখতে মানূষের অধিকারের কথাগুলো। প্রথমে দৈনিক ‘মিল্লাত’ পরবর্তী সময়ে দৈনিক ‘সংবাদ’র মাধ্যমে সত্যেন সেন সাংবাদিকতা করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের আজকের দিনে মুন্সীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ১১৩তম জন্মবার্ষিকী। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ও রাজনীতিবিদ সত্যেন সেনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।


সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের মার্চ ২৮ তারিখে বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ডাক নাম ছিল লস্কর। তার পিতা নাম ধরনীমোহন সেন, এবং মাতার নাম মৃণালীনি সেন। চার সন্তানের মধ্যে সত্যেন ছিল সর্বকনিষ্ঠ। সোনারং গ্রামের সেন পরিবার ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনন্য উদাহরণ। সত্যেনের কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। তার আর এক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। সত্যেন সেনের পরিবারেই তার পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। প্রাইমারী ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও পরিবার ও গৃহ শিক্ষকের কাছেই সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯১৯ সালে সোনারং হাইস্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯২১ সালে তিনি যখন সোনারং হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন থেকেই তার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ লাভ করে। ১৯২৪ সালে সোনারঙ হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় কলেজে ভর্তি হন।এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফএ ও বিএ পাস করেন। এর পর তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগে এমএ শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৩১ সালে কারাবরণ করলে জেলে থেকেই তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগদেন এবং আমৃত্যু বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়াও সত্যেন সেন ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক। প্রথমে দৈনিক মিল্লাতে তাঁর সাংবাদিক জীবনের শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘সংবাদ’র মাধ্যমে সত্যেন সেন সাংবাদিকতা করেছেন। জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের বাঁকে তিনি কোথাও আপোষ করেননি। যারা করেছে, তাঁদেরকে তিনি ঘৃণা করতেন। শ্রমিক সংগঠক ও কথাশিল্পী সত্যেন সেন ১৯৬৯ সালে বিপ্লবী রণেশ দাশগুপ্ত, শহিদুল্লা কায়সারসহ একঝাঁক তরুণ উদীচী গঠন করেন। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী এদেশে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার সংস্কৃতি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সত্যেন সেনের সৃষ্টিকর্ম ও সাহিত্য হলো সমাজ বাস্তবতার স্পষ্ট প্রকৃতি-স্বরূপের প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনের সকল কিছুতেই মৌলিক বিষয় হিসেবে কাজ করেছে মানুষের জীবন-সংগ্রাম ও শ্রম-সভ্যতার ইতিহাস। স্বাধীনতার পর তিনি উদীচী পুনর্গঠনের কাজ করেন। সাহিত্য চর্চাও অব্যহত রাখেন। গান মাধ্যমে মানুষকে জাগরিত করা সহজ। এই উপলব্দি নিয়ে গণমানুষের জন্য মানুষের জীবন বাস্তবতার গান রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের সুকন্ঠ গায়ক এবং গণসঙ্গীত রচয়িতা। জন্মলগ্ন থেকে উদীচী অধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম করে আসছে। উদীচী ’৬৮, ’৬৯, ’৭০, ’৭১, সালে বাঙালির সার্বিক মুক্তির চেতনাকে ধারণ করে গড়ে তোলে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম।


সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার একটি নিদর্শন এবং বাংলা সাহিত্যের অনন্য পথিকৃৎ। মানুষের জীবন ও ইতিহাসকে যে রচনাকার সামগ্রীকভাবে অবলোকন করতে সক্ষম না হন, যিনি মানব সমাজটাকে তার বর্তমানের সকল বৈষম্য দূর করে সঙ্গতিপূর্ণ এক মানব সমাজ সৃষ্টিতে নিজেকে উৎসর্গ না করেন এবং যিনি দূরগামী সেই লক্ষ্যকে নিত্য মুহূর্তের কর্ম ও আচরণের সঙ্গে যুক্ত করতে না পারেন, তাঁর পক্ষে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার অনুপ্রেরণাদায়ক সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। সত্যেন সেন পরিণত বয়সে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। তিনি মূলত কোনো লেখাই লেখার জন্য লিখতেন না। তিনি লিখতে মানূষের অধিকারের কথাগুলো। সত্যেন সেনের সাহিত্যকর্ম সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার একটি নিদর্শন এবং বাংলা সাহিত্যের অনন্য পথিকৃৎ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সমূহঃ


১। মহা বিদ্রোহের কাহিনী, ২। ভোরের বিহঙ্গী, ৩। রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ, ৪। অভিশপ্ত নগরী, ৫। পাপের সন্তান, ৬। সেয়ান, ৭। পদচিহ্ন, ৮। পুরুষমেধ, ৯। আলবেরুনী, ১০। সাত নম্বর ওয়ার্ড, ১১। বিদ্রোহী কৈর্বত, ১২। কুমারজীব, ১৩। অপারেজয়, ১৪। মা, ১৫। উত্তরণ, ১৬। একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে ইত্যাদি। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ সত্যেন সেন ১৯৬৯ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে সাহিত্য মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।


১৯৭৩ সালে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে সত্যেন সেনের । চিকিৎসার জন্য চলে যান ভারতে। আশ্রয় নেন শান্তি নিকেতনের তার মেজদিদি প্রতিভা সেনের কাছে। সাহিত্য চর্চা ও অসুস্থতার মাঝে চলে যায় ৮টি বছর। ১৯৮১ সালে ৫ জানুয়ারি শারীরিক অবস্থার অবনতির হলে শান্তি নিকেতনের গুরুপল্লীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ১১৩তম জন্মবার্ষিকী। আজীবন সংগ্রামী কৃষক সংগঠক, শিল্পী, সাংবাদিক ও লেখক সত্যেন সেনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল :-& ফেসবুক লিংক
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০২০ দুপুর ১:৩৩
২টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম্লিগ যদি আসে তাহলে ....... :(

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৬



বিএনপি। আপনারা ১৭ বছর ঘরে থাকতে পারেন নাই কিন্তু এখন যদি আবার আম্লিগ ফিরে আনেন তাহলে আপনারা তো দূরের কথা আপনার বাড়ির মাটিও থাকবে না। আপনার ঘর-দরজা থাকবেনা। শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাকতাড়ুয়া

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৪



কৃষির সাথে আমার ও আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ফসলি জমিতে ভুত তৈরি করে দিতে হয়, ভুত বলতে বই পুস্তকের ভাষায় কাকতাড়ুয়া। ফসলি জমিতে ভুত থাকলে পাখি এসে ফসল নষ্ট করে না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩


বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

আজমেরী হক বাঁধন ইতালিতে হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই- আগস্টের আন্দোলনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাক্টরগাজি → চাঁদগাজী → সোনাগাজী → জেনারেশন৭১ কে নিয়ে দুটি কথা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ব্লগার গাজী সাহেব জ্ঞানী কিন্তু তিনি কট্টরপন্থী তাঁর ছেড়া টাইপের মানুষ তবে আলাপচারীতার লোক হিবেবে উনি খারাপ না। আপনি যদি ওনার সংগে হিজড়া রানূ-র মতো জ্বীহুজুর জ্বীহুজুর বলেন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

×