somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ প্রিন্সেস আরিয়া (শেষ পর্ব)

০৩ রা অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব
শুনেছি বিয়ের দিন বাসর ঘরের দিকে যাওয়ার সময় ছেলেদের মনে একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করে । আমার মনেও যে একটা উত্তেজনা কাজ করছিলো সেটা আমি অস্বীকার করবো না । তবে আমার উত্তেজনাটা হচ্ছে ভয়ের । আমি রাতের বেলা দেখা সেই অন্ধকার চেহারা গুলোর কথা বারবার মন থেকে দুর করার চেষ্টা করতে লাগলাম কিন্তু আমার চোখের সামনে যেন সেগুলোই ফিরে ফিরে আসতে লাগলো । আমি কিছুতেই মন থেকে ভয়টা বের করতে পারলাম না ।

যখন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম তখনও বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকধুক করতে লাগলো । আমি দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলাম । ভয়ংকর কিছু দেখতে পাবো ভেবেছিলাম তবে তার বদলে অনেকটা অবাক হয়েই দেখলাম যে বিরাট বড় একটা খাটের মাঝে একজন মানুষ ঘোমটা দিয়ে বসে আছে । পুরো দৃশ্যটা খুবই স্বাভাবিক মনে হওয়ার কথা কিন্তু আমার মন থেকে সেই ভয়টা কোন ভাবেই গেল না । আমি জানি ঘোমটা সরালে আমি সেই ভয়ংকর মুখটাই দেখবো । আমি দরজার কাছেই দাড়িয়ে রইলাম ।


হঠাৎই আমার মাথার ভেতরে কেউ বলে উঠলো, ভয় পাচ্ছো ?

আমাকে উত্তর দিতে হল না । মেয়েটা একটু হেসে উঠলো । তারপর বলল, এতোই যখন ভয় তাহলে যখন খাল পার হতে মানা করলাম তখন এপাড়ে এলে কেন শুনি?

তখনই আমার মনে পড়লো সেই কথা । সত্যিই যখন খালটা পাড় হতে গিয়েছিলাম তখন একটা কন্ঠস্বর আমি ঠিকই শুনতে পেয়েছিলাম । কেউ যেন আমাকে যেতে মান করছিলো । কিন্তু তখন আমি নিজের কৌতুহলের ব্যাপারে এতোই মশগুল ছিলাম যে অন্য কিছু মাথায়ই আসে নি । আমি পার হয়ে এসেছিলাম । তারপর বিপদে পড়েছি ।

-তুমি ভয় পাচ্ছো ?
আবারও আমার মাথার ভেতরে সেই আওয়াজটা হল । আমি কোন কথা বললাম না । কেবল সামনের ঘোমটা দেওয়া আমার বিবাহিত বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম ।

-ভয় পেও না । আমি যা করেছি তা তোমার ভালর জন্য করেছি । যদি তোমাকে আমি বিয়ে করতে না চাইতাম তাহলে হয়তো তোমার মাথা খারাপ হয়ে যেত নয়তো তোমাকে মেরে ফেলা হত ! বুঝেছো ?
আমি তখন বললাম, ঐ উপজাতি ছেলেটাকে তোমরা মেরেছো?
-হ্যা । আমাদের এখানে প্রতি পূর্নিমাতে একটা রিচুয়্যাল হয় । সেটার সময় সে ওখানে হাজির হয়েছিল । আমাদের হাতে অন্য কোন উপায় ছিল না ।
-আমিও কি ঠিক সেই সময়ে হাজির হয়েছিলাম ?
-ঠিক সেই সময়ে না । একটু আগে ।

আমি কী বলবো খুজে পেলাম না । সে বলল, ভয় পেও না । আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না । বিছানাতে এসে বস ।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম দ্বিধা নিয়ে । নরম বিছানার উপর বসে পড়লাম । সে বলল, আমার নাম তো তুমি জানো ?
-হ্যা । আরিয়া !
-আমার বাবা আমাদের গোত্রের সর্দার । রাজাও বলতে পারো । সেই হিসাবে আমি কিন্তু প্রিন্সেস ! তুমি জানো আমাকে বিয়ে করার জন্য আমাদের গোত্রের কত গুলো জ্বীণ লাইণ ধরে আছে ? আর আমি তোমাকে বিয়ে করেছি !
আমি বললাম, মানুষের সাথে তোমাদের বিয়ে হয় ?
-হ্যা মাঝে মধ্যে হয় ! আমাদের যখন কোন ছেলে কিংবা মেয়েকে পছন্দ হয় খুব তখন আমরা তাকে ধরে নিয়ে আসি । তাদেরকে রেখে দেই নিজেদের কাছে ।
কী ভয়ংকর অবস্থা ! আমি বললাম, আমাকেও রেখে দিবে এখানে?
আরিয়া বলল নিয়ম মত তোমাকে আর বাইরে যেতে দেওয়ার নিয়ম নেই । তবে তুমি ভয় পেও না । সুযোগ পেলে আমি তোমাকে রেখে আসবো । ঠিক আছে ! দেখি এবার কাছে এসো দেখি, আমার ঘোমটা তুলো !

এই কথাটা শুনে আমার বুকের মাঝে আবারও একটা ভয়ের অনুভূতি খেলে গেল । আমি কোন ভাবেই সেই চেহারা আর দেখতে চাই না । কোন ভাবেই না । তবে আমি আরিয়াকে রাগিয়ে দিতেও চাই না । সে যখন বলেছে যে আমাকে সময় সুযোগ মত বাইরে রেখে আসবে তখন নিশ্চয়ই আবার ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগ রয়েছে । কিন্তু যদি ওক রাগিয়ে দিই তাহলে হয়তো সেই সুযোগ আর আমার আসবে না ।

আমি আস্তে আস্তে আরিয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম । তারপর আস্তে আস্তে ভয়ে ভয়ে ওর ঘোমটা তুললাম । ভয়ে ভয়ে ওর চেহারার দিকে তাকাতঈ খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম । যে চেহারা দেখবো বলে ভেবেছিলাম সেটা দেখতে পেলাম না । তার বদলে সেখানে খুব স্নিগ্ধ আর চমৎকার একটা চেহারা দেখতে পেলাম । খাড়া নাক, পাতলা ঠোঁট। টানা চোখ কালো ঘন চোখ । তবে অন্য সাধারন মেয়েদের থেকে আরিয়ার চোখের পার্থক্য হচ্ছে ওর চোখের মনি খানিকটা লাল । তবে সেটা মোটেই ভয়ংকর না। আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে মেয়েটি !
আরিয়া বলল, অবাক হচ্ছো?
-হুম !
আরিয়া হেসে ফেলল । তারপর বলল, এটা আমার মানুষ্য রূপ । আমার আসলে রূপ তুমি দেখলে সহ্য করতে পারবে না । হয়তো মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটবে তোমার ।
আমি আরিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম । আরিয়া আবার বলল, তবে ভেবো না যে আমি অন্য কোন মেয়ের রূপ ধরেছি । এটা কিন্তু আমারই চেহারা । মানুষ্য চেহারা ! বুঝেছো !
-বুঝেছি !

আরিয়ার সাথে আরও অনেক কথা হল । ওদের ওখানে থাকতে হল আরও কয়েকটা দিন । তারপর একদিন হঠাৎ আরিয়া বলল, চল তোমাকে রেখে আসি !
-আজই ?
-বাবা একটু বাইরে গেছে। এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না ।
-আমি চলে গেছি এটা তোমার বাবা যখন জানতে পারবে তখন?
-আমাকে একটু বকবে হয়তো তবে চিন্তা কর না । আমি সামলে নিবো । এখন একটা কাজ কর । আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর তো !

আমি খানিকটা সংকোচের সাথেই আরিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম । আরিয়া বলল, চোখ খুলবে না । যখন খুলতে বলবো তখন খুলবে ! ঠিক আছে?
-আচ্ছা!

কয়েক সেকেন্ড সম্ভবত চোখ বন্ধ করে ছিলাম । আরিয়া বলল, এবার চোখ খুলো !
আমি চোখ খুলে দেখি আমি সেই হোটেলের ভেতরে দাড়িয়ে রয়েছে । আরিয়া আমার পাশেই দাড়িয়ে রয়েছে । এখন রাত। আমাকে পূর্নিমা !
আরিয়া আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । তারপর বলল, আমি আসি কেমন?
-আচ্ছা!
-তুমি ভাল থেকো!

আমার মনে হল যেন আরিয়া আমার চোখের সামনেই গায়েব হয়ে গেল । আমি কিছু সময় দাড়িয়ে রইলাম সেখানে দাড়িয়ে ছিলাম । হঠাৎ আমার কেন জানি মনটা খারাপ । তবে সেটা খুব বেশি সময় স্থায়ী হল না । আবার যে আগের জায়গাতে ফিরে এসেছি এটাই সব থেকে বড় কথা ।

-স্যার আপনি বাইরে কেন?
আমি ফিরে তাকালাম ! তাকিয়ে দেখি সেই বেয়ারাটা । আমার দিকে এগিয়ে আসছে । আমি কিছু না বলে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে । তার চোখে কোন উদ্বেগ নেই । বরং খানিকটা বিরক্তি রয়েছে । আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক মনে হল না । কারণ হিসাব মত আমি বেশ কিছুদিন ধরেই আরিয়াদের সাথে রয়েছি । কম করে হলেও সাত আট দিন । এই সাত দিনে হোটেলের লোকজন কি আমাকে খুজে নি?
আমি বললাম, না মানে ....
-স্যার দয়া করে ঘরে যান । প্লিজ !
তখনই আমার মনে একটা সন্দেহ জাগলো । আমি বেয়ারাকে বলল, তোমার সাথে আমার শেষ কবে দেখা হয়েছিলো?
আমার এই প্রশ্ন শুনে বেয়ারা একটু থমকালো । তারপর তার মুখে আবারও সেই বিরক্তি ভাবটা দেখতে পেলাম । সে বলল, আজই তো হল । মনে নেই আপনার?
আমি তারপর বললাম, আজকে কয় তারিখ?
-স্যার আজকে ১৭ তারিখ ।

আমি এটাই সন্দেহ করেছিলাম ! অর্থ্যাৎ আমি যে আরিয়াদের সাথে সাত দিন ছিলাম সেটা গায়েব হয়ে গেছে । আমি ঠিক সেই দিনেই পৌছে গেছি যেদিন আমি এখানে এসেছিলাম এবং যেদিন আমি কৌতুহলবসত লেবু বনে ঢুকেছিলাম । ওদের ওখানে সাত আট দিন পার হয়ে গেলেও এখানে মাত্র কয়েক ঘন্টা পার হয়েছে । কিভাব সম্ভব হল এটা ? আমি কিছুতেই ব্যাপারটা হজম করতে পারলাম না । কোথা থেকে যেন একটা ভয় এসে আমাকে পেয়ে বসলো । আমার মনে হল যে আমার শ্রদ্ধেহ শ্বশুর মশাই যেকোন সময়ে এখানে চলে আসতে পারে । এবং আমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে । পরদিন সকালেই আমি ঢাকাতে চলে এলাম ।

ঢাকাতে এসেও আমার মনের ভেতর থেকে ভয় গেল না । আমি এক ওঝার কাছে গিয়ে হাজির হলাম । ওঝা আমার বক্তব্য সম্পর্ন শুনে বলল, বিয়ে যখন হয়েছে তখন সে তোমার পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না ।
-তাহলে ? এখন আমার কী করনীয়?
-চিন্তা কর না । আমি তোমাকে কিছু জিনিস পত্র দিচ্ছি । এগুলো নিয়ে তোমার ঘরের চারিপাশে ছিটিয়ে দিবে । তাহলে কেউই আর তোমার বাসায় ঢুকতে পারবে না । আর এই তাবিজটা সব সময় তোমার কাছে রাখবে । তাহলে সে তোমার কাছে আসবে না ।

তারই করলাম । ঘরের চারিদিকে সেই পানি ছিটিয়ে দিলাম । তাবিজটাও সাথে সাথে রাখলাম । প্রথম কিছুদিন আমার মনে ভয় যেত না কিছুতেই । বারবাই মনে হত যেন এই এখনই আরিয়া কিংবা তার বাবা চলে আসবে আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য । তবে একটা সময় সে ভয়টা কেটে গেল । দেখতে দেখতে কয়েকমাস কেটে গেল । তারপরই ভয়টা আস্তে আস্তে কেটে গেল ।


আমি কেবিনে এসে ঢুকলাম । বুকের ভেতরে সেই ভয়টা আবারও ফিরে এসেছে । বারবার মনে হচ্ছে আমি এখন কী করবো? কী রা উচিৎ আমার?
তখনই দেখলাম আরিয়া আমার কেবিনে ঢুকলো । আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে রয়েছে । চোখে কোন রাগ নেই বরং সেখানে একটা অন্য রকম দৃষ্টি রয়েছে । আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই সে এসে আমি জড়িয়ে ধরলো । আমি কিছু বলতে পারলাম না । কারণ কিছু পরে আমি কেবল অনুভব করলাম যে মেয়েটা কাঁদছে ।
আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম আরিয়ার এই আচরনে ।
আমার বুকে মাথা রেখেই আরিয়া বলল, আমি কি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারি বল? কখনও না । তুমি আমাকে কেন ভয় পাও আমি জানি না কিন্তু আমি তোমার ক্ষতি করবো না । তবুও তুমি চাও না দেখে এতোদিন তোমার কাছে আমি আসি নি । কিন্তু ইদানীং তোমাকে এতো মনে পড়ে আমার যে আমি কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি ।

দেখলাম আরিয়া আমাকে ছেড়ে দিল । তারপর নিজের চোখ মুছলো । ওর চোখের রং ফিরে এসেছে । সবার সামনে যত সময়ে ছিল আরিয়ার চোখ কালো ছিল । দেখলাম আস্তে আস্তে সেটা আবার কালো হয়ে গেল । নিজেকে একটু সামলে নিতেই দরজাটা টোকা পড়লো । আযাদের ডাক শুনতে পেলাম । আমাকে ডাকছে । আমি আরিয়াকে রেখেই বের হয়ে গেলাম ।

তবে মন থেকে কিছুতেই আরিয়ার কথা গুলো বের করতে পারলাম না । সত্যিই তো আরিয়া তো আমার কোন ক্ষতি করে নি । বরং ও আমাকে রক্ষা করেছে । ও যদি না চাইতো তাহলে আমি হয়তো আজকে বেঁচে থাকতাম না । কিংবা আমার মাথা খারাপ হয়ে যেত । ঐ পর্যটকের মত । ও না চাইলে আমি হয়তো কোন দিন এই স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে আসতে পারতাম না । এই মেয়েটাকে আমি কেন ভয় পাচ্ছি ! আমি নিজের কাছেই খানিকটা লজ্জিতবোধ করলাম । অন্তত আরিকাকে ভয় পাওয়ার কি কোন দরকার ছিল আমার !

অফিস থেকে একাই বের হলাম । যদিও মনের ভেতরে একটা ইচ্ছে ছিল যে আরিয়াকে নিয়ে বের হব এক সাথে । কিন্তু প্রথমদিনই পরিচিত হয়ে যদি একসাথে অফিস থেকে বের হই তাহলে অনেকের চোখে সেটা স্বাভাবিক মনে হবে না । আরিয়া আরও কিছু সময় রয়ে গেল তার অফিসের অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে। তবে আরিয়া ঠিকই আমার ধরে ফেলল । অফিস থেকে বেরিয়ে রিক্সা করে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম, মাঝে এক সিগনালে অপেক্ষা করছি আর আরিয়ার কথা ভাবছি তখনই সে কোথা থেকে রিক্সায় উঠে এল । আমি খানিকটা চমকে উঠলেও সামলে নিলাম ।
-মিস মি?
আমি কোন জবাব দিলাম না । আরিয়া রিক্সাওয়ালাকে ঠিকানা বলে দিল । বাসার দিকে আমার আর যাওয়া হল না ।

আমার বাসার থেকে আরও কিছুটা দুরে আরিয়ার বাসা । বাসা বলতে একটা সুউচ্চ এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে ওর ফ্ল্যাট ! আমি ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হলাম । আরিয়া আমাকে একটা ঘর দেখিয়ে বলল, ঐ রুমে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও । আমি খাবার দিচ্ছি ।

কথা গুলো এতো স্বাভাবিক ভাবে বলল যেন আমি এখানে নিয়মিত আসি । ওর আচরনে কোন সংকোচ নেই, কোন ভনিতা নেই । আমি ওয়াশ রুমে গিয়ে দেখি সেখানে আমার জন্য একটা আলাদা পোশাক রাখা রয়েছে । আরিয়ার সব কিছুর দিকে খেয়াল রয়েছে । অবশ্য খেয়াল থাকবে না কেন ! সে তো স্বাধারন কেউ না । আমি একটু সময় নিয়েই গোসল সারলাম ।

ফ্রেশ হয়ে ডাইয়িং এ আসতে আসতে দেখলাম টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে । আরিয়াকে দেখলাম না আশে পাশে । সম্ভবত এখনও গোসলে । তবে সে বের হয়ে এল একটু পরেই । ওকে দেখে খানিকটা খাবি খেলাম । ওর পরনে একটা লম্বা টিশার্ট দেখতে পেলাম কেবল । আর কিছুই সে পরে নি । ওর ফর্সা পরিস্কার পা আমি আগেও দেখেছি, আমাদের বিয়ের দিন ।
আরিয়া আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, এই টিশার্ট টা চিনতে পারছো কি?
একটু ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম । তারপর চিনতে পারলাম । এটা আমারই টিশার্ট !
-এটা তো আমার !
-হ্যা ।
-হারিয়ে গিয়েছিলো ।
-কেবল এটা না, এই ৭ মাসে তোমার মোট ১১টা টিশার্ট আর শার্ট হারিয়েছে । সব আমার কাছে !
আমি কেবল অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম ।
আরিয়া বলল, তোমার কাছে তো যাওয়ার উপায় তুমি বন্ধ করে রেখেছো, তাই এই শার্ট টিশার্ট গুলো নিয়ে এসেছি যখন সুযোগ পেয়েছি ।

আমি এবার সত্যিই একেবারে নির্বাক হয়ে গেলাম । কী বলবো কিছু খুলে পেলাম না । আমার মধ্যে এই মেয়ে কী এমন দেখলো ? এই ভাবে কেন একজন আমাকে ভালোবাসবে ? নিজেকে আমি যতটুকু চিনি বলতে পারি যে আই অলমোস্ট গুড ফর নাথিং । তাহলে...

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে আরিয়ার সাথে কিছু সময় কাটিয়ে আমি রাতে বাসায় ফিরে যাবো তবে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজকে রাতে বাসায় যাবো না । এখানে থাকি আরিয়ার সাথেই । বাসায় ফোন করে বলে দিলাম । মা যদিও নানা রকম প্রশ্ন করছিলো তবে শেষ পর্যন্ত মেনে নিলো । রাতের বেলা আমি আরিয়ার সাথেই ঘুমাতে গেলাম । ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম আরিয়া সেই আমাদের বাসর রাতের মত করে বিছানাতে বসে রয়েছে । ঘরের পরিবেশটাও আমার কাছে ঠিক তেমনই মনে হল । একই রকম তাপমাত্রা, সেই সাথে আলোর পরিমানও একই রকম । কেবল পার্থক্য আজকে ওর শরীর আমার টিশার্ট পরে আছে। আমার দিকেই তাকিয়ে আছে সেই আগুন লাল চোখে । তবে আজকে আমার মোটেই এই চোখ দেখে ভয় লাগলো না । আমি ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম ।


তিন
আমি আমার হাত থেকে সেই তাবিজটা সরিয়ে ফেলেছি । আরিয়া যদিও বলছিলো সে এই তাবিজে সাধারন জ্বীনদের আটকানো যায় কিন্তু হিসাব মত সে হচ্ছে প্রিন্সেস । এই তাবিজ তার খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না । তবে যে পানিটা আমি বাসায় ছিটিয়েছিলাম সেটা সবাইকে আটকাতে পারে । তারপরেও আমি তাবিজটা খুলে ফেললাম । আমার মনের ভেতর থেকে সব ভয় দুরে চলে গিয়েছিলো ।

তবে কদিনের ভেতরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করা শুরু করলাম । আমি দিনে রাতে যেখানেই যাই না কেন সব সময় খেয়াল করতাম যে একটা কালো চিল আমার মাথার উপরে উড়লো । যেন আমার উপর সব সময় লক্ষ্য রাখছে । আমার মনে হল আরিয়াই সম্ভবত এমনটা করছে । সে আমাকে বলেছিলো আমি কোথায় যাই না যাই সব কিছুর উপর সে লক্ষ্য রাখে । আমাকে একদম চোখের আড়াল করে না ।

কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরে আরিয়া আমার কাছে এসে খানিকটা রাগান্বিত কন্ঠে বলল, তুমি আবারও ঐ তান্ত্রিকের কাছে গিয়েছো?
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম । তারপর বললাম, কী বল এই সব ? আমি কেন যাবো?
আরিয়া আমার দিকে ভাল করে তাকিয়ে রইলো । একভাবে আমার চোখের দিকে । তারপর দেখলাম ওর চোখ শান্ত হয়ে এল । আমার কাছে এসে বলল, তুমি যাও নি । কিন্তু ....
এবার আমি খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম । বললাম, কিন্তু কি?
-না মানে কদিন থেকেই দেখতে পাচ্ছি সময়ে সময়ে তুমি যেন কোথায় হারিয়ে যাও ।
-মানে?
-মানে হচ্ছে আমাদের যখন কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় তখন তাদের একটা প্রেজেন্স সব সময় আমরা অনুভব করি । সম্পর্ক বলতে যখন আমরা অন্য কারো সাথে মিলিত হই সেই কথা বলছি। জ্বীন সাথে জ্বীনের এই সম্পর্কটা বেশ শক্ত । মানে সব সময় আমরা বুঝতে পারি সে আছে । লাইক যখন তুমি সিমের ডাটা অন রাখো তখন নেটওয়ার্ক সব সময় জানে তুমি কোথাও আছে । এখন হঠাৎ করে যদি ডাটা অফ করে দিলে, কিংবা মোবাইল বন্ধ করে দিলে তখন সিস্টেম হঠাৎ করে তোমাকে হারিয়ে ফেলবে । মানুষের সাথেও আমাদের এই বন্ডটা তৈরি হয় । যদিও জ্বীনের যতটা শক্ত মানুষের সাথে এতোটা শক্ত হয় না তবে হয় ।
-তাহলে?
-গত কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করছি তুমি যেন আমার থেকে হারিয়ে যাচ্ছো, ক্ষনে ক্ষনে হারিয়ে যাচ্ছো।
-কিন্তু আমি তো কিছু করি নি।
-বুঝতে পারছি।
-তাহলে?

আমি এই প্রথম আরিয়ার চোখে কেমন যেন একটা দুষ্চিন্তার ছাপ দেখতে পেলাম । আমার হঠাৎ কী যেন মনে হল বললাম, আচ্ছা আমি কদিন থেকেই লক্ষ্য করছি যে আমার দিকে কেউ যেন নজর রাখে। একটা পাখি ওড়ে সব সময় । রাতেরও বেলাও।
আরিয়া ঝট করে ঘুরে তাকালো আমার দিকে । তারপর বলল, তাই নাকি?
আমি খানিকটা শঙ্কিত কন্ঠে বললাম, হ্যা ।
-চিল?
-হ্যা ।
এবার দেখলাম আরিয়া একটু চিন্তিত হল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, যাই হোক তুমি চিন্তা করো না । সব সময় হাতের কাছে মোবাইল রাখবে । সব সময় । আমি যেন একবার কল করেই তোমাকে পাই । মনে থাকবে তো ...

আরিয়া যেভাবে কথাটা বলল আমার সত্যিই একটু ভয় লাগলো । এমন কন্ঠে সে তো কোন দিন কথা বলে নি সে । আমি কি কোন বিপদে আছি? আমার মনের কথা যেন ও বুঝে ফেলল । তারপর বলল, ভয় পেও না । আমি থাকতে তোমার কোন ক্ষতি হতে আমি দেব না । বুঝতে পেরেছো ? এখন এদিকে এসো তো একটু । আদর করে দেই তোমাকে ।

আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল কোন ঝামেলা ছাড়াই । তবে সেই চিলটা ঠিকই আমার সাথে সাথেই থাকতো সব সময় । তবে একদিন ঠিক ঠিকই বিপদ এসে হাজির হল । অফিসের কাজে আমি মুন্সিগঞ্জ এসেছিলাম । কাজ শেষ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে দিতে রাত আটটা বেজে গেল । এই পর্যন্তও সব কিছু ঠিক ছিল কিন্তু যখন গাড়িটা একেবারে মঝপথে থেমে গেল । আমার মাথায় তখনও অন্য কিছু আসে নি । আমি গাড়ি থেকে বুঝার চেষ্টা করলাম যে কী হয়েছে ।

তখনই দেখলাম ফোন বেজে উঠলো । আমি ফোনের দিকে তাকাতেই দেখি আরিয়া ফোন করেছে । আমি রিসিভ করতেই ওর কন্ঠে কেমন যেন একটা উৎকন্ঠা শুনতে পেলাম । ও বলল, তুমি কোথায় ?
-এই তো ঢাকার দিকে আসছি ।
-সব কিছু ঠিক আছে?
-না মানে গাড়িটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল ।
-কী !
আরিয়া যেন চিৎকার করে উঠলো । কোথায় আছো তুমি ? একদম সঠিক লোকেশন বল আমাকে .... এখনই আমাকে জিপিএস লোকেশন পাঠাও এখনই....
-আরে বাবা পাঠাচ্ছি .....

কিন্তু এখনই দেখলাম সব রকম আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল । ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ কয়েকবার নাড়াচাড়া দিলাম কিন্তু কোন লা হল না । সেটা কিছুতেই আর কাজ করলো না । আমি তখনই চারিপাশে লক্ষ্য করে দেখলাম যে চারিদিকে পরিবেশ কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে । একদম শান্ত । কোথাও কোন আওয়াজ নেই । আমার কাছে মনে হল আমি যেন অন্য কোন জগতে চলে এসেছি। অন্য কোথায়!

আমি সেই অন্ধকারের ভেতরে হঠাৎ তিনটা আলোর বিন্দু দেখতে পেলাম । দুইটা বিন্দু দেখলে ভাবতাম হয়তো কোন গাড়ি আসছে কিন্তু তিনটা লাল বিন্দু দেখে মনে হল অন্য কিছু । তিনটা বাইক কি?
কিন্তু না । আমার ধারনা ভুল ছিল । তিনটা আলোর বিন্দু আরও একটু কাছে আসতেই খেয়াল করলাম সেগুলো তিনটা থেকে ছয়টা হয়ে গেছে । তিনজোড়া চোখ ।

আমার দিকে এগিয়ে আসছে !
আমার মন থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই ভয়টা আবার ফিরে এল সাথে সাথে । আরও একটু কাছে আসতে আমি ওদের দেখতে পেলাম । সেই প্রথম দিনের ভয়টা আমার মাঝে ফিরে এল সাথে । এরা আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করতে যে আসে নি সেটা আমার বুঝতে মোটেও কষ্ট হল না । কিন্তু আমি সেই আরিয়ার স্বামী এটা জানার পরেও এরা আমার ক্ষতি করবে ?

আমার মনের কথা যেন ওরা বুঝতে পেরে একজন আমার মাথার ভেতরেই বলে উঠলো, তুমি আরিয়ার স্বামী এটা জেনেই তোকে আমরা মেরে ফেলবো।
-কিন্তু কেন?
-এসব জেনে তোর কী লাভ ?
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না । দেখলাম একজন আমার সামনে চলে এল চোখের পলকে . তারপর এক হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরলো । আমি নিজের দুই হাত দিয়ে সেই হাতটাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম বটে কিন্তু কোন কাজ হল না । বিন্দু মাত্র লাভ হল না । কেবল অনুভব করলাম যে আস্তে আস্তে আমার গলায় সেই শক্ত হাতটা বসে যাচ্ছে । আর খুব বেশি হলে কয়েক সেকেন্ড । তারপরেই আমার মৃত্যু হবে ।

আমি শেষ বারের মত কারো চেহারা মনে করার চেষ্টা করলাম । কারো চেহারা মনে এল না । কেবল আরিয়ার হাস্যজ্জ্বল মুখটা চোখের সামনে এল । কেবল মনে হল শেষ বারের মত যদি আরিয়াকে আর একবার দেখা যেত । মেয়েটা যখন জানবে আমি মারা গেছে তখন কী করবে কে জানে !

যখন মনে হল আর কোন লাভ নেই তখনই মনে হল সামনে দাড়ানো জ্বীনটা নড়ে উঠলো । তারপরেই আমি আমার গলায় চাপ থেকে মুক্তি পেলাম । সে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে । মাটিতে পড়ে গেলাম । কিছু সময় সেখানেই পড়ে রইলাম । তবে আমার নাকে আর্তনাদ ভেসে আসছিলো ঠিকই ! মনে হচ্ছিলো যেন কেউ প্রবল মৃত্যু যন্ত্রনায় কাঁতরাচ্ছে ।

আমি যখন খানিকটা সামলে নিয়ে উঠে বসেছি তখন দেখতে পেলাম দুইটা জায়গাতে আগুন জ্বলছে । সেগুলো আর কিছু নয়, তিন জনের ভেতরে দুইজনের দেহ । অন্য জন মাটিতে পড়ে আছে । তার গলার উপর পা রেখে দাড়িয়ে আছে আরেকজন । সেও কালো আলখেল্লা পরা । আমাকে বলে দিতে হল না যে এই উপরে দাড়িয়ে থাকা জ্বীনটা কে !

-আরিয়া !
আমি কোন মতে ডাক দিলাম । দেখলাম সেই কালো অন্ধকার চেহারাটা আমার দিকে ফিরে তাকালো । চোখ দুটো আগুনের মত লাল । আমার দিকে তাকিয়ে আছে একভাবে । আমি আরেকটু এগিয়ে যেতেই আরিয়ার কন্ঠটা আমার মাথার ভেতরে ঢুকে বলে উঠছো, অন্য দিকে মুখ ফেরাও অপু ! ভয় পাবে।
আমি বললাম, পাবো না । ওকে ছেড়ে দাও...
-না । এর কোন ক্ষমা নেই । এতো বড় সাহস এ তোমার গায়ে হাত দিয়েছে ...
-প্লিজ ছেড়ে দাও .... আমি বলছি ছেড়ে দাও ...

কিছু সময় কেটে গেল কোন রকম আওয়াজ না করেই । তারপর দেখলাম পা টা সরিয়ে নিল । ছাড়া পেয়েও নিচে পড়ে থাকা শরীরটা উঠতে পারলো না । আরিয়া যখন আবার আমার দিকে তাকালো দেখতে পেলাম ওর মানুষ্য চেহারা ফিরে এসেছে । আমার কাছে এসে আমাকে ভাল করে পরীক্ষা করলো । আমি বললাম, তুমি ঠিক আছো ?
-আমি ঠিক আছি । তুমি ঠিক আছো তো?
-হ্যা ।

আমার হাত ধরে সেই পরে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে বলল, তোকে কে পাঠিয়েছে আমি জানি । কেবল তাকে গিয়ে বলবি যে যতদুর পালিয়ে যাওয়ার যেন চলে যায় ।
তারপর আমার হাত ধরে গাড়ির দিকে হাটা দিল ।

গাড়িতে চাবি মোচড় দিতেই গাড়ি চালু হয়ে গেল । আমি খুব বেশি অবাক হলাম না । সম্ভবত ওরাই কিছু করেছিলো । আরিয়া গম্ভীর মুখে বসে ছিল আমার পাশে । সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল । আমি ওর চেহারা দেখেই বুঝতে পারছিলাম যে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে ।
আমি বললাম কী হল বল তো ?
-কী হল মানে?
-মানে তুমি আমাকে খুজে পাচ্ছিলে না কেন ?
-ওরা সম্ভব তোমার লোকেশন ট্রেসলেস করে দিয়েছিলো ।
-কী করম?
-তোমাদের মধ্যে তো জ্বীনে ধরা অনেক রোগী খবর শুনতে পাও, তাই না ?
-হ্যা ।
-তখন কোন হুজুর কিংবা ওঝা কী করে জানো? ওরা এমন একটা বেস্টনী সেই মানুষটার চারিদিকে দিয়ে দেয় যেটা করে সেই জ্বীনটা আর সেই মানুষটাকে খুজে পায় না । ওরাও ঠিক একই কাজ করেছিলো । তোমার চারিদিকে একটা বেস্টনী দিয়ে রেখেছিলো।
-তারপর ? আমাকে খুজে পেলে কীভাবে?

এই কথা বলার পরই দেখলাম আরিয়া আমার দিকে তাকালো । গভীর চোখে । দেখলাম ওর চোখের মনিটা আরও লাল হয়ে গেছে । তবে আমার কেন জানি মনে হল ও কাঁদছে । আরিয়া বলল, তুমি যখন মারা যাচ্ছিলাম তখন শেষ বারের মত আমাকে দেখতে চেয়েছিলে । সেটা এতোই তীব্র ছিল যে ঐ বেস্টনী ভেত করে বের হয়েছে । এটা হয়েছে কেবল মাত্র তুমি আমাকে ভালোবাসো বলে । জানো আমার মনে একটু ভয় ছিল যে হয়তো কেবল ভয়ের কারণেই তুমি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছো না । কিন্তু আজকের পরে সেটা ভয়টা দুর হয়ে গেছে ।

আমি গাড় দাড় করালাম । আরিয়া খুব গভীর ভাবে আমাকে চুমু খেল । তারপর বলল, আজকের পর থেকে তোমার উপর কোন বিপদ আমি আসতে দিবো না । আই প্রমিস !

আমি কথাটা বিশ্বাস করে নিলাম । সত্যিই আরিয়া এই কথাটা ঠিকই রাখবে ।



পরিশিষ্টঃ

কেটে গেছে আরও মাস খানেক । এই সময়ের মাঝে সপ্তাহ খানেক আরিয়া যেন কোথায় চলে গিয়েছে । তার কোন খোজ খবর নেই। অবশ্য বলে গিয়েছিলো আমাকে । আজকে অফিসে কাজ করছি এমন সময় পিয়ন এসে বলে গেল যে আমার সাথে এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছে । সে নাকি আসফিমা ম্যাডামের পরিচিত !
আসফিমা মানে আরিয়া ! সর্বনাশ ! আবার কেন ?

আমি প্রায় দৌড়ে হাজির হলাম ওয়েটিং রুমে । গিয়ে দেখি মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক বসে আছে । এই লোকটা কে ?
আমি কাছে যেতেই বলল, বস ।
কন্ঠে কর্তৃত্বের সুর স্পষ্ট । তবে সে মুখ খুলে কথাটা বলে নি । তার মানে স্পষ্ট । আমার সামনে বসা মানুষটা আরিয়ার পরিচিত ।
আমি বসলাম ।
-আমাকে চিনতে পারো নি?
মুখ না খুলেই ভদ্রলোক আবারও আমাকে প্রশ্ন করলো । এবং সাথে সাথেই আমি তাকে চিনতে পারলাম সাথে সাথেই ।
ইনি আরিয়ার বাবা । আমার শ্বশুর মশাই।

মানুষ হোক জ্বীন হোক সে তো আমার শশুর হোন । আমি উঠে গিয়ে সালাম করতে গেলাম । সে বলল, থাক থাক ।
আমি আবার বসলাম । তারপর বলল, এখানে যদি মুখ ফুটে কথা বলেন তাহলে ভাল হয় । বুঝতেই তো পারছেন ।
-হ্যা । বুঝতে পারছি । যাই হোক যে কারণে এসেছি । তুমি ঠিক আছো তো ? তোমার শরীরে কোন সমস্যা দেখা দিয়েছি কি?
-দেওয়ার কি কথা !
-হ্যা সাধারনত দিয়ে থাকে । যাক নেই যখন ভাল । আমি এটাই দেখতে এসেছিলাম।
-আরিয়া কোথায়?
-আছে । তোমার কাছে চলে আসবে ।
-আপনি রাগ করেন নি এই যে আমি আর আরিয়া চলে এসেছি এখানে...
-প্রথমে একটু রাগ করেছিলাম । তবে এখন ওকে । নিজের মেয়েই তো । আর আরিয়া যা করেছে তাতে ওর উপর রাগ করে থাকা যায় না ।
-কী করেছে ও ?

তারপর আমার শ্বশুর মশাই যা বলল তাতে আমার চোখ কপালে উঠলো । আমাদের যেমন দেশ নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারটা বদল হয় আরিয়াদের নাকি বদল হয় । যদি কেউ বর্তমান শাসককে চ্যালেঞ্জ করে এবং পরাজিত করে তাহলে নাকি ক্ষমতা বদল হতে পারে । এমনই একটা দল নাকি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিলো । এবং সেই দল প্রধানের ছেলেই নাকি আমার উপর হামলা করেছিলো ।
এক জ্বীন নাকি অন্য দিনের উপরে আক্রমন করে না স্বাধারনত যদি না কোন অপরাধ করে । আমার উপর হামলার কারণেই আরিয়া একটা ইস্যু পেয়েছে । এবং বলা চলে সেই দল প্রধানের ছেলে সহ পুরো দলকেই সাফ করে দিয়েছে ।

আমি বললাম, কিন্তু ওরা আমার উপর হামলাই কেন করলো?
আমার শ্বশুর মশাই হাসলো । তারপর বলল, আসলে ঐ দল প্রধানের ছেলের সাথে আরিয়ার একটা বিয়ের কথা বার্তা চলছিলো । কিন্তু আরিয়া মাঝখান থেকে তোমাকে বিয়ে করে । তাই তার রাগ ছিল । আজকাল আমাদের মাঝেও অনেকে এই বাংলা সিনেমা দেখা শুরু করেছে বুঝেছো !

শ্বশুর মশাই আর বসলেন না । চলে গেলেন । আমি চুপচাপ বসেই রইলাম । আমার জীবনটা কি ছিল আর আর কি হয়ে গেল । তবে যা হয়েছে খারাপ হয় নি মোটেও !

-
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০২১ রাত ১২:৫৪
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দীর্ঘতম বিষধর সাপ শঙ্খচূড় ।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৬ ই জুলাই, ২০২২ দুপুর ১:০০


পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম বিষধর সাপ শঙ্খচূড় বা রাজ গোখরা। এর ইংরেজি নাম King Cobra এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ophiophagus hannah যা Elapidae পরিবারভুক্ত একটি সাপ। এই সাপটি দীর্ঘতা ও ক্ষিপ্রতায় সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

খোলস

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০৬ ই জুলাই, ২০২২ বিকাল ৩:৪৬

নিজের এলাকা ছেড়েছিল সে অনেক অনেক আগে। অত কুকীর্তির পর নিজের এলাকায় টিকে থাকা বা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ নতুন, অপরিচিত জায়গায় এসে দীর্ঘদিন লো-প্রোফাইলে থেকে মোটামুটি নির্জীব জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাগী বউ !! একটি রম্য কথন

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ০৬ ই জুলাই, ২০২২ বিকাল ৫:৩৮


(photo credit google)
রাগী বউ !!

ঢাকার সবুজবাগ থানার ল্যান্ড ফোন ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো। এক অপরিচিত লোক ফোন করেছেন। ডিউটি অফিসার ফোন রিসিভ করে ফোন করার কারন জানতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারকেলের তৈরি দুটো থাই মিষ্টি খাবার

লিখেছেন জুন, ০৬ ই জুলাই, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:২২


থাইল্যান্ডের স্থানীয় একটি মিষ্টি খাবার নাম তাঁর খাও নিয়াও মা মুয়াং
থাই ভাষায় খাও নিয়াও অর্থ স্টিকি রাইস আর আমকে বলে মা মুয়াং।অসাধারন স্বাদের এই খাবারটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার চোখে আজকের সেরা ৩ টি মন্তব্য। ব্লগে সভ্যরা লিখে বেয়াদবরা নয়।

লিখেছেন ভার্চুয়াল তাসনিম, ০৬ ই জুলাই, ২০২২ রাত ৯:০০

আসলে একজন ব্লগারের মাণ নির্ধারিত হয় তার মন্তব্য এবং লেখার মাধ্যমে। হিট বা মন্তব্য কিছু সংখ্যা মাত্র। গতকাল অফিসে বসে ব্লগিং করা নিয়ে সৃষ্ট ক্যাচালের জের ধরে ব্লগার স্বপ্নবাজ অভি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×