somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ জলিল মোল্লার যুক্তি ....

১৭ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পানের পিক ফেলে চেয়ারম্যান জলিল মোল্লা সামনে দাড়ালো ইদ্রিস আলীর দিকে তাকালো । ইদ্রিস আলীর ছেলের ফোন ছিনতাই হয়েছে গতকাল রাতের বেলা । ইদানীং রতনপুরের অপরাধের পরিমানটা একটু বেড়ে গিয়েছে । প্রায়ই দেখা যায় সেখানে নানান রকমের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে । গ্রামের মাতব্বর হওয়ার কারণে মানুষজন জলিল মোল্লার কাছে সব কিছুর নালিশ নিয়ে হাজির হয় । জলিল মোল্লা একাধারে গ্রামের মোড়ল এবং চেয়ারম্যান । সেই হিসাবে গ্রামে সবাই তার কথা শুনে । তার দেওয়া বিভিন্ন ফতেয়া অনুযায়ী গ্রামের নানান সমস্যার সমাধান করা হয় !
গ্রামে কোন অপরাধ কিংবা অন্য কোন ঝামেলা হলে আগে তার কাছে খবর আসা চাই । সে বলতে গেলে নিজেই সব কিছু বিচার করে । থানা পুলিশ করতে দেয় না । তার কথ হচ্ছে সে থাকতে থানা পুলিশ কেন । সে কি মরে গেছে নাকি । তার কাছে সব সময় ন্যায় নিচার পাওয়া যায়।

ইদ্রিস আলী গ্রামের টাকা পয়সাওয়ালাদের একজন । তার দুই ছেলে শহরে থাকে । ভাল চাকরি করে । ইদ্রিস আলী নিজের পাটের আড়ত আছে । সেখান থেকেও ভাল টাকা পয়সা আয় হয় । তার ছোট ছেলে এখনও কলেজে পড়ে । সেই ছেলেকে ইদ্রিস আলী একটা একটা দামী ফোন কিনে দিয়েছিলো । সেই ফোনটাই গতকাল ছিনতাই হয়ে গেছে ।
জলিল মোল্লা অনেকটা সময় মন দিয়ে শুনলেন ইদ্রিস আলীর কথা । ইদ্রিস আলী এও জানালো যে কে ছিনতাই করে সেই বিষয়ে সে জানে । সম্পর্কে সে জলিল মোল্লার শ্যালক, নাম ইয়াকুব । যদিও মুখ ঢেকে ছিনতাই করেছে তবে ইদ্রিস আলীর ছেলে তাকে চিনতে পেরেছে । তবে সেই কথা সরাসরি বলতে পারলো না ইদ্রিস আলী । জলিল মোল্লা বলল, রাত বিরাইতে এতো দামী ফোন নিয়ে তোমার পোলা বাইর হইছে কেন ? তুমি জানো না এতো দামী ফোন যদি কেউ দেখে তাহলে যে কারো লোভ জন্মাবে ।
ইদ্রিস আলী বলতে গেল, কিন্তু .....
-তাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে মোল্লা জলিল বলল, শুনো এইবার থেকে সাবধানে থাকবা । বাইরে বের হওয়ার ফোন নিয়ে বের হবা না । ঠিক আছে?

আশে পাশে যারা ছিল সবাই মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ঠিক ঠিক, দোষ তোমার পোলারই । এতো দামী ফোন নিয়ে বের হওয়া ঠিক হয় নাই । যদি ফোন না নিয়ে বের হইতো তাহলে আজকে চুরি হইতো না । এইবার থেকে ফোন নিয়া বাইর হইবা না।
জলিল মোল্লা বলল, আর শুনো থানা পুলিশের দরকার নেই । গ্রামের একটা সম্মান আসে । এই গ্রামে পুলিশ আইলে গ্রামের মান সম্মান নষ্ট হইবো ।
সাথে সাথে সবাই বললল, হ, একদিন ঠিক, একদম ঠিক ।

তার কদিন পরে জলিল মোল্লার কাছে আবারও নালিশ এসে হাজির । এবার নালিশ নিয়ে হাজির হয়েছে গ্রামের একজন গরীব কৃষক, নাম তার রিপন মিয়া । আজকে সে জানালো যে রাতে আসতে গিয়ে তার মোবাইল ছিনতাই হয়েছে ।
জলিল মোল্লা আবারও বলল, রাতে দামী ফোন নিয়ে বাইরে বের হইছো কেন?
রিপন মিয়া বলল, হুজুর আমি গরীব মানুষ । দামী ফোন কোথায় পাবো ? আমার নোকিয়া এগারোশ মডেল । কিন্তু আমার জন্য এটাই অনেক বড় কিছু ।
জলিল মোল্লা কিছু সময় গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলো । সভায় আরও অনেকেই উপস্থিত রয়েছে । তারা জলিল মোল্লার দিকে তাকিয়ে আছে । সে কী বলে সেটা শুনতে চায় তারা । দামী ফোন দেখলে চোরের লোভ লাগে বুঝলাম কিন্তু কম দামী ফোন ছিনতাইয়ের পেছনে যুক্তি কি! এটা তারা শুনতে চায় !
জলিল মোল্লা বলল, আসলে কি হয়েছে, এই দেখো গ্রামে এখন কত মানুষ টাকা পয়স আয় করতেছে । সবাই দামী দামি ফোন নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে । এই দামী ফোন দেখেই ছিনতাইকারী মনে একটা তীব্র আকাঙ্খা জাগতেছে । কিন্তু তারা এখন আর সেই সুযোগ পাচ্ছে না সেই দামী ফোন নেওয়ার। কারণ এখন তারা সবাই সাবধান হয়ে গেছে । কিন্তু তাদের তো সেই দামী ফোনের লোভে পেয়ে বসেছে। তাই রাতের বেলা একা পেয়ে এই কমদামী ফোন নিয়েই তারা চলে যাচ্ছে । বুঝেছো এইবার ?

উপস্থিত সবাই বলল, ঠিক ঠিক একদম ঠিক । আপনি একদম ঠিক বলেছেন । সবাইকে এখন থেকে যে যার দামী ফোন আছে সেগুলো নিয়ে বাইরে বের হবে না । কেউ কোন ফোন নিয়েই আর বের হবে না । ছিনতাইকারী যেন দেখতেই না পারে। তাহলেই এই ফোন ছিনতাই দুর করা যাবে ।

গ্রামের সবাই তাই করা শুরু করলো । যে যে দামী ফোন বের করতো সবাই ফোন লুকিয়ে ফেলল । কম দামী ফোন নিয়েই বাইরে বের হত । কিন্তু দেখা গেল তাতেও ফোন ছিনতাই দুর হল না । ঠিকই একই ভাবে এরওর কাছ থেকে ফোন ছিনতাই হতে শুরু করলো । এরপর সবাই আবারও মোল্লা জলিলের কাছে এসে হাজির হল । সব কিছু শুনে মোল্লা জলিল বলল, এটার পেছনেও কারণ আছে । মানুষজন দামী ফোন ব্যবহার করা বন্ধ করেছে তো কী হয়েছে, ছিনকারীরা এখন টিভি দেখছে সিনেমা দেখছে ইন্টারনেটে দামী দামী ফোনের ছবি দেখছে । এই যে কদিন আগে আইফোন বারো বের হল । ছবি দেখে তো আমারই লোভ লাগে । বুঝো তাইলে অবস্থা ! এই গুলোর ছবি দেখে ছিনতাই কারীরা মনকে বুঝাতে পারে না । তাই তারা ছিনতাই করে । যতদিন নান টিভি মুভি আর ইন্টানেটে এই সবদামী দামী মোবাইলের ছবি ভিডিও দেখা বন্ধ হবে ততদিন এই ফোন ছিনতাই বন্ধ হবে না । বুঝেছো সবাই !
সবাই মাথা নাড়লো । তারা খুব বুঝতে পেরেছে ।

তারপর কেটে গেছে কয়েকদিন । নিজের একটা কাজে জলিল মোল্লা শহরে গিয়ে হাজির হল । কাজ শেষ করতে করতে বেশ রাত হয়ে গেল । শহর থেকে সরাসরি বাস রতনপুর পর্যন্ত আসে না । দুই গ্রাম আগেই থেমে যায় । সেখান থেকে আবার ভ্যান কিংবা অটো রিক্সাতে করে আসতে হয় । সেদিন একটু বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে কোন কিছুই ছিল না । জলিল মোল্লা হেটে বাসার দিকে আসছিলো । তখনই তিনজন কালো কাপড় পরা যুবক মোল্লাকে ঘিরে ধরলো । তারপর তার কাছ থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নিল । বাঁধা দিতে চেষ্টা করাতে তিন মিলে তাকে বেদম মাইর দিল । এমনই মাইর দিলো ঠিকঠাক মত সে হাটতেও পারছিলো না ।

কোন মতে সে নিজের গ্রামে পৌছালো । চিকিৎসা নিয়ে বসার মত উপযোগী হলে সে জরূরী ভিত্তিতে গ্রামে মিটিং ডাক দিল । সবাই তার দুঃখের কথা শুনে খুব মর্মাহত হল । মুখ দিয়ে চুকচুক করতে লাগলো । সবাই খুব কষ্ট পেয়েছে ।
জলিল মোল্লা বলল, এবার কিছু একটা করতেই হবে । পুলিশে খবর দিতে হবে ।
সবাই হায়হায় করে উঠলো । করেন কী করেন কী ! গ্রামের একটা মান সম্মান আছে না !!
ইদ্রীস আলী উঠে দাড়িয়ে বলল, কী আর করবেন মোল্লা সাহেব, ছিনতাইকারী এই যে দামী ফোন, অন্যের ধনসম্পদ দেখে লোভী হয়ে যায় । তখন তারা আর কী করবে যাকে সামনে পাবে তারটাই তো কেড়ে নেবে । আপনি ওভাবে সামনে গেলেন কেন এতো রাতের বেলা । এতো রাতের বেলা যাওয়া মোটেই উচিৎ হয় নাই । তারপর উপর আবার বাঁধা দিতে গেছেন, একটু মারবেই । মারবে না বলেন !

জলীল মোল্লা আর কী বলবে । তার যুক্তি তো ঠিকই ছিল এতোদিন কিন্তু নিজের উপরেই যখন যুক্তি চলে এল তখন বুঝতে পারলো যে কতখানি সঠিক না বেঠিক ছিল সে !
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:০৮
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নন্দিনী

লিখেছেন রাজীব নুর, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:১৫



তুমি আমার কাছে কি চাও নন্দিনী?
বারবার কেন আমার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চেষ্টা করছো?
দেখো, আমি সাংসারিক মানুষ। বউ বাচ্চা আছে।
এরকম করো না। প্লীজ। এসব ভালো নয়।

তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মা

লিখেছেন বিএম বরকতউল্লাহ, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৪৯


ব্যথায় তুমি জল ফেলিবার আগে
কার সে চোখে বহে জলের ধারা
তোমার দুখে কে বা উঠে কেঁদে
কষ্টে তোমার হয় যে দিশাহারা!



না খেয়ে মা কোঁচড় ভরে ভিক্ষে করা ভাতে
ইচ্ছে করে ছেলের মুখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এবার যখন আমরা ধরব, ফাইনাল হয়ে যাবে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৭



সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস্ পরশ। তিনি বলেছেন, ‘এবার যখন আমরা ধরব, ফাইনাল হয়ে যাবে। এবার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাস্কর্যই আমাদের প্রধান সমস্যা?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৪১


দেশে হাজার রকমের সমস্যা৷ সীমাহীন ঘুষ-দুর্নীতি চলছে- আপত্তি নেই! বলাৎকার-ধর্ষণ চলছে- আপত্তি নেই! মাদক-সন্ত্রাস চলছে আপত্তি নেই! ভোট-অধিকার ডাকাতি চলছে- আপত্তি নেই! মোল্লাতন্ত্র এসব অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ জন্মদিন আমার সোনামণিটার

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০২ রা ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৩:০২


দেখতে দেখতে আরো একটা বছর চলে গিয়ে আবারো আমার ছেলেটার জন্মদিন চলে এলো। অনেক প্ল্যান-প্রোগ্রাম করার করার পরেও এবারও দেশে যাওয়া হলো না। পরপর দু'টো বছর এভাবে ছেলেটার জন্মদিনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×