somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিহাস বিস্মৃত নারী বিপ্লবীরা : পর্ব-১

১১ ই নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মর্তে প্রথম মানুষের আগমন এবং নানান শ্বাপদ সংকুল পিচ্ছিল পথ পরিক্রমায় আজকের এই অত্যাধুনিক পৃথিবী ...পরিবর্তনের প্রত্যেক পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অজস্র অজানা গল্প । নাম না জানা অগুনতি মানুষের আত্মত্যাগ আর হাহাকারের গল্পও । 'প্রকৃতির' খামখেয়ালীপনার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যাওয়া প্রথম সেই বনমানুষটি কিংবা আজকের ফিলিস্তিন, তিব্বত, মিশর, কাশ্মিরে স্বাধীনতার স্বপক্ষের সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো ... প্রত্যেকের উদ্দেশ্য এক ....."পরিবর্তন'' ।

বিপ্লবের সংজ্ঞায় বলা হয়, একটি গতিশীল কর্মকান্ড যা সরকার কিংবা সামাজিক কোন নিয়মের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে ... এবং একজন বিপ্লবী সে, যে বিপ্লবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয় , পরিবর্তনে যার গভীর প্রভাব বা ভূমিকা থাকে।

বিপ্লবী বলতে আমাদের চোখে চে' গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, মাও সে তুং এর ছবি ভেসে ওঠে... কিন্তু ইতিহাস প্রায়ই সেইসব নারী বিপ্লবীদের ভুলে যায় যারা তাদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য, সিস্টেমের বিপক্ষে গিয়ে তাদের সময়, একাগ্রতা, আত্ননিবেদন করেছেন, এমনকি জীবনপর্যন্ত ত্যাগ করেছেন । ইতিহাসের সমস্ত বিপ্লবেই এমন হাজার হাজার নারীও অংশ নিয়েছেন যারা অবহেলায় হারিয়ে গেছেন । অথচ পরিবর্তনের পক্ষে তাদের গুরুত্ব কোন অংশেই কম নয় । রাজনীতি বা বিপ্লবের ময়দানে তারা একেকজন একেকভাবে এসেছেন, কেউ হয়তো রাইফেল হাতে ময়দানে নেমেছেন আবার কেউ কলম হাতে প্রতিবাদী হয়েছেন। কিন্তু তারা সবাই তাদের বিশ্বাসের জন্যই লড়াই করেছেন।

বিপ্লব, সে সফল হোক কিংবা ব্যার্থ , এইসব নারীরা স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন । এমন প্রতিবাদী, মনুষ্যত্বে ভাস্বর কিছু নারী বিপ্লবীকে নিয়েই এই সিরিজ পোস্ট

১. Nadezhda Krupskaya

২৬ ফেব্রুয়ারী, ১৮৬৯ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটাসবার্গে এক ফ্যাক্টরী ইন্সপেক্টরের ঘরে জন্ম । পুরো নাম Nadezhda Konstantinovna Nadya Krupskaya । বাবার চাকরীর সুবাদে ফ্যাক্টরী শ্রমিকদের শিশুদের সাথে শৈশব কাটিয়েছেন । কাছ থেকে দেখেছেন শ্রমিকদের দুঃসহ জীবনযাপন, মালিক শ্রেণীর প্রতি জমাট ক্ষোভ, দাঙ্গা-বিক্ষোভ । এই অভিজ্ঞতাই তাকে তার জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সাহায্য করে ।

ভীষণ মেধাবী এই নারী মাধ্যমিকে গোল্ড মেডাল পান । হায়ার সেকেন্ডারী পাশ করে শিক্ষকতা শুরু করেন । নিম্নশ্রেণী বিশেষত নারী শ্রমিকদের মাঝে শিক্ষাবিস্তারে নিরলস কাজ করতে থাকেন ।



১৮৮৯ সালে মার্কসের ''ক্যাপিটাল" পড়ার মাধ্যমে দিক্ষিত হন মার্ক্সিজমে । সে সময় রাশিয়ান সোশ্যালিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর শিক্ষার জন্য ছোট ছোট অনেক স্কুল গড়ে তোলে । পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি এসব স্কুলে শিক্ষকতার কাজ চালিয়ে যান পাশাপাশি টলষ্টয় , ফ্রেডারিখ এঙ্গেলসহ নানান দার্শনিকদের লেখা বই পড়ে ফেলেন ।

রাশিয়ায় ততদিনে সোস্যালিস্ট মুভমেন্ট নাড়া দিয়ে উঠছে । বুর্জোয়াদের বিপক্ষে শ্রমিকদের অসন্তোষ প্রকাশ হতে শুরু করেছে । তখনো মার্ক্সবাদীরা ছোট ছোট সার্কেলে আন্ডারগ্রাইন্ড থেকে শ্রমিকদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন । ১৮৯৪ তে এমন কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কসিস্টদের এক মিটিংএ Krupskaya লেনিনের সাক্ষ্যাৎ পান ।

১৮৯৫তে সেন্ট পিটার্সবার্গের মার্কসবাদীরা মিলিত হয়ে একটি দল গঠন করেন যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো শ্রমিক শ্রেণীর অধিকারের দাবী প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর কাছে পৌঁছে দেওয়া । সে বছরই লেনিন ও Krupskaya পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন । তাদের সাইবেরিয়ায় জেলে পাঠানো হয় এবং সেখানেই তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন । হয়তো অনেকেই জানতেন না যে Krupskaya ছিলেন লেনিনের একমাত্র স্ত্রী



সাইবেরিয়ায় বন্দীত্বকালীন সময়টা তাদের খারাপ কাটেনি । Krupskaya'র ভাষায় .. "আমরা অল্প বয়স্ক ছিলাম এবং দুজনের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা অনুভব করতাম" । এ সময় তারা রাশিয়ান সাহিত্য, বিশ্ব সাহিত্য, রাজনীতি, পারষ্পরিক মতাদর্শ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গী বিনিময় করতেন ।
১৮৯০ তে পার্টির সিদ্ধান্তে দুজনে ওয়েস্টার্ন ইউরোপে পাড়ি জমান । সেখানে পার্টির একটি গুরুত্বপূর্ন প্রজেক্ট যা ছিল একটি সংবাদপত্র প্রকাশ ( Iskra- "The Spark" ) করা তার দায়িত্ব পান Krupskaya । রাশিয়ান মার্ক্সসিস্টদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, তাদের মতাদর্শ প্রচার, রোজকার অসংখ্য চিঠির উত্তর দেয়া, অসংখ্য সাংকেতিক চিঠি/আর্টিকেল ডিকোড করাই ছিল তার কাজ ।

সেসময় 'রাশিয়ান সোস্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি' স্পষ্টত দুটো ধারায় বিভক্ত ছিল । লেনিন নিয়ন্ত্রিত ''বলশেভিক (Bolsheviks) " যা শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণ করতো । অপরদিকে মধ্যবিত্ত/প্রলেতারিয়েত/বুর্জোয়া শ্রেনীর পক্ষে ছিল স্টালিন নিয়ন্ত্রিত মেনশেভিক (Mensheviks )" পার্টি । বলশেভিক পার্টি কংগ্রেসে মেজরিটি ভোটে এগিয়ে ছিল ।

১৯০৩ সালে পার্টির ২য় কংগ্রেসে 'মেনশেভিক পার্টি' দলের নেতৃত্ব পেলে Krupskayaকে পত্রিকার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয় । লেনিন দল থেকে পদত্যাগ করেন ।
দলের ভাঙ্গনের ফলে সাধারণ শ্রমিক থেকে মার্কসিস্ট নেতাদের মধ্যে নানা সন্দেহ দানা বেধে উঠতে থাকে । Krupskaya এসময়ে দলকে গুছিয়ে নিতে মাঠে নামেন । এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু হয় । Krupskaya সহ দলের নারীরা যুদ্ধাহত সৈনিকদের সেবায় এগিয়ে আসেন।
আগষ্ট ১৯১৪, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে লেনিনসহ Krupskayaকে সুইজারল্যান্ডে যেতে বাধ্য করা হয় ।
১৯১৭ সালের অক্টোবরে রাশিয়ান বিপ্লব সংঘটিত হবার আগে তারা দেশে ফিরে এসে শ্রমিকদের পক্ষে দাড়ান । Krupskaya সে সময় দলের সেক্রেটারী ছিলেন । জার্মানী ও অষ্ট্রিয়াতে যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে আনতে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। এরই মাঝে ১৯১৫ তে তিনি নিজের লেখা একটি বই প্রকাশ করেন (Public Education and Democracy ) ।

অক্টোবর বিপ্লবের ফলে বলশেভিক পার্টি ক্ষমতায় এলে Krupskayaকে শিক্ষাবিস্তার কমিটির প্রধান ( শিক্ষামন্ত্রী) করা হয় । এর ফলে তিনি রাশিয়ার অনেক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কাজ করতে থাকেন । নারীশিক্ষা বিস্তার, তরুনদের একত্রিত করা, বয়ষ্ক শিক্ষা , লাইব্রেরী তৈরী , মতাদর্শিক শিক্ষাপ্রচার করা ছিল তার মূল দায়িত্ব । সিভিল ওয়্যার চলাকালীন সময়ে তিনি রেড আর্মিকে পরিচালনাও করেন ।

Krupskaya বিশ্বাস করতেন শ্রমিক শ্রেনীকে শিক্ষিত করার মাধ্যমে, তরুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে । কেবলমাত্র ভঙ্গুর অর্থনীতি, যুগ যুগ ধরে চলে আসা গৃহযুদ্ধের ফলে ভগ্নপ্রায় সমাজ ব্যাবস্থার কারণে তিনি বেশিদূর এগোতে পারেন নি ।

ইতিমধ্যে ইউরোপসহ রাশিয়ার বুর্জোয়াশ্রেণী এক হতে শুরু করেন । দৃশ্যপটে স্টালিনের আবির্ভাব ঘটে । বেশ শক্তিশালী হয়ে তারা পুনরায় দলের নেতৃত্ব নিয়ে নেয় । ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যু হলে তিনি দলের হাল ধরেন । সাথে ছিলেন ট্রটস্কি । ১৯২৪ এর মে মাসে পার্টির ১৩তম কংগ্রেসে তিনি স্টালিনের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন যা The Lessons of October নামে পরিচিত ।

অক্টোবর ১৯২৬ পর্যন্ত তিনি দলের সাথে ছিলেন । এর মধ্যেই তিনি গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েন । West of Lenin's testament নামে একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন । ১৯২৭ এর পর তিনি পুরোপুরি দলের কাজ বন্ধ করে দেন। দীর্ঘসময় ধরে তিনি তার বিখ্যাত বই "Reminiscences of Lenin " লেখার কাজ করেন। অনেকটা আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ে তার ও লেনিনের কর্মজীবনের পুরোটাই তুলে ধরেছেন ।

Krupskaya মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিক্ষাবিস্তারের জন্য কাজ করে গেছেন । স্টালিন ক্ষমতায় আসার পর তাকে নিয়ে পত্রিকায়,দলে, জনসভায় সবপ্রকার আলোচনা নিষিদ্ধ করেন । যা স্টালিনের মৃত্যু পর্যন্ত বহাল ছিলো । তারপরও Krupskaya স্টালিনের দুঃসাহসের বিপক্ষে দাড়িয়ে অনেককে সাহস যুগিয়েছেন । তার জীবনের শেষ ক'টা বছর তিনি অত্যন্ত কষ্টে কাটান । ১৯৩৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী তিনি মস্কোতে মারা যান ।
তার মৃত্যুর পর ট্রটস্কি তার এপিটাফে নিচের কথাগুলো লিখেছিলেন ....

" With profound sorrow we bid farewell to the loyal companion of Lenin, to an irreproachable revolutionist and one of the most tragic figures in revolutionary history. "


২. Sophie Scholl

৯মে ১৯২১ জার্মানীর ফ্রটেনবার্গ শহরের মেয়রের ঘরে জন্ম নেন সোফি । ৬ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ । প্রাচুর্যতার মধ্যে মানুষ হলেও মায়ের কাছ থেকে মানবিক এবং সামাজিক গুণাবলি রপ্ত করেন । পারিবারিক আবহ এবং মায়ের প্রতি তীব্র অনুরাগের কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি অন্যায়কে তীব্র ঘৃণা করতে শেখেন । ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল এবং স্বাধীনচেতা ।

জার্মানীতে তখন নাজি বাহিনির দাপট চলছে । হিটলারের দমন পীড়ন নীতির কারণে নাজি বাহিনি তখন সাক্ষ্যাৎ যমদূত । গোটা জার্মানী হিটলার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত ।
নাজী পার্টির ক্ষমতা দখলের ফলে হুট করে গোটা দেশে বিপুল পরিবর্তন শুরু হয় । সেটা শিক্ষাক্ষেত্রেও পড়ে । পুরোনো বইয়ের বদলে পার্টি কর্তৃক সার্টিফায়েড বই বিতরণ করা হয় । শিক্ষকদের বাধ্য করা হয় পার্টি নিয়ন্ত্রিত শিক্ষক লীগে যোগ দিতে । শারীরিক শিক্ষা, খেলাধুলা এবং আউটডোর এ্যাক্টিভিটিসকে মেজর পার্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।

হিটলার যে কত বড় দূরদর্শী নেতা ছিলেন সেটা বোঝা যায় ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত তার Hitler Youth movement গঠনের কারণ বিশ্লেষণ করলে । হিটলার জানতেন শিশুদের মগজে যদি তার দর্শণটা ঢুকিয়ে দেয়া যায়, তাদের যদি আত্মবিশ্বাসী এবং ক্ষমতার প্রতি মোহ তৈরী করা যায় তবে তার স্বপ্ন অনেকাংশে সফল হবে । কারণ এরাই তার কাঙ্খিত সে সমাজে/রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ । সাধারণত ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী বাচ্চাদের এ দলে সদস্য করা হতো । ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলো ১ লক্ষ । হিটলারের ক্ষমতা দখলের পর ১৯৩৬ সালে এর সদস্য গিয়ে দাড়ায় ৪ মিলিয়নে !! সে সময় এই দলে শিশুদের সদস্য হওয়াটা বাধ্যতামূলক করা হয় ।



সোফি যে স্কুলে পড়তেন সেখানকার স্টুডেন্টদেরও ইয়্যুথ ম্যুভমেন্টে নাম লেখাতে হয় । সোফি’র ৫ ভাইবোনও দলে যোগ দেন । ১৪ বয়স বয়সে (১৯৩৫) সোফি জার্মান গার্লস লীগে (ইয়্যুথ ম্যুভমেন্টের মেয়েদের অংশ ) স্কোয়াড লীগার হিসেবে পদোন্নতি পান । ইয়্যুথ ম্যুভমেন্টের অংশ হবার পরও সোফির কিছু ইহুদি বন্ধু ছিল যাদের সে বাড়িতে আমন্ত্রন করতো । সেরকম কিছু ইহুদী মেয়েকে দলে সদস্যপদ না দেয়ায় প্রথম সরাসরি প্রতিবাদ জানান । কিছুদিন পরে এক ইহুদি লেখকের লেখা গান গাইবার জন্য (যে লেখকের লেখা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো ) কিছু মেয়েকে ভৎর্সনা করা হলে সোফি এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দলের নেতৃত্বের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৩৫ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যুরেমবার্গ আইন জারী হলে দৃশ্যপটে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয় ( ইহুদি নিধনযজ্ঞ শুরু )। ইহুদিদের ধরপাকড় করা, চিহ্নিত করা কিংবা গুম করা শুরু হয় । ইহুদি শিশুরা স্কুল ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ স্থানে পালাতে শুরু করে । সোফির ব্যাক্তিগত বিশ্বাস, আদর্শিক চেতনার উপর প্রথম বড় একটা আঘাত আসে ।

১৯৪০ সালে স্কুল ছেড়ে সোফি একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়ানো শুরু করে । এই অভিজ্ঞতায় পরবর্তীতে সে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় । এদিকে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে । এর মধ্যে হিটলারের সমালোচনার জন্য তার বাবাকে নাযী বাহিনী বন্দী করে । তার ছেলেবন্ধু যে ফ্রন্টে জার্মানী বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করছে নাযী বাহিনীর বর্বরতার কথা বলে পরোক্ষভাবে সোফিকে প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করে ।

ঠিক সে সময় তার ভাই হ্যান্স এবং তার কয়েকজন বন্ধু মিলে গঠিত করে White Rose movement ( এই বিপ্লবকে জার্মানীতে হিটলারের বিপক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী কর্মকান্ড হিসেবে ধরা হয় । তারা নাযী বিরোধী বক্তব্য,লিফলেট,দর্শন প্রচার করতো । এরা ছিলো আন্ডারগ্রাউন্ড । ভারতের নকশাল বিদ্রোহীদের সাথে এদের মিল পেতে পারেন )। সোফি সানন্দে তাতে যোগ দেনে এবং লিফলেট এবং স্পিচ লিখতে সাহায্য করেন । শুরুতে তাদের কার্যক্রম মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর আশপাশ জুড়ে ছিলো । লিফলেট বিলি করা এবং রাস্তার পাশে হুটহাট বক্তব্য দেয়াতেই সীমাবদ্ধ । যাই হোক, মোটামুটি বেশ সাড়া পড়ে যায় । তারা দলেও ভারী হতে থাকে । এর মধ্যে গেস্টাপো বাহিনীর কাছেও তাদের কার্যক্রমের খবর পৌছে যায় । এমনই এক দিনে সোফি এবং হ্যান্স গেস্টাপো বাহিনীর হাতে লিফলেট ও লিখিত বক্তব্যের প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন ।

৪ দিন বাদে সোফিকে পাবলিক কোর্টে নেয়া হয় । যেখানে বিচারক তার রায়ে নিম্নলিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ....

“The accused, Sophie Scholl, as early as the summer of 1942 took part in political discussions in which she and her brother Hans Scholl, came to the conclusion that Germany had lost the war. She admits to having taken part in the preparing and distributing of leaflets in 1943. Together with her brother she drafted the text of the seditious ‘Leaflets of the Resistance in Germany’. In addition, she had a part in the purchasing of paper, envelopes and stencils, and together with her brother she actually prepared the duplicated copies of this leaflet. She put the prepared leaflets into various mailboxes, and she took part in the distribution of leaflets in Munich. She accompanied her brother to the university, was observed there in an act of scattering the leaflets, and was arrested when he was taken into custody.”

তাদের ইন্টারোগেশন সেলে নেয়া হয় । টর্চার করা হয় বাকীদের তথ্য দেয়ার জন্য । কিন্তু তারা সব দায় নিজেরা নিয়ে নেন । তবে খুব বেশিদিন আর তাদের মুখ বন্ধ রাখার উপায় ছিলনা । টর্চারের মাত্রা বেড়ে গেলে তারা কিছু নাম বলতে বাধ্য হন ।

১৯৪৩ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী আরো কিছু প্রথম সারীর সদস্যকে গ্রেফতার করে কোর্টে নেয়া হয় । সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় । একই সেলে বন্দী অপর একজনকে সোফি মৃত্যুর আগে কিছু কথা বলে যান ..
“ আজ এক চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল দিন । আমার মৃত্যু আসন্ন কিন্তু আর কত তরুণ, সম্ভাবনাময় প্রাণকে সম্মুখযুদ্ধে মরতে হবে !? আমার মৃত্যুর ফলে আমার কাজের জন্য যদি হাজারো মানুষ জেগে ওঠে , যদি ছাত্ররা বিপ্লবে নেমে পড়ে তবে এ মৃত্যু স্বার্থক । “

সোফিকে সেদিনই মিউনিখ প্রিজনে গিলেটিনে হত্যা করা হয় ( ২২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৩ । বয়স ২১ ) । নাহ, সেদিন শহরে কোন ছাত্র বিক্ষোভ দেখা যায়নি !!

তারপর পৃথিবী কতশতবার পাল্টে গেছে । ইতিহাস অজস্রবার নতুন করে লেখা হয়েছে । খুব কম সংখ্যক মানুষই হোয়াইট রোজ বিপ্লবের সেই তরুণ সেনানীদের আত্মত্যাগকে মনে রেখেছিল । তবে আধুনিক জার্মানীতে এখন তাদের নিয়ে আলোচনা হয় । তার প্রমাণ ১৯৯৯ সালে “Brigette’’ নামক ম্যাগাজিন পাঠকদের ভোটে সোফি’কে ‘Woman of the Century’ এবং ২০০৩ সালে সোফি এবং ভাই হ্যান্স’কে ‘Greatest Germans’ নামক এক টেলিফোন পুলের ভোটে চতুর্থ স্থান স্বীকৃতি দেয়া থেকেই বোঝা যায় ।


চলবে .........

দৃষ্টি আকর্ষণ : ব্যস্ততা এবং অনভিজ্ঞতার দরুণ লেখাটা হয়তো পরিপূর্ণ হলোনা । উপদেশ কিংবা সমালোচনা সাদরে গৃহীত হবে। এই সিরিজে আরো দুটো পোস্ট দেয়ার ইচ্ছে আছে । তবে সেটা নির্ভর করছে পাঠকদের মতামত এবং কৌতুহলের উপর।

তথ্য সংযুক্তি : পাঠকদের সুবিধার্থে লেখার মাঝে লিংক যুক্ত করা হয়েছে । এটি সরাসরি কোন অনুবাদমূলক লেখা নয় । ভাবানুবাদ করে নিজের মত করে লেখার প্রয়াস ছিল ।

এছাড়া সাহায্যকারী লিংকগুলো ...
১. Russian Revolutionaries 1914-20
২.Encyclopedia Britannica
৩.History Learning Site

এই লেখার ব্যাপারে আন্তরিক সহযোগীতা ও উপদেশের জন্য প্রিয় ব্লগার কাল্পনিক ভালোবাসা ভাইয়ের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা । :)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৫৯
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কক্সবাজার ভ্রমণ ২০২০ : যাত্রা শুরু

লিখেছেন পগলা জগাই, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১২:৫১




দীর্ঘ্য ৬ বছর পরে পরিবার নিয়ে বেরাতে যাওয়ার সুযোগ হলো আবার। এর মধ্যে ওদের নিয়ে বেরাতে গেলেও তা ছিলো ডে ট্রিপ, যেখানেই গেছি রাতের মধ্যে বাড়িতে ফিরতেই হয়েছে। স্ত্রী-কন্যকে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারী পাচার

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ দুপুর ১:৫৯



এশিয়ার এক নম্বর নারী ও শিশু পাচার রুট বাংলাদেশ।
প্রতিদিন দেশ থেকে প্রচুর নারী ও শিশু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অথবা বিমান যোগে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারকৃত নারী ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিলেকোঠার প্রেম- ১২

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৩

প্রায় দেড় বছর! না না এক ফাল্গুন থেকে আরেক ফাল্গুন পেরিয়ে চৈত্রের শেষ। নাহ ঠিক দেড় বছর না, এক বছরের একটু বেশি সময় পর পা দিলাম আমার চিরচেনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের প্রতি দয়ামায়া না থাকলে দেশে কি কি ঘটতে পারে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১০



ভারত খাদ্য রপ্তানী করে, বাংলাদেশের মতো ভারতে সকাল-বিকেল খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে না, আয়ের তুলনায় খাবারের দাম কম; খাবারে কেমিক্যাল, ফরমালিন মিশায় না; অনেক বছর এত বেশী খাদ্য উৎপাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিরু আলুমের সিনেমা বাহিরে চলিচ্ছে , ভিতরে খালি ক্যারে

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৮


প্রাডো গাড়ি নিয়ে ঘুরছেন হিরো আলম। ছুটছেন এক প্রেক্ষাগৃহ থেকে আরেক প্রেক্ষাগৃহে। তাঁকে ঘিরে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে আবার উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ করা গেলেও প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে আসন ফাঁকা। নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×