একটা স্নিগ্ধ সন্ধ্যার গল্প।
==============
প্রথম পর্ব : লাল মাটির দেশে প্রথম দেখা
সকালটা ছিল অদ্ভুত রকমের নরম।
আকাশে মেঘ ছিল না, তবু রোদের ভেতরে যেন এক ধরনের ম্লান কোমলতা লেগে ছিল। শান্তিনিকেতনের লাল মাটির পথ ধরে ছায়া ফেলেছিল সারি সারি শাল, কৃষ্ণচূড়া আর সোনাঝুরি। দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে আসছিল মনে হচ্ছিল, বাতাসও যেন রবীন্দ্রনাথের কোনো অদেখা গানের পঙ্ক্তি গুনগুন করছে।
প্রথমবারের মতো এই শহরে পা রাখল মনমিতা রহমান।
বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে পড়তে এসেছে সে। বাংলা সাহিত্য নিয়ে তার এক অদ্ভুত টান। ছোটবেলা থেকেই সে বিশ্বাস করত—কোনো শহর যদি মানুষের আত্মাকে বদলে দিতে পারে, তবে তার নাম শান্তিনিকেতন।
ট্রেন থেকে নেমে যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছাল, তখন তার চোখে ছিল বিস্ময় আর বুকভরা স্বপ্ন।
তার মা বিদায়ের সময় বলেছিলেন—
— "মানুষ হয়ে ফিরিস মা। শুধু ডিগ্রি নিয়ে নয়।"
কথাটা কানে বাজছিল।
প্রথম ক্লাসের দিন।
বিশ্বভারতীর পুরোনো ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনমিতা নতুন মুখগুলো দেখছিল। কারও হাতে বই, কারও হাতে গিটার, কেউ আবার শালপাতার চায়ের কাপ হাতে তর্ক করছে জীবনানন্দ না রবীন্দ্রনাথ—কে বড় কবি।
হঠাৎ একটি বই মাটিতে পড়ে গেল।
মনমিতা নিচু হয়ে বইটি তুলতে গিয়ে দেখল, আরেকটি হাত একই সঙ্গে বইটি তুলতে এগিয়ে এসেছে।
দুটি হাত এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল।
ছেলেটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল—
— "সরি... আপনি আগে নিন।"
মনমিতা বইটি বাড়িয়ে দিল।
— "আপনার বই।"
ছেলেটি মলাটের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
— "আরে! এটা তো আপনার বই। আমারটা তো ওখানে।"
দুজনেই হেসে ফেলল।
এই হাসিটাই হয়তো তাদের অদৃশ্য পরিচয়ের প্রথম স্বাক্ষর।
ছেলেটির নাম কল্লোল মুখার্জী।
কলকাতার উত্তরাংশে তাদের কয়েক পুরুষের পুরোনো বাড়ি। বনেদি পরিবার। ঠাকুরদা আইনজীবী ছিলেন, বাবা শিল্পপতি, মা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী।
কিন্তু কল্লোলের মধ্যে বনেদিয়ানার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের নীরবতা।
সে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে ভালোবাসত।
পরের দিন আবার দেখা।
তারপর লাইব্রেরিতে।
তারপর ছাতিমতলায়।
তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে।
কেউ কাউকে খুঁজত না।
তবু দেখা হয়ে যেত।
কখন যেন "আপনি" থেকে "তুমি" হয়ে গেল।
এক বিকেলে কোপাই নদীর ধারে বসেছিল দুজনে।
নদীটা খুব বড় নয়।
কিন্তু তার নীরবতার গভীরতা সমুদ্রের মতো।
কল্লোল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
— "তুমি বাংলাদেশ ছেড়ে এত দূরে পড়তে এলে কেন?"
মনমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
— "কারণ কিছু জায়গায় মানুষ শুধু পড়তে যায় না... নিজেকে খুঁজতেও যায়।"
কল্লোল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এত সহজ একটা বাক্যের ভেতরে এত গভীরতা!
সেদিন ফেরার পথে বৃষ্টি নামল।
আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি।
দুজনেই দৌড়ে আশ্রয় নিল একটি পুরোনো শিরীষ গাছের নিচে।
কল্লোল নিজের ব্যাগ থেকে একটি ছোট ছাতা বের করল।
ছাতাটা এত ছোট যে দুজনকে ঢাকতে পারছিল না।
মনমিতা হেসে বলল—
— "এভাবে ভিজতে ভিজতে অসুখ হবে কিন্তু।"
কল্লোল মৃদু হেসে উত্তর দিল—
— "সব অসুখের ওষুধ হয় না। কিছু অসুখ মানুষ ইচ্ছে করেই বয়ে বেড়ায়।"
মনমিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
বৃষ্টির ফোঁটা গাল বেয়ে নেমে আসছিল।
কোনটা বৃষ্টির জল, আর কোনটা অকারণ এক অচেনা অনুভূতির স্পর্শ—সে বুঝতে পারছিল না।
রাত।
হোস্টেলের জানালার পাশে বসে মনমিতা ডায়েরি খুলল।
লিখল—
"আজ একজন ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো। ছেলেটি খুব কম কথা বলে। কিন্তু তার নীরবতা যেন অনেক কথা বলতে জানে। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই শহর আমাকে শুধু বই নয়, আরও কিছু শেখাতে চলেছে।"
অন্যদিকে, কলকাতায় ফিরে কল্লোলও নিজের ঘরে বসে ছিল।
তার মা দরজায় এসে বললেন—
— "আজকাল তোকে খুব খুশি দেখাচ্ছে।"
কল্লোল মুচকি হেসে বলল—
— "হয়তো শান্তিনিকেতনের বাতাসের জন্য।"
মা হেসে চলে গেলেন।
কিন্তু তিনি জানতেন না, বাতাসের সঙ্গে কারও চোখের গভীরতাও মিশে গেছে।
শান্তিনিকেতনের দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল।সকাল শুরু হতো ক্লাস দিয়ে।
দুপুর কাটত লাইব্রেরিতে।
আর বিকেল মানেই কোপাই নদীর ধারে দীর্ঘ হাঁটা।
সেখানে তারা রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, কবিতা আবৃত্তি করত, গান গাইত, আবার কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো কথা না বলেও পাশাপাশি বসে থাকত।
কল্লোল একদিন বলেছিল—
— "জানো মনমিতা, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভাষা কোনটা?""কোনটা?"
"যে ভাষায় কিছু না বলেও মানুষ একে অপরকে বুঝতে পারে।"
মনমিতা উত্তর দেয়নি।
শুধু হালকা হেসেছিল।
সেদিন কোপাই নদীর জলে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল।
লাল আভায় রাঙা হয়ে উঠেছিল নদীর জল, আর সেই আলোয় দুজন মানুষের ছায়া ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছিল।
তারা তখনও জানত না জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সন্ধ্যাগুলোই একদিন সবচেয়ে গভীর বিষাদের স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




