somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হঠাৎ স্বর্ণকেশী! (অখন্ড)

১৩ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ১২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বি.দ্র. লেখাটা পর্ব আকারে ব্লগে লিখেছিলাম। এবার ভাবলাম জুড়ে দিয়ে এক করে দেই। সে হিসেবে কিছুটা হলেও রিপোস্ট-এর দোষে দুষ্ট। আগাম ক্ষমাপ্রার্থী।

১.
আমি অনীক। সাদামাটা বৈচিত্র্যহীন। একঘেয়ে চরিত্র। তার ওপর চেহারায় ভবঘুরে ভাব প্রকট। শুধু ভাবে নয়, আমি আসলেই ভবঘুরে। টাঙ্গাইলের ছেলে। স্কুল পেড়িয়েই ঘরছাড়া। ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি মেসে থেকে নটর ডেমে পড়েছি। তারপর বুয়েট আর বাউন্ডুলে হলজীবন। মাস্টার্সের সুযোগে আবারও নতুন করে ভবঘুরের ঝোলা কাঁধে জার্মানির মিউনিখে উড়াল দেওয়া। সেই পড়াশোনার পাটও চুকে গেছে দিনকয়েক হলো। ভিনদেশি এই শহরে কপাল গুনে একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলা হয়েছে। সামনের মাস থেকে কাজ শুরু। এ মাসটা তাই বেকার।

সময়ের অভাবে পড়ে থাকা কাজের একটা লিস্ট বানিয়েছি। লিস্টের তিন নম্বরে আছে দাঁতের ডাক্তার দেখানো। আজকে সকাল সাড়ে দশটায় টারমিন। টারমিন মানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। জার্মানি আসা অবধি টারমিনে টারমিনে জীবন অতিষ্ঠ। ইউনিভার্সিটিতে থিসিসের প্রফেসরের সঙ্গে দুই মিনিট কথা বলব। অফিসের দরজায় কড়া নেড়েই সেরে নেওয়া যায়। কিন্তু না, তার জন্যও টারমিন লাগবে। অতিমানবীয় প্রফেসর তার অতি ব্যস্ত ক্যালেন্ডার থেকে সপ্তাহ দু-এক পর দয়া করে সময় দিলেও দিতে পারেন। কিংবা নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলব, তো সবচেয়ে কাছের টারমিনই তিন সপ্তাহ পর। ঘোড়ার ডিম! মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়।

ভয় ভয় লাগছে। দাঁতের ডাক্তারের ব্যাপারে আমার মধ্যে সহজাত ভীতি কাজ করে। বছর দু-এক আগে একরকম বাধ্য হয়ে গিয়েছিলাম ডেন্টিস্টের কাছে। চারটা আক্কেলদাঁত একসঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাড়ি ফুঁড়ে ভীষণ বেকায়দায় বের হয়ে আসছে। পুরো আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলাম। এই ছাব্বিশ বছর বয়সে এত আক্কেল আমি কই রাখি। যা হোক, ঠিক হলো, দুই দফায় দুই দিনে দুটো করে দাঁত তোলা হবে। তো প্রথম দফার দিনে হাসিখুশি সরল চেহারার ডাক্তার মশাই সাঁড়াশির মতো দেখতে কলিজা হিম করা বস্তুটি মাত্র হাতে নিয়েছেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমি গাঁক গাঁক করে অস্ফুট স্বরে ইংরেজিতে আপত্তি জানালাম।

সবে তখন জার্মানিতে এসেছি। জার্মান জ্ঞান বলতে ওই গুটেন মর্গেন পর্যন্তই। জার্মান ডাক্তার আমার চিঁ চিঁ শুনে থমকে গেলেন। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, ‘দেখো, তুমি কী বলছ, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার ইংরেজি বেশি সুবিধের না। আমি আসলে ঘোড়ার ডাক্তার।’ এই পর্যায়ে আমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকালাম। কোনো মতে বললাম, কী বল তুমি, ঘোড়ার ডাক্তার মানে কী? উত্তরে তিনি হড়বড় করে বললেন, ‘আমি আসলে ঘোড়ার দাঁতের ওপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। মাত্র কয়েক বছর হলো আরও পড়াশোনা আর ডিগ্রি যোগ করে মানুষের দাঁতের ডাক্তারির লাইসেন্স নিয়েছি। এখনো সপ্তাহে তিন দিন মিউনিখের আশপাশের খামারগুলিতে ঘুরে ঘুরে ঘোড়ার দাঁত তুলি। আর বাকি দুই দিন এই চেম্বারে বসি।’ এই পর্যায়ে বিস্ময়ে চোয়াল হাঁটুতে নেমে এল আমার। ওদিকে ডাক্তার বলেই চলেছেন, ‘ঘোড়ার সঙ্গে তো আমার জার্মান, ইংরেজি কোনোটাই বলতে হয় না। কিন্তু এখন তোমার মতো অনেক বিদেশি রোগী আসে। আমার খুব সমস্যা হয় কথা বুঝতে। তুমি কী আমাকে কোনো উপদেশ দিতে পার যে, কেমন করে আমি আরেকটু ভালো ইংরেজি শিখতে পারি? আর হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে তুমি, আবার বল তো? কোনো সমস্যা?’ আমার মনে হলো ঝেড়ে একটা দৌড় দেওয়া উচিত। একদম পেছন ফেরা যাবে না। কিন্তু আত্মায় কুলাল না। তার বদলে আমি দাঁত তোলার উঁচু চেয়ারের প্রখর আলোর নিচে তবদা খেয়ে বন্ধ চোখে নিরুপায় বসে থাকলাম।

সেই রোমহর্ষক ঘটনাই এখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবছি, যাব নাকি থাক আজকে? ডাক্তার যদি দাঁত ধরে নাড়াচাড়া দিয়ে অবস্থা আরো বেগতিক করে দেয়? শক্ত একটা যবের রুটি খেতে গিয়ে নিচের দাঁতের আনুবীক্ষনিক একটা অংশ ভেঙে গেছে। জার্মান রুটিও বটে। মাথায় মারলে মাথা ফেটে যেতে পারে। বাঙ্গালির ছেলে, কেন যে পাউরুটি ফেলে কাঠের টুকরা চিবাতে গেলাম! বাংলা ভাষার ব-বর্গীয় একটা গালি মনে আসছে। হলে আর মেসে থাকার সুবাদে বঙ্গীয় ব- আর চ-বর্গীয় বিশেষ শব্দভান্ডারের ওপর ভালো দখল আছে। ঢোঁক গিলে বিশাল শক্তিশালী বাংলা গালিটা গিলে ফেললাম। বাইরে থেকে দাঁতটা দেখলে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু জিভের ডগায় একটা অস্বস্তিকর অমসৃণতা সারাক্ষন উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে। নাহ, যাই; কারণ, এই টারমিন নেয়া হয়েছে তেরো দিন আগে। আজ না গেলে দেখা গেল তিন মাস পর আবার টারমিন পাওয়া যাবে। ততদিনে দেখা যাবে টিস্যু পেপারে মুড়ে দাঁত হাতে নিয়ে ঘুরছি। সুতরাং, যা থাকে কপালে, যাবই যাব আজকে। যা হয় হবে, হক মাওলা!

ডাক্তারের চেম্বার বাসা থেকে খুব একটা দূরে না। লিন্ডউর্ম ষ্ট্রাসে ৫২। ষ্ট্রাসে মানে স্ট্রিট বা রাস্তা আর কী। মিনিট বিশেকের হাঁটা পথ। মাথার ওপর এক আকাশ রোদ। হেঁটে যেতে খারাপ লাগবে না। আর সমস্যা তো দাঁতে, পায়ে তো নয়, প্রবোধ দিলাম নিজেকে। কানে হেডফোনটা গুঁজে বেরিয়ে পড়লাম। ধীর লয়ে বেজে চলছে এড শিরান। গানের নাম ফটোগ্রাফ। গানটার ভেতর এক ধরনের বিভ্রম আছে। বিভ্রম আমার ভালো লাগে।

ফুটপাথ ধরে আমার পাশেই হাঁটছেন আরেকজন। অল্পবয়সী এক তরুণী। বয়স পঁচিশেক হবে হয়তো। আমি অন্যমনস্ক। কিন্তু তার খুঁড়িয়ে চলা আমার দৃষ্টি এড়াল না। তার বাম হাতে ক্রাচ, ডান পায়ে অতিকায় প্লাস্টার। প্লাস্টার নিয়ে হাঁটাচলার সুবিধার জন্য হাঁটু পর্যন্ত মেডিকেল বুট। আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম, প্লাস্টার আর মেডিকেল বুট, সব মিলিয়ে এই তরুণীর ডান পায়ের ওজন কত হতে পারে। পাঁচ, দশ, নাকি পনেরো? আমার পায়ের হালকা স্নিকার্সের তুলনায় তো নিশ্চিত বেজায় ভারী। কিন্তু হাঁটার গতিতে আমরা সমান। আমার তাড়া নেই, তাই কচ্ছপ গতিতে হাঁটছি।

হঠাৎ কীসে যেন একটা ধাক্কার মতন খেলাম। তাল সামলাতে সামলাতে খেয়াল করলাম ফুটপাথ মেরামতের কাজ চলছে। ব্যারিকেডের মতো দিয়ে রেখেছে ফুটপাথের এক পাশটা জুড়ে। সাইনবোর্ডও একটা বসিয়ে দিয়েছে। তাতে লেখা—বাউষ্টেলে, মানে কন্সট্রাকশন সাইট। নির্মাণ কার্য চলিতেছে আর কী। আর আমি অন্ধ সেই সাইনবোর্ডটাতেই ধাক্কা খেয়েছি। একেই বলে চোখের মাথা খাওয়া। আর ভাউ রে ভাউ, জার্মান বাউষ্টেলেও বটে। বাংলাদেশে তাও তো শুধু বর্ষাকালেই আল্লাহর দুনিয়ার সব খনন কাজ আর সৌন্দর্য বর্জনের, এই কী বলি, মানে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলে। আর এই জার্মান দেশে বছর জুড়েই লেগে থাকে বাউষ্টেলের হাউ কাউ। মনে মনে গজগজ করছি আর সঙ্গে মুখ দিয়েও এক দুইটা গালি সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বেমক্কা। ভীষণ বিরক্তি নিয়ে সতর্কভাবে হাঁটতে শুরু করেছি। বাউষ্টেলের গুষ্টি কিলানো বাদ দিয়ে অন্য দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করা যায় কিনা ভাবছি।

প্লাস্টার কুমারী আমার ক্ষণিকের বিরতিতে কিছুটা এগিয়ে গেছেন। তার চোখ, কান, মাথা সব ঢাকা হালকা নীল রঙের একটা সুতির টুপিতে। এই আগস্টের ত্রিশ ডিগ্রির সকালে কোন পাগলে টুপি পরে বের হয়। পায়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার মাথাটাও গেছে। আর আমি তাকে অল্পবয়সী তরুণীই বা ভাবছি কেন। পাশ দিয়ে, সামনে দিয়ে হেঁটে চলায় তার চেহারাটা তো একবারও চোখে পড়েনি। পঁচাত্তুরে বুড়িও তো হতে পারে। হাত থেকে ক্রাচ পড়ে গেলে তুলে দিতে গিলে খ্যাঁক করে উঠবে। এ রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে আমার ঝুলিতে।

একবার বাসস্টপে অপেক্ষা করছি। বাস এল। আমি উঠতে যাচ্ছি। আমার সামনে এক নানির বয়সী ভদ্রমহিলা। হাতে বিরাট পেটমোটা বাজারের থলি নিয়ে বাসে উঠতে তার বেশ কষ্টই হচ্ছে। আমি ভদ্রতা করে হাত বাড়িয়েছি থলেটা বা তার হাতটা-যেটাই এগিয়ে দেবে, ধরব বলে। আমাকে হতভম্ব করে বুড়ি নানু চিল-চিৎকার দিয়ে উঠলেন। আমাকে প্রায় একরকম ধাক্কা মেরে এক ঝটকায় বাসে চেপে বসলেন। আমি ঘাবড়ে গিয়ে কেমন ক্যাবলা হয়ে থমকে গেলাম। বাসচালক মনে হয় এমন খিটখিটে জার্মান বুড়োবুড়ির দল আর আমার মতো নির্বোধ ভিনদেশি যুবক দেখে অভ্যস্ত। তিনি আমাকে সহাস্য ইশারায় যেন বলার চেষ্টা করলেন—‘হালকাভাবে নাও আর চুপটি করে বসো। এমনটি যেন আর করো না, নইলে কিন্তু কাম্মে দেবে, হাহাহা...।’ আসলেই, বলা যায় না, দিলেও দিতে পারে কামড়ে। আমি ভয়ে কাঁচুমাচু দিয়ে হাত গুটিয়ে সেই যে ঝিম ধরে জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলাম, আজ পর্যন্ত ভুলেও কারও দিকে হাত বাড়িয়ে দিইনি।

প্লাস্টারকুমারী, থুক্কু প্লাস্টারনানুর নীল টুপি আমাকে টক ঝাল স্মৃতিটা আবার মনে করিয়ে দিল। তাই পড়ে থাকা ইট বালু, যন্ত্রপাতিতে সরু হয়ে আসা ফুটপাথে আমি তার থেকে দুই হাত নিরাপদ দূরত্বে সন্তর্পণে হাঁটছি। রোদেলা আকাশে হঠাৎ কোত্থেকে এক টুকরো ছাইরঙা মেঘ এসে জুটেছে। আর আজব ব্যাপার হলো, এই মেঘ আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। কই যেন পড়েছিলাম, যদি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে। মেঘ ব্যাটা কী কপাল হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আসছে নাকি আজকে। কিন্তু আমি তো বঙ্গে নেই, আমি আছি জঙ্গে, মানে জার্মান মুলুকে। কিন্তু এই বঙ্গ প্রবাদে বিশ্বাসী মেঘটা থেকে আচমকা একটা বাংলা বৃষ্টি নামলে সমূহ বিপদ। এই পথে বাস-ট্রামের লাইন নেই। আর সঙ্গে ছাতাও নেই। কাকভেজা হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছাতে হবে। কেয়া মুশকিল! আনমনে হাত চলে গেল সাত দিনের না কাটা দাঁড়িতে আর কপাল বেয়ে নেমে আসা অবাধ্য চুলের ভিড়ে। মেঘ-বৃষ্টি, কাক-বক কী সব ভাবছি, এমন সময়ে কিছু একটা পতনের শব্দে চিন্তার ঘোর কেটে গেল। মুহূর্তে সামনে তাকিয়ে দেখি প্লাস্টার কন্যার ক্রাচ মাটিতে আছড়ে পড়েছে।


২.
ক্রাচের পতন অনুসরণ করে দেখলাম ক্রাচের মালিকও হেলে পড়ে যাচ্ছেন আলোর গতিতে। হাতের লাঠি ছাড়া তিনি একেবারে অসহায়। পুরো ছবিটা আমি যেন স্লো মোশনে ঘটে যেতে দেখছি। যেন কোনো কোরীয় সিনেমার রূপক দৃশ্য। ক্রাচ মাটিতে পড়ে শূন্যে ডিগবাজি খাচ্ছে। নীল টুপি মেয়েটা তাল হারিয়ে পড়ে যেতে যেতে আকাশে হাত বাড়িয়েছে অদৃশ্য খড়কুটো ধরবে বলে।

সব দেখেশুনে আমি কেমন হতবিহ্বল হয়ে গেলাম এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু মুহূর্তটা শেষ হওয়ার আগেই নিজের অজান্তেই অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ছয় ফুটি শরীরটা সামনে ছুড়ে একটা ইগল ছোঁ মেরে ধরে ফেললাম মেয়েটাকে। যেন জন্টি রোডস স্টাইলের দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে আটকে দিলাম ভয়ংকর এক বাউন্ডারি। স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু ফেলার সময় পেলাম না। কারণ আমি এবার তাকেসহ একসঙ্গে পড়ে যাচ্ছি। আজকের পপাৎ ধরণিতল ঠেকাবে কোন ভূতে।

কিন্তু ভূতকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ফুটপাথ ফুঁড়ে গজিয়ে উঠল প্রাচীন এক ল্যাম্পপোস্ট। যেটা একটু আগেও এখানে দেখিনি। নিজেকে মনে হলো রূপকথার জ্যাক নামের যুবক আর ল্যাম্পপোস্টটা তার সেই গগনবিদারী শিম গাছ। বিস্ময়ে বিমূঢ় আমি পড়ে যেতে যেতে এক হাত বাড়িয়ে মরিয়া হয়ে তা-ই আঁকড়ে ধরে ফেললাম। আরেক হাতে তখনো প্রায় ঝুলন্ত, প্রায় পড়ন্ত অচেনা বিদেশিনী। নাকি সে-ই এ দেশে দেশি আর আমিই বরং বিদেশি। এই বিপদের ভেতরও মাথায় এত আগড়ুম-বাগডুম ভেবে যাচ্ছে দেখে অবাক হলাম।

যা হোক, আমি নিজেকে সামলে নিয়ে আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম বটে, কিন্তু দেখলাম যে, ক্রাচের অভাবে তার দুই পায়ে ভর দেওয়া অসম্ভব। আমি সংকোচ ঝেড়ে বলে বসলাম—অসুবিধা নেই, আপনি আমার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ান।

জার্মান ভাষায় আবার বাংলার মতো আপনি, তুমি আছে। মেয়েটিও কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমাকে ধরে দাঁড়িয়েছে বটে কিন্তু আচমকাই আমার হাতঘড়িটায় তার নীল টুপিটা আটকে গিয়ে বেরিয়ে এল একরাশ সোনালি চুলের বন্যা। ভীষণ অপ্রস্তুত আমি আল পটকা টুপিটা ছুটিয়ে এনে কোনোমতে মেয়েটার হাতে গুঁজে দিয়ে এই প্রথম তার দিকে ভালো করে তাকালাম। সবুজ চোখের সঙ্গে পিঠ ঢেকে নেমে আসা সোনালি চুলের স্রোত মিলিয়ে তাকে মনে হচ্ছে যেন ভূমধ্যসাগর থেকে উঠে আসা এক জলকন্যা। আমি এই অতি সৌন্দর্যের কাছে আড়ষ্ট হয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলাম। আরেক দিকে তাকিয়ে বললাম—আপনি এই ল্যাম্পপোস্টটা ধরে একটু কষ্ট করে দাঁড়ান, আমি চট করে আপনার ক্রাচটা এনে দিচ্ছি।

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখি এক লোক হন্তদন্ত হয়ে ক্রাচ কুড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছেন। তার মাথার হলুদ হেলমেট আর গায়ের ফ্লোরোসেন্ট রঙের জ্যাকেট দেখে বুঝলাম, তিনি ফুটপাথ মেরামতের লোক হবেন। ক্রাচটা তিনি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্রাচের মালিকের কোথাও লেগেছে নাকি, সব ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি ঝটিকা কুশলাদির একটা ঝটিকা ঝাপটা মেরে এক দৌড়ে কোত্থেকে একটা ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে এলেন। চেয়ারের হতচ্ছাড়া চেহারাটা দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এতে বসলে হিতে বিপরীতের আশঙ্কাই প্রবল।

স্বর্ণকেশী ততক্ষণে নিজেকে পুরোপুরি গুছিয়ে নিয়েছে। আমার হাত থেকে ক্রাচ নিয়ে, চুলের রাশি আবার নীল টুপির শাসনে পুরে বেশ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃতজ্ঞতার একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে খুব নম্রভাবে লোকটাকে জানিয়ে দিলেন সে একদম ঠিক আছে, আর বসে বিশ্রাম নেবার দরকার নেই। লোকটাও ভদ্রতায় মাথা ঝাঁকিয়ে তার ফোল্ডিং সিংহাসনটা বগলদাবা করে বিদায় নিল।

আমিও তার পিছু পিছু সটকে পড়ব কিনা ইতস্তত করছি। এত ‘পথে হলো দেরি’ করে কী লাভ। বরং আমার এত সাধের ডাক্তারের টারমিনটা ছুটে যেতে পারে। তখন আরেক বিপদ। সটকে পড়ার জন্য পা বাড়াতে গিয়েছি আর স্বর্ণকেশী এবার ঝকঝকে একটা হাসি দিয়ে কিশোরীর সারল্য নিয়ে আমার দিকে তাকাল। সেই হাসির সুর কাচের চুড়ির রিনিঝিনির মতো কানে বেজে কেমন করে যেন আমার পালিয়ে যাওয়া থামিয়ে দিল। বাধ্য হয়ে ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম।

‘উফ, আপনি যে আজকে কোথা থেকে দেবদূতের মতো আসলেন। আমাকে ওভাবে সেকেন্ডের ভেতর খপ করে না ধরে ফেললে আজকে আমার ভাঙা পাটা আবার ভাঙত।’ বলেই স্বর্ণকেশী একটা অদৃশ্য দুর্ঘটনার কাল্পনিক দৃশ্য দেখে শিউরে উঠল। তারপর বললেন, ‘আমি কি ধন্যবাদ হিসেবে আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়াতে পারি, প্লিজ না বলবেন না?’ আমি সলজ্জ হাসিতে ধন্যবাদটা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আরে না, না এ তো এমন কিছু না। আর মাফ করবেন, আমার একটা টারমিন আছে, আজকে কফি খেতে পারছি না। আর, সাবধানে চলবেন, আমি চলি।’

আসলে আমি পালিয়ে বাঁচতে পারলে বাঁচি। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। আর তাড়া তো আছেই। পা বাড়িয়েছি যাব বলে, অমনি শার্টের হাতায় টান পড়ল। চমকে থেমে গেলাম। এই মেয়ে তো ভয়ানক!

‘আমারও টারমিন আছে, আমারটাও ডাক্তারেরই। তাহলে কি যে যার কাজ সারার পর কাছের একটা কফি শপে আসতে পারি না। এই তো রাস্তার ওপারেই একটা ক্যাফে আছে। আর আমি...।’ এই বলে তরুণী ক্রাচটা হাতবদলের বিরতি নিল। বুঝলাম সে তার নামটা বলতে যাচ্ছে। শূন্য আগ্রহ অনুভব করলাম। জার্মান এই তরুণীর নাম আবার কী হবে। হয় ক্যাথরিন, নয় আনা। আর ছেলে হলে হতো স্টেফান কিংবা মুলার। নামকরণের মতো একটা মামুলি ব্যাপারে এ দেশের মানুষের আগ্রহ বা সময় কোনোটাই নেই। এরা ফক্সওয়াগন, বিএমডব্লিউ বানিয়ে আর ফুটবল খেলেই কুল পায় না, তার ওপর আবার বাচ্চাকাচ্চাদের নতুন নতুন নাম খোঁজা তো একেবারেই বাহুল্য।

আমি অধৈর্য নিয়ে ক্রাচ কন্যার বৈচিত্র্যহীন নামটা শোনার অপেক্ষায় অনিচ্ছায় দাঁড়িয়ে আছি।
‘আমি লতা।’
আমি চমকে গেলাম।
পরক্ষণেই সে বলল, ‘লতা, শার্লতা।’
আমার চমক কমে গেল। খালি একটু অবাক হলাম আর কী। জার্মান উচ্চারণে খটমট শার্লট হয়ে যায় শার্লতা। আর তাও সংকুচিত হয়ে এসে থামে লতায়। এখানে সব শার্লতার ডাকনাম লতা। কী আশ্চর্য! আর কী কোমল। আমাকে ভাবনা থেকে বের করে নিল লতার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা। আমি হাত ঝাঁকানোটা এড়াতে এলোমেলো চুলে উদ্দেশ্যবিহীন হাত চালিয়ে বললাম, ‘আমি অনীক।’

৩.
লতা আমার এড়ানোটুকু খেয়াল করল ঠিকই, কিন্তু তাতে অপ্রস্তুত হলো না। বরং স্মিত হেসে অদ্ভুত পরিষ্কার উচ্চারণে আমার নামটা ধরে বলল, ‘অনীক, পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। আচ্ছা, ওই কথাই থাকল, ডাক্তারের টারমিন শেষে এক ঘণ্টা পর, মানে এগারোটায় আমি ক্যাফেটায় থাকব। চলে আসবেন কিন্তু।’ আমি নির্লিপ্ত উত্তর দিলাম, ‘দাঁতের ব্যাপার, কিছুই বলতে পারি না। ডাক্তার কতক্ষণ বসিয়ে রাখবেন, তার ওপর নির্ভর করবে আসতে পারব কিনা। না পারলে ধরে নেবেন, সেখানে আটকে গেছি।’

বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে লতা সায় দিয়ে কিছুটা ক্ষান্ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা, কোনো জোরাজুরি নেই। না আসতে পারলে ওই যে বললেন, ধরে নেব ডাক্তারের ষড়যন্ত্র।’ আর সেই সঙ্গে খিলখিল হাসি। ঠিক যেন পাহাড়ি ঝরনা। আরও একবার বেসামাল ভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই স্বর্ণকেশীর হাসিটুকু বিচিত্র কোনো কারণে বড্ড পরিচিত ঠেকতে লাগল। কোনোমতে একটুকরো ভাঙা হাসি দিয়ে বিড়বিড় করে বললাম, ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে, আসি তাহলে এখন।’ কী উত্তর এল, না শুনেই পা চালালাম বিক্ষিপ্তভাবে। আর বাতাসে এলোমেলো হাত চালিয়ে ভ্রান্তিটাকে তাড়িয়ে দিতে চাইলাম। আজকের দিনটা এমন গোলমেলে কেন?

ভ্রান্তির অতলান্তিক থেকে আমাকে বের করে আনল কফিশপটাই। চলতে চলতেই চোখে পড়ল, বেশ বড়সড় জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাফেটা। একটাই দোকান। তার এক দিকে কফির আয়োজন। আরেকদিকে তুর্কি ডোনার কাবাব রেস্তোরাঁ। ডোনার কাবাব মানে আমাদের দেশে হালের শর্মা আর কী। কয়েক বংশ ধরে জার্মানিতে ঘাঁটি গাড়া তুর্কিদের প্রতি জার্মানদের একটা সহজাত প্রচ্ছন্ন বিদ্বেষ কাজ করে। কিন্তু দুপুর কী সন্ধ্যায় জার্মান জাত্যভিমান বুক পকেট থেকে নামিয়ে রেখে সেই তুর্কিদেরই হাতে বানানো এক আধটা ডোনার কাবাব পেটে চালান না দিলে চলেই না এদের। এখন বাঙাল আমার মনটাও দ্রুতলয়ে ভেবে চলছে, একটা চিকেন ডোনার কাবাবযোগে দুপুরের খাবারটা সেরে ফেললে কেমন হয়?

এই-সেই ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত রাস্তার ওপার থেকে ভেসে আসা ম ম কাবাবের ঘ্রাণেরই জয় হলো। ঠিক করলাম, দাঁতের একটা গতি করেই ডাক্তারের হাত থেকে ছুটে সোজা কফিশপে চলে আসব। স্বর্ণকেশী না স্বর্ণলতা কী যেন নাম, তার দেখা পেলে ভালো, আর না পেলে কবজি ডুবিয়ে ডোনার কাবাব আর সঙ্গে ঠান্ডা এক বোতল কোক মেরে দিয়ে ঘাউক ঢেকুর তুলে বাসায় গিয়ে অলস ভাতঘুম দেওয়া যাবে। তবে তারই মাঝে কেন যেন মনে হলো নীল টুপি লতাকে কফি কাপ হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখলে মন্দ হতো না। জীবনে ঘাস-লতা-পাতা-সবুজের দরকার আছে। পরক্ষণেই নিজের ছেলেমানুষি চিন্তায় বিরক্ত হলাম। সহিস হয়ে মনের ঘোড়ার লাগাম টেনে ডানে বামে আর না তাকিয়ে সোজা আসল ঘোড়ার ডাক্তারের চেম্বারের পথে এগোতে থাকলাম।

গন্তব্যে পৌঁছানোমাত্রই অভ্যর্থনায় থাকা ফ্রাউ ক্যাথরিন আমার হাতে এক তাড়া কাগজ ধরিয়ে দিয়ে একটা প্রশস্ত হাসি হেসে কাজে ডুবে গেল। বলে রাখি, ফ্রাউ মানে ‘মিস’; সম্মানার্থে যেমন বলা হয়ে থাকে। আমি এক পলক কাগজগুলো দেখে ভুরু কুঁচকে বললাম, এগুলো তো গতবারই পূরণ করে গেলাম, আবার কেন? ফ্রাউ ক্যাথরিন সহাস্যে জানাল, ‘আরে বুঝলে না, জিডিপিআর, জিডিপিআর। তোমার আগের সব ডেটা আমরা মুছে দিয়েছি। কী আর করা, এখন আবার একটু কষ্ট কর।’ মনে পড়ে গেল, পুরো ইউরোপ জুড়ে জিডিপিআর মানে জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন ওরফে তথ্য প্রতিরক্ষা আইন নিয়ে তোলপাড় চলছে।

অগত্যা বাধ্য ছেলের মতো কলম চেয়ে নিয়ে বসে গেলাম ফরম পূরণ করতে। নামধাম, ঠিকানা, ডায়াবেটিস আছে কিনা জাতীয় মামুলি প্রশ্নের তালিকা। কিন্তু ধৈর্যের বিচ্যুতি ঘটল যখন এসে ঠেকলাম—আপনি কি অন্তঃসত্ত্বা? কোন মাস চলছে? এটি কি আপনার প্রথম সন্তান? এর আগের কয়টি সন্তান আছে, নিচে উল্লেখ করুন। সন্তান প্রসবকালীন জটিলতা থেকে থাকলে তাও উল্লেখ করুন, ইত্যাদি ইত্যাদি...।

ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং ক্রস চিহ্ন দিয়ে কোনোমতে কাগজগুলো ফ্রাউ ক্যাথরিনের হাতে ফেরত দিলাম আর মহিলা একটা চটুল হাসি দিয়ে ঘোষণা দিল, ক্রস দিয়েছ কেন? ক্রস মানে তো ‘হ্যাঁ’। এই বলে সে হা–হা করে পুরুষালি ভঙ্গিতে হেসে উঠল। বিব্রত আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়েছি ঘ্যাচাংগুলোকে শুধরে দেব বলে। ‘ওমা, তোমার গালে কি টোল পড়ে? কি দারুণ!’ ফ্রাউ ক্যাথরিনের কথায় অজান্তেই হাত চলে গেল গালে। সাত দিনের দাঁড়িও কী যথেষ্ট না হতচ্ছাড়া মেয়েলি টোলটাকে ঢেকে দিতে? কী লাভ হলো তাহলে এত কষ্ট করে ভাব নিয়ে দাঁড়ি না কামিয়ে থেকে? মাঝখান দিয়ে খালি গাল কুটকুট করছে। ধুর! বাঁচাল এই মহিলা লাগামহীন বলে চলছে, ‘এই তোমার দেশে সব ছেলেই কি তোমার মতো লম্বা, এমন তামাটে গায়ের রং? খাঁড়া নাক আর কালো চুলের সঙ্গে নিকষ কালো চোখ? ইশশ্।’ তার চোখে মুখে কপট আফসোসের ছাপ।

বিরক্তির মাত্রা আমার এখন সপ্তমে চড়েছে। মহিলা শুধু বাঙালির ছেলের রূপটাই দেখেছে, বিরূপ দেখেনি। হুংকার দিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘এ্যাই! একদম চোওওপপ! কিন্তু তার বদলে ভদ্রতার একটা নীরব হাসি দিয়ে ভুলগুলো শুধরে আবার এসে বসলাম প্লাস্টিকের কটকটে গোলাপি চেয়ারের সারিতে। কী রং রে বাবা। মনে হয় ডাক্তার বাবুর বউ পছন্দ করে কিনেছেন। তার ওপর চেয়ারগুলো ক্ষুদ্রাকৃতির। এই লিলিপুটের চেয়ারে কতক্ষণ গালিভারের মতো বসে থাকতে হবে ভাবছি আর তখনই কেমন করে যেন চোখ আটকে গেল দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে।

পাহাড়ি মেঠো পথ দিয়ে এক তরুণী হেঁটে যাচ্ছে। হাতের বাহারি ঝুড়ি উপচে পড়ছে রঙিন বুনো ফুলের ভিড়ে। অবাক হয়ে দেখলাম মেয়েটার মাথায় বাধা নীল রুমালটা অবিকল লতার টুপিটার মতো নীল। আরও ভড়কে গেলাম যখন খেয়াল করলাম ঝুড়ি হাতে ছবির মেয়েটা ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছে। কী দেখছি এসব? চোখ কচলে ভালো করে আবার তাকাব, কিন্তু চোখ খুলতেই হাত ঘড়িটায় দেখলাম কয়েক গাছি উলের সুতা আটকে আছে। নীল রঙের। ছাড়িয়ে আনলাম সযত্নে। আলতো করে দুই আঙুলের মাঝে ফেলে ছোট্ট একটা নরম নীল বল বানিয়ে ফেললাম। এর মাঝে আমার ডাক পড়ল। ‘হ্যান্ডসাম অনীক, এবার তোমার পালা।’ ফ্রাউ ক্যাথরিনের মিষ্টি গলা আমার মেজাজ আরেকবার তিরিক্ষি করে দিল। একদম পিত্তি জ্বলে গেল। উঠতে উঠতেই চটজলদি উলের বলটার জন্য একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজলাম। কী মনে করে মানিব্যাগটা খুলে কয়েন রাখার কোটরে সেটাকে রেখে দিলাম। কেন রাখলাম? জানি না। নেহাত ছেলেমানুষি হয় তো, ঠিক জানি না। উঠে দাঁড়িয়ে আরেকবার ছবিটার দিকে চোখ গেল। ক্রাচটা গেল কই? আশ্চর্য! ঝুড়ি হাতে মেয়েটার আরেক হাতে তো একটা ভেড়ার বাচ্চা! বেরসিক ভেড়াটা আবার ঝুড়ি থেকে ফুল টান দিয়ে মনের সুখে চিবোচ্ছে!

৪.
সামান্য কুঁজো ষাট ছুঁই ছুঁই মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া আপাত গম্ভীর ডাক্তার হেইস কিন্তু আসলে আমুদে এক ভদ্রলোক। সঙ্গে প্রকান্ড টাক। তাকে দেখলেই সত্যজিতের প্রফেসর শঙ্কুর কথা মনে পড়ে। দাঁত দেখেদুখে ডাক্তার হেইস আমার মাথার ওপর থেকে দুশ্চিন্তার মেঘ সরিয়ে জানালেন, ‘সামান্য একটু ভেঙেছে। এটা একটা মিহানিহাল ড্যামেজ, ব্যাপার না।’ আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, মিহানিহাল কী বস্তু আবার? হেইস সজোরে মাথা নেড়ে অতি কষ্টে উচ্চারণ করলেন, আরে মিহানিহাল বোঝ না, কী বল তুমি? মিখ-খা-নিখ-খাল! আমি বুঝলাম। তিনি আসলে বলার চেষ্টা করছেন ‘মেকানিক্যাল’। একে ইংরেজি কম জানা ঘোড়ার ডাক্তার, তার ওপর কথায় এক ধরনের আঞ্চলিক জার্মান টান আছে। কোন অঞ্চলের, সেটা জানা বা বোঝা এই অধমের জ্ঞানের বাইরে।

ডাক্তার হেইস বলেই চলছেন, ‘কী চিবোতে গিয়েছিলে, বলত?’ উত্তরে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, ‘কী আবার, তোমাদের পাথুরে রুটি আর কী?’ আমার অভিযোগ শুনে হেইস তার দাঁত দেখার যন্ত্রপাতিগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলে উঠলেন, ‘এই পাথুরে রুটি খেতে খেতে এক সময়ে এমন অভ্যস্ত হয়ে যাবে যে আর কিছু তখন মুখেই রুচবে না। জার্মান রুটির এমন গুন, বুঝলে।’ আমি এতক্ষণে কিছুটা অধৈর্য। তবুও মন দিয়ে হেইসের কথা শুনে যাচ্ছি কোনো একটা সমাধান শোনার আশায়। ডাক্তার বুড়োটা বলেই চলছেন, ‘যা হোক, এমন নাটকীয় কিছু হয়নি। দাঁতটা তোমার এভাবেই থাকুক না। নাকি দেব ঘষে সমান করে?’ বলেই টুথপেস্টে বিজ্ঞাপনের মতো চওড়া একগাল হাসি দিলেন ভদ্রলোক। সোনা দিয়ে বাঁধানো তার বাম পাশের ক্যানাইন দাঁতের সোনালি ঝিলিকে পলকের জন্য আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। তার ওপর দাঁত ঘষে সমান করে দেওয়ার প্রস্তাবে আঁতকে উঠলাম। ‘ঘষে সমান করে দেব’ শুনতেই কী মারাত্মক শোনাচ্ছে! সজোরে মাথা নেড়ে আপত্তি জানালাম, ‘না, না, ঘষতে হবে না। দাঁতের ওপর কিছুদিন জিভ বুলিয়ে দেখি যদি কোনো গতি হয়। আর কাজ না হলে তুমি তো আছই।’ হেইস ডাক্তার কিছুটা হতাশ হয়ে সেদিনের মতো কেস ডিসমিস করে আমাকে ছেড়ে দিলেন।

লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘড়ি ধরে ঠিক মিনিট বারোর মাথায় পৌঁছে গেলাম লতার দেখানো ক্যাফেটায়। ঢুকতেই ভাজা মাংসে স্বর্গীয় ঘ্রাণ নির্মম ঘাঁই মেরে গেল নাকে। সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ভাজার তেল ফোটা মুচমুচে শব্দ। সেই সকালে অতি তিতকুটে রং চা দিয়ে এক টুকরো জেলি-পাউরুটি গিলে বেরোনো হয়েছে। ভাবছি, লতার অপেক্ষায় বসে থাকব নাকি এই ফাঁকে চটজলদি পেটে কিছু চালান দিয়ে ফেলব। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হওয়ার আগেই মনস্থির করা দরকার। সব দেখেশুনে আমাকে অবাক করে দিয়ে ধু ধু মরুভূমি পেটটা এবার তামাম ক্যাফে কাঁপিয়ে প্রচণ্ড ‘গ্রাউল–গ্রাউল’ ডাক ছেড়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। এরপর আর কী দোটানায় থাকা যায়? সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো যে খাবই খাব।

বহু আকাঙ্ক্ষিত ডোনার কাবাব, বড় এক প্লেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কলিজা ঠান্ডা করা এক বোতল কোক অর্ডার দিয়ে তীর্থের কাকের তৃষ্ণা নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছি।

এ সময় হঠাৎ কানে একটা চিল চিৎকার ভেসে এল। কোণার টেবিলে মায়ের সঙ্গে বসা পুতুলের মতো শান্ত চেহারার বছর দেড়েকের বাচ্চাটা কেন যেন খুব ক্ষেপে গিয়ে তারস্বরে জগৎ সংসারের ওপর তার বীতশ্রদ্ধ জানান দিচ্ছে। সেই ক্ষ্যাপা গান শুনে উল্টো দিকের টেবিলে বসা বিরস বুড়োটা খিস্তিখেউড়ের বন্যা বইয়ে দিতে থাকলেন। তার গলাবাজি আর গালি বাজির সারমর্ম হলো, ফ্রাউ মার্কেল যে কোত্থেকে লাখ লাখ গেঁয়ো ভূত ধরে এনেছে। সামনে জার্মানির ভবিষ্যৎ অমাবস্যার মতো অন্ধকার। মার্কেলকে এর জন্য পস্তাতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওদিকে বাচ্চা সামলাতে ব্যস্ত আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা সিরিয়ান কিংবা আফগানি বাচ্চার মায়ের নির্বিকার মুখ দেখে বুঝলাম, বুড়োর এত সাধের জার্মান গালিগুলো একদম জলে গেছে। জার্মান ভাষাটা তার কাছে দুর্বোধ্য। খামাখা গালিগুলো তার বোরকায় লেগে বুমেরাং হয়ে ফিরে গেছে। বুড়োটার রুষ্ট আচরণে কষ্ট পেলাম। কারণ, লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার পেছনে এ দেশের নিজের তাগিদটাই বেশি। কারণ পানিশূন্যতার মতো জার্মানি এখন শিশু শূন্যতা আর অল্পবয়সী তরুণ-যুবকদের শূন্যতায় ভুগছে। বুড়োটাকে মিষ্টি মোলায়েম ভাষায় হালকার ওপর ঝাপসা একটু শাসিয়ে আসার জন্য পা বাড়ালাম। আর অমনি বাচ্চাটা মায়ের কোল থেকে একটা ঝপাৎ ঝাঁপ দিয়ে পকাৎ করে দৌড়ে পালানো শুরু করল। ক্যাফেটা রাস্তার একদম পাশে। বেরোলেই সাঁই সাঁই গাড়ি। আমি পড়িমরি করে এক ছুটে বাচ্চাটার হাত ধরে ফেললাম এবং সঙ্গে সঙ্গে ছেড়েও দিলাম। হাতে ভয়ংকর এক ক্যাঁক কামড় দিয়ে দিয়েছে বিচ্ছুটা। আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখছি এখন। ফুলের মাঝখানে আবার ছোট ছোট রঙিন পাখি গোল হয়ে পিকিপক স্বরে উড়ে বেড়াচ্ছে।

তবে স্বস্তির ব্যাপার, এর মাঝে বিচ্ছুটার মা দৌড়ে চলে এসেছে। আজকে এই পুঁচকে সিদ্ধার্থের আর গৃহত্যাগ করা হলো না তাহলে। কিন্তু বিস্ময়ে মুখ হা হওয়ার দশা হলো যখন ভদ্রমহিলা কোনোরকম জড়তা ছাড়া চোস্ত জার্মানে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাচ্চার ছটফটানির জন্য এক চোট দুঃখ প্রকাশ করে কাউন্টারে বিল চেয়ে টেবিলে ফিরে গেলেন। সেই সঙ্গে চিরকালের অধৈর্য আমাকে যেন ধৈর্যের একটা বড়ি গিলিয়ে দিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা।

ক্যাফের দরজার দিকে তাকালাম। লতা বা এ রকম কাউকে দেখা গেল না। ওদিকে আমার অতি সাধের ডোনার কাবাব তৈরি। ইশারায় আমাকে প্লেট নিয়ে যেতে ডাকা হলো। আমি হাতের কামড়ে দেওয়া লাল হয়ে যাওয়া জায়গাটা ডলতে ডলতে সামনে এগোলাম। ভালো কামড়ই দিয়েছে। পাঁচটা আর পাঁচটা, মোট দশটা দাঁত দিয়ে দুই দুইটা আধ খাওয়া চাঁদ এঁকে দিয়েছে এক চোটে।

চোট সামলানোর খুব বেশি সময় পেলাম না। পায়ের নিচের মাটি কেমন দুলে উঠল। ভূমিকম্প নাকি? নাকি একবারে কেয়ামত শুরু হয়ে গেল? একেবারেই অপ্রস্তুত আমি পা ওপরে দিয়ে চিৎপটাং হয়ে পড়ে যাচ্ছি। ক্যাফের ঝাড়বাতিটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আর পড়েই যখন যাচ্ছি, তখন আর ঝাড়বাতির সৌন্দর্য দেখে কী হবে। চোখ বন্ধ করে ফেলে মাটি আছড়ে পড়ার অপেক্ষায় নিজেকে সঁপে দিতে দিতে চরম অবিশ্বাস নিয়ে দেখলাম সেই দেড় ফুটি দাঁতাল বিচ্ছু কোমরে হাত দিয়ে দস্যু বনহুরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মুখে দিগ্বিজয়ী হাসি। তাহলে যত দোষ এই খুদে নন্দ ঘোষের! আমার হাঁটু বরাবর তারই এক মোক্ষম ফ্রি কিকে এখন আমি ঘায়েল টালমাটাল হয়ে ফুটবলের মতো উড়ে পড়ে যাচ্ছি।

কিন্তু না। কী যে হলো বুঝলাম না। কে যেন খুব শক্ত হাতে খপ করে ধরে ফেলল। একেবারে মেঝেতে মাথা ঠুকে যাওয়ার আগ মুহূর্তে। বিস্ময়ে মূক আমি আস্তে আস্তে পিটপিট করে চোখ খুলে দেখি, একি! মাথার ওপর নীল আকাশ। আর সূর্যের তীব্র সোনালি ঝিলিক। আমি কই? পরাবাস্তব জগৎটা ঠুস করে মিলিয়ে গেল কানে আসতেই, ‘ভয় নেই, ধরে ফেলেছি।’ এবার ভালো করে চোখ মেলে দেখি, নীল আকাশ কই, এ তো নীল টুপি। আর সূর্যের ঝিলিকই বা কই, এ তো সোনালি চুলের ঝাঁপি। চোখ পর্যন্ত এসে হানা দিয়ে অন্ধ করে দিচ্ছিল।

ঘোরটা কাটার সুযোগ না দিয়েই লতা আমাকে এক হাতে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। আরেক হাত তখনো ক্রাচে ভর দেওয়া। সে যে কখন, কোত্থেকে, কীভাবে ছুটে এল, কিছুই ভেবে পেলাম না। কিন্তু ঝাড়া ছয় ফুটের আশি কিলোর কাউকে হাতে ক্রাচ আর পায়ে প্লাস্টার নিয়েও যে অনায়াসে ধরে তুলে ফেলতে পারে, সে যেমন তেমন মেয়ে না। নাম লতা হলেও এই মেয়ে অন্য ধাতুতে গড়া। ঠোঁটের কোনো নরম আলতো একটা হাসি নিয়ে লতা এবার বলল, ‘কেমন দারুণ ধরে ফেললাম, বলেন তো?’ আমার ভূত দেখা ভয় পাওয়া চেহারা তখনো স্বাভাবিক হয়ে আসেনি। উত্তর না দিয়ে আমি তীব্র দৃষ্টিতে লতার গহিন সবুজ চোখের দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছি।

৫.
দিনে দুপুরে বেশিক্ষণ চন্দ্রাহত হয়ে থাকা গেল না। পলক না ফেলে মাছের মতো তাকিয়ে আছি দেখে লতা চোখের সামনে দুই আঙুলে বার কয়েক তুড়ি মেরে বলল, ‘এই যে, কি হলো আবার, ভিমড়ি খেয়ে গেলেন নাকি?’ বিহ্বল আমি একবার ঢোঁক গিলে ধন্যবাদ বা ওরকম কিছু একটা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে বেরোল, ‘উফ্, আউউ...!’ আশ্চর্য! লতা একটা রাম চিমটি মেরে দিয়েছে। বলা কওয়া ছাড়াই। ঠিক একটু আগে কামড় খাওয়া জায়গাটায়। ব্যথায় রীতিমতো ঝাপসা দেখছি। মানে কী? চিমটি দেওয়ার কী হলো! এদিকে লতা চোখে–মুখে দুষ্টামি মেখে আরেকবার চিমটি দেওয়ার জন্য আঙুল বাঁকিয়ে আবার আসছে। আর আমার মেজাজে কুলাল না। খপ করে লতার হাত শক্ত করে চেপে ধরে চাপা গর্জনের সঙ্গে বললাম, ‘কী হচ্ছে এসব!’ আরও একটা প্রচণ্ড ঝাড়ি দেব, কিন্তু ‘ইশ্, লাগছে, ছাড়ো!’ আমাকে থামিয়ে দিল। ঘাবড়ে গিয়ে হাত ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। দেখি লতার মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। আর তার থেকেও স্পষ্ট তার হাতে আমার পাঁচ আঙুলের ছাপ। লাল হয়ে জেগে উঠেছে।

লতা ধপ করে কাছের চেয়ারটায় বসে পড়ল কলের পুতুলের মতো। খালি পার্থক্য, এই পুতুলের মুখটা ফ্যাকাশে, ব্যথায় কোঁকড়ানো। মনে হয় একটু বেশি জোরেই চাপ দিয়ে ফেলেছি। হাতটা আস্তে আস্তে ডলছে মেয়েটা। খুব আড়ষ্ট হয়ে ইতস্তত করছি দুঃখিত বা ওরকম কিছু বলব বলে। কিন্তু কিছুতেই মুখে আসছে না। ওসব দুঃখিত–ফুখিত আমার ধাতে পোষায় না। নাহ! ধুর, কাজটা ঠিক হয়নি। কই সে পরির মতো আকাশ থেকে নেমে এসে আমার মাথাটা ফেটে চৌচির হওয়া থেকে বাঁচাল আর আমি সামান্য কৌতুকে ক্ষেপে গিয়ে তাকেই মেরে বসলাম? তাহলে দেড় ফুটি বিচ্ছুটার সঙ্গে আমার আর কী তফাৎ থাকল? একরাশ লজ্জা আর সংকোচ এসে ঘিরে ধরল। কী করি, কী করি।

কী মনে করে টঠস্ত হয়ে কাউন্টারে রাখা ঠান্ডা কোকের বোতলটা ছোঁ মেরে এনে লতার হাতটা টান মেরে তাতে বোতলটা চেপে ধরলাম। কিন্তু রক্ষা হলো না। আচ্ছন্ন লতা চমকে কেঁপে উঠল। ফলাফল ধাক্কা লেগে বোতল উল্টে গেল। সেই উল্টে যাওয়া বোতল বিপজ্জনক ভঙ্গিতে বার দুই শূন্যে ডিগবাজি দিয়ে ওয়েস্টার্ন সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যের মতো বুলেট হয়ে ঠুশ করে কপালের ঠিক মাঝ বরাবর বাড়ি খেয়ে আমাকে আবার সর্ষেফুলের খেতে পাঠিয়ে দিল। তারপর নব্বই ডিগ্রি ঘুরে উড়ে গিয়ে কোণার টেবিলের সেই বদরাগী বুড়োটার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে পুরোনো ডিসি ১০ মডেলের বাংলাদেশ বিমান হয়ে অনেক দূর সশব্দে ছেঁচড়ে থামল অবশেষে। ততক্ষণে আমি চোখে পুরোপুরি কবরের অন্ধকার দেখছি। তার উপর কোক পড়ে চুল হয়েছে কাকভেজা আর ভিজে চুপচুপে শার্টের অবস্থাও বারোটা। জ্ঞান আছে না গেছে বুঝতে পারছি না। শুধু জানি এখন আমার উচিত লতা নামের এই আজব মেয়েটার হাত নয় বরং গলা চেপে তীব্র একটা ঝাঁকুনি দেওয়া।

কিন্তু বেশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনে হলো কেউ যেন ধাক্কা দিয়ে কুয়ার ভেতর ফেলে দিয়েছে আর আমি হুটোপুটি খেয়ে শূন্যে পড়ে যাচ্ছি। এর মাঝেই কেউ যেন গায়ের সব শক্তি দিয়ে গালে প্রচণ্ড শব্দে একটা রাম চড় মেরে বসল। মাথা ঝাঁকি দিয়ে অতি কষ্টে চোখ খুলে ঝাপসা দেখতে পেলাম নাক বরাবর লতার মুখ। সারা মুখে বিচিত্র স্বস্তির হাসি। ‘চড়টা কাজে দিয়েছে তাহলে। টলে পড়ে যাচ্ছিলে। কেমন বুদ্ধি করে চড় মারলাম দেখলে? দেখো এখন কেমন দিব্যি জ্ঞান টনটন করছে।’ জ্ঞান টনটন করছে কিনা বলতে পারি না, কিন্তু একটা মেয়ের কাছ থেকে রেস্তোরাঁশুদ্ধ লোকের সামনে এমন বিরাশি শিক্কার চড় খেয়ে মান ইজ্জত যে পুরোপুরি গন কেস, সেটা নিশ্চিত। আর মাথাটাও দেদারসে ভনভন করছে। আচ্ছা, লতা কী আমাকে ‘তুমি’ করে বলল এখন? খেয়াল করেনি বোধ হয়। যা হোক, কী মনে হতে এত কাছে পেয়েও গলাটা টিপে দেওয়ার চিন্তা ঝেড়ে ফেললাম।

লতা এই ফাঁকে ক্যাফের মালিকের কাছ থেকে চেয়ে একটা আইস ব্যাগ এনে কপালে চেপে ধরেছে। ক্লাসের অবাধ্য দুষ্ট ছেলের মতো মাথা সরিয়ে আনলাম। গাঁক-গাঁক করে বললাম, ‘লাগবে না, প্লিজ ছাড়ুন।’ বেশি রুক্ষ শোনাল কিনা ভেবে নিজেকে অবাক করে দিয়ে যোগ করলাম, ‘ধন্যবাদ। তবে চড়ের জন্য না। তখন ছুটে এসে ধরলেন যে, সে জন্যে।’ সঙ্গে জোড়াতালি দেওয়া একটা কৃত্রিম হাসি। ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়া শার্টের ভেতর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আঠালো চুলের ভেতর একটা অনিচ্ছার হাত চালিয়ে বললাম, ‘মাফ করবেন, হাতমুখ না ধুলেই নয়। একটু ওয়াশ রুম থেকে আসছি। আপনার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। অর্ডার দিন, আমি আসছি।’

পরের দৃশ্যটা এরকম কপাল ফুলে বুড়ো গন্ডারের ভোঁতা শিঙের মতো উঁচু হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমার তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। লতার এনে দেওয়া আইস ব্যাগটা অবহেলায় টেবিলে পড়ে আছে। আর আমি বড় বড় কামড়ে বিশাল এক প্লেট ডোনার কাবাব হাপিশ করে দিচ্ছি। মাঝে মাঝে ঠান্ডা কোকে সশব্দে সুড়ুৎ সুড়ুৎ সুখটান। ইচ্ছে করে করছি। উদ্দেশ্য, সামনে এক বাটি ঘাস পাতা নাকি সালাদ নিয়ে বসা লতা নামের এই স্বল্প পরিচিতাকে বিরক্ত করা। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। এই মেয়ে অল্প অল্প করে সালাদ মুখে পুড়ে বিচিত্র এক শান্তি মুখে ফুটিয়ে জাবর কাটছে। তার খাওয়ার ধরন দেখে স্কুলের কৃষিবিজ্ঞান বইয়ে পড়া দেশি জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গলের নেপিয়ার ঘাস চিবানোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। লতার মুখে কথা নেই, পরিচিত হওয়ার তাড়া নেই। খাওয়াটাই যেন জীবনের অন্তর্নিহিত মোক্ষ। আমিও আছি, কিছু জিজ্ঞেস না করলে আমিও মুখ সেলাই করে থাকব। খেয়ে দেয়ে বিল মিটিয়ে এই মেয়েকে ‘শ্যোনেন টাগ’, মানে ‘শুভ দিন’ বলে বাসার দিকে হাঁটা দেব। তারপর এ্যাইসা ঘুম দেব যে একদম কাল সকাল দশটা বাজিয়ে উঠব। ধুত্তোরি, সকাল থেকে কী সব লতাপাতায় জড়িয়ে পড়লাম! এগুলোতে আমার অ্যালার্জি হয়। হাত–পা চুলকায়।

‘পা‘টা যে কী বেকায়দায় ভাঙল জানো না তো। শুনলে গড়াগড়ি দিয়ে হাসবে।’ জাবর কাটা শেষে বাটিটা এক পাশে সরিয়ে রেখে বলল লতা। কাহিনি শুনে গড়াগড়ি দিয়ে হাসার লোক আমি না। কিন্তু সত্যি বলতে কী, জানতে ইচ্ছা হচ্ছে ঘটনাটা। যদিও উত্তরে আমি নির্বিকার একটা ‘হুম’ বলে দায় সারার ভান করলাম। লতা আমার হুমটাকে কৌতূহল ধরে নিয়ে বলতে লাগল, ‘মাসখানিক আগে ছুটিতে সুইজারল্যান্ডে গেলাম বোল্ডারিং করতে।’

আমি এবার কাবাব চিবানোতে আলাব্বু দিয়ে নড়েচড়ে বসলাম। বোল্ডারিং মানে কী, ওই যে হুক-দড়ি কোনো কিছু ছাড়া খালি হাতে পাহাড় বাওয়া, ওইটা না? এই মেয়ে কী পাহাড় বাইতে গিয়ে পা ভেঙেছে? বাপস্, এতো মারাত্মক এক পরদেশি জেনানার সামনে বসে আছি। অথচ ছোটখাটো গড়নের এই হালকা-পাতলা মেয়ে দেখে মনে হয় জোরে একটা ফুঁ দিলে শিমুল তুলার মতো উড়ে যাবে। তার স্ফটিক পেলব ত্বক আর এক মাথা সোনালি চুলের বন্যার সঙ্গে আর যাই হোক খালি হাতে পাহাড় বেয়ে ওঠাটা ঠিক যায় না। কিন্তু কী বলা উচিত ভেবে পেলাম না। তার বদলে গল্প শোনার আশায় ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলাম ক্যাবলাকান্তের মতো।

আমাকে হতাশ করে লতা কথা থামিয়ে উঠে গিয়ে একটা কফি নিয়ে এসে ধোঁয়া ওঠা চুমুক দিতে লাগল। আশার কথা, তারপর আবার শুরু হলো কথার ফুলঝুড়ি। ‘আমরা সুইস আল্পসের ম্যাজিক উড জায়গাটা বেছে নিলাম বোল্ডারিংয়ের জন্য। একদম বোল্ডারিং স্বর্গ বলতে পারো। কোন পাহাড়ের কোন খাঁজ বেয়ে বেয়ে উঠতে হবে, সব ম্যাপ করা আছে। এমনকি একটা বইও আছে জায়গাটার ওপর। আমরা নয়জনের দল নিয়ে হুল্লোড় করে এক সকালে শুরু করলাম। আস্তে আস্তে মাকড়সা গতিতে বেয়ে বেয়ে দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম চূড়ায়।’ এই খানে লতা তার স্মার্টফোনটা বের করে গোটা কয়েক ছবি দেখাল আঙুলের ডগায়। ভয়ংকর খাঁড়া একটা চূড়ার একদম কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেলফি স্টিকে তোলা ছবিতে লতা আর তার দল বিজয়ের ভি চিহ্ন দেখাচ্ছে। আমার ভাত খাওয়া বাঙালি কলিজাটা একদম শুকিয়ে গেল আতঙ্কে। মনে পড়ে গেল দেশে বুয়েট থেকে একবার কুমিল্লা যাওয়া হয়েছিল। পাহাড় বাওয়া বলতে ওই লালমাই-ই শুরু আর শেষ। সেই তুলনায় এই মেয়ের আল্পসের কোনো এক মাঝারি সাইজের পাহাড় চড়া আমার কাছে কিলিমাঞ্জারো বিজয়ের মতো শোনাল। তাও আবার খালি হাতে। এখন বুঝতে পারছি একটু আগে চিতার ক্ষিপ্রতায় ছুটে এসে আমাকে ক্যাচ ধরে ফেলার তালিমটা সে কোথা থেকে পেয়েছে। বাবা রে, কী মেয়ে রে। একে বেশি ঘাঁটানো যাবে না। বললাম নিজেকে। কিন্তু তাক লেগে নিজের অজান্তেই। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘তারপর?’ যেন ঠাকুর মার ঝুলি শুনছি।

ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে লতা হাত উল্টে বলল, ‘কিন্তু নামতে গিয়েই ঝামেলাটা বাঁধল, বুঝলে। জিরিয়ে টিরিয়ে বিকেল নাগাদ নেমে আসা শুরু করলাম। আমি কীভাবে যেন একটু পিছিয়ে পড়লাম। প্রায় নেমে এসেছি। এমন সময়ে, বাকিদের ধরতে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে হড়কে গেল পা।’ আমি শিউরে উঠে লতার গড়িয়ে পড়াটা যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেলাম। ‘তারপর কী হলো?’ লতা একটা রহস্যময়ী হাসি দিয়ে বলে চলল, ‘তারপর আর কী, তোমাদের বলিউডি নায়িকার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে খাদের মতো একটা জায়গায় এসে থামলাম। খালি আফসোস যে, কোনো ধিতাং ধিতাং গান বাজছিল না সেখানে। আর খাদের ভেতর তোমার মতো কোনো নায়কও ছিল না যে কিনা ডিসকো ড্যান্স থামিয়ে আমাকে উদ্ধার করতে আসবে, হি–হি–হি। এল কে, হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্স আর মাঝবয়সী টাক পরা এক প্যারামেডিক। ধুর, কিছু হলো, বলো?’

লতার কাহিনি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। কিন্তু এখানে আমি লতার পকপকানি থামিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। জানালাম যে, আমি ভারতীয় নই আর ডিসকো নাচও জানি না। লতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তাহলে তুমি কোন দেশি? তাই তো বলি, তুমি,...তুমি একটু অন্যরকম।’ বলেই আমার চুল-নাক-মুখ-গালের টোলের ওপর হরিণী চোখ বুলিয়ে একটা প্রচ্ছন্ন প্রশংসার হাসি হাসল। আমার জায়গায় মাসুদ রানা থাকলে খুব ভাব নিয়ে এতক্ষণে মেয়ে-পটান্তিমূলক কোনো পিক আপ লাইন ঝেড়ে দিত। কিন্তু আমি মাসুদ রানা নই, বরং টাঙ্গাইল্যা অনীক আহমেদ। আর লতাও কোনো সোহানা নয়, বরং জার্মান শার্লট। সুতরাং, সেই লাইনে না গিয়ে লতার ক্ষণিকের লাজুক হাসিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে গলা খাঁকারি দিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম, ‘আমি বাংলাদেশি’। এবার উল্টো আমাকে হতবাক করে লতা বলে বসল, ‘কি! তাই নাকি? আমি তো গত বছর কক্সবাজার গিয়েছিলাম। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার-এর হয়ে।’ শুনে আমার চোখ ছানাবড়া অবস্থা।

ছানাবড়া চোখ ঠেলে আবার কোটরে পাঠিয়ে বললাম, ‘সত্যিই?’ লতার উত্তর, ‘হ্যাঁ, গত বছর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই একটা টিমের সঙ্গে তোমার দেশে গেলাম। পাক্কা দুই সপ্তাহ ছিলাম। পুরো অন্য ধরনের একটা অভিজ্ঞতা। আমরা এত সামর্থ্য থাকার পরও কয়টা আর লোককে আশ্রয় দিচ্ছি জার্মানিতে, তোমরা তো সেই তুলনায় ভীষণ উদার। অনীক, তুমি একটা ভালো দেশের মানুষ।’ আমি লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকালাম। খালি হাতে পাহাড় বাওয়া এই মেয়ের পক্ষেই সম্ভব কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই সপ্তাহ কাটানো। লতাকে যতই জানছি, ততই একটা ঘোরের ভেতর পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু এই ঘোরটা আমার ভালো লাগছে।

৬.
এই নীল টুপি ক্রাচ কন্যা নির্জলা গুল মারছে কিনা কে জানে। আমি যেরকম গবেট ধরনের, তাতে যে কেউ ঢালাওভাবে গুল মেরে পার পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু গুল হোক আর নাই হোক, খুব জানতে ইচ্ছা করছে, লতা টুকটাক কোনো বাংলা শিখে এসেছে কিনা। চোখের তারায় কৌতূহলের ঝিলিক দেখে লতা ভুল-ভাল উচ্চারণে যে বাক্যটা বলল, তাতে আমার পিলে চমকে গেল। পিলে কেন, পিলেদের বাপ-দাদারা থাকলে তারাও চমকাতেন। কই আমি ভাবছি সে ‘অ্যাই মামা, জিগাতলা যাবা?’ ধরনের কিছু একটা বলবে, তা না বলে লতা খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল, ‘হাফ কেজি করাল্লাহ্ ডাও। টিটাহ্ ডেখে।’ এর চেয়ে যদি বলত, ‘নোয়াখালী বিভাগ চাই’ তাহলেও এত ভড়কে যেতাম না। লতার টিটাহ্ করাল্লাহ্ আমাকে নিমেষে ঘায়েল করে ফেলল। হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ার দশা। লতা সামান্য আহত হয়ে তাকাল। তাতে হাসি চওড়া হয়ে এ কান-ও কান হয়ে গেল। কোক পড়ে তখনো আধভেজা শার্টের বুকপকেট চেপে হাসতে থাকলাম।

খুব এক দফা হেসে যখন ভালো করে চোখ মেললাম, দেখি লতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো কী যেন দেখছে। তার চাহনির হদিস করতে গিয়ে দেখলাম, দৃষ্টিটা আমার দিকেই। অস্বস্তিতে পড়লাম। এই মেয়ে তো বাঙালি মেয়ের মতো চোখে চোখ পড়তেই পলক সরিয়ে ফেলছে না। বরং তাকিয়েই আছে। ভালো জ্বালা তো! একে কী ফ্রাউ ক্যাথরিনের রোগে ধরল নাকি? খুক করে কেশে লতার ধ্যান ভাঙানো চেষ্টায় বললাম, ‘এত কিছু রেখে করল্লার পিছে লাগলে কেন?’ বলেই বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি। আপনি থেকে অনুমতিবিহীন তুমিতে চলে গিয়েছি। কিন্তু মনে হলো, ধ্যাত, গুল্লি মারি এই আপনি-তুমির ফাউ শিষ্টাচারে। বলেছি, বেশ করেছি।

লতার উত্তরে করল্লার বিহাইন্ড দ্য সিন জানা গেল। তাদের ডাক্তারি দলটা ভোর সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আন্ডা-বাচ্চা, ছাও-পাওদের টিকা দেওয়ার কাজ করেছে। আর ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিন সে ক্যাম্প লাগোয়া কাঁচাবাজারে গিয়েছে। তারপর রেস্ট হাউসে ফিরে সেখানের কিচেনে সবজি-টবজি সেদ্ধ কী হালকা তেলে ভেজে খেয়েছে। এই জার্মানগুলো পারেও বটে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, কারও আশায় বসে না থেকে এরা নিজেদের মতো সব গুছিয়ে নিতে জানে। আরও জানা গেল, করল্লা ছাড়াও এই পাগল মেয়ে প্রচুর পরিমাণে পটল, ঢ্যাঁড়স, কাঁকরোল ইত্যাদি সাবাড় করে দিয়ে এসেছে। যা যা সে এই খটমট জার্মান দেশে কোনো দিন দেখেনি, তার সবটার স্বাদই সে আমাদের বঙ্গদেশে গিয়ে নিয়ে এসেছে।

ওদিকে লতা হাত নাচিয়ে মহানন্দে বলেই চলছে, ফিরে আসার আগের দুই দিন সে ঢাকায় এক ডাক্তার বন্ধুর হোন্ডার পেছনে বসে খুব ঘোরা ঘুরেছে। পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা সব তার মুখস্থ। আমি আর বিস্ময় লুকিয়ে রাখার জায়গা পেলাম না যখন লতা জ্বলজ্বলে চোখে বলল, তার বাংলাদেশ ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ঠাটারিবাজারে স্টারের কাচ্চি বিরিয়ানি। সেটা এক চামচ করে খেয়েছে আর কেঁদেছে। তারপর ঠান্ডা পানি গিলে পরের চামচটা মুখে নিয়েছে। যদিও ঝালের জ্বালায় সে পাঁচ-ছয় চামচের বেশি এগোতে পারেনি, কিন্তু তার কাছে নাকি মনে হয়েছে কাচ্চি একটা বেহেশতি খাবার। আমি লতার তারিফ শুনে বলেই ফেললাম, ‘অবশ্যই বেহেশতি খাবার। প্লেটের পর প্লেট কাচ্চি নামিয়ে কোলেস্টেরলের পারদ উঁচিয়ে পটল তুলে ফেললে তো আসলেই বেশ শর্টকাটে বেহেশতে পগার পার হওয়া যায়। তখন আঙুল হেলালেই সুন্দরী হুর পরি কিংবা সুদর্শন গেলেমান থালা কে থালা মৌ মৌ কাচ্চি নিয়ে হাজির হবে। তখন মজার ওপর মজা।’ অবশ্য, এখানে লতাকে হুর পরি আর গেলেমান সম্পর্কে একটা আবছা ধারণা দিতে হলো। শুনে–টুনে লতা রীতিমতো ক্যাফে কাঁপিয়ে হাসল। সত্যি বলতে, এর আগে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কারও সঙ্গে এমন সহজভাবে কথা বলে আরাম পাইনি।

কফি ধোঁয়ায় বেশ কাটছিল সময়টা। উদ্ভূত লতা আর তার যত অদ্ভুতুড়ে গল্প। ওয়েটার ব্যাটার বিল নেবার তাড়ায় আমরা নড়ে চড়ে বসলাম। যে যার বিল মিটিয়ে দিলাম কোনো রকম দ্বিরুক্তি ছাড়াই। কারণ, জানি বাধা দিয়ে লাভ নেই। জার্মান এই কুলটুর (কালচার আর কী) আমার ভালোই লাগে। হিজ হিজ হুজ হুজ। যার যার তার তার। নিজেরটা দিয়ে থুয়ে কিছু মিছু থাকে। পকেট একেবারে গড়ের মাঠ হয়ে যায় না।

বাইরে আগস্টের তুমুল দুপুর। বাড়িঘর-দোকানপাটের জানালায় ছোট ছোট টেবিল ফ্যান ঘুরছে। সূর্য নেমে এসেছে ঘাড়ের ওপর। বেগতিক দেখে লতার নীল টুপি হাতব্যাগে গা ঢাকা দিয়েছে। সুযোগ পেয়ে শাসন ছেড়ে নেমে আসা সোনালি চুলে অন্যমনস্ক লতাকে মনে হচ্ছে যেন বহুদূরের কোনো ভিনগ্রহের অচিন মানবী। চাইলেও যাকে চেনা দায়। এক মুহূর্তের জন্য মুখ থেকে কথা হারিয়ে গেল আমার।

শূন্যে হাতড়ে কোনোমতে গোটা কয়েক কথা খুঁজে পেলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘এবার যে বাড়ির পথ ধরতে হবে। ভালো লাগল কথা বলে। সাবধানে চললে ভালো হয়। এদিকে তো বাস-ট্রাম কিছু নেই। যেতে অসুবিধা হবে না তো?’ কথাগুলো অনেক চেষ্টা করে আপনি-তুমি এড়িয়ে বললাম। লতা হাত দিয়ে সামনের দিকে ইশারা করে জানাল, তার বাসা খুব কাছেই। মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। আমার কাছেপিঠে কোথাও থাকা হয় কিনা। খেয়াল করলাম, তার কথাতেও আপনি-তুমি ঊহ্য।

রাস্তার ওপাশের গির্জাটার পাশের বাড়ির তিন তালায় আমার রাজত্ব। সঙ্গে এক চীনা আর রাশিয়ান শরিকও আছে। শুনে লতা প্রস্তাব দিল, এত কাছেই যখন থাকা হয়, তখন সপ্তাহ দুই পরের শনিবার বিকেলে যাব নাকি তার সঙ্গে নদীর পাড়ে হাঁটতে। তত দিনে নাকি তার প্লাস্টার, মেডিকেল বুট ইত্যাদি থাকবে না। কিন্তু রুটিনমাফিক মিনিট চল্লিশেক হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করতে হবে। ভাবলাম, সামনের মাসের চাকরিটা শুরু হওয়ার আগে এ মাসের বিকেলগুলো এমনিতেও অলস বসে কাটত। তা ছাড়া, হুল্লোড়প্রিয় চাইনিজ আর রাশিয়ান রুমমেটদের সঙ্গে আমার মুখচোরা স্বভাবের কারণে ‘কী খবর, কেমন আছ’-এর” বাইরে তেমন একটা উঠ-বস নেই। অন্য বন্ধু-বান্ধব হয় পড়াশোনা, নয় চাকরির ধান্দায় ব্যস্ত। খালি আমিই আপাতত অবসর। তা ছাড়া পুরো মিউনিখের ভেতর এই ইজার নদীর পাড়টা আমার প্রিয় একটা জায়গা।

ঠিক হলো এই শনিবারের পরের শনিবার বিকেল পাঁচটায় নদীর দক্ষিণ পাড়ের সেতুটার কাছে দাঁড়িয়ে থাকব। লতা ঠিক ঘড়ি ধরে পৌঁছে যাবে। মুঠোফোন নম্বর চালাচালির এই অস্থির যুগে মুখের কথার এই বন্দোবস্তটা আমার মনে ধরল। এর ভেতর একটা অনিশ্চয়তা আছে। আর জগৎটাই তো হাইজেনবার্গ সাহেবের অনিশ্চয়তার সূত্র দিয়ে ঘেরা। বেগ ঠিক থাকে তো অবস্থান ঠিক থাকে না। কিংবা উল্টোটা। দেখে যাক, শনিবারে নদীর পাড়ে লতার অবস্থান কেমন থাকে। হাত নেড়ে হেসে বিদায় নিয়ে পা বাড়ালাম বাড়ির পথে।

৭.
পা বাড়ালাম বটে, কিন্তু পা বড্ড ভারী ঠেকল। এগোতে চাইল না যেন। ভাবলাম, একবার পেছন ফিরে দেখি লতা ঠিকমতো রাস্তা পেরোতে পারল কিনা। কিন্তু সেতো ভাঙে, তবু মচকায় না গোছের মেয়ে। অন্তত এতক্ষণের পরিচয় থেকে যেটুকু বুঝেছি। ক্রাচ নিয়ে রাস্তা পার হওয়া লতার কাছে হাতের তুড়ি। ঠাস করে আমাকে চড় মারার আগে যেমন তুড়ি বাজিয়েছিল, তেমন তুড়ি। মনে হতেই হাত চলে গেল গালে। কী শক্তি দিয়ে মেরেছিল বাপস। এখনো যেন জ্বলছে। কিন্তু, আশ্চর্য, অপমানে না, অন্য কিছুতে। ধরতে পারছি না। ধরতে পেরে কাজ নেই। নিজেকে কষে বকা দিলাম—‘হুরর অনীক মিয়া, বেশি ন্যাকামি হচ্ছে। পুতুপুতু আউট। শিনা টান ইন। আগে বাড়ো, জওয়ান। লিঙ্কস-রেখস্ট, লিঙ্কস-রেখস্ট, লেফট-রাইট, লেফট-রাইট।’

পা চালাতে চালাতে মনে মনে সকালে কাজের যে একটা ফর্দটা করেছিলাম, সেটাকে ডাকলাম। ডাকামাত্র আলাদিনের চেরাগ ফুঁড়ে দৈত্যের মতো ইয়া লম্বা চওড়া এক লিস্টি বেড়িয়ে এল। বেয়াড়া রকম বেড়ে যাওয়া চুল কেটে কদম ছাঁট করা, সাত দিনের দাঁড়ি কামিয়ে তিন দিনের দাঁড়িতে নামিয়ে আনা, গোটা তিনেক ফরমাল শার্ট কেনা, সঙ্গে কয়েকটা স্যান্ডো গেঞ্জিও, বাংলাদেশি দোকানে গিয়ে কাজলি মাছের জন্য হানা দেওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি মামুলি কাজের সুদীর্ঘ তালিকা। মনে মনে তাতে চোখ বোলাচ্ছি।

এ সময় বাঁধ সাধল বাঘ আকৃতির এক জার্মান শেফার্ড। ফুটপাথের সমান্তরালে সাইকেলের জন্য রাখা সরু লেন দিয়ে তার মালিক ফুরফুরে মেজাজে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। আর শেফার্ড। সাহেব কেশর ফুলিয়ে ফুটপাথ দিয়ে ছুটছে তার পিছু পিছু। চোখে পড়ল, কুকুরটার মুখে মাজল পড়ানো। মানে এখনো ঠিক নতুন মালিকের বশে আসেনি পুরোপুরি। ঘ্যাক করে কামড়ে দেওয়ার আশঙ্কায় এই ব্যবস্থা। কালো আর ঘিয়া মেশানো এই প্রকাণ্ড প্রাণীটাকে দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। দৌড়ানোর ভেতর এক ধরনের বন্যতা আছে।

কিন্তু, একি! কুকুরটা যেন খুব ক্ষেপে গিয়ে এলোপাতাড়ি ভঙ্গিতে ছুটে এসে আচমকা ধাক্কা দিয়ে প্রায় গায়ের ওপরে উঠে যাচ্ছে। ধাক্কা খেয়ে আমি লাটিমের মতো বাঁই বাঁই করে বার কয়েক ঘুরপাক খেয়ে দেয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে কুকুরটা অস্ফুট গর্জন তুলে সাঁই সাঁই করে নেই হয়ে গেছে। জার্মান শেফার্ড বলে কথা। তার ওপর আবার আধা পোষ মানা। যাক বাবা, খুব বেঁচে গেছি। ঘাড় মটকে দেয়নি, এই বেশি।

চকিতে কী যেন মনে হলো। অতীন্দ্রিয়ের মতো কিছু একটা কাজ করল বোধ হয়। পেছন ফিরে তাকাব, তার আগেই ঠন করে ধাতব কিছু আছড়ে পড়ার শব্দে অজানা আশঙ্কায় জমে গেলাম। মুহূর্তের অসাড় ভাব কাটিয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলাম, লতার ক্রাচ উড়ে গিয়ে মাঝ রাস্তায় পড়েছে। আর কুকুরটা দূরে বিন্দু থেকে বিন্দুতর হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর...আর, লতা এলোমেলোভাবে ফুটপাথে পড়ে আছে। নিঃসাড়। একটা হাত প্রায় রাস্তার ওপরে। কোনো কিছু না ভেবে নিজের অজান্তেই লতা বরাবর ছুটতে লাগলাম। সিগনাল লাল কী সবুজ, জানি না। হঠাৎ বিশাল একটা ট্রাকের শেষ মুহূর্তের প্রচণ্ড ব্রেকের তুমুল আর্তনাদে থমকে দাঁড়ালাম। ঘ্যাচচচ্...!

৮.
লতা–আ–আ...! চিৎকার করতে গিয়ে পারলাম না। শব্দ বেরোল না। বেশি ঘাবড়ে গিয়েছি। ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ব্রেক কষে ট্রাকটা সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে থামল। জোর করে চোখ মেললাম বিস্ময় নিয়ে। স্বস্তির বিস্ময়। দানবীয় ডাইমলার ট্রাক মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে। ডানে-বামে গাড়ি চলা রাস্তায় আরেকটু হলে আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে যেত। ভাগ্যিস, সামনের রাস্তাটা খালি; আর পেছনের রাস্তায় গাড়িগুলো সিগনালে দাঁড়িয়ে। তা না হলে লতার হাতের ওপর দিয়ে...। আর ভাবতে চাইলাম না। এদিকে, ড্রাইভার আমার উড়ে এসে তার গাড়ির সামনে পড়ার দোষে শাপশাপান্ত শুরু করে দিয়েছে। বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে এক সেকেন্ডে দৌড়ে পৌঁছে গেলাম লতার কাছে।

হাঁটু মুড়ে বসে সবার আগে লতার হাতটা কোলে তুলে নিলাম। কী করব, মাথা কাজ করছে না। গত মাসে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ফার্স্ট এইড কোর্স করেছিলাম। তার কানাকড়ি কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু কবজিটা হাতড়ে হাতড়ে কোনোমতে পালস পেয়ে বুঝলাম জ্ঞান নেই। খুব দ্রুত ভাবতে গিয়ে সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে আমার। লতার মাথাটা এবার কোলে নিয়ে ঝুঁকে পড়ে জোরে জোরে ডাকলাম, ‘লতা, লতা...’। লাভ হলো না। হাতটা ভেজা ঠেকল। চমকে গিয়ে দেখি মাথার পেছনটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ফুটপাথেও রক্তের একটা সরু ধারা চুঁইয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। আমার মেরুন শার্ট কালো ছোপে ভরে গেছে। এত রক্ত দেখে মাথা ঝিমঝিম করছে। স্কুলে বায়োলজি নিতে পারিনি যে কারণে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঝাপসা দেখছি। কিন্তু জ্ঞান হারানোর মতো বোকামি করার সময় এটা না।

জোর করে চোখ সরিয়ে আরেক দিকে ফেরালাম। এক হাত দূরে পড়ে থাকা লতার ব্যাগটার ভেতর থেকে নীল টুপিটা উঁকি দিচ্ছে। উবু হয়ে টুপিটা টান দিয়ে এনে লতার মাথায় চেপে ধরলাম। রক্তটা বন্ধ হওয়া খুব দরকার। টুপির সঙ্গে লতার ব্যাগ থেকে স্মার্টফোনটা বেরিয়ে এসেছে। মাথায় কাজ করল, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি ফোন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা। কিন্তু, নম্বরটা যেন কী? নাইন ওয়ান ওয়ান? নাকি নাইন নাইন নাইন? কিন্তু একটা তো আমেরিকার, আরেকটা বাংলাদেশের। জার্মানিরটা কী? মাথা পুরো সাদা হয়ে গিয়েছে ঘটনার বিহ্বলতায়। না, না, মনে পড়েছে। ওয়ান ওয়ান টু। এক হাতে খুব সাবধানে লতার মাথাটা সামান্য উঁচু করে পকেট থেকে বার কয়েকের চেষ্টায় নিজের ফোন বের করলাম। হাত ঘামছে প্রচুর। কিছুতেই স্ক্রিন লকটা খুলতে পারছি না। ঘেমে যাওয়া বিশ্বাসঘাতক আঙুলগুলো কিছুতেই কথা শুনছে না। পরপর তিনবার ভুলভাল করে ফোনটাই লক হয়ে গেল। মুঠোয় ধরে থাকা ফোনটার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকালাম।

টপটপ করে কয়েক ফোটা পানি পড়ল স্ক্রিনটায়। অবিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম, আমি কী কাঁদছি নাকি? চোখ পড়ল লতার কপালেও পানির ফোটা। কী মনে হতে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখি সকালের সেই একটুকরো কালো মেঘটা ঠিক মাথার ওপরে। চারপাশ কেমন আবছা ঘোলাটে লাগছে। এক দুই ফোটা বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। দিশেহারাভাবে চারপাশে তাকালাম কাউকে ডাকব বলে। সাহায্যের জন্য। কিন্তু, লোকজন কই সব? কোথাও কেউ নেই। এতগুলো গাড়ি হাঁকানো রাস্তা আচমকাই পুরোপুরি সুনসান। শুধু এক আধটা কাচ তোলা গাড়ি পঞ্চাশের রাস্তায় ষাট-পঁয়ষট্টিতে শাঁ শাঁ করে ছুটে মিলিয়ে যাচ্ছে। হয়তো কারও চোখেই পড়ছে না পথের ধারে রক্তে ভেসে যাওয়া লতা আর অসহায়, নিরুপায় অনীককে। দোকানপাটও নেই কাছে ধারে যে ছুটে গিয়ে কাউকে ডেকে আনব। লতাকে কোলে তুলে নিয়ে যাব, তাতে যদি ভাঙা পায়ের কোনো ক্ষতি হয়? তা সেই চেষ্টা করলাম না।

হঠাৎ লতার পড়ে থাকা ফোনটা হাতের নাগালে দেখে তা-ই তুলে নিলাম কী মনে হতে। না, কোনো স্ক্রিন লক দেওয়া নেই। ওয়ান ওয়ান টু চাপতেই ওপাশ থেকে স্বর ভেসে এল। মনে হলো দেবদূতের কণ্ঠ শুনছি। গড়গড় করে এক নিশ্বাসে বলে গেলাম কী ঘটেছে আর কোথায় আছি। আমাকে জায়গা থেকে না নড়ার অনুরোধ করে বলা হলো পাঁচ-দশ মিনিটের মাথায় অ্যাম্বুলেন্স আসছে।

মুহূর্ত আগের উত্তেজনা ভুলে ক্লান্ত হয়ে আসা স্নায়ু আর নিতে পারছে না। ফুটপাথে পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসে লাল হয়ে আসা নীল টুপিটা চিপে রক্ত ফেলে আবার লতার মাথায় ধরলাম। অবাক হয়ে দেখলাম হেলান দিয়েছি একটা ল্যাম্পপোস্টে, যেটা একটু আগেও ছিল না, দিব্যি দিয়ে বলতে পারি। এদিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা অজস্র ফোটার ঝুম বৃষ্টিতে আকার নিয়েছে। বৃষ্টি নামার কী আর সময় পেল না? প্রকৃতি মাঝে মাঝে এত নিষ্ঠুর কেন? শার্টের কয়েকটা বোতাম খুলে সযত্নে বৃথাই লতার পুতুলের মতো মুখটা বৃষ্টি থেকে আড়াল করতে চাইলাম। কালবৈশাখী ঝড়ে পড়া মা শালিক যেমন ছানাটাকে ডানা দিয়ে ঢেকে রাখে, ঠিক তেমন। এবার আর কোনো কিছু বাঁধ মানতে চাইল না। গরম নোনা জল আর শীতল বৃষ্টির স্রোত মিলে ঝাপসা চোখে কোন দিকে চেয়ে যে অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকলাম অধীর হয়ে, জানি না।

৯.
গ্রহের চারপাশে হন্যে হয়ে ঘোরা উপগ্রহের মতো সেই তখন থেকে রাজবাড়ির মতো দেখতে এই হাসপাতালের চারদিকে অর্থহীন ঘুরপাক খাচ্ছি। কিন্তু চাইলেও চলে যেতে পারছি না। পা বাড়াতেই গেলেই কীসের এক অদৃশ্য সুতার টানে বারবার ফিরে আসছি। ফিরে এসে আবার বসেছি বিশাল করিডরে রাখা বেঞ্চটায়। না, ঠিক বসে নেই; বেঞ্চে শুয়ে আছি। হাতের ওপর মাথা রাখা। রাত বাজে সাড়ে এগারোটা। দেয়ালে টানানো বিশাল ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটার টিক টিক বড্ড কানে বাজছে। ধু ধু ফাঁকা করিডর আর খোলা জানালার বাইরে নক্ষত্রের রাত। শার্টে এখনো লতার রক্ত। আজকে রাতে ঘুম নেই। রাশিয়ান ফ্ল্যাটমেট ভ্লাদিমিরকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছি আজকে ফিরছি না। অবাক হয়েছে ছেলেটা, কিন্তু কিছু আর জানতে চায়নি গায়ে পড়ে।

লতার বিপদ একরকম কেটে গেছে। খুব সংক্ষেপে খবরটা বিকেলেই বলা হয়েছে। তবু আইসিইউতে পড়ে থাকা মেয়েটার এই হালের জন্য কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করা যাচ্ছে না। পুরো ঘটনাটার জন্য নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। লতা নামের এই মেয়ের সঙ্গে আজকে আমার দেখা না হলে কী আসত যেত? যে যার কাজ সেরে নির্ঝঞ্ঝাট বাড়ি চলে গেলে তো এমনটা হতো না। কফি খেতে গিয়ে এত দেরিই বা করলাম কেন? লতাকে আগে ছেড়ে দিলে তো কুকুরটার দৌড়ে এসে ধাক্কা দেওয়া থেকে বেঁচে যেত। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসবই ভাবছি খালি।

ডক্টর ক্লাউডিয়াকে এগিয়ে আসতে দেখে এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসলাম। বসা থেকে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম। ‘অনীক, ঘুমাচ্ছ নাকি? ভালো খবর আছে। মাথার চোটটা অল্পের ওপর দিয়ে গেছে বলতে হবে। আমরা তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। গোটা দশেক সেলাই দিতে হয়েছে অবশ্য। তবে পা সারতে বেশি সময় লাগবে, ভাঙা পায়ে আবার আঘাত, বোঝই তো।’ বলেই ডক্টর ক্লাউডিয়া খুব উৎসুক চোখে তাকালেন প্রতিক্রিয়া বোঝার আশায়। ‘ওহ, আচ্ছা’। মুখচোরা আমি এ ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না সেই মুহূর্তে। শুধু মনে হলো যেন বুক থেকে পাথর সরে গেছে। আবার যেন ঠিকঠাক মতো শ্বাস নিতে পারছি। খানিকটা ইতস্তত করে ক্লাউডিয়া ডাক্তার আপা হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন।

এই একবেলায় ফ্রাউয়েন ক্লিনিক মাইষ্ট্রাসে নামের এই হাসপাতালের অর্ধেক ডাক্তার-নার্সদের নাম মুখস্থ হয়ে গেছে। সবাই নিজে যেচে এসে খুব কৌতূহল নিয়ে কথা বলেছেন আমার সঙ্গে। আমি কে, কী, কোথা থেকে, কেমন করে ইত্যাদি। কারণ, লতা কাকতালীয়ভাবে এই হাসপাতালের রেসিডেন্ট ডাক্তার। এর আগে তারা লতার কোনো বন্ধু-বান্ধবের হদিস পায়নি। তাই আজকের এই দুর্ঘটনার পর সবেধন নীলমণি আমাকে দেখে কৌতূহল আর ধরছে না এদের। ‘রেসিডেন্ট’ নামকরণের সার্থকতা প্রকাশের জন্য লতা নাকি দিন কী রাত এই হাসপাতালেই পড়ে থাকত। বাড়িটাড়ি যাওয়ার বিশেষ তাড়া তার কখনই ছিল না। তাই বন্ধু-বান্ধব হবে কোথা দিয়ে? অন্তত কার্ডিয়াক ওয়ার্ডের নার্স ফ্রাউ আনার অভিযোগ শুনে তো তাই মনে হলো।

কিন্তু এখন যে নার্স হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে, তাকে ঠিক চিনলাম না। খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে তিনি আমার দুই হাত পেতে কী যেন একটা গছিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘গ্রাতুল্যিয়েরে হের আখ্মেদ। অভিনন্দন, আহমেদ সাহেব। একদম বাপকা বেটা হয়েছে, যেমন রাজা, তেমন রাজপুত্তুর। খালি গালের টোলটা ছাড়া।’ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নার্স উধাও। গছিয়ে দেওয়া বস্তুটি আরেকটু হলে হাত গলে পড়েই যেত। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ইয়া মাবুদ! এই গ্যাদা বাচ্চা আমার হাতে ধরিয়ে দেওয়ার মানে কী? নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল হয়েছে। মরিয়া হয়ে চারপাশে কাউকে খুঁজলাম। কারও টিঁকিও দেখলাম না। তার বদলে চোখ পড়ল কোনার দেয়ালে টানানো ছোট্ট ব্ল্যাকবোর্ডটায়। লেখা ‘মোহাম্মদ এলফিকি/আহমেদ পরিবার, জন্ম: রাত এগারোটা চল্লিশ’। তার মানে ভুল আখ্মেদকে ভুল মোহাম্মদ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া কাছে পিঠের কোনো সময় কোনো কর্ম বা অপকর্ম মনে পড়ছে না যার জন্য মাঝ রাতে এভাবে কর্মফল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কী ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেল। আমি এখন কই যাই, কাকে ডাকি? জিন্দেগিতে কোনো দিন বাচ্চা কাচ্চা কোলে নেইনি। তার ওপরে প্রচুর হাত ঘামছে। বাচ্চারা বোধ হয় নার্ভাসনেস বুঝতে পারে। হাতের ভেতর মোহাম্মদ সাহেব গলা কাঁপিয়ে চিৎকার দেওয়া শুরু করল। আমি তার কম্পমান আলা-জিহ্বা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। ভয় হচ্ছে এখনই হাত গলে পড়ে যবে আর মাথা টাথা ফেটে বিতিকিচ্ছিরি একটা কাণ্ড ঘটবে। তাহলে নবজাতক গুম আর নির্যাতনের আগামী দশ বছর জার্মান জেলে বসে আলু সেদ্ধ আর ঘ্যাট জাতীয় স্যুপ খেয়ে কাটাতে হবে। আর লতা তত দিনে একটা মাঝবয়সী খিটখিটে, ক্ষ্যাপা পাগল ডাক্তার হয়ে এই হাসপাতালের অলিগলিতে দিনরাত ঘুরতে থাকবে।

খোদার কী দয়া। করিডরের নীরবতা ভেঙে চারিদিক আলো করে যে ব্যক্তিটা উদয় হলো, তাকে দেখে অন্য সময় আরেক দিকে হাঁটা দিতাম। কিন্তু এখন এই দুহাত জোড়া জাপানি হরফ, গোলাপ ফুল থেকে শুরু করে মেরিলিন মনরোর উলকি আঁকা, দুই কানে আধ ডজন দুল ঝোলানো লোকটাকে দেখে আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। কারণ, এই ভীম পালোয়ান গোছের লোকের চেহারাই ছোটে মোহাম্মদের মুখে কেটে বসানো। কোনোমতে কোল থেকে আলা-জিহ্বা সমেত চিজটা নামিয়ে ভীম বাবার হাতে ধরিয়ে চাবি দেওয়া কলের পুতুলের মতো আওড়ে গেলাম, ‘গ্রাতুল্যিয়েরে হের আখ্মেদ। আমি গাইনির ব্রাদার অনীক।’ তারপর চোঁ করে ছুটলাম সিঁড়ির দিকে। মানির মান আল্লাহ রাখে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। উফফ্!

সিঁড়ি ভেঙে হুড়মুড় করে নামতেই আবার ডক্টর ক্লাউডিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমাকে দেখে মুখ উজ্জ্বল করে বলল, ‘অনীক, লতাকে কেবিনে পাঠিয়ে দিয়েছি আমরা। কড়া ডোজে ঘুমাচ্ছে বেচারা। তুমি কী একবার দেখতে চাও? কিন্তু দূর থেকে দেখতে হবে, ভেতরে যাওয়া বারণ। ভিজিটিং আওয়ার তো সন্ধ্যায়ই শেষ, তাই।’ লতাকে আজকেই দেখতে পাব, ভাবিনি। ভুল শুনছি কিনা ভাবলাম। একটা হৃৎস্পন্দন বোধ হয় ঠিকমতো পড়তে পারল না। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে অন্ধের মতো ডক্টর ক্লাউডিয়ার পিছু পিছু পৌঁছে গেলাম লতার কেবিনে।

দেখতে না আসলেই হয়তো ভালো হতো। কেবিনের সাদা বিছানায় লতার শুয়ে থাকার দৃশ্যটা নিতে পারলাম না। মাথায় অনেকগুলো সেলাই পড়েছে। ওরা সেলাই দেওয়ার জন্য বাম পাশের চুল কামিয়ে দিয়েছে। আর আরেক পাশে ঠিকই সোনালি চুলের ঘন মেঘ। ব্যান্ডেজ মোড়ানো ভাঙা পা উঁচু করে ঝোলানো। ছেলে হিসেবে আমি শক্ত স্নায়ুর নই। ঘাবড়ে গেলে হাত ঘামে, রক্ত দেখলে মাথা ঝিমঝিম করে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘুমন্ত লতাকে দেখে বুকের ভেতরটা মুচড়ে মুচড়ে আসতে লাগল। আজকে বৃষ্টির ভেতর রাস্তার ওপর লতাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করার সময়েও এত কষ্ট লাগেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস অজান্তেই বেরিয়ে গেল পাঁজরের কোন ভেতর থেকে। ডক্টর ক্লাউডিয়াকে কোনো কিছু না বলে ফাঁকা করিডর ধরে আনমনা হাঁটতে শুরু করলাম।

বাসায় ফিরে যাব ভাবছি। কাল সকাল সকাল চলে আসব। এক তোড়া ফুল পেলে কী লতার ভালো লাগবে? মেয়েটার মন ভালো করা দরকার। অচেনা একটা রিংটোনের শব্দে ভাবনার সুতো কেটে গেল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি লতার ফোন। রয়ে গিয়েছে আমার কাছে। স্ক্রিনে রাত বাজে প্রায় সাড়ে বারোটা। কেন যেন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলল, খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে ওপাশে। অস্বস্তি লাগছে। ফোনটা কী ধরব?

১০.
মুঠোফোন বেজেই যাচ্ছে। আগের দিনের অ্যানালগ ফোনের ক্রিং ক্রিং সুরে। মনে হচ্ছে ওপাশ থেকে কেউ আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নম্বর চাপছে। এমন প্রাগৈতিহাসিক রিং টোন দিয়ে রাখার অপরাধে আমি লতার হয়ে ফোনটা ধরলাম না। তা ছাড়া, মনে হচ্ছে ফোনের ভেতর ঝামেলা আছে। আজকে এমনিতেই অনেক বিপদ-আপদ গেছে। এখন ফোন ধরে খাল কেটে আর কুমির না আনলেও চলবে।

কিন্তু ভালো লাগছে না। লতার জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে। কিন্তু দুশ্চিন্তাটা কমেছে আগের চেয়ে। সেখানে এসে হানা দিয়েছে প্রচণ্ড খিদে আর ক্লান্তি। এরা একসঙ্গে সিন্দাবাদের ভূতের মতো কাঁধে জেঁকে বসেছে। বাসায় গিয়ে হট শাওয়ার নিয়ে একটা ডিম ভেজে আর এক গ্লাস দুধ গিলে ঘুমিয়ে থাকব। এ ছাড়া, কিছু নেইও ঘরে। তাতে কিছু আসে যায় না। ডিম-দুধই খেয়ে নেব হালুম করে। তারপর ফোঁস ফোঁস ঘুম। মাঝে মাঝে নাক ডাকা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে পাশের ঘর থেকে ভ্লাদিমির ঠকঠক করে পলকা দেয়ালে আপত্তির টোকা দেয়। আমি বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য না করে পাশ ফিরে বালিশ কানে চেপে বিপুল বিক্রমে নাক ডাকা চালিয়ে যেতে থাকি। ভ্লাদিমির কোন ছাড়, স্বয়ং ভ্লাদিমির পুতিনও আমাকে জ্বালিয়ে সুবিধা করতে পারবে না। কোথায় রক্ত গরম রয়্যাল বেঙ্গল আর কোথায় রাশিয়ার হোৎকা সাইবেরিয়ান টাইগার! তুলনাই চলে না।

এই হাসপাতাল খুব পুরোনো। কারুকাজ করা অনেক উঁচু ছাদ আর সাবেকি আমলের কাঠের মেঝে। রাজবাড়ি রাজবাড়ি গাম্ভীর্য আছে। সিঁড়ি ভেঙে নামছি আর মচমচ করে শব্দ হচ্ছে। প্রায় সদর দরজার কাছে চলে এসেছি। ধাক্কা লাগল কারও সঙ্গে। অন্যমনস্ক ছিলাম হয় তো। ভালো করে চোখ তুলে তাকাতে দেখি এক তরুণী হাতের ফোনটায় ডুবে এলোমেলো হাঁটছে। আমি দুঃখিত বলতে যাওয়ার আগেই পকেটে লতার ফোন আবার বেজে উঠল। সামনের মেয়েটাও দেখি ঠোঁট কামড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে ফোনটা কানে ধরল। ধাঁধায় পড়ে গেলাম। এই মেয়েটাই ফোন করছে নাতো? লতার বন্ধু হয়তো। আবার এক হাতে ধরা সাদা অ্যাপ্রনটা বলে দিল যে, সে এই হাসপাতালেরই ডাক্তার কিংবা নার্স। তফাৎটা ঠিক বুঝতে পারি না আমি। যাক, অতি চিন্তা করে লাভ নেই। রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। আগস্টে হিরের কুঁচি ছড়ানো রাতের আকাশে সুকান্তের চাঁদ উঠেছে। সেই আলোয় অতিপ্রাকৃত লাগছে চারপাশ। রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। বাস-ট্রামের আশা না করে হেঁটেই যাব ভাবছি। মিনিট বিশ-পঁচিশেক লাগবে বড় জোর। কোনো ব্যাপার না।

বাঁধ সাধল লতার অস্থির ফোন। বেজেই চলছে আর বেজেই চলছে। ফোন হাতে নিয়ে ইতস্তত করছি। ধরতে যাব, অমনি রিং থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড বাদেই ভেসে উঠল খুদে বার্তা, ‘লতা, কই তুমি? আমি ডিউটিতে। শিগগির কল দাও। প্লিজ, প্লিজ।—লিওনি’। তাহলে তখন দরজার কাছে ধাক্কা লাগল যে, সেই কী এই লিওনি? ডাক্তার কলিগ কিংবা বন্ধু? লতার দুর্ঘটনার খবর কী তার বন্ধু জানে? নাকি নতুন কোনো অঘটনের খবর জানাতে লতাকে খুঁজছে মেয়েটা? হাঁটতে থাকা মানুষ যেমন কেউ নিঃশব্দে পিছু নিলে ঠিকই টের পেয়ে যায়, তেমন সতর্ক হয়ে গেলাম। তারপর লিওনি নামের ওপর আঙুল টিপে অপেক্ষায় থাকলাম। আর কখন যে উল্টো ঘুরে আবার হাসপাতালের দিকে রওনা দিলাম, বলতে পারব না।

লিওনি লতার বদলে আমার গলা শুনে ভড়কে গেল। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভড়কে যাওয়াটা সন্দেহের তীর হয়ে দাঁড়ানোর আগেই আমি খুব দ্রুত আর খুব সংক্ষেপে বলে গেলাম লতার পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার কাহিনি। কিছুটা অবাকই হলাম লিওনি কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বাধ্য ছাত্রের মতো কথাগুলো শুনে গেল। কিন্তু তারপর যখন অনুরোধ করল, আমি যদি খুব বেশি দূর চলে গিয়ে না থাকি, তাহলে এখনই তার সঙ্গে হাসপাতালের সামনে দেখা করতে পারব কিনা। তখন আমার অবাক হওয়ার পালা। এমন কী জরুরি কথা থাকতে পারে? এখন ঘড়িতে বাজে রাত একটার কাছাকাছি।

মিনিট দশেকের পরের দৃশ্য এরকম। লিওনি আর আমি হাসপাতালের ভেতরের বিশাল বাগানটায় পাশাপাশি একটা বেঞ্চে বসে আছি। লিওনি লতার প্রায় শূন্য সংখ্যক বন্ধুবান্ধবের একজন। সে একটু আগে যে খবরটা আমাকে জানাল সেটা লতাকে কী করে জানাব, তাই ভাবছি দুজন মিলে। কেমন অবশ আর বিমূঢ় লাগছে। আজকে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে লতার বাবা ফ্রেডরিখ স্নাইডার মারা গেছেন। মাত্রই অবসরে যাওয়া লতার বাবা প্রতিদিনের মতো টেনিস কোর্ট থেকে সাইক্লিং করে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে বিশাল এক ট্রাক তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। কাহিনির আরেকটা অদ্ভুত অংশ আছে। একটা কুকুর কোথা থেকে ছুটে এসে তার সাইকেলের সামনে পড়াতে ভদ্রলোক কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাইকেলের সরু রাস্তা ছেড়ে বাম পাশের গাড়ির রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আর তাতেই...। লতা আর তার বাবার ঘটনার ভেতর এত মিল কেন? এর ব্যাখ্যা কী? তা ছাড়া, লতাকে কালকে কীভাবে খবরটা জানাব? লিওনিকে অনুরোধ করে বললাম, এই কথা লতাকে তারই জানানো উচিত। কিন্তু আমি থাকব সেখানে। সকাল সাতটায় আমি চলে আসব। উঠে দাঁড়ালাম বাসার ফিরব বলে। লিওনির নাইট ডিউটি আছে। এত বড় দুঃসংবাদ চেপে কাজ করে যাওয়া তার জন্যও কঠিন।

বিক্ষিপ্তভাবে পা চালাতে চালাতে ভাবছি, দেয়ার আর মেনি থিঙ্কস বিটুইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ। দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্যের প্রভাবই বেশি। শেক্সপিয়ারের কথা। আজকের ঘটনা দুটো আমি মেলাতে পারছি না কিছুতেই। দুটো দুর্ঘটনা। দুই শহর। দুই সময়ে ঘটা। অথচ কী মারাত্মক অন্ত্যমিল। হাঁটছি আর ভাবছি। ভাবছি আর হাঁটছি। এক চাঁদের আলো ছাড়া রাস্তায় আর কেউ নেই। কেমন জানি শিউরে উঠলাম।

১১.
লতাকে দেখে হকচকিয়ে গেলাম। খুব শান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসে লিয়নির সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলছে। লিয়নি কী তাহলে বলেনি খবরটা? কী নিয়েই বা কথা হচ্ছে তাদের? নিঃশব্দে এসে তাদের কথার পাশে দাঁড়ালাম। লতা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে শুধুই অতল বিষাদ। বুকের ভেতরটা জমে বরফ হয়ে গেল। চোখ এমন বস্তু, যার ভাষা পড়তে কারও ভুল হয় না একটুও। তার মানে লতা জানে!

লিয়নিও ঘুরে তাকাল আমাকে দেখে। তার চাহনি বলছে, সে একটু আগেই লতাকে সব বলেছে। আমার অপেক্ষায় আর না থেকে। অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে ফেললাম। দেরি করে ফেলেছি। বাজে এখন সাড়ে সাতটা। তবে, কাক ভেজা চেহারা দেখে মনে হলো লিয়নি দেরিটা মাফ করে দিয়েছে। বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। গাড়িঘোড়ার সময় ধরে আসা-যাওয়া আজকে গিট্টু লেগে গেছে। খানিক অপেক্ষা করে থেকে ঝড়-বাদল মাথায় নিয়ে প্রায় দৌড়ে চলে এসেছি।

নীল টি-শার্ট ভিজে কালো হয়ে গেছে। চুল চুঁইয়ে পানি পড়ছে ফোটায় ফোটায়। সে অবস্থাতেই লতার পাশে বসলাম। এ রকম পরিবেশে কী বলা উচিত, কী করা উচিত—কোনো কিছুই মাথায় আসছে না। কোনো সান্ত্বনা কী যথেষ্ট? আচ্ছা, লিয়নি কী কুকুরের অংশটা লতাকে বলেছে? আমরা বাঙালিরা যেমন দুঃসংবাদের পুরোটা একবারে না বলে আস্তে আস্তে ভেঙে ভেঙে বলি, জার্মানরা সেরকম না। তারা যেকোনো খারাপ খবর খুব ডিটেইলসহ একবারে জানিয়ে দেয়। এতে নাকি মানুষ সহজভাবে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে। অন্তত, লতাকে দেখে তাই মনে হচ্ছে। তার বিকারশূন্য চেহারায় বিষাদ ছাড়া আর কোনো অভিব্যক্তি নেই। থাকলেও সেটা বোঝা সাধ্যের বাইরে।

এই অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আড়ষ্ট বোধ করছি। লিয়নি উঠে চলে গেছে ক্লাউডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে। লতা চুপ। নীরবতা ভেঙে দিল ক্রিং ক্রিং। লতার ফোনটা পকেট থেকে বের করে তার হাতে দিলাম। লতার মা ফোন দিয়েছেন। উঠে তফাতে গিয়ে দাঁড়াব, লতা খুব শক্ত করে হাতটা ধরে ফেলে আবার বসিয়ে দিল। লতার হাতে আইভি দিয়ে সুচ ফোটানো। সেই হাতে এত জোর এল কোত্থেকে ভাবছি। নিচু স্বরে দু-এক কথা ফোনটা সেরে সে এবার তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল, ‘অনীক, একটা কথা রাখবে? আমাকে নিয়ে যাবে আমাদের বাড়িতে? খুব যাওয়া দরকার।’

হ্যাঁ, একশবার নিয়ে যাব।’ কথাটা আমি বলিনি। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা প্রায় বছর পঁচাত্তরের এক বিশাল বপু ভদ্রমহিলা কথাগুলো কোনোমতে এক নিশ্বাসে বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠে পুরোনো ডিজাইনের স্কার্টের পকেট থেকে ইনহেলার নিয়ে গাঁজার কলকেতে দম দেওয়ার ভঙ্গিতে কয়েকটা দ্রুতগতির টান মেরে ধপ করে সামনে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়লেন।

লতা কিছুটা দ্বিধাভরে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে মৃদু স্বরে জানাল, এই ভদ্রমহিলা হলেন ফ্রাউ কেলনার। লতা তাঁর বাসার এক রুম ভাড়া নিয়ে থাকে আজকে ছয় বছর হলো। লতার ওপর যে ফ্রাউ কেলনারের একটা আলাদা অধিকার আছে আর তাদের সম্পর্কটা যে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে, তার চেয়েও বেশি কিছু সেটা বুঝতে সময় লাগল না। হাতের ফুল আর লতার জন্য আনা ঘরে বানানো খাবারের বাক্সটা নামিয়ে রেখে তিনি লতার হাতটা পরম মমতায় নিজের হাতের ভেতর পুরে ফেললেন। কে বলে লতার বন্ধু নেই। লতার পঁচিশ আর ফ্রাই কেলনারের পঁচাত্তরে কিছু আসে যায় না। মায়াটাই আসল।

লিয়নি আর ক্লাউডিয়া রুমে ঢুকলেন। ঢুকেই ঘোষণা দেওয়ার মতো করে বললেন, যে আজকে ট্রেন পাওয়া যাবে না। চালকদের ইউনিয়নের কী একটা ধর্মঘট চলছে। ডার্মষ্টাডের মতো জায়গায় প্লেনে গিয়ে লাভ নেই। নেমে সেই আবার গাড়িই নিতে হবে। যেহেতু একেবারে প্রত্যন্ত এলাকা। তার চেয়ে একবারে এখান থেকে গাড়ি নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পথ বেশি না, ঘণ্টা পাঁচ কী ছয়। কিন্তু মুশকিল হলো, তারা দুজনের কেউই যেতে পারবেন না। এত অল্প নোটিশে ছুটি মিলবে না। লতা, লিয়নি ও ক্লাইডিয়া একই বিভাগের ডাক্তার। হাসপাতাল হাপিশ করে এতগুলো ডাক্তার এক সময়ে ছুটি নিলে সমস্যা হয়ে যাবে। তবে লতাকে খুব সাবধানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিলে তারা আজকেই ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করে দেবেন। সেটা কোনো সমস্যাই না। একটা ফোল্ডিং হুইল চেয়ারও জোগাড় করে দেওয়া যাবে। বলেই তারা দুজন একসঙ্গে আমার দিকে তাকালেন কোনো একটা হ্যাঁ সূচক উত্তর শোনার আশায়। উত্তরে আমি একটা ঢোঁক গিললাম। সঙ্গে অনুরোধের ঢেঁকিটাও গিলব কিনা ভাবছি।

এদিকে লতা কিন্তু একদৃষ্টিতে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার চোখে চিকচিকে অনুনয় ঝরে পড়ছে। কিন্তু এই পা ভাঙা, মাথায় দশ সেলাইয়ের ব্যান্ডেজসহ লতাকে আমি নিয়ে যাব কী করে? আর শুনে তো মনে হচ্ছে লতার বাড়ি ডার্মষ্টডের কোনো গহিন গ্রামে। আবার, না-ই বা বলি কীভাবে। ধুর, অনীক মিয়া, এত কিছু ভেবে কী লাভ। আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে দিলাম। লতার চোখে বিষণ্ন কিন্তু আশ্বস্ত একটা হাসি খেলে গেল। অবাক হয়ে ভাবলাম, মাঝে মাঝে চোখের ভাষার কাছে মুখের ভাষা যে কত তুচ্ছ আর অপ্রতুল!

লিয়নি, ক্লাউডিয়া অনেক অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ফ্রাউ কেলনারও দেখলাম লতার আঘাতের ব্যাপারে কী জানতে তাদের পিছু পিছু বেরিয়ে গেলেন। শুধু আমি বোকা হয়ে লতার পাশে বসে থাকলাম। উসখুস করছি। কী ভেবে জানি না, লতার হাতটা ফ্রাউ কেলনারের মতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। যে হাতে সুচ ফোটানো নেই। তারপর আমাকে আরও বোকা করে দিয়ে লতা একেবারে বুকের ভেতর মুখ গুঁজে নিশ্চুপ হয়ে থাকল। যেন ঝড়ের আগের গুমোট মেঘ। কী বলব ভেবে না পেয়ে লতার মাথায় আস্তে আস্তে সাবধানী হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম। এর বেশি আর কী-ই বা সান্ত্বনা দিতে পারি? লতার চুলে ব্যান্ডেজ ব্যান্ডেজ ঘ্রাণ। কালকে লতার চুল দেখে যেমন ভেবে ছিলাম, এখন দেখছি সামান্যই চুল কাটা হয়েছে। বাম পাশে সিঁথি করে ডানে চুল ফেলে রাখলে বোঝাই যাবে না। আশ্চর্য! কী সময়ে কী ভাবছি। খুব লজ্জা লাগল নিজের কাছেই। নিজের ক্ষুদ্রতা ঢাকার জন্যই কী না বলতে পারব না, লতার শুকনো চোখ যেন মিছেমিছিই মুছে দিলাম আলতো আঙুলের ছোঁয়ায়।

জানালার বাইরে তাকালাম চোখ যত দূর যায়। বৃষ্টি থামার কোনো নিশানা নেই। আরে, মনে হলো যেন একটা কুকুরকে ভিজতে দেখলাম। ঠায় তাকিয়ে আছে। যেন এদিকেই। পলক ফেলেই আবার দেখি, কই কুকুর? যাহ্, খালি উল্টাপাল্টা কী সব ভাবছি। তবুও কী এক আশঙ্কায় লতাকে বুকের ভেতর আরও শক্ত করে ধরলাম। লতা নামের এই মানবীর সঙ্গে আমার পরিচয় একদিনের। তাতে কী, সময় তো শুধুই একটা মাত্রা মাত্র। কিন্তু আজকের এই বিচিত্র মুহূর্তে এই নীরব ঘরে নাম না জানা একটা বোধ কোথা থেকে বেপরোয়া উড়ে এসে সময় নামের এই মাত্রাটা হারিয়ে দিয়ে গেল। লতা কাঁদছে। অবশেষে। সমুদ্রে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতন। বাঁধনহারা। আর ভীষণ এক অমোঘ মায়ায় আমি ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেতে থাকলাম।

লতাকে ছাড়তে ছাড়তে বিকেল গড়িয়ে পাঁচটা বেজে গেল। গ্রীষ্মকাল বলে রক্ষা, নইলে শীতের বিকেল পাঁচটা মানে ঘোর অমাবস্যা। গাড়ি জোগাড় হয়েছে খুব সহজেই। ফ্রাউ কেলনারের ছোট্ট ফক্সওয়াগান গলফ গাড়িটা নেওয়া হয়েছে। তবে গাড়ির সঙ্গে গাড়ির মালিকও যাচ্ছেন। তার যুক্তি হচ্ছে, এত বড় পথ, তিনি সঙ্গে গেলে ভাগ করে গাড়ি চালালে কারও গায়ে লাগবে না। আসলে বুড়ি লতাকে মেয়ের মতো ভালোবাসেন নাকি আমার সঙ্গে একলা লতাকে ছাড়তে চাচ্ছেন না, ঠিক বুঝলাম না। সত্যি কথা বলতে কী, তিনি সঙ্গে যেতে চান শুনে আমি ভরসাই পেলাম। আমি থাকতে গাড়ি তাকে চালাতে হবে না। কিন্তু মাঝ রাস্তায় আবার বিষম হাঁপানিতে অক্কা না পেলে হয়। তখন আমি ব্যান্ডেজে মোড়ানো লতা আর আর তার সদ্য পটল তোলা বাড়িওয়ালিকে নিয়ে কই যাব?

ভাবতে গিয়ে স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাত ঘেমে উঠল। তুমুল বৃষ্টির কোনো কমতি নেই আজকে। তার ওপর জার্মান অটোবান বলে কথা। এই অটোবান বা হাইওয়ে গতিসীমা বলে কিছু নেই। তিন শতেও চালায় লোকে হরদম। এর মাঝে ঘেমো হাতে স্টিয়ারিং ছুটে গেলে আর রক্ষা নেই। ধুর! কপালের নাম গোপাল!

ঘণ্টাখানেক তাও ভালোই চালিয়েছি বলতে হবে। এর ভেতর লতা মুখ হা করে ঘুমিয়ে গেছে। বেচারা! ভিউ মিরর দিয়ে এই বিদেশিনীকেই দেখছি মাঝে সাঝে। সেটা ফ্রাউ কেলনারের চোখ এড়াল না। ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেল তো! তার ওপর সে আবার গাড়ির রেডিওর বোতাম চেপে চেপে এমন এক চ্যানেলে নিয়ে গেছে আরে সেখানে এমন আধ ভৌতিক সুরে অপেরা সংগীত বাজছে যে, আমার রীতিমতো ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। আর না পেরে সশব্দে কুমিরের মতো বিশাল একটা হাই তুলে ফেললাম। সামনে পেট্রল স্টেশন দেখলে থামতে হবে কফির জন্য। নইলে ফ্রাউ কেলনারের অপেরা আমাকে কবজা করে ফেলবে।

অটোবান ছেড়ে লান্ডষ্ট্রাসেতে উঠেছি। লান্ডষ্ট্রাসেও হাইওয়ে, কিন্তু শহরের বাইরে দিয়ে যাওয়া রাস্তা। এই লান্ডষ্ট্রাসে একটা বনের মতো জায়গার ভেতর দিয়ে গেছে। মেঘলা বলে হঠাৎ সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নইলে আগস্টে রাত দশটার আগে সূর্য ডোবে না। হেডলাইট ফুল অন করে দিলাম। সামনে হরিণের ছবির সাইন। বন থেকে বেরিয়ে হরিণ বা অন্য প্রাণী মাঝে মধ্যে রাস্তার উঠে গাড়ির সামনে পড়ে যায়, তাই এই সতর্কতা। সাবধান হয়ে গেলাম। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। আরে, ওটা কী? হেডলাইটে তীব্র আলোর সামনে আচমকাই বিশালাকার কিছু একটা দেখতে পেলাম। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ভেতর ব্রেক চেপে দিয়েছি। কিন্তু লাভ হলো না। বৃষ্টিভেজা পথে ফ্রাউ কেলনারের ফক্সওয়াগান প্রাণীটিকে চাপা দিয়ে কিছু দূর ছেঁচড়ে গিয়ে থামল। কোনোমতে রাস্তা থেকে গাড়ি সরিয়ে ঘাসের ওপর থেমে ইমারজেন্সি লাইট জ্বেলে দিলাম। নইলে পেছনে থেকে অন্য গাড়ি আসলে বিপদের ওপর বিপদ।

ব্রেকের ঝাঁকুনিতে লতা ঘুম ভেঙে গেছে। ‘কী হয়েছে, কী হলো? অ্যাক্সিডেন্ট?’ আর ফ্রাউ কেলনারকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি হার্ট অ্যাটাক করে মরে শক্ত হয়ে আছেন। আর আমার ধুকপুকানি বোধ হয় চার হাত দূর থেকেও শোনা যাবে। ফ্রাউ কেলনারকে খোঁচা মেরে দেখব যে জ্যান্ত আছে কিনা নাকি নেমে গিয়ে কুকুর না শেয়াল প্রাণীটিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেব ভাবছি। হঠাৎ ভদ্রমহিলার তব্দা কেটে গেল। তিনিও লতার মতো ‘কী হলো? কী হলো?’ করা শুরু করলেন। এখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন এরা দুজন অনর্থক চেঁচামেচি করে একজন আরেকজনের আতঙ্ককে সমানুপাতিক হারে বাড়িয়ে দেবে। এই কাজে মেয়েরা ওস্তাদ। হোক বাঙালি কী জার্মান। দুই নারীকে আতঙ্কের ভেতর রেখে গাড়ি থেকে নামলাম।

কৌতূহলী হয়ে এক–দুই পা এগিয়ে গেলাম। ব্যাপারটা দেখা দরকার। কিন্তু যা দেখলাম, তাতে রক্ত হিম হয়ে গেল। প্রাণীটা কুকুর বা শেয়াল কোনোটাই না। কিংবা দুটোই। ধারালো নখ, দাঁত আর লোমশ শরীর মিলে মনে হলো স্টিফেন কিংয়ের বই থেকে উঠে আসা ওয়্যারউলফ গোছের কিছু। বাস্তবে এই অসময়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা ঘুটঘুটে অন্ধকার বুনো পথের ধারে যে এমন কিছুর যে দেখা মিলতে পারে সেটা কল্পনারও বাইরে। রাস্তা থেকে সরাবো কেমন করে ভাবছি। খালি হাতে ধরব না কী...ভাবার সময় পেলাম না। প্রাণীটা জান্তব একটা চিৎকার দিয়ে এক ঝটকায় চার পায়ে উঠে দাঁড়াল। ভয়ে ছিটকে পিছিয়ে গেলাম। গাড়ি গায়ের ওপর দিয়ে উঠে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকা কীভাবে সম্ভব? কী করি এখন? কিছু করার নেই। কারণ, আতঙ্কে আমি জমে গিয়েছি। প্রাণীটা লাফ দিল। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। তারপর, বাতাস ফুঁড়ে কানে এল গুলির শব্দ। পরপর তিনটা। কী ঘটছে কিছু বুঝতে পারছি না। ঘুরে তাকিয়ে দেখি ফ্রাউ কেলনারের তাক করা পিস্তল থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আর অদ্ভুত প্রাণীটা মাটিতে লুটিয়ে। ঠিক আমার পায়ের কাছে।

১২.
দশ মিনিটের মাথায় অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেড আর তিনটা পুলিশের গাড়ি মিলে রাস্তা কর্ডন করে আলো-টালো জ্বেলে রাতটা একদম দিন করে দিল। লতা দারুণ কাজ করেছে। কী হলো, কী হলো করে পিনিক খাবার ভেতরেও সে বুদ্ধি করে পুলিশে ফোন করে দিয়েছে। দুর্ঘটনার খবর জানানোটাই নিয়ম।

না-কুকুর না-শেয়াল জন্তুটাকে যখন বিশাল একটা প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর ঢোকানো হলো, আমি তখন ইচ্ছে করেই আমাদের গাড়ির সামনে ভেতরে বসা থাকা লতার জানালার সামনে দাঁড়ালাম। যেন লতা দৃশ্যটা ঠিক দেখতে না পায়। কাজটা সচেতন নাকি অবচেতন মনেই করলাম, জানি না। খামোখা মেয়েটার মনের ওপর আর চাপ বাড়িয়ে কী লাভ?

তিন-তিনটা গুলি খাওয়া নিথর পাশবিক দেহটা থেকে তখনো এক ধরনের জান্তবতা ঠিকরে পড়ছে। মেঘ সরে যাওয়া চাঁদের নরম আলো আর ভিড় জমিয়ে থাকা পুলিশের গাড়িগুলোর প্রখর আলো মিলে বাস্তব আর পরাবাস্তবের মাঝামাঝি একটা জগৎ তৈরি করে দিয়েছে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া আজকের এই পথের ধারে। বারবার মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল আছে। ধরতে পারছি না। বোঝা তো দূরের কথা। খালি মনে হচ্ছে আধিভৌতিক একটা থ্রিলার উপন্যাসের ভেতর ঢুকে গিয়েছি। উপন্যাসের নাম ‘কুকুরের অভিশাপ’ জাতীয় কিছু একটা।

কখন যে নিঃশব্দে ফ্রাউ কেলনার এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, টের পাইনি। চোখাচোখি হতেই বুঝলাম, তার আর আমার উদ্দেশ্য অভিন্ন। লতাকে কোনো কিছু দেখতে না দেওয়া। এতক্ষণ হয়ে গেল, অথচ এই ভদ্রমহিলাকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। ফ্রাউ কেলনারের হাতব্যাগে আপেল কাটার ছুরির সঙ্গে নিকষ কালো পিস্তলটা না থাকলে প্রাণটা আজকে রাতে একদম বেঘোরেই যেত। পেশায় এককালের মিলিটারি নার্স ফ্রাউ কেলনার অবসরে যাওয়ার পরও জিনিসটার মায়া কাটাতে পারেননি। ট্যাক্স আর লাইসেন্স রিনিউ করে করে সেবাস্তিয়ানকে সঙ্গেই রেখে দিয়েছেন সযত্নে। সেবাস্তিয়ান তার পিস্তলের নাম। পুরো নাম সেবাস্তিয়ান কেলনার। তাজ্জব বনে যাওয়ার বদলে তাক লেগে গেল। একগাল হেসে ফেললাম মুগ্ধতায়। এই মুহূর্তে ফ্রাউ কেলনার আমার অভিধানে এক অতিমানবীর নাম। আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে নতুন চোখে দেখছি। তার পিস্তলের গালভরা রাশভারী কোনো নাম তো থাকতেই পারে, পারে না? পিস্তলের নাম সেবাস্তিয়ান কেন, জার্মান ফুটবলার বাস্তিয়ান শোয়ানষ্টাইগার হলেও অবলীলায় মেনে নিতাম। জান বাঁচানো অস্ত্র বলে কথা! বেঁচে থাকো বাবা সেবাস্তিয়ান।

মুশকিল হচ্ছে, আমাদের আজকের এই অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর যাত্রার বাকিটুকু পথ এই অতিমানবীকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার পক্ষে বোধ হয় স্টিয়ারিং ঘোরানো সম্ভব হবে না। ফ্রাউ কেলনার গুলি চালানোর পর পুলিশ আসার অপেক্ষায় না থেকে কুকুরটাকে রাস্তার এক পাশে টেনে সরিয়ে আনার মতো বোকামি করে হাত মচকে ফেলেছি। কিংবা মচকে না গেলেও ডান হাত ভালো করে আর সোজা করা যাচ্ছে না। এখন নিজের আঙুল কামড়াতে ইচ্ছা করছে ক্ষোভে-দুঃখে। না জানি কপালে আজকে রাতে আর কী কী আছে।

প্রচুর পরিমাণে ফরম পূরণ আর পাতার পর পাতা সাইন করে করে এক কী দেড় ঘণ্টা পার হয়ে গেল। জার্মানি কাগজের দেশ। পান থেকে চুন খসলেই তাড়া তাড়া কাগুজে ফাঁপরে পরে যেতে হয়। আর সেখানে তো কুকুর চাপা দিয়ে ফ্রাউ কেলনারের গলফ গাড়ির চলটা উঠিয়ে ফেলেছি। পাতাকে পাতা উড়িয়ে পুরো ঘটনা দাঁড়ি, কমাসহ লিখে লিখে মহাভারত লিখে ফেলেছে মাঝবয়সী ইন্সপেক্টর। ধৈর্যের বাঁধ যখন প্রায় ভেঙে যায় যায়, ঠিক তখন পুলিশের গাড়িগুলো বিদায় নিল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম যেন।

ওদিকে উত্তেজনায় ফ্রাউ কেলনারের চোখ চকচক করছে। গাড়ির চাবিটা তার হাতে দিয়ে দিলাম দোয়া দরুদ পড়ে। সত্যি বলতে কী, আসলে ঠিক ভরসা পাচ্ছি না। অন্ধকার রাত। থেকে থেকে বৃষ্টি-বাদল চলছে। এখনো লতাদের গহিন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে ঘণ্টা চারেক তো লাগবেই। মনকে সান্ত্বনা দিলাম, যাক গেছে তো হাতের ওপর দিয়ে, জানটা তো বাঙালের ধরেই আছে এখনো। এই তো বেশি। কী যে যা-তা কাণ্ড একটা হয়ে যেতে পারত আরেকটু হলেই, ভাবতে গিয়েও ভাবতে চাইলাম না।

এর ভেতর অনেকক্ষণ একইভাবে বসে থেকে লতার পায়ে ঝি ঝি ধরে গেছে। সে চাইছে তাকে যেন আধ শোয়া করে দেওয়া হয়। আরেক বিপদে পড়লাম। তাহলে সিট বেল্ট বাঁধা হবে কেমন করে? ভ্রু কুঁচকে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বললাম, পারব না! লতা চি চি করেই যাচ্ছে নিচু স্বরে। ফাঁপর আর ফাঁপর। এবার বললাম, এ্যাই মেয়ে, চোওওপ! লতার অনুরোধ রীতিমতো ঘ্যানঘ্যান ঠেকছে। ধ্যাত! দাঁত কিড়মিড় করে আবার বকা দিলাম, নড়েচড়ে বস, ঝি ঝি চলে যাবে। মাঝখান থেকে ফ্রাউ কেলনার বলে উঠলেন, ‘দাও না যেভাবে চাইছে সেভাবে ব্যবস্থা করে। তোমার সমস্যা কী অনীক?’ ফোঁস করে উঠলাম, ‘কিন্তু এভাবে তো সিট বেল্ট বাঁধা যাবে না। হাইওয়ে পুলিশ গাড়ি থামিয়ে ক্যাঁক করে ধরলে কী বলবেন, বলুন তো?’ উত্তরে ফ্রাউ কেলনার যা বললেন, তাতে হাসব না কাঁদব, নাকি তাকেও কষে একটা ঝাড়ি মারব বুঝতে পারছি না। ভদ্রমহিলা বলে চললেন, ধরলে বলব, ‘বাবারা, আমি বুড়ো মানুষ। এত নিয়মকানুন জানি না। আমাদের যেতে দাও’। গাট্টাগোট্টা বাঁজখাই জার্মান পুলিশকে ‘বাবারা, ছেড়ে দাও, যেতে দাও’ জাতীয় কথাবার্তা বললে কত দূর কী কাজ হবে কঠিন সন্দেহ আছে।

কিন্তু যা হোক, শেষমেষ লতার ঘ্যানঘ্যানের জয় হলো। বেচারা তো আর শখ করে অনুনয়-বিনয় করেনি। অস্বস্তি লাগছে বলেই তো করেছে। আহারে লতাটা। মায়া লাগল ভীষণ। খুব সাবধানে আমার টান লাগা হাত দিয়েই তাকে এক রকম পাঁজকোলা করে শুইয়ে দিলাম। অনেক কসরত করে পিঠের নিচ দিয়ে সিট বেল্ট ঘুরিয়ে বাঁধতে গিয়ে ঘাম ছুটে গেল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসব। লতা আউ করে উঠল। থতমত খেয়ে থেমে গেলাম। লতার কোথাও লেগেছে কিনা বুঝতে পারছি না। তারপর চোখে পড়ল শার্টের বোতামে পেঁচিয়ে আটকে পড়া সোনালি চুল। দেখছি, দেখছি বলে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চুল গেল আরও পেঁচিয়ে। গেরোটা ভালো করে দেখতেও পাচ্ছি না। চশমাটাও ড্যাশবোর্ডের ওপরে রাখা।

হাইপারমেট্রোপিয়া আছে। বেশি কাছের জিনিস ঝাপসা দেখি। লতা এখন ঝাপসা এক অবয়ব। কেন যে টি শার্ট বদলে ভদ্রগোছের এই শার্ট গায়ে চাপিয়ে আসলাম। টি শার্টের কোনো বোতাম নেই। বোতামের বড়শিতে কোনো মৎস্যকন্যাও আটকে পড়ে না। বড় নখও নেই যে সূক্ষ্ম হাতে চুলগুলো বের করে আনব বোতাম ঘরের ফাঁদ থেকে। এদিকে ঘাড়ে লতার গরম নিশ্বাস পড়ছে। আচ্ছা, কুকুরটা যদি আসলেই ওয়্যারউলফ হয়, তাহলে লতা আবার ড্রাকুলা নয় তো? এত কাছে পেয়ে ঘাড় মটকে আমার এবি পজিটিভ রক্ত সব লোপাট করে নেবে নাতো? কী সর্বনাশ! লতার চুল থেকে তীব্র ল্যাভেন্ডারের ঘ্রাণ আসছে। কোথায় গেল কালকের ব্যান্ডেজ ব্যান্ডেজ ঘ্রাণ? মাতাল মাতাল লাগছে। লতা কিচিরমিচির করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। নিরুপায় হয়ে ফ্রাউ কেলনারকে ডাকলাম। তার আপেল কাটার ছুরিটা এখন ভীষণ দরকার।

ঘ্যাচাং...! ফ্রাউ কেলনার বাতাস ফুঁড়ে উদয় হয়ে গাছের ডালাপালা কাটার দুই হাত লম্বা কাঁচি দিয়ে লতার এক ফালি চুল কেটে দিয়েছেন। তার মুখে বিজয়ের চওড়া হাসি। বললেন, ‘বাগানের জন্য কাঁচিটা কালকেই কিনেছি। গাড়ির ব্যাক ডালা থেকে আর নামানো হয়নি। কী দারুণ কাজে লেগে গেল, তাই না, অনীক?’

জবাব না দিয়ে অনীক মিয়া তখন খোলা বাতাসে হা করে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। ফ্রাউ কেলনারের ইনহেলারটা পাওয়া গেলে মন্দ হতো না। আরে, হাতের মুঠোয় কী? মুঠো খুলতেই দখিনা এক দমকা বাতাস এসে চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল। লতার সেই এক ফালি চুল কোন ক্ষণে কীভাবে এসে যে হাতের মুঠোয় বন্দী হয়েছে, জানা নেই। হাত বাড়িয়ে আবার ধরতে চাইলাম। কিন্তু আঙুলের ফাঁক গলে ঝিকমিকিয়ে কী এক আঁধারে মিলিয়ে গেল সোনালি রেশমগুলো। ঠিক জোনাকির মতো। রুদ্ধশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম সেই রেশমি ঝিলিক। চাঁদের আলোয় লেখা এই ছোট্ট গল্পটা আমি ছাড়া আর কেউ জানল না।

ফ্রাউ কেলনার হাঁক দিলেন, ‘কি অনীক, এখানেই বাড়িঘর করে থেকে যাবে নাকি? লক্ষ্মী ছেলের মতো গাড়িতে এসে বস। নইলে গেলাম আমরা তোমাকে ফেলে।‘ সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন স্টার্টের শব্দ। পড়িমরি করে এসে বসলাম। আড়চোখে পেছন ফিরে দেখি লতা আবার ঘুমিয়ে কাদা। নাক ডাকাও চলছে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো ঘুমিয়ে থাকা লতা যেন রূপকথার সেই রাজকন্যা। সোনার কাঠি আর রুপার কাঠির পাহারায় যাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে অনন্তকাল ধরে। যে রাজকন্যার ঘুম আর ভাঙে না, রাজপুত্রের চোখে পলক আর পড়ে না...।

সিট বেল্ট বাঁধার সময়টুকুও পেলাম না। হ্যাঁচকা টানে ছিটকে পড়ার দশা। ফ্রাউ কেলনার একবারও ডানে বামে না তাকিয়ে, কোনো রকম ইন্ডিকেটর না দিয়ে জোরসে এক্সিলেটর চেপে ধরেছেন। আতঙ্কে সিঁটিয়ে গেলাম। লাফ দিয়ে গাড়ি একদম মাঝ রাস্তায়। সত্তর লেখা সাইনবোর্ড দেখিয়ে মিনমিন করে বললাম, ‘একটু কী আস্তে চালানো যায়?’ ফ্রাউ কেলনার একটা দুর্বোধ্য ক্রূর হাসি দিয়ে ঘোষণা দিলেন যে আজকে রাতে তিনি তার বয়সের চেয়ে কম গতিতে গাড়ি চালাতে নারাজ। ওদিকে গতির কাটা এক শ পেড়িয়ে গেছে। আমি ঘোর অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছি এই ক্ষ্যাপা অতিমানবীর দিকে। আর ফ্রাউ কেলনারের নিরীহ গোলগাল কালো ফক্সওয়াগানটা হঠাৎ টকটকে লাল একটা খুনে ফেরারি হয়ে যেন অদৃশ্য সব পোরশে-মাজ্জারাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বনপথের আঁধার ফুঁড়ে উড়ে চলছে দূর অজানায়।

১৩.
বিয়ারের বোতল দিয়ে যদি শোকের পরিমাণ মেপে ফেলা যেত, তাহলে চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, ম্যাক্সিমিলিয়ানের মনে এখন বেজায় দুঃখ। ঘরের মেঝে, কোনা কানাচ, সবখানে শূন্য বিয়ারের বোতলের রাজত্ব। টেবিলের নিচে আরও এক বাক্স অপেক্ষমাণ। ছিপি খুললেই শোকের ফেনিল ধারা হয়ে বেরিয়ে আসবে। ম্যাক্সিমিলিয়ান, মানে লতার বছর চারেকের বড় ভাই ম্যাক্সের সঙ্গে লতার চেহারার কোনো মিল নেই। লতা ছোটখাটো হালকা পাতলা গড়নের। সেখানে সাত ফিট ম্যাক্সের মাথা প্রায় চৌকাঠ ছুঁয়েছে। আমি ছয় হয়েও তার ঘাড়ের কাছে এসে মিলিয়ে গেছি। নিয়ম করে দৌড়ানো আমার পেটানো শরীর তার দশাসই আকৃতির কাছে নস্যি। জিম ইনস্ট্রাক্টর ভেবে ভুল হলেও ম্যাক্স আসলে পেশায় স্কুলশিক্ষক। কাছের শহরের একটা স্কুলে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের অঙ্ক পড়ায়। বাবার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে কালকে চলে এসেছে মায়ের কাছে। যা হোক, খুব সাবধানে শোকে গড়াগড়ি দেওয়া বোতলগুলো টপকে সোফাটার কাছে এসে পৌঁছালাম।

আজকে রাতে লতাদের কাঠের বাড়িটার দোতলায় ম্যাক্সের সঙ্গে আমার থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। আর নিচের ঘরগুলোতে লতা, লতার মা ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনার। নির্দ্বিধায় বন্দোবস্ত মেনে নিয়েছি। কী একের পর এক ঘটনার পাকেচক্রে অযাচিতভাবে জড়িয়ে পড়েছি। সরল নিরুপদ্রব জীবনে অভ্যস্ত আমি। এত বৈচিত্র্য পোষায় না। লতাকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তাকে আনা গেছে ভালোয় ভালোয়। ব্যস, এটুকুই! কাল ভোরের আলো ফুটতেই আমি ফুট্টুস!

দুটা ঘর। আমাকে সোফা বেডটা দেখিয়ে ম্যাক্স অনায়াসে শোয়ার ঘরে বাকি বোতলগুলোর সদগতি করতে করতে ঘুমিয়ে যেতে পারে। কিন্তু না। সে ঠিক নাক বরাবর বসে আছে। তার পায়ের কাছে বসে থাকা হুমদো সিয়ামিজ বিড়াল কার্পেটে নখ ঘষছে। আমাকে বেশ কয়েকবার বোতল সেধেও লাভ হয়নি বলে দুজনের চেহারায় কিঞ্চিৎ হতাশা। ম্যাক্সকে দেখে মনে হচ্ছে সুদীর্ঘ কোনো গল্প বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই রে, তাহলেই সেরেছে! আমার তো উল্টো ইচ্ছে করছে, বিড়ালটাকে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে দিয়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যাই। কিন্তু তা না করে ভদ্রতার খাতিরে চেহারায় কৃত্রিম আগ্রহ ফুটিয়ে গল্প শুরুর অপেক্ষায় সোফার কুশনে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছি। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি, ঠিক দুই মিনিটের মাথায় হাত-পা ছড়িয়ে নাক ডেকে কুম্ভকর্ণের ঘুম দেব। বিয়ারের বোতল মাথায় ভাঙলেও লাভ হবে না তখন।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ম্যাক্স শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়াল। তখনো আমি বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেরোতে পারিনি। হেনরিখ স্নাইডার তাহলে লতা আর ম্যাক্সের আপন বাবা না? সৎ বাবা! কিন্তু ভাইবোন দুজন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে স্নাইডার সাহেবকেই বাবা হিসেবে নিয়েছে। অমায়িক, ভালো মানুষ এই লোকটা তাদের কোনো দিন বাবার অভাব বুঝতে দেননি। আর লতার আসল বাবার যে নামটা ম্যাক্স জানাল, সেটা শুনে চমকে গেলাম। মাথিয়াস ম্যুলার নামটা কে না জানে। ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি খুললেই তো তার নাম ভেসে ওঠে। বিখ্যাত অভিযাত্রিক। তিন-তিনবার এভারেস্টে চড়েছেন। এখন আছেন অ্যান্টার্টিকাতে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর খুব দারুণ একটা গবেষণার কাজে একদল নামকরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। তার করা ডকুমেন্টারির প্রতিটা পর্ব নেটফ্লিক্সে লাখ লাখ লোক হুমড়ি খেয়ে দেখছে।

তো ম্যাক্স আর লতা খুব ছোট থাকার সময়ে ম্যুলার সাহেব একদিন আবিষ্কার করলেন, ছানাপোনা, ঘরসংসার এগুলো খুবই একঘেয়ে আর বিরক্তিকর এক পিছুটান। এই পিছুটানের ভারে তিনি জীবনের যে চূড়ায় যেতে চান, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব না। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো এভারেস্টের পথে। সময় নষ্ট না করে নেপালের বেস ক্যাম্প থেকে কয়েক লাইনের এক চিঠি পাঠিয়ে দিলেন লতার মায়ের কাছে। সেই চিঠিতে ছোট্ট লতা আর ম্যাক্সের জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। লতার গৃহিণী মা এক অদ্ভুত জীবনযুদ্ধে পড়ে গেলেন।

মজার ব্যাপার, সে যুদ্ধে তার সহযোদ্ধা হলেন ম্যুলার সাহেবেরই সবচেয়ে কাছের বন্ধু লতার সৎ বাবা হেনরিখ স্নাইডার। ওয়ান ম্যানস ট্র্যাশ ইজ এ্যানাদার ম্যানস ট্রেজার। ম্যুলার সাহেবের হেলায় ফেলে দেওয়া পরিবারটা তিনি কুড়িয়ে পাওয়া হিরের টুকরোর মতো আগলে রেখেছিলেন এতকাল। এই গভীর রাতের আপাত শোকবিহীন পিনপতন নীরব কাঠের দোতলায় বসে দেখতে পেলাম পিছুটান আর রক্তের টানের থেকেও বড় এক টান আছে এই জগতে। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার টানে হেনরিখ স্নাইডার নামের ভালোমানুষ লোকটাকে লতা আর ম্যাক্স মিলে যে চূড়ায় উঠিয়ে বসিয়েছে, ম্যুলার সাহেব চাইলেও এ জীবনে তার নাগাল পাবেন না। সেটা যে এভারেস্টের থেকেও উঁচু এক জায়গা। ম্যাক্সিমিলিয়ান তার গালিভারের মতো শরীর কাঁপিয়ে শিশুর মতো কাঁদছে। আমি বাধা দিলাম না।

ম্যাক্স যখন কথার ঝাঁপি খুলেই বসেছে, তখন আরও একটা ব্যাপার জানার জন্য মনে খচখচ করছে। কিন্তু এটা হয়তো ঠিক সময় না। ম্যাক্স মনের কথা বুঝতে পেরেই কিনা জানি না, চোখ মুছে বলে বসল, ‘কুকুরের বিষয়টা ভাবছ, তাই না?’ আমি কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গে ওপর-নিচ মাথা নাড়লাম।

ম্যাক্স-লতার নতুন বাবা এই অকূলপাথারে পড়া পরিবারটায় আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন বটে। কিন্তু সঙ্গে করে একটা ছোট ঝামেলাও এনেছিলেন। ‘এই ব্যাপারটা একটা অভিশাপের মতন, বুঝলে...।’ ম্যাক্স কথাটা শেষ করতে পারল না। তার মাঝেই কোথা থেকে এক তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ভেসে এল রাতের আঁধার চিরে। চিৎকারটা নিচতলা থেকে আসছে। সবার আগে মনে হলো, লতা! তাকিয়ে দেখি ম্যাক্স নেই। হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেছে। আমিও এক ঝটকায় নামলাম। লতার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। বাকিরাও এসে ভিড় করেছে। বিড়ালটাও আমার আগে পৌঁছে হাজির। এলো চুলে উঠে বসা লতাকে হতবিহ্বল লাগছে। তার ঠোঁট ভয়ে নীল। সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। খোলা জানালা দিয়ে লোমশ একটা বিশাল কুকুর তার ঘরের ভেতর লাফ দিয়েছে।

এ রকম পরিবেশে কিছু বলা উচিত কিনা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছি। তার আগেই দেখি ম্যাক্স বাদে বাকি তিন জোড়া চোখ ঘুরে গেছে আমার দিকে। হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি আবার কী করলাম? ভালো করে খেয়াল হতেই দেখলাম, হাতে ভাঁজ করা টি-শার্ট ধরা। রাতে ঘুমানোর জন্য ম্যাক্সের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম। গল্প শুনতে শুনতে শার্ট খোলা হয়েছে বটে কিন্তু ম্যাক্সের দেওয়া টি-শার্ট আর গায়ে গলানো হয়নি। লতার চিৎকারে অমনি হাতের মুঠোয় নিয়েই নেমে এসেছি। কী মারাত্মক! লতার খোলা জানালা দিয়ে আসা মাঝ রাতের ঠান্ডা বাতাস হি হি করে কাঁপিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা যেন আরও পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়ে গেল। লতা, ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনারদের যথাক্রমে পঁচিশ, পঞ্চাশ আরে পঁচাত্তরের চোখের সামনে মানইজ্জতটা একদম গেল! তাড়াতাড়ি করে পায়ের কাছে ঘুরতে থাকা বিড়ালটাই কোলে তুলে নিলাম। মনে হলো ঘরের মেঝে ফাঁক হয়ে যাক, আমি বিড়ালসহ ঢুকে যাই। কিন্তু তার বদলে হাতের ভেতর ম্যাঁওপ্যাঁও করতে থাকা বদমাশ বিলাইটা ঘাড় বরাবর দিল এক খামচি। সেকেন্ডে মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে বাঁদরটাকে একটা চড় মারার জন্য হাত বাড়িয়েছি, কিন্তু তার গাল কই? গোঁফের পাশে না কানের নিচে? ঠাহর করতে না পেরে শয়তানটাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়ে দ্রুত ড্রয়িংরুমে চলে এলাম।

ম্যাক্স পিছু পিছু বেরিয়ে এসেছে। ততক্ষণে আমি টি-শার্ট চাপিয়ে আবার কিছুটা ভদ্রস্থ হয়ে ঘাড়ের খামচিটা পরখ করে দেখছি। ম্যাক্সের সেদিকে খেয়াল নেই। তার সমস্ত চিন্তা তার বোনকেন্দ্রিক। কাছে এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে বলল, ‘লতা খুব ভয় পেয়েছে। তুমি কিছু মনে না করলে আজকের রাতটা এই ড্রয়িংরুমের সোফায় কাটাতে পারবে? মা আর ফ্রাউ কেলনারের ঘুম দরকার। আমিও পারছি না। বিয়ার একটু বেশিই গেলা হয়েছে।’ ম্যাক্সের ঢুলঢুলে চোখের অনুরোধ ফেলা গেল না। বাকিটা রাত সেখানেই কাটল। কান খাঁড়া থাকল যদিও। কী বিচিত্র রাত। যেন শেষই হতে চাইছে না। লতার ঘরের দরজা আধা ভেজানো। মাঝে একবার উঠে গিয়ে জানালা লাগিয়ে দিয়ে আসলাম। যদি সত্যিই লাফ দিয়ে কিছু ঘরে ঢুকে যায়? বলা তো যায় না। লতার মুখের দিকে তাকালাম। এক গুচ্ছ চুল এসে কপালের একপাশটা ঢেকে দিয়েছে। যেন মেঘে ঢাকা ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ। খুব ইচ্ছা করল আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিতে। হাত বাড়ালাম। কিন্তু কেন যেন আঙুলগুলো লতার চুল ছুঁয়ে ফেলার ঠিক আগ মুহূর্তে সরিয়ে নিলাম। সব ইচ্ছেঘুড়িকে আকাশে উড়তে দিতে নেই। খুব সাবধানে দীর্ঘশ্বাসটা লুকিয়ে ফেলে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলাম।

সোফায় ফিরে এসে দেখি ম্যাক্স অন্ধকারে ভালুকের মতো ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঘুমাচ্ছে না কেন জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘তোমাকে কুকুরের ব্যাপারটা বলা হলো না তখন।’ হাত নেড়ে বললাম, ‘আরে, কোনো ব্যাপার না। কাল সকালে বললেও তো হতো। আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না।’ শীতল উত্তর এল, ‘সকাল হলেই তুমি ফিরে যাবে, আমি জানি, অনীক।’ আমি ধরা পরে যাওয়া চোরের মতো পিটপিট করে তাকালাম। বাতি নেভানো ঘরে ম্যাক্সের সেটা দেখতে পাওয়ার কথা না। কিন্তু মনে হলো সে ঠিকই টের পেয়েছে। অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে আমি শেষ মেষ বললাম, ‘ম্যাক্স, বল তাহলে, আমি শুনছি।’ এদিকে সত্যি বলতে, আমার আর কেচ্ছা-কাহিনি শোনার শক্তি নেই। এতটা পথ পেরিয়ে এসে শরীর-মন দুজনই বিশ্রামের জন্য আঁকুপাঁকু করছে।

ম্যাক্স তার বোতলে লম্বা চুমুক মেরে শুরু করল, ‘অনীক, তুমি ম্যাক্স ক্লারার নাম শুনেছ? নাম শুনে আবার ভেবে বসো না সে আমার জ্ঞাতি ভাই টাই গোছের কেউ, হাহাহা...।’ নামটা ঠিক শুনলাম তো? মাসখানেক আগে ‘ডাখাউ’ নামের মিউনিখের এক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঘুরতে গিয়ে এই নাম শুনেছি। জার্মানির ইতিহাসের ভয়ংকর এক নিষ্ঠুরতার নাম ম্যাক্স ক্লারা। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পেশায় ডাক্তার ক্লারার অনেক গিনিপিগ দরকার হতো। নাৎসী বাহিনীর হাতে মারা যাওয়া ইহুদিদের লাশ ছিল তার সেইসব গিনিপিগ। কিন্তু সে তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকের কথা। ম্যাক্সিমিলিয়ান কীসের গল্প বলতে চাইছে আসলে?


১৪.
আধ মাতাল ম্যাক্স তার পনেরো কী ষোলো নম্বর বিয়ারের বোতলে টান দিতে দিতে বলেছিল, ম্যাক্স ক্লারাকে আমি চিনি কিনা। আমি হ্যাঁ বলতেই ম্যাক্স এক অদ্ভুতুড়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসল। ম্যাক্স আর লতার সৎ দাদা মানে স্নাইডার সাহেবের বাবা জ্যাকব স্নাইডার ছিলেন জার্মানির লাইপজিগ শহরের জাঁদরেল ডাক্তার আর বিজ্ঞানী ম্যাক্স ক্লারার ছাত্র। ছাত্রের গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল মামুলি ইঁদুর কী বড়জোর গিনিপিগ। কিন্তু ফুসফুসের ওপর গবেষণা চালাতে গিয়ে একপর্যায়ে তরুণ জ্যাকবের আরও বড় প্রাণীর দরকার হলো। সেটা মানুষের লাশ হলে সবচেয়ে দারুণ হয়। কিন্তু ক্লারা তার উৎসাহে ভাটা দিলেন। কারণ, ইহুদিদের লাশ ক্লারা একান্ত নিজের গবেষণার কাজে লাগাতেন। সেখানে ছাত্রকে ভাগ দিতে তার মন সায় দিল না। তার বদলে তিনি জ্যাকবকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো কুকুরের ওপর চালাতে বললেন। জ্যাকবও দেখল, প্রস্তাব মন্দ না। একবারে নিশ্চিত হয়েই মানুষের ওপর গবেষণা চালানো দরকার। কুকুর আর মানুষ শারীরতত্ত্বভাবে খুব কাছাকাছি। তাই গবেষণার ফলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ।

কিন্তু জ্যাকবের গোটা তিরিশেক কুকুর লাগবে। যুদ্ধের ডামাডোলে নাৎসিপন্থী ম্যাক্স ক্লারার ততোধিক নাৎসি ঘেঁষা জ্যাকব তখন খ্যাপাটে এক বুদ্ধি বের করে ফেলল। লাইপজিগ শহরের চারপাশের গ্রামে নাৎসিরা মাইকিং করে জানিয়ে দিল, পোষা কুকুরকে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। অমুক তারিখে অমুক জায়গায় যেন যে যার কুকুর নিয়ে হাজির হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ইউরোপ জুড়ে তুমুল জলাতঙ্কের প্রকোপ জার্মানির মানুষের মনে আছে। তাই লোকজনের কাছ থেকে সাড়াও পাওয়া গেল সেরকম।

পরের ঘটনা সোজাসাপটা। জ্যাকব বেছে বেছে ইহুদি মালিকের কুকুরগুলোকে হাইডোজের কিটামিন-রম্পুন ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলল। তার ডান হাত একটুকুও হাত কাঁপল না। বাকি কুকুরগুলো ঠিকই র‍্যাবিসের টিকা নিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে খ্রিষ্টান মালিকের পিছু পিছু বাড়ি ফিরে গেল। অবশ্য ইহুদিদের একটা দল জোট পাকিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল বটে, কিন্তু নাৎসিদের ফাঁকা গুলির শব্দে ভয়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছিল তাদের সেদিন। তবে কুকুরের ফুসফুসের ওপর জ্যাকবের গবেষণা ষোলো আনা সার্থক। ম্যাক্স ক্লারা আর জ্যাকব মিলে পরবর্তীতে ইহুদিদের লাশের ওপর সেই বিদ্যা ফলিয়ে মানুষের ফুসফুসে নতুন একধরনের কোষ আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিল। সেই কোষের নাম আবার দেওয়া হয় ‘ক্লারা কোষ’।

কিন্তু সমস্যার শুরু হলো আরও পরে। যুদ্ধের প্রয়োজনে জ্যাকবকে নাৎসিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধে যেতে হলো। কোনো এক অপারেশনে গিয়ে জ্যাকব শত্রুপক্ষের গ্রেনেড হামলায় পড়ে। ডান হাতটা উড়ে গিয়ে খাঁড়ির ভেতরেই কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে। কিন্তু কী আশ্চর্য, কোথা থেকে এক বিশাল কুকুর এসে ছোঁ মেরে জ্যাকবের ডান হাতটা নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তুমুল গোলাগুলি আর কামান-গ্রেনেডের ভিড়ে কুকুর আসল কীভাবে কেউ বলতে পারেনি।

যুদ্ধ শেষ। ম্যাক্স ক্লারা আর তার শিষ্যদের ধরপাকড় করে জার্মানি থেকে বের করে দেওয়া হলো। হাতকাটা জ্যাকব পরিবার নিয়ে লুকিয়ে এই ডার্মষ্টাডে চলে এল। অজপাড়াগাঁয়ের লোক শহুরে একজন ডাক্তার পেয়ে বিগলিত। জ্যাকবদের কোনো অসুবিধা হলো না। কিন্তু উনিশ শ পঞ্চান্ন সালের এক শীতের সকালে জ্যাকব স্নাইডারকে তার পোষা কুকুর বাজেভাবে কামড়ে দিল। জলাতঙ্কের চৌদ্দটা ইনজেকশন দিয়েও লাভ হলো না। জ্যাকব স্নাইডারের ভয়ংকর হ্যালুসিনেশন শুরু হলো। তার পায়ের কাছে নাকি কালো রঙের ত্রিশটা কুকুর বসে থাকে। জ্যাকব কুকুরের মতো থাবা গেড়ে প্রচুর লালা ফেলতে ফেলতে সপ্তাহখানেকের মাথায় মারা গেল। রেখে গেল তিনটা নানা বয়সী ছোট ছোট বাচ্চা আর তরুণী স্ত্রী।

তবে জ্যাকব মারা গিয়ে ভালোই হয়েছে। তাকে একটা বীভৎস মৃত্যু দেখতে হয়নি। দিন কয়েক বাদে তার তিন মাসের ছোট শিশু, মানে লতার সৎ বাবা স্নাইডারের সবচেয়ে ছোট ভাই জুলিয়ানকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে একটা ভুট্টা খেতে যখন তাকে পাওয়া গেল, তখন বড় বড় নখের আঁচড়ে সেটা আর মানবদেহ বলে চেনা যায় না। সেটা কুকুরের কাজ কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এটুকু বলে ম্যাক্স আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘এখন বল তো, এর পরে আর কে অপঘাতে মারা গেছে? বলতে পারলে তোমার জন্য দুই বোতল বিয়ার পুরস্কার।’ আমি আর কী বলব। সব শুনে কেমন অসাড় অসাড় লাগছে। আর মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘাড়ের পেছন থেকে ইয়া বড় কুকুর লাফ দিয়ে পড়ল বলে। হাত উল্টে বললাম, ‘জানি না, তুমিই বল না।’ ম্যাক্স একটু চুপ থেকে যে কথা শোনাল, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ‘এমিলি। শার্লট মানে লতার যমজ এমিলি।’ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ম্যাক্স বলেই যাচ্ছে, ‘শার্লট আর এমিলি নাম দুটো রাখা হয়েছিল বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক শার্লট ব্রন্টি আর তার বোন এমিলি ব্রন্টির নামে। আমার মায়ের খুব প্রিয় লেখিকা এই দুজন।’ হতভম্ব আমি কথার মাঝখানে দুম করে বলে বসলাম, কিন্তু তোমরা তো স্নাইডার সাহেবের রক্তের সম্পর্ক নও, তাহলে কীভাবে?’ ম্যাক্স ফোঁস করে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, ‘জানি না, অনীক, ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। এমিলির ব্যাপারটা ঘটার আগে আমি এসব কুসংস্কার পাত্তা দিতাম না। এমিলি মারা যাওয়ার পর থেকে লতার জন্য ভয় ঢুকে গেছে। তাই হয়তো এসব কাকতালীয় ঘটনাকে চাইলেও উড়িয়ে দিতে পারি না।’

ম্যাক্স আবার চুপ। লতার ঘরের আধ ভেজানো দরজার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে রাজ্যের মায়া মেখে। চোখ ফেরানো দায়। তবুও চোখ ফিরিয়ে আস্তে আস্তে বললাম, ‘এমিলির কী হয়েছিল?’ উত্তরে ম্যাক্স আঠারো নম্বর বোতলের ছিপি খুলে বসল। তারপর শুরু করল, ‘এমিলি মারা যায় বছর পাঁচেক আগে। লতা আর এমিলি বাড়ি এসেছিল ক্রিসমাসের ছুটিতে। এক বিকেলে হাঁটতে বেড়িয়েছে দুজন। কোত্থেকে কার এক কুকুর এসে আচমকা ধাক্কা দিল। এমিলি ছিটকে পড়ল রাস্তায়। সেকেন্ডের মাঝে একটা লরি চলে গেল মাথার ওপর দিয়ে। স্পট ডেড।’ আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনে যাচ্ছি। দম ছাড়তেও ভয় লাগছে। লতার আর এমিলির দুর্ঘটনা প্রায় এক। স্নাইডার সাহেবের মারা যাওয়াটাও কুকুরকেন্দ্রিক। কিন্তু পার্থক্য, লতা দুর্ঘটনায় কুকুরের অংশটুকু আমি আর ফ্রাউ কেলনার মিলে ম্যাক্স আর তার মায়ের কাছ থেকে গোপন রেখেছি। এখন মনে হচ্ছে কাজটা ভুল হয়নি। পরিবারটা এমনিতেই বিরাট আতঙ্কের ভেতর আছে। কিন্তু সেই আতঙ্ক এখন আমার ভেতরও ঢুকে গেছে, তার কী হবে?

ম্যাক্স উঠে দাঁড়াল, ‘অনেক রাত হয়েছে, অনীক। ঘুমিয়ে পড়, কেমন?’ ঘুম কী আর আসে? এপাশ-ওপাশ করে কাটল রাতটা।

পরদিন ঝলমলে সকাল। গির্জাটা উঁচু একটা টিলার মতন জায়গায়। লতাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে আনতে হয়েছে। এখন রীতিমতো হাত ব্যথা করছে। গালিভার ম্যাক্স কেন যেন ইচ্ছে করে এই দায়িত্বটা আমার কাঁধে সঁপে দিয়েছে। তখন কী আর হ্যাঁ-না বলার সুযোগ থাকে? নিজেকে এখন আমার মহারানির সেবায়েত মনে হচ্ছে। রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন ঠেলে নিয়ে চলছি। লতা হাজারবার ‘সরি সরি, কষ্ট দিচ্ছি, ক্রাচটা দিলে নিজেই হেঁটে যেতে পারি...’ ইত্যাদি মেয়েলি কথাবার্তা বিরামহীনভাবে বলে বলে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। উত্তরে বলা উচিত ছিল, ‘আরে নাহ্, এ আর এমনকি।’ কিন্তু উল্টো দিয়েছি কষে এক ধমক, ‘অ্যাই মেয়ে, অ্যাই, বলেছি না চুপ করে থাকতে? এত কথা বলার কী আছে, উফ্!’

মেয়েটা সেই যে চুপ মেরে গিয়েছে, এখন পর্যন্ত আর কোনো কথা বলেনি। সে আজকে একটা ছাই রঙের টপের সঙ্গে কালো স্কার্ট পড়েছে। টিলার ওপরে ওঠার সময়ে আচমকা বাতাসে তার স্কার্ট নৌকার হাওয়া লাগা পালের মতো উড়ে মেরিলিন মনরোর ‘দ্যা ফ্লাইং স্কার্ট’ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। আঁতকে উঠে কোনোমতে সেটাকে পাকড়াও করে হাঁটুর নিচে গুঁজে দিয়েছি। তখনো লতা অস্পষ্ট একটা ধন্যবাদের মতন কী যেন আওড়ে আবার কুলুপ এঁটে চুপ। নিস্তব্ধতাটা বিকট ঠেকছে। আজকের দিনে লতার সঙ্গে এতটা রূঢ় না হলেও চলত। তাও আবার সামান্য কারণে। মাফটাফ চাইতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু মাফটা গলার কাছে এসে আটকে আছে। মুখ ফুটে বলা যাচ্ছে না। তাই অসহায়ের মতো চুপ করে থাকাই হলো।

গির্জার ভেতরটা একেবারে হিম। অথচ বাইরে উষ্ণ সকাল। ম্যাক্সের ভয়ে নাকি নেহাত ভদ্রতায়, কোনটার কারণে সকালটা থেকে গিয়েছি, জানি না ঠিক। এখন ঠান্ডায় জমছি বসে বসে। লতাকে বাকিদের সঙ্গে সামনের সারিতে বসিয়ে দিয়ে এসেছি। আর আমি বসেছি বেশ খানিকটা পেছনের সারিতে। ইচ্ছে করেই। প্রশ্নবোধক চাহনি এড়াতে হয়তো বা। পাদরি সাহেব বাইবেল খুলে পড়া শুরু করেছেন। আমার সেদিকে মন নেই। কালকে ম্যাক্সের বলা কথাগুলো কানে ভাসছে। রাতের অন্ধকারে ম্যাক্সের কাহিনি রীতিমতো রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে। কিন্তু এখন, এই ফকফকে দিনের আলোয় সব কেমন গাঁজাখুরি আর হাস্যকর লাগছে। তবুও কোথায় যেন একটা অস্বস্তি খচখচ করছে।

১৫.
গির্জা তারপর গির্জা লাগোয়া কবরস্থানে কফিনের শেষ মাটিটুকু ফেলা—সব কিছু লতাদের পাশে থেকে দেখছি যন্ত্রের মতো। বিষণ্ন, নীরব পরিবেশ। আর বাতাসটাও ভারী ঠেকছে। রোদ পালিয়ে গিয়ে কোত্থেকে একখণ্ড মেঘ এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক মাথার ওপরে। বৃষ্টি হয়ে নামলে খোলা জায়গায় মানুষগুলোর ভেজা ছাড়া গতি নেই। আনুষ্ঠানিকতা তাই বোধ হয় একটু তাড়াহুড়ায় সারা হলো।

টিলা বেয়ে ওঠা যত সহজ মনে হয়েছিল, লতা আর তার হুইল চেয়ার ঠেলে নামা তার চেয়ে তিন গুণ কঠিন মনে হলো। এক দুই ফোটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে এর ভেতরে। ম্যাক্স, ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনারের ছোট দলটা দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। ম্যাক্স একবার পেছনে ফিরেছিল, কিন্তু আমি হাত নেড়ে আশ্বস্ত করাতে আর থামেনি। সবার থেমে লাভও নেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল হয়ে গেছে। ম্যাক্সকে দাঁড়াতে বলা উচিত ছিল। লতার হুইল চেয়ার আর চলছে না। এক টুকরো নুড়ি পাথর চাকায় বেকায়দায় ঢুকে গেছে। অনেক চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিলাম। পথ বেশি না। লতাদের বাড়ি এখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ।

লতা এর ভেতর ‘কী হলো, কী হলো’ করে উঠেছিল। মেজাজ গরম থাকায় বিরাট এক বকা দিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছি। বেচারা চুপ মেরে অপরাধী চেহারায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। বকা দিয়ে নিজের অপরাধের পাল্লাটা বাড়িয়েই চলছি আজকে সকাল থেকে। আমি এমন কেন? এখন আবার তাঁর হুইল চেয়ারের চারপাশে অর্থহীন ঘুরপাক খাচ্ছি। এক হাতে নিজের চুল খামচে ধরে আরেক হাতে দুশ্চিন্তায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা দাঁড়ি নির্মমভাবে চুলকে যাচ্ছি। কী করব ভাবছি। এই ফাঁকে কখন যে লতা হাতের ক্রাচটায় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই করিনি। চোখ পড়ায় এবার রে রে করে তেড়ে গেলাম। ক্রাচে ভর দিয়ে তাইরে-নাইরে করে ঘুরে বেড়ানোর অবস্থায় নেই লতা। ধুর! পায়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার মাথাটাও গেছে। যা-তা শুরু করেছে। আমার মগজে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ হয়ে গেল। ইচ্ছে হচ্ছে হুইল চেয়ারটাকে ফুটবলে ফ্রি কিক দেওয়ার মতো করে উড়িয়ে দিই। আর লতাকে মন ভরে বকাঝকা দিয়ে একলা নিচে নেমে যাই। আমার বয়েই গেছে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। ম্যাক্স এসে তার বোনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাক। আমার কী দায়?

কিন্তু তার বদলে করলাম ঠিক উল্টো কাজটা। এক ঝটকায় কোনো কিছু না ভেবেই আজব মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। ভাঙা পা দিয়ে এক কদম হাঁটার আগেই। লতা অবাক হওয়ারও সময় পেল না। বরং দুই হাতের ভেতর আটকে পরে সে রূপকথার পিনোকিওর মতো কাঠ হয়ে গেল। মুশকিলে পড়ে গেলাম। কাজটা কী ঠিক হলো? ফোনটাও আনা হয়নি লতাদের বাসা থেকে যে ম্যাক্সকে ফোন করে ফিরে আসতে বলব।

অপ্রস্তুত লাগছে। পরিবেশটা তরল করার জন্য একরকম জোর করে এ কান ও কান চওড়া একটা হাসি টেনে বললাম, ‘তুমি আমার দেশের মেয়ে হলে এতক্ষণে চিৎকার চেঁচামেচি করে বলত, অ্যাই অ্যাই, ছেড়ে দে শয়তান...! তুমি কিছু বলছ না যে?’ লতার আড়ষ্টতা আর কাটে না। এবার মরিয়া হয়ে বললাম, ‘আর কী ভাবেই বা এখান থেকে বাড়ি যাওয়া যেত? কিছু তো বল? নইলে কিন্তু ফেলে দেব। এই আমি দিলাম হাত ছেড়ে। এক, দুই...।’ তিনের আগেই লতা ভয় পেয়ে গলা আঁকড়ে ধরল। আর ফিক করে হেসে ফেলল। এটার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। এই হাসিটুকু। উত্তরে আমিও হেসে ফেললাম। মনের গহিন থেকে উঠে আসা স্বস্তির হাসি। হুইল চেয়ারটা এতিম করে দিয়ে আমরা টিলার ঢালু পথ বেয়ে নামতে থাকলাম।

প্রথম পাঁচ মিনিট মনে হচ্ছিল লতা এত হালকা। যেন ছোট্ট চড়ুই পাখি। পরের পাঁচ মিনিটে চড়ুইটা আস্তে আস্তে বিরাট এক পেঙ্গুইন হয়ে গেল। মানে আমার হাত প্রায় ধরে এসেছে। তার ওপর উঁচু নিচু পথ। বাংলা সিনেমার নায়কেরা অমন স্বাস্থ্যবতী নায়িকাদের অনায়াসে কোলে নিয়ে নাচত কেমন করে ভাবছি। এই মুহূর্তে তাদের ওস্তাদ মানছি মনে মনে। সে তুলনায় ছিপছিপে ছোটখাটো গড়নের লতা কিছুই না। কিন্তু, তাও; উফফ্, আর তো পারি না। লতা আমার ক্লান্তিটা টের পেয়েই কিনা জানি বলে উঠল, ‘অনীক, একটু কী নামিয়ে দেবে? ক্লান্ত লাগছে’। খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে লতাকে সাবধানে নামিয়ে দিয়ে ক্রাচটা ধরিয়ে দিলাম। বিড়ি–সিগারেট ফোঁকার স্বভাব থাকলে এই ফাঁকে একটা সুখটান দিয়ে ফেলা যেত। তার বদলে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে নিয়ে চিবোচ্ছি।

সড় সড় জাতীয় একটা শব্দ কানে আসছে। পাত্তা দিলাম না। কাক টাক হবে হয়তো। তার চেয়ে বড় চিন্তা মাথার ওপরের মেঘটা নিয়ে। টুপটাপ বৃষ্টি নেই বটে। কিন্তু আকাশ ঝড়ের আগের চেহারা নিয়ে ঘাপটি মেরে আছে। হঠাৎ লতা হাত ধরে সামনের দিকে ইশারা করল। অসাড় হয়ে গেলাম। কালো-বাদামি একটা ডোবারম্যান। হিংস্রতম জাতের কুকুর। আকারে বিশাল। সড় সড় করে শুকনো পাতা সরিয়ে কী যেন খুঁজছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো ধক্ধক্ করে জ্বলছে যেন। দেখে মনে হলো যা খুঁজছিল, তা পেয়ে গেছে। আমাদের পেয়ে গেছে।

লতার হাতের ভেতর আমার হাত ঘেমে উঠছে। হাতটা ছুটিয়ে কোমরে গোঁজা মরক্কান ড্যাগারটা নিমেষে বের করে সামনে ধরলাম। লতা বোবা বিস্ময়ে দেখছে। মারাত্মক ধারালো ফলার ছুড়িটা তাঁর খুব পরিচিত। লতাদের ড্রয়িং রুমের দেয়ালে ঝুলছিল গতকাল রাত পর্যন্ত। সকালে সঙ্গে নিয়ে নিয়েছি। ফ্রাউ কেলনারের সঙ্গে বিপদের বন্ধু পিস্তল সেবাস্তিয়ান থাকতে পারলে আমার সঙ্গে আধবেলার জন্য মরক্কান ড্যাগার থাকলে ক্ষতি কী? খুলে নিয়েছি তাই দেয়াল থেকে। গিয়ে জায়গামতো রেখে দেব। কেউ জানবেও না। ছুড়িটা যে বের করতেই হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

এক পা, এক পা করে ডোবারম্যানটা এগিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে আমারও গলা শুকিয়ে আসছে। আমি এখন যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারি। কিন্তু ঠিক কখন, বুঝে উঠতে পারছি না। কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব? চোয়াল শক্ত করে ছুড়ি বাগিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটা হাতে তার চেয়েও শক্ত করে লতাকে জড়িয়ে ধরেছি। সময় যেন থমকে গেছে। কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। আমি চোখ বুজে ফেললাম। ঝাঁপটা আমিই দেব। কুকুরের আগেই। ঠিক তখনই তীব্র শিসের মতো শব্দ কানে আসল। ‘বেনিয়ামিন, বেনিয়ামিন! কই তুমি?’ কালো ওভারকোটে ঢাকা এক লোক উদয় হলেন শূন্য থেকে। ডোবারম্যানটা পরিচিত ডাক শুনে ঘেউ ঘেউ করে সেদিকে ছুটল। আমি আর লতা কুকুরটা উধাও হওয়ার পরও কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর সশব্দে ফোস করে হাঁপ ছেড়ে দুজন দুজনের দিকে তাকালাম। কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম দুজনে মিলে। শুধু শুধুই। কিন্তু বেনিয়ামিন বলল কেন লোকটা? বেঞ্জামিন না কেন? আচ্ছা, বেনিয়ামিন কী বেঞ্জামিনের ইহুদি উচ্চারণ?

চিন্তাটা আর এগোতে পারল না। লতা কী যেন বলছে। খেয়াল হতে বুঝলাম হাত ছাড়তে বলছে। লতা এখনো আমার হাতের শেকলে বন্দী। জড়িয়ে ধরেই আছি। সলজ্জে ছেড়ে দিয়ে ছিটকে সরে আসলাম। লতা বাহু ডলছে। পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট সেখানে। ঠিক দিন কয়েক আগে কফিশপে এভাবেই লতার হাতে দাগ ফেলে দিয়েছিলাম। সেই কথা মনে করে এবার রীতিমতো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে থাকলাম। মাথা ঠিক ছিল না ঘটনার আকস্মিকতায়। লতা সেটা বুঝে নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আমরা আজকে এখানেই থাকব নাকি বাড়ির দিকে পা চালাব? কোনটা বলতো, অনীক?’ আমি কিছুটা সহজ হয়ে আবার লতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। কিন্তু হাত কাঁপছে। লতা কী সেটা বুঝতে পারছে? মুশকিল, মুশকিল।

এদিকে ঝড়ের আগের বাতাসে চুল উড়ে এসে চোখের ভেতর ঢুকে যাওয়ার দশা। বারবার ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিয়েও লাভ হচ্ছে না বিশেষ। কিন্তু থামলে চলবে না। ঝড় আসি আসি করছে। শেষমেষ লতা একটা অদ্ভুত সমাধান বের করল। তার চুলের তিন কোনা ক্লিপটা খুলে আমার চুলে আটকে দিল। আশ্চর্য বনে গেলাম! মেয়েলি সাজের সরঞ্জাম দিয়ে আমার বেয়ারা কিন্তু পুরুষালি চুলগুলো শাসনে আনার অপরাধে লতাকে কী শাস্তি দেওয়া উচিত ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু, কী অবাক কাণ্ড। রাগটাকে ঢোক গিলে নাই করে দিয়ে সহাস্যে লতাকে বললাম, ‘ক্লিপ দিয়ে চুল আটকানোর ফৌজদারি অপরাধে ক্লিপের মালিককে আজকে জব্দ করা হলো। তাকে আজকে আমার কবজা থেকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না। হা–হা–হা...।’ কপট অট্টহাসিতে চারিদিক কাঁপিয়ে দিলাম। আর লতা? সে যারপরনাই চেচাচ্ছে, ‘ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও শয়তান...।’ বলতে বলতে ক্রাচটা দিয়ে বেমক্কা একটা ঠোকা দিয়ে দিল কপাল বরাবর। আমি তাও রাগলাম না। বরং মিথ্যে হুমকি দিলাম, ‘কপাল ফুঁড়ে শিং গজালে কিন্তু ক্ষ্যাপা স্প্যানিশ ষাঁড়ের মতো তাড়া করব, বলে দিলাম।’

কোলের ভেতর বন্দী লতা খিলখিল করে হাসছে। হাসির তোড়ে মাথা ঝিমঝিম করছে। এ কোন নতুন বিপদে পড়লাম!

১৬.
জীবনে যতগুলো গল্প-উপন্যাস পড়েছি, তার কোনোটায় পড়িনি যে, নায়িকা নায়ককে ধরে টিটেনাসের টিকা দিয়ে দিচ্ছে। সব দোষ লতাদের ভাম আকৃতির বিড়ালটার। আর বাইরের ঝড়টাও দায়ী। নইলে এতক্ষণে ফ্রাউ কেলনারকে নিয়ে লতাদের বিদায় জানিয়ে রওনা দিয়ে দেওয়া যেত। ঠিক যাই যাই করছি, আর অমনি আকাশ ভেঙে ঝড় শুরু হয়ে গেল। লতারা ভাইবোন আর মা মিলে কিছুতেই আমাদের যেতে দিল না। আর এর ভেতরে ড্রাইভিং করাটাও বেশ কঠিন। অগত্যা অপেক্ষা ছাড়া আর গতি নেই আপাতত।

ড্রয়িংরুমে সবাই ঝিম মেরে বসে আছি। কেউ কোনো কথা বলছি না। কেবলই মনে হচ্ছে চলে গেলেই পারতাম। এই পরিবারটাকে শোক করার জন্য একটু একলা সময় দেওয়া উচিত ছিল। এর মাঝে আবার লতাদের বিড়ালটা এসে বারবার পায়ের কাছে লেজ ঘষছে। কাতুকুতুর মতো লাগছে। কিন্তু এমন পরিবেশে কী হাসা মানায়? কষ্ট করে গাল কামড়ে হাসি চেপে বিড়ালের অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছি। ইচ্ছে করছে, এটাকে ধরে একটা একটা করে মোচ টান দিয়ে তুলে ফেলি। কালকে রাতে দস্যুটা ঘাড়ে আঁচড়ে দিয়েছে। এখনো জ্বলছে। যদিও পাত্তা দিইনি। কিন্তু এখন মনে পড়তেই জ্বলুনি টের পেলাম। হাত চলে গেল ঘাড়ে। কলার সরিয়ে দেখলাম, পাঁচটা নখের ধারালো দাগ দগদগে হয়ে ফুটে উঠেছে।

ব্যাপারটা সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা লতার চোখে ধরা পড়ে গেল। লতা ম্যাক্সকে ইশারা করাতে ভালুক ম্যাক্স না দাঁড়িয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এল। এক রকম জোর করে দাগটা পরখ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা দিয়ে দিল, ‘অনীকের টিটেনাসের টিকা লাগবে। কাঠমুন্ডু তো খামচে কম্ম কাবাড় করে দিয়েছে।’ থতমত খেয়ে গেলাম, বিড়ালের নাম কাঠমুন্ডু? ম্যাক্স হেসে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা মজা করে নাম দিয়েছিল কাঠমুন্ডু। cat-man-do থেকে কাঠমুন্ডু।’ বলেই ম্যাক্স জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাবার কথা মনে পরে গেল বোধ হয়।

কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, আর মিনিট পনেরো অপেক্ষা করে আমরা আস্তে আস্তে উঠি। নইলে রাত হয়ে যাবে পৌঁছাতে। ম্যাক্স গ্রাহ্য করল বলে মন হলো না। বরং লতা শোয়া থেকে উঠে বসে ম্যাক্সকে আবার কী একটা ইশারা করতেই সে রান্নাঘরের ফ্রিজের দিকে হাঁটা দিল। ফিরে এল ছোট একটা অ্যাম্পুল আর ইনজেকশন নিয়ে। এদের ফ্রিজে মাছ-মাংসের সঙ্গে টিটেনাসের টিকাও থাকে নাকি? নড়েচড়ে বসলাম। সুচ মানেই হাত ফোটানো। হাত ফোটানো মানেই রক্ত অবধারিত। অনেকভাবে আপত্তি জানানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। ম্যাক্স এমন ক্যাঁক করে ধরল! আর লতা ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে এসে আমার হাতা গুটিয়ে স্বাস্থ্যবান মতো একটা রগ বের চাপ দিয়ে ধরে সুচটা ফোটাতে গেল। কিন্তু বিড়াল কাঠমুন্ডু ভিলেনের মতো দৌড়ে এসে কমান্ডো স্টাইলে ঝাঁপিয়ে পড়ে লতার হাতটা বিচ্ছিরিভাবে নাড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত।

ঘেমে নেয়ে ভয়ে আতঙ্কে চিঁ চিঁ করতে করতে মাথা ঝাঁকাতে লাগলাম। সজাগ থাকতে হবে। এরা যেন কিছুতেই না বোঝে যে আমার রক্ত ভীতি আছে। কিন্তু মাথা আর কী ঝাঁকাবো, ম্যাক্স সর্বশক্তি দিয়ে ঘাড় ধরে যেভাবে ঝাঁকাতে আরম্ভ করল, তাতে শরীরের কল-কবজা সব ঝনঝনিয়ে উঠল মনে হলো। চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। ‘অনীক, অনীক, অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে নাকি? কী সর্বনাশ!’ চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করতেই লতা দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ইনজেকশন পুশ করে দিয়েছে। বাবা রে, যেমন মেয়ে, তেমন তার বিড়াল। দুজনের মাথা একসঙ্গে ঠুকে দিতে পারলে খুব শান্তি পেতাম। রাগ লাগছে। কিন্তু তার ভীম পালোয়ান ভাই ম্যাক্সের সামনে লতাকে কিছু বলা যাবে না। আরেকটা ঝাঁকুনি দিলে ঘাড় মটকে যেতে পারে।

এদিকে রক্ত ছিটকে কাপড়ের অবস্থা দফা-রফা। এ অবস্থায় বাইরে গেলে লোকে ভাববে কাউকে খুনটুন করে পালাচ্ছি। লতার মা আমার দিকে তাকিয়ে একমুহূর্ত কী যেন ভাবলেন। তারপর কাঠের সিঁড়ি মচমচিয়ে দোতলায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। নেমে এলেন গোটা পাঁচেক ইস্ত্রি করা ধোপদুরস্ত শার্ট নিয়ে। তারই একটা জোর করে হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘তোমারটা বদলে এটা পরে নাও তো।’ সঙ্গে দিলেন কাঠের একটা ছোট বাক্সে ভীষণ স্টাইলিশ কয়েক জোড়া কাফলিং। লতার বাবা মনে হলো দারুণ শৌখিন লোক ছিলেন। আপত্তি তুলতেই দেখি লতার চোখে নীরব অনুরোধ।

বাধ্য ছেলের মতো জামাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই ফ্রাউ কেলনার একটা ফিচেল হাসি দিয়ে বললেন, ‘যাচ্ছ কই, এখানেই পরো না?’ বাকিরাও তাতে যোগ দিয়ে হাহা করে হেসে উঠল। কালকে রাতে অমন তাড়াহুড়োয় শার্ট না পরেই দৌড়ে নেমে আসার কথা মনে পড়ে গেল। ইশ্! মান-সম্মানের যেটুকু বাকি আছে সেটা নিয়ে কোনোমতে সরে পড়তে পারলে বাঁচি এখন। কিন্তু সবার হাসিতে গুমোট ভাবটা সামান্য হলেও কেটে গেছে। দেখে ভালো লাগছে।

সূক্ষ্ম স্ট্রাইপের কালচে নীল শার্টটা চাপিয়ে ফিরে এসে দেখি লতার মা অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছেন। কারও ছায়া খুঁজছেন যেন। আস্তে আস্তে বললেন, ‘চমৎকার লাগছে, অনীক। লতার বাবাও লম্বা-চওড়ায় তোমার মতো ছিল। বাকি কাপড়গুলোও যদি নাও খুব খুশি হতাম। রেখে আর কী হবে?’ বলে খুব ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন যেন। মৃদু একটা ধন্যবাদ দিয়ে হাত বাড়িয়ে কাপড়গুলো নিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করলাম, এই মানুষগুলো যেন বিপুল এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি পান।

ঝড় ধরে এল একটু পরেই। বৃষ্টিটা চলছে যদিও। লতার কাছ থেকে একটা ছাতা নিয়ে ফ্রাউ কেলনারকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে কী মনে করে ছাতা ফেরত দিতে ফিরে এলাম। দরজার কাছে কাঠমুন্ডু অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আজকে যদি এই কাঠমুন্ডু বিড়ালের কাটা মুন্ডুটা হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতে পারতাম, তাহলে আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হতো না। ছাতাটা ম্যাক্সের হাতে ফেরত দিতেই সে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। ‘লতার জন্য অনেক কষ্ট দিলাম। আবার এসো। খুব ঘুরব তখন দুজন মিলে।’ ম্যাক্সের বজ্র বেষ্টনীতে আমার হাড়গোড়গুলো এদিকে মড়াৎ মড়াৎ করছে।

লতা এগিয়ে এসে ম্যাক্সের ভাইতুতো ভালোবাসার বেড়িজাল থেকে আমাকে উদ্ধার করল। রহস্য করে বলল, ‘অনীক, মাথাটা কাছে আনো তো।’ চরম নির্লজ্জের মতো ধড়-মাথা সব সমেত লতার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালাম। ক্রাচে ভর দেওয়া লতা হাত বাড়িয়ে চুলগুলো ইচ্ছেমতো এলোমেলো করে দিয়ে দক্ষ ম্যাজিশিয়ানের মতো কানের পাশ দিয়ে যে বস্তুটি বের করে আনল, সেটা হলো সকালে চুলে আটকে দেওয়া লতার তিন কোণা ক্লিপটা। হা হয়ে গেলাম। খেয়ালই ছিল না এটার কথা। চুলের কোন আড়ালে ঘাপটি মেরে ছিল। ক্লিপটা হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘রেখে দাও। আমি এসে ফেরত নেব। তদ্দিন আবার চুলে পরে ঘুরে বেরিয়ো না। লোকে ভুল বুঝবে।’ বলেই চোখ টিপি। পাল্টা চোখ টিপি একটা দিলাম বটে। কিন্তু আসলে ইচ্ছে করছে ম্যাক্সের মতো কান্ড করে লতার হাড়গোড় মড়মড়িয়ে দিই। মেয়েটা পাগল। পাগল মানুষ এত ভালো লাগে কেন?

খানিকবাদে গতিসীমাহীন অটোবানে উঠে উন্মাদ গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে ঘোর লাগা পরাবাস্তব জগৎটা পেছনে ফেলে আবার ফিরে যেতে লাগলাম পুরোনো একঘেয়ে জীবনের সাদাকালো বাস্তবতায়।

১৭.
ফ্রাউ কেলনারের পেটমোটা ব্যাগটা কোলে নিয়ে বিরস মুখে বসে আছি মেয়েদের ট্রায়াল রুমের সামনে। ফেরার পথে ফ্রাউ কেলনার আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটা শপিং মলে নিয়ে এসেছেন। মিউনিখ পৌঁছাতে রাত আটটা পেরিয়ে যাবে। তাই টুকটাক ডিম-রুটি ইত্যাদি কেনাকাটা সেরে নেবেন। কালকে আবার কীসের যেন বন্ধ। কিন্তু কীসের ডিম-রুটি কেনা, ফ্রাউ কেলনার দুই হাত ভর্তি কাপড় নিয়ে ভেতরে গেছেন। যদিও পরিষ্কার নোটিশ টানানো আছে, তিনটার বেশি নেওয়া যাবে না। আমার মতো আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী অলস বসে হাই তুলছেন কিংবা ফোনে ভিডিও গেম খেলছেন। চেহারায় গাঢ় হতাশা। নারী জাতির খপ্পরে পড়লে যা হয় আর কী। নাহ, এমন ভুল করা যাবে না কখনো। ভাবতে ভাবতে ব্যাগটার দিকে তাকালাম। এক পকেট খোলা। হাল ফ্যাশনের ঝাঁ চকচকে স্মার্টফোনটা উঁকি দিচ্ছে। চেইন টানা আরেক পকেটে পিস্তল সেবাস্তিয়ান ঘুমাচ্ছে। লতা কী এক মহিলার সঙ্গে থাকে রে বাবা!

আচ্ছা, লতা এখন কী করছে? নিশ্চয়ই কাঠমুন্ডু নামের ধরিবাজ বিড়ালটা পায়ের কাছে নিয়ে বসে আছে ড্রয়িংরুমে। হাতে কী গরম এক মগ কফি? রেশমের মতো চুলগুলো কী কপাল ঢেকে নেমে এসেছে? শেষ বিকেলের আলোয় লতাকে আরেক পৃথিবীর অপ্সরীর মতো লাগার কথা। সবুজ মণির চোখ আর সোনালি এলোমেলো চুলে একাকার লতার মুখটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি যেন। প্রতিমা গড়ার পর কারিগর যেমন দেখে। কল্পনায় ডুবে যেতে ভালো লাগছে।

বাঁধ সাধল সোমালীয় কী ইথিওপীয় চেহারার এক অল্পবয়সী মা। আমার বাদামি চামড়া দেখেই কিনা জানি না, সহজভাবে এগিয়ে এসে বললেন, ‘কিছু মনে না করলে দুই মিনিটের জন্য ওকে একটু দেখবেন? আমি এই দুটো জামা ট্রাই করে দেখব খালি। যাব আর আসব।’ হ্যাঁ-না কিছু বলার আগেই তিনি তার পাঁচ-ছয় বছরের ছেলেটাকে ধরিয়ে দিয়ে এক হাত উপচে পড়া জামাকাপড় নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। এদিকে ফ্রাউ কেলনারও বেরিয়ে এসে তার দাঁতের এক পাটি টিস্যু পেপারে মুড়ে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে গেলেন। প্রাইস ট্যাগের সুতা দাঁতে আটকে নাকি পুরো পাটি খুলে এসেছে। আমি পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এক হাতে ফ্রাউ কেলনারের টকটকে লাল হাতব্যাগ আর আরেক হাতে তার দাঁতের পাটি আর হাঁটুর ওপর পাঁজি চেহারার পিচ্চিটাকে নিয়ে ‘অ্যাজ আ মেটার অব ফ্যাক্ট’ ভঙ্গিতে বসে আছি। নিজেকে দশভুজা দুর্গা মনে হচ্ছে। যেকোনো সময় প্রয়োজন মাফিক বগল ফুঁড়ে আরও গোটা আষ্টেক হাত বেরিয়ে আসতে পারে। বলা যায় না।

বলা নাই, কওয়া নাই, কোলে বসা ইঁচড়ে পাকাটা থাবা মেরে দুই কান ধরে ফেলে ডিবি পুলিশের মতো জেরা শুরু করল, ‘এ্যাই, সত্যি করে বল তো, তুমি কি আমার মায়ের বয়ফ্রেন্ড নাকি?’ তব্দা খেয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি জুতসই উত্তর দিলাম, ‘আরে কী যে বল না? আমার তো গার্লফ্রেন্ড আছে। দেখলে না দাঁতের পাটি দিয়ে গেল? এখন কান ছাড় তো প্লিজ।’ আড়াই ফুটি ডিবি ইন্সপেক্টর কানটা অ্যায়সা জোরসে মুলে দিয়ে কী মনে করে আবার দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দিল। তারপরই আবার নতুন যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। চুল-দাঁড়ি নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। অতিষ্ঠ লাগছে রীতিমতো। কিন্তু কান মলা খাবার ভয়ে মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছি। এর চেয়ে কাঠমুন্ডু বিড়ালও বোধ হয় ভালো ছিল। কেন যে আজকে মাঝপথে গাড়ি থামাতে রাজি হলাম ভেবে নিজেকে শাপ-শাপান্ত করছি।

এর মাঝেই বিকট প্রিং প্র্যাং শব্দে ফ্রাউ কেলনারের ফোনটা বেজে উঠল। প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। লতার ফোন! কিন্তু ধরা কী ঠিক হবে? অন্যের ফোন। আর ধরবই বা কীভাবে। হাত দুটো ফ্রাউ কেলনারের দাঁত আর ফাজিল ছেলেটার কাছে আটক। বগল ফুঁড়ে হাত বেরোনোর এই তো মোক্ষম সময়। কিন্তু কই, হাত তো গজাচ্ছে না। এদিকে পিচ্চি নিজের কপাল দিয়ে আমার কপালে একটা বেদম ঢুঁ মেরে দিয়েছে। মুহূর্তেই শপিং মলটা সর্ষে ফুলের খেত হয়ে গেল। কিন্তু সর্ষে খেত থেকে বেরোবার আগেই সে আচমকা ধাক্কা মেরে দৌড় দিয়েছে মাকে বেরোতে দেখে। ধাক্কা লেগে ফ্রাউ কেলনারের দাঁত ছিটকে পড়ে দূরের ম্যানিকুইনের বেগুনি রঙের ইভিনিং গাউনের নিচে গায়েব হয়ে গেল।

ঝুপ করে বসে টপ করে সরিয়ে আনতে হবে দাঁতের পাটিটা। কারও চোখে পড়ার আগেই। নইলে পারভার্ট গোছের কিছু ভেবে বসতে পারে লোকজন। এমন সময়ে, ‘কিছু কি খুঁজছেন? সাহায্য করতে পারি?’ ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। হাতের টিস্যুতে লুকানো ফ্রাউ কেলনারের যত নষ্টের গোড়া দাঁত। পাওয়া গেছে। আল্লাহ বাঁচিয়েছে! আমতা-আমতা করে কী যেন বলতে যাচ্ছি আর ফ্রাউ কেলনার বেরিয়ে এলেন ট্রায়াল রুম থেকে। ‘অনীক, আমার দাঁত কই, ব্যাগ কই? আর ম্যানিকুইন জাপটে ধরে কী করছ ওখানে?’ দেখলাম, আসলেই তো! ম্যানিকুইনের কোমর ধরে ভর দিয়ে উবু হওয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। মাথাটা হেঁট হয়ে গেল একেবারে। যাতা সব কাণ্ডকারখানা আমার সঙ্গেই হয়? ধুস! সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলাকে অজস্রবার দুঃখিত দুঃখিত বলতে বলতে ব্যাগটা ছোঁ মেরে ফ্রাউ কেলনারকে এক রকম টানতে টানতে বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে।

গাড়িতে বসে মনে পড়ল, লতা ফোন করেছিল। সে কথা বলতেই ‘কী বলল ও’, জানতে চাইলেন ফ্রাউ কেলনার। বললাম, আপনার ফোনে করেছিল। ধরি কী করে?’ ফ্রাউ কেলনার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে তোমার ফোন দিয়ে একবার খোঁজ নিলে না কেন? লতার কেমন বন্ধু তুমি? আজব ছেলে তুমি, অনীক!’ কেমন বন্ধু সেটা তো ভেবে দেখিনি। তবে আজব তো বটেই, কারণ লতার নম্বরটাই তো জানা নেই। নেওয়াও হয়নি এত ঘটনা আর অঘটনের ভেতর। লতাও তো জানতে চায়নি। তাই আমিই বা চাই কী করে? এই আড়ষ্টতা আমার আজীবনের। আমি ফ্রাউ কেলনারের কথার উত্তর না দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে চুপচাপ ড্রাইভিংয়ে মন দিলাম।

তারপর পেরিয়ে গেছে এক, দুই, তিন দিন করে এক সপ্তাহ। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল বেঁচে থাকলে নির্ঘাত মাথা বরাবর অ্যানালগ ফোনের হাতল ছুড়ে মারতেন। যোগাযোগের এই স্বর্ণযুগে আমি পড়ে আছি ঘ্যাংর ঘ্যাং কুয়ার ব্যাঙ হয়ে। নাম না জানা একটা বিচিত্র অপেক্ষা নিয়ে সকালের রোদ মেখে, সন্ধ্যার তারা গুনে পার করে দিচ্ছি দিনগুলো। আর থেকে থেকে খালি মনে হয়, এই শহরে এত গাছ, এত সবুজ, তবুও যেন অক্সিজেনে বড় অভাব। আরও কিছু লতাপাতা থাকলে বোধ হয় ঠিকঠাক শ্বাস নেওয়া যেত।

চাকরিটা শুরু হতে আরও এক সপ্তাহ বাকি। ব্যস্ততা ভালো ওষুধ। কিন্তু ওষুধের অভাবে আপাতত দৌড়াদৌড়ি করে কাটাচ্ছি। সকাল-বিকেল দুই বেলায় দৌড়াই। আগে দৌড়াতাম নদীর পাড়ে। এখন দৌড়াই লতা আর ফ্রাউ কেলনার যেই বাড়িটায় থাকেন, সেই ব্লকটার চারদিকে। সেই তো আবার গ্রহ আর উপগ্রহ খেলা। এই কক্ষপথে কখন যে কীভাবে নিজের অজান্তে আটকে গেছি, জানা নেই। বাড়িটার সামনে বিশাল চেরি গাছ। তাতে দাঁড়কাকের বাসা। কাকের বাসায় তিনটা ডিম। সব মুখস্থ হয়ে গেছে। ফ্রাউ কেলনার পঁইপঁই করে বলে দিয়েছিলেন, যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাই এক দিন। ইচ্ছে করেই যাইনি। তার বদলে ঘর অন্ধকার করে বসে থাকি লতার ক্লিপটা হাতে নিয়ে। কিংবা মানিব্যাগটা খুলে শ খানেকবার দেখি ছোট্ট নীল উলের বলটা। লতার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হলো, সেদিন আমার হাতঘড়িতে আটকে ওই যে তার নীল টুপি থেকে উলের সুতাটা খুলে এসেছিল। হাতের আঙুলে বল বানিয়ে সযত্নে রেখে দিয়েছি মানিব্যাগের আশ্রয়ে।

সাত দিনের মাথায় মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেল। প্রতি রাতে ডিনার সেরে এক কাপ চা খাই। আজকে চা খাবার বদলে মানিব্যাগ থেকে উলের বলটা বের করে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিয়ে কোৎ করে গিলে ফেলতে গেলাম। ফ্ল্যাটের রাশিয়ান ছেলে ভ্লাদিমির কিচেনে কী একটা নিতে এসে দেখে বলটা মুখে পুরে ফেলছি প্রায়। ‘কী খাচ্ছ তুমি? বিয়ার-ওয়াইন ডিঙিয়ে এক লাফে লাল-নীল বড়ি? বাড়িওয়ালাকে জানিয়ে দেব কিন্তু।’ কথাটা যদিও পানির মতো ভদকা গিলতে থাকা ভ্লাদিমিরকে মানায় না। অভয় দিয়ে বললাম, ‘আরে ধ্যাত, কী বল, বনবন খাচ্ছি।’ বনবন লজেন্সের জার্মান নাম। কিন্তু ভ্লাদিমির নাছোড়বান্দা, ‘হাতে দাও, আমিও একটা খাই।’ বাধ্য হয়ে হাতের মুঠ খুললাম। অবাক ভ্লাদিমির বলটা আলতো করে তুলে পরখ করে দেখতে দেখতে বলল, ‘ঘটনা কী, ম্যান? ঝেড়ে কাশো তো? কিছু একটা বিহাইন্ড দ্য সিন আছে মনে হচ্ছে, হুম?’ ‘সিন টিন কিছু নেই, সরো তো, দৌড়াতে যাব’। বলে উঠে আসতে গেলাম আর ব্ল্যাক বেল্টওয়ালা ভ্লাদিমির ক্যারাটের এক প্যাঁচে ধরাশায়ী করে মেঝেতে ফেলে দিল। এই কাজ সে প্রায়ই করে। কাছের স্পোর্টস ক্লাবটায় একসঙ্গে যাই আমরা। অন্যদিন হলে আমিও একটা ফিরতি মার দিতাম। নয়তো অন্তত ব্লক করে মারটা আটকে দিতাম। আর আজকে এই চীনা জোঁকের হাত থেকে কোনোমতে ছুটতে পারলে বাঁচি। কিন্তু চাপাচাপি আর বেধড়ক মারামারির পাল্লায় পড়ে শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে বাধ্য হলাম, ‘থাম, থাম, বলি, বলি।’

আধা ঘণ্টা পর ভ্লাদিমির আবার একটা ঘুষি মারল। পেট বরাবর। বাম কিডনি ইন্না লিল্লাহ বলে মারা গেল মনে হলো। ‘অনীক, এটা তোমার গাধামির জন্য। আর কী কী গাধামি করে বেড়াচ্ছ দেখি তো।’ তারপর ফ্রিজ খুলে আবিষ্কার হলো দুই লিটারের আধ খাওয়া আইসক্রিমের বাক্স। টেবিলের ওপর পাওয়া গেল ল্যাপটপে চলতে থাকা ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’। হেডফোন লাগিয়ে দেখছিলাম। এই নিয়ে সাতবার। ভ্লাদিমির এবার সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দৌড়াতে না যাবে বলছিলে, যাও। আর ফ্রাউ কেলনারের কাছ থেকে লতার ফোন নম্বরটা নিয়ে আসবে। নইলে বাসায় ঢোকা বন্ধ। এমন লুতুপুতু, কেঁচো-শামুক কোনো ছেলের এই বাসায় থাকার দরকার নাই।’ ভ্লাদিমিরের শেষ কথাটা গায়ে বিছুটির মতো লাগল। আমি কেঁচো!

কেঁচো থেকে এখন আমি এক লাফে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়ে যাব। গতি বাড়ালাম। বাইরে শান্ত রাত। আকাশটা তারায় তারায় ছেয়ে যাওয়া। চেরি গাছগুলো থেকে বেসামাল মিষ্টি ঘ্রাণ উড়ে আসছে। লতার বাসার কাছে এসে আস্তে আস্তে গতি কমিয়ে দিলাম। পায়ের শব্দে দাঁড়কাক দুটো বিরক্ত হয়ে গাছ থেকে উঁকি দিল। তাদের ছানা ফুটে গেছে। সকালেও ডিম দেখে গেছি। আরে, একি? লতার ঘরটায় আলো! স্বচ্ছ সাদা লেসের পর্দার ওপাশে দুটো ক্রাচ। জানালার সামনে ভর দিয়ে রাখা। বুকের ভেতর ধপ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিকল হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে অচল দাঁড়িয়ে পড়লাম।

১৮.
পায়ের লোমগুলো যেন ঘাড় উঁচিয়ে তাকাচ্ছে আর বলছে, ফিরে যা, ফিরে যা। আসলেই, দৌড়ের শর্টস আর হুডি পরে এ বাড়িতে উদয় হওয়াটা ঠিক হয়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে পায়ের লোম কোনো বড় সমস্যা নয়। ঘাপলা অন্যখানে। লতা আর ফ্রাউ কেলনারের আচার আচরণ অদ্ভুত ঠেকছে। সোফায় বসা লতা বাতাসে এলোপাতাড়ি ক্রাচ ঘুরিয়ে কী যেন বিড়বিড় করছে। নাগালের ভেতর দাঁড়ানো আমার মাথায় ক্রাচের একটা বাড়ি মাথায় পড়লে ভবলীলা সাঙ্গ আর পায়ে লাগলে তো নিশ্চিত পঙ্গু। ওদিকে, ফ্রাউ কেলনার ভোজালি আকৃতির ঢাউস এক ছুড়ি দিয়ে সশব্দে টমেটো কাটছেন। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে আমাকেও কেটে ফেলতে পারেন টমেটোর সঙ্গে। ভুল সময়ে চলে আসলাম মনে হচ্ছে।

ক্রাচ আর ভোজালি নামিয়ে দুজন মিলে এবার মাথা-মুণ্ডুহীন সব প্রশ্ন ছোড়া শুরু করল। কবে ফিরেছি, ঘটনা কবে ঘটল, সে কখন আসবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ধাঁধায় পড়ে গেলাম। শেষটায় অধৈর্য হয়ে বলতে হলো, ‘মাফ চাই, কিচ্ছু বুঝছি না। কোথাও তো যাই-ই–নি যে ফিরতে হবে। এর ভেতর আর কী এমন ঘটে গেল যার কারণে “তাকে” আসতে হবে? এই “সে” টাই বা কে?’

ফ্রাউ কেলনার শীতল গলায় বললেন, ‘সব জানি। ব্যাঙ খাটাশ নামের যে ভারতীয় ছাত্রটা লতার আগে থাকত এখানে, তারও একই কেস ছিল।’ লতা আবার পাশ থেকে ধুয়ো তুলছে ‘সব শিয়ালের এক রা। লেজকাটা শিয়াল সব।’ আমি শিয়াল? তাও লেজকাটা? ভেতরের রয়্যাল বেঙ্গলটা ঠুস করে ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল। আর ব্যাঙ খাটাশই বা কোন চিড়িয়া? পরক্ষণেই অবশ্য বুঝে নিয়ে এক চোট হাসলাম মনে মনে। হাল না ছেড়ে জানতে চাইলাম, ‘তা, ভেঙ্কটেশের কেসটা কী ছিল?’ উত্তরে দুজন একসঙ্গে কিচমিচ করে যা বলল তা হলো, ভেঙ্কটেশ একদিন বলা কওয়া ছাড়া দেশে চলে যায়। দিন দশেক পর ফিরে এসে ঘোষণা দেয়, সামনের মাস থেকে সে ঘর ছেড়ে বড় ফ্ল্যাটে উঠে যাবে। কারণ সে বিয়ে করে এসেছে। সামনের মাসে বউ চলে আসবে উড়ে। শুনে কলিজা ঠান্ডা মেরে গেল। শুনতে পেলাম, পায়ের লোমগুলো আবার কথা বলা উঠছে, ‘লেও ঠেলা, অনীক মিয়া! এক সপ্তাহ গা ঢাকা দেওয়ার মাশুল গোনো এবার।’

এরপর পাক্কা আধ ঘণ্টা লেগে গেল এই দুই ভদ্রমহিলাকে বোঝাতে যে, আমাকে বিনা দোষে দোষী করা হচ্ছে। মাঝে অতি উৎসাহী ফ্রাউ কেলনার উঠে এসে আমার আঙুল উল্টে পাল্টে আংটি জাতীয় কাল্পনিক কিছু একটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করে আবার টমেটোগুলোর কাছে ফিরে গেছেন। ‘যা হোক, অনেক রাত, আজকে উঠি, আরেকদিন আসব। আর তোমাদের ভেঙ্কটেশ অনেক সাহসী ছেলে। এত দুঃসাহস আমার নেই। তা ছাড়া, আমি তো আর...’ বেফাঁস একটা কিছু বলতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে সামলে নিলাম।

উঠে আসতে যাব আর লতা ক্রাচ বাগিয়ে কবজিতে বিঁধিয়ে হিড়হিড় করে টেনে আনল তার সামনে। খিটমিটিয়ে হাসছে সে ঠোঁট টিপে। ‘কিছু বলবে?’ কথাটা বললাম দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে। চোখাচোখি হতে দেওয়া যাবে না। তাহলেই সিঁধেল চোর বমাল ধরা পড়ে যাবে। কোনো কথা না বলে লতা হাত বাড়িয়ে এক টুকরো কাগজ গুঁজে দিল হাতের মুঠোয়। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড শক খেলাম। ঘর্ষ বিদ্যুৎ! প্রায়ই হয় এমন। দরজার হাতলে। আজকে যোগ হলো লতার হাত। কাণ্ড দেখে লতা খিকখিক করে হাসছে। পিত্তি জ্বলে গেল। ঠিক করলাম, এই মেয়েকে একদিন এমন শক দেব! খিকখিক তখন হাউমাউ হয়ে যাবে।

বেরিয়ে এসে নোট খুলে দেখি লেখা, ‘এই মঙ্গলবার সেই কফিশপটায়? সকাল এগারোটায়।’ নিচে ফোন নম্বর দেওয়া। তারও নিচে আবার একটা হুমকিও আছে, ‘না আসলে কিন্তু...’, পাশে ছবি কঙ্কালের খুলির ওপর আড়াআড়ি দুটি ক্রাচ। মনটা ভরে গেল আশ্চর্য উষ্ণতায়। নোটটা সযত্নে বুক পকেটে রাখলাম। কিন্তু চেরি গাছের বেআক্কেল কাক দুটোর আর সহ্য হলো না। কাঁধ বরাবর কালো হুডিটার ওপর সাদা একটা অস্ট্রেলিয়ার ম্যাপ এঁকে দিল। অন্য সময় হলে মনে হয় ইট ছুড়তাম। কিন্তু আজকে কাক বাবা-মার দিকে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে বাউ করে একটা অভিনন্দন ছুড়ে দৌড় শুরু করলাম ফিরতি পথে।

১৯.
এভাবে আর কতক্ষণ ডাল আঁকড়ে গাছে বসে থাকব, ভাবছি। সকালে ভ্লাদিমিরের প্যাঁচা মুখ দেখে বেরোনোর ফল। নইলে কী আর এই দশা হয়। সসেজ আকারের ছয় ইঞ্চি খয়েরি একটা কুকুর তার মনিবের পিছু পিছু হাঁটছিল। আমিও মনের সুখে এগোচ্ছিলাম কফিশপটার দিকে। হাতে সময় নিয়ে বেরিয়েছি। আস্তে ধীরে হাঁটলেই হবে। হেডফোনে চমৎকার গান বাজছে। পাশ দিয়ে যাচ্ছি আর বজ্জাতটা হঠাৎ ঘেউমেউ করে ক্ষেপে গিয়ে পা বরাবর কামড়ে দিতে চাইল। লাফিয়ে সরে আসলাম বটে, কিন্তু তার সঙ্গে লতাদের ডার্মষ্টাডের বাড়িতে বসে ম্যাক্স যা যা কুকুর বৃত্তান্ত বলেছিল, সব মনে পড়ে গেল। কুকুরে কামড়ালে চৌদ্দটা ইনজেকশন!

বিরক্তি ভরে লোকটাকে বলতে গেলাম, ‘আশ্চর্য! কী রকম কুকুর পোষা হয়, হ্যাঁ? কামড়াতে আসছে যে।’ মুখ থেকে কথা সরার আগেই লোকটার হাত থেকে রশি ছুটিয়ে চারপেয়ে সসেজটা আমার দিকে ছুটে এল। মাথার ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, বাজান রে, দৌড় দে। নইলে কিন্তু চৌদ্দটা...। ঘাবড়ে গিয়ে আমিও ছুট লাগালাম। প্রায় এক কিলোমিটার পথ সেই রকম দৌড়ানি খাওয়ার পর কপাল জোরে এই গাছটা দেখতে পেলাম। আর সেটাতেই উঠে মিনিট পনেরো যাবৎ ফেরারি আসামির মতো পালিয়ে আছি। একটু আগে কুকুরের মালিককে শিস দিয়ে ডাকতে ডাকতে খুঁজতে দেখলাম, ‘উর্স্টি সোনা, কই তুমি, টুইট, টুইট...।’ বাহ্, বলিহারি নাম বটে। উর্স্ট মানে সসেজ। সেই উর্স্ট থেকে উর্স্টি। কিন্তু সসেজটাকে আর দেখছি না অনেকক্ষণ। নামব নাকি?

ইশ্, সেরেছে! লতাকে দেখা যাচ্ছে। গাছের ডালে বাঁদরের মতো বসে আছি দেখলে না জানি কী ভাববে। কিন্তু ফাজিল কুকুরটা আসলেই চলে গেছে না গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে, এটাও বোঝা দরকার। সুতরাং, কী আর করা। লতার সামনে আত্মপ্রকাশ করতেই হলো। ‘পিসস্, পিসস্, লতা, এই, ওপরে তাকাও।’ কিন্তু, কী আশ্চর্য! সামান্য স্বরও বেরোল না গলা দিয়ে। তার বদলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিলাম এক হাঁচি। হ্যাঁচ্চোওও...সর্বনাশ! গাছটা ফুলে ফুলে ভরা। ফুলের রেণুতে আমার মারাত্মক অ্যালার্জি। কিন্তু হাঁচিটাই বাঁচিয়ে দিল। লতা মুখ তুলে তাজ্জব বনে গেল। ‘অনীক, তুমি ওখানে? কী ব্যাপার? আবার বলো না যে ফুল পাড়তে উঠেছিলে।’ সঙ্গে গা জ্বালানো হাসি। মেয়েরা এত কাণ্ডজ্ঞানহীন হয় কী করে? এই বিপদের ভেতর লতার আচরণে রাগ হলো খুব।

নিউটনের আপেলের মতো টুপ করে গাছ থেকে পড়লাম। ইচ্ছা ছিল ঘাড় বরাবর সিন্দাবাদের ভূত হয়ে নেমে ঘাড়টা মটকে দিই। কিন্তু আজকে ঠিক করে এসেছি কোনোরকম চোটপাট করব না। ভীষণ ভদ্রলোক হয়ে থাকব। কিন্তু লতাকে সসেজ কুকুরের কাহিনি বলতেই সে আরেক দফা হেসে গায়ের ওপর লুটিয়ে পরে আর কী। সবকিছুতেই এদের চটুল হিহি হাহা। উফ্, অসহ্য। চোয়াল শক্ত করে কোনোমতে সহ্য করে গেলাম।

কফিশপে ঢুকে লতা মেন্যু কার্ডে ডুবে গেল। সে নাকি আজকে সব খেয়ে ফেলবে। অনেক দিন পর আজকে বাইরে খাওয়া। আতঙ্কে পকেট চেপে ধরার বদলে কান চেপে ধরে ঢোক গিলছি। গাছে বসেছিলাম যখন, কোন ফাঁকে যে মৌমাছি চামে চিকনে বাম কানটায় হুল ফুটিয়ে দিয়েছে। পিন ফোঁটার মতো সামান্য লেগেছিল তখন। এখন যতই সময় গড়াচ্ছে, কান ফুলে ধান ভানার কুলার মতো আকার নিচ্ছে। ভয়ে আছি, যেকোনো মুহূর্তে লতার চোখে কানের বেচাইন অবস্থা ধরা পড়ে যাবে। আর সে আরেকবার আমাকে ভেড়া বানিয়ে হাসাহাসি জুড়ে দেবে। লাগবে না আমার লতাপাতা। কোনোমতে আস্ত কান নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে পারলে বাঁচি।

এই রে, আরেকটা হাঁচি আসছে নাকি? নাক তো দেখি সুর সুর করছে। লতা মেন্যু থেকে মুখ তুলে বলছে, ‘অনীক, ডোনার কাবাব নেবে নাকি একটা? একবারে লাঞ্চ হয়ে গেল তাহলে?’ ওদিকে তখন হাঁচিটা গিলে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টায় করছি, ‘হ্যাঁ...হ্যাঁহ...।’ লতা উত্তর পেয়ে খুশি মনে উঠে গেল অর্ডার দিতে। আর আমি সমস্ত ইহ জাগতিক ভদ্রলোকামির নিকুচি করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কাঁপিয়ে দিলাম এক হাঁচি, হ্যাঁচ্চোওওহ...। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অল্পবয়সী ওয়েটার ছেলেটার হাত থেকে কাটা-চামচের ঝুড়িটা উল্টে ঝনঝনিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। কার্নিশে বসা কবুতরগুলো বাকুমবাকুম শব্দে ঝাঁক বেঁধে উড়ে পালাল। আর কালপ্রিট আমি, লতার দিকে ভীষণ একটা অসহায় চাহনি ছুড়ে দিয়ে আবার কান ঢেকে বসে থাকলাম। লতার মুখটায় ক্ষণিকের জন্য বিচিত্র মায়া খেলে গেল যেন। নাকি চোখের ভুল?

টেবিলে ফিরে এসে লতা তার ব্যাগ থেকে হালকা গোলাপি একটা রুমাল বের করে আস্তে করে ঠেলে দিল। বিনা বাক্যব্যয়ে গোলাপি রুমালটা নিয়ে সোনার চেইন, সনি টিভি, মোটরসাইকেল যৌতুক নেওয়া বরের মতো নাকে চেপে ধরলাম। হাঁচি থেকে বাঁচা বলে কথা।

খাবার দিয়ে গেছে ওয়েটার। আবার হাঁচির ভয়ে তিন কামড়ে নামিয়ে দিয়েছি কখন। গালে হাত দেওয়ার ভঙ্গিতে ফুলে ঢোল হয়ে ওঠা কানটা ঢেকে রেখেছি। আর কফির কাপে অলস চুমুকের ফাঁকে লতার স্লো মোশনে খাওয়া দেখে যাচ্ছি। সে ডুবে আছে কাবাব-সালাদের দুনিয়ায়। আর আমি ডুবে আছি লতায়পাতায় ঘেরা এক মায়ার ভুবনে। কিন্তু পাঁচ মিনিট তাকিয়ে থাকার পর মায়া পুরোপুরি উবে গেল। উল্টো বিরক্তি লাগা শুরু হলো। এই মেয়ের প্লেট শেষ হওয়ার অপেক্ষায় তো রবিনসন ক্রুশোর মতো আমার চুল দাঁড়ি পেকে যাবে! তার ওপর খাওয়ার মাঝে লতা কোনো কথাই বলছে না।

উসখুস করে উঠেছি, লতা খাওয়া থামিয়ে কথার ফুলঝুড়ি মেলে বসল। পা পুরোপুরি সেরে উঠলে তার কত কী প্ল্যান—সেই নিয়ে। সে আবার কোন কোন পাহাড়ে চড়বে, কই কই ঘুরতে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনতে শুনতে একঘেয়েমিতে আমি হদ্দ হয়ে যাচ্ছি। মাথাটা ঘোলাটে হয়ে আসছে। লতার কথাবার্তা এখন মহিলা মশার ভন ভন অত্যাচার। হঠাৎ পরিচিত একটা শব্দে চমক ভাঙল। লতা বলে চলেছে, এই ডিসেম্বরে সে আবার এক ডাক্তারি দলের সঙ্গে হয় দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে যাবে, নয়তো বাংলাদেশে রাজশাহীতে যাবে। নড়েচড়ে বসলাম। ডিসেম্বর? আমার তো এই ডিসেম্বরে দেশে যাওয়া হবে না। নতুন চাকরি থেকে ছুটি মিলবে না। নাকি চেষ্টা করে দেখব? ওদিকে, লতা বলেই চলছে, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশে তো একবার গিয়েছি। নতুন অভিজ্ঞতা দরকার।’ বিরক্তিটা যেন বুমেরাং হয়ে ফিরে এল। নতুন অভিজ্ঞতার গুষ্ঠি কিলাই। দক্ষিণ আফ্রিকা মাই ফুট! যাক গে লতা যেই চুলায়। নাটালের জুলু-পিগমিদের গ্রামে গিয়ে হেপাটাইটিসের টিকা খাইয়ে আসুক কী ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়ে আসুক। আমার কী?

মেজাজটা খাপ্পা হয়ে আছে। হাত গুটিয়ে ভোম মেরে আছি। ঝামেলাটা লেগে গেল এখানেই। লতার চোখের অ্যান্টেনায় আমার কুলা কান আটকে গেল। ‘কানে কী হয়েছে, অ্যাঁ? বোলতা-টোলতা কামড়ে দিয়েছে নাকি?’ উত্তর না দিয়ে বিল মেটাতে উঠে গেলাম। আমার আর লতার কাবাব তো বটেই, তার ওপর লতার চকলেট কেক, আইসক্রিম আর বিশাল একটা কোল্ড কফি। মানিব্যাগ মরুভূমি! লতা পিছু পিছু উঠে এসেছে। রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আসতে টিস্যুর ওপরে খশখশ করে কী সব নাম লিখে দিয়ে বলল, ‘অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন। এই ওষুধটা কিনে খেলে চলে যাবে আধবেলার মাঝে।’ হাতির কান হয়ে ওঠা বেঢপ বাম কানটা ঝাঁকিয়ে উদাসভাবে বললাম, ‘কিনব না, ওষুধে আমার অ্যালার্জি।’

২০.
করপোরেট অফিসের এটিকেট মেনে ফরমাল পোশাকে ফুলবাবু সেজে আসতে হয়। বিরাট অস্বস্তি নিয়ে সারা দিন গলায় ফাঁসের মতো টাই বেঁধে রাখি। টি-শার্ট, জিনসের আরাম জীবন থেকে নাই হয়ে গেছে একরকম। তার ওপর কাজের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। দম ফেলারও সময় মিলছে না। বাধ্য হয়ে লতার কাছ থেকে লুকিয়ে বাঁচিয়ে পালিয়ে চলা হচ্ছে এই মাসখানেক। মাঝে ওদিক থেকে বার কয়েক আগ্রহ দেখানো হলেও এদিক থেকে ‘হ্যাঁ, হু, আচ্ছা, দেখি’ করে পাশ কাটানো হয়েছে। আর ছুটির দিনে লতা ইদানীং বাড়ি চলে যায় মায়ের কাছে। তাই হাজার ইচ্ছে থাকলেও ব্যাটে-বলে মিলছে না।

এভাবেই ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো নিজের থেকে উল্টে পাল্টে গিয়ে কখন যে ডিসেম্বরে এসে থামল, বুঝতেই পারিনি। কিন্তু একদিন সময় বের করতেই হলো। অনুরোধটা লতার ভাই ম্যাক্সিমিলিয়ানের। লতার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। পায়ের রিপোর্ট দেখে কী একটা সিদ্ধান্ত জানাবার কথা। ম্যাক্সের খুব ইচ্ছা ছিল আসার। কিন্তু কাজে আটকে গেছে। আর খবরে সে পড়েছে, মিউনিখ শহর নাকি গলা বরফে ডুবে গেছে। কথা সত্য না। হাঁটু বরফ পড়েছে মাত্র কোথাও কোথাও। তবে ‘গ্লাট আইস’ মানে পিচ্ছিল বরফে ঢাকা পথঘাট এখন বেজায় বিপজ্জনক। ম্যাক্সের ভয়, লতা কোথাও ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়ে গেলে আবার কী বিপদ হয়। তাই আমি যদি খুব ঝামেলা মনে না করি, তাহলে যেন লতার সঙ্গে যাই। এমনিতেই কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। তাই সানন্দেই রাজি হয়ে গেলাম। অফিস থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে নিলাম। আর লতা এই কয় মাসে চুল পেকে, দাঁত পড়ে কী রকম খিটখিটে বদরাগী বুড়ি হয়ে গেছে, সেটা দেখার ইচ্ছেটাও মনের ভেতর বড় হতে হতে তিমি মাছের আকার নিয়েছে।

কপাল এমন যে দিনটার শুরুই হলো হুলুস্থুল তুষারপাতের ভেতরে। ভারী টুপি, মাফলার আর ওভারকোটে মোরব্বা হয়ে ছাতা মাথায় রওনা হলাম লতার বাসার পথে। পৌঁছে কলিং বেল টিপে দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়ে আছি। এই মাইনাস সাতেও হাত ঘামছে। হতাশ করে দিয়ে দরজা খুললেন ফ্রাউ কেলনার। আর খুলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে কী সব বলতে বলতে এই পাঁচ ফুটি ভদ্রমহিলা শূন্যে লাফিয়ে ছয় ফিট উঁচুতে টুপির আড়ালে লুকানো চুলগুলো হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে এনে গালে চকাম্ করে চুমু খেয়ে ফেললেন। তারপর টালমাটাল আমি কোনোমতে সিধে হয়ে দাঁড়াবার আগেই শুরু হলো গালাগালের তুবড়ি। আমি নাকি একটা আলসের ডিপো আর কুলটুর (কালচার) না জানা ভূত। চেহারা রাসপুতিনের মতো হলে হবে কী, মনটা ঠিক রোমের নীরোর মতো পাথর। নইলে কেন এত দিনে তাকে একবারও দেখতে এলাম না। বাংলাদেশের ছেলেরা এমন ‘মিনসে’ টাইপ হতে পারে সেটা তার জানা ছিল না। জবাবে আমি বৃথাই কাজের দোহাই পাড়ছি আর অসহিষ্ণুর মতো খুঁজছি যেন কাউকে। কিন্তু সে কই?

‘অনীক!’ ডাক শুনে চেয়ে দেখি লতা। মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য কথা হারিয়ে গেল। ফ্রাউ কেলনারের ড্রইংরুমটা আলো করে নেমে এসেছে কোনো আকাশের পরি। দীঘল সোনালি বেণি কাঁধ বেয়ে নেমে এসে লুটিয়ে পড়েছে টকটকে লাল কোটের ওপর। ঠোঁটে হালকা রঙের আভা। সবুজ চোখে গাঢ় কাজল। লাল-সোনালির-সবুজের অপূর্ব তরঙ্গে অভিভূত হয়ে পড়লাম। আকাশের পরিদের ক্রাচ থাকে না। আর এই পরিটা জগৎ–সংসারের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। চোখ ফিরিয়ে নেয় সাধ্য কার। মুগ্ধতার অতলে, মনের গভীরে শুরু হলো আরেক তুষারপাত।

ফ্রাউ কেলনারকে আজকে মারাত্মক সুন্দর লাগছে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। সে কী রাসপুতিনের রানি হবে নাকি ইত্যাদি বলে বুড়ির মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। যাকে বলার, সেই সাহস নেই দেখে এই চালাকি।

লতাকে নিয়ে বরফ ঢাকা মসৃণ ফুটপাথ ধরে হাঁটছি খুব সাবধানে। আর দম ছাড়ছি তার থেকেও সাবধানে; পাছে লতা ধুকপুকানি শুনে ফেলে। চোরের ভয় পুলিশ পুলিশ। আবোলতাবোল ভাবার বেখেয়ালে পা হড়কে পিছলে পড়ার জোগাড় হলো। কিন্তু লতা খপ করে কোটের হাতা ধরে ফেলায় মাথাটা এ যাত্রায় চৌচির হওয়া থেকে বাঁচল। কে যে কাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বোঝা মুশকিল। ম্যাক্স আর লোক পেল না।

বাস পাওয়া গেল না। স্টপেজের ডিজিটাল স্ক্রিনে একটা লাইনই ভেসে যাচ্ছে, ‘পরবর্তী বাসের সময়সূচি অনিশ্চিত...পরবর্তী বাসের সময়সূচি অনিশ্চিত...।’ লতা মাথা নেড়ে প্রস্তাব করল, ‘চল হেঁটেই যাই।’ রাজি হলাম না। কারণ পথ আসলেই ভীষণ পিচ্ছিল। খামোখা যেচে পড়ে বিপদ ডেকে আনার মানে হয় না। দুশ্চিন্তা ঘুচিয়ে পাঁচ মিনিটের মাথায় বাস চলে এল। হাজার দুর্যোগেও এ দেশে সব সচল। সময়ের হেরফের হয় বটে, এই যা।

বাসে চড়ে দেখি, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী’ অবস্থা। হরেক লোকের ভারে একেবারে গিয়েছে ভরি। ভিড় ঠেলে দেখি একটাই মাত্র আসন খালি। দ্রুত লতাকে বসিয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। লতা কৃতজ্ঞতার হাসি ছুড়ে দিল। আমিও শূন্য থেকে হাসিটা মুঠোয় পুড়ে পকেটে রাখলাম। লতা দুষ্টুমি করে চোখ টিপি দিল। আমিও ভ্রু কুঁচকে মিথ্যে রাগ দেখালাম। এই নির্বাক খুনসুটিতে লতার পাশে বয়স্ক ভদ্রমহিলা রীতিমতো বিরক্ত মনে হলো। মারকুটে চাহনি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে তার মনের কথা, ‘আমাদের মেয়েটার সঙ্গে এই হ্যাংলা ঢ্যাঙা বিদেশি ছেলেটা কী করছে? খুব ইটিশ-পিটিশ, অ্যাঁ?’ বুঝলাম, ব্রহ্মাস্ত্র বের করতে হবে। টুপি খুলে ফেললাম। মুক্তি পেয়ে কপাল ঢেকে নেমে এল অবাধ্য কালো চুল। এলোমেলো আঙুল চালিয়ে চুলগুলো শাসনে এনে ক্লিন শেভড গালে গভীর টোল ফেলে, যতখানি সম্ভব কিশোরীমোহন ভঙ্গিমায় হাসা যায়, তেমনি করে হাসলাম। আর সামান্য মাথা হেলিয়ে বললাম, ‘দুঃখিত, এই চুপ করছি আমরা।’ উত্তরে, বিরক্তি মুছে প্রচ্ছন্ন প্রশংসা খেলে গেল ভদ্রমহিলার চোখে। যাক বাবা, ব্রহ্মাস্ত্র কাজে দিয়েছে তাহলে। সব সময় দেয় না। কিন্তু আজকে দেখি এক ঢিলে দুই পাখি কুপোকাত। পাশের সিটে বসা লতা ক্রাচ ছেড়ে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে। ধড়াম শব্দে ক্রাচ ছিটকে পায়ের কাছে পড়তেই আরক্ত মুখে সেটা তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরো ব্যাপারটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম।

জায়গামতো এসে বাস ছেড়ে নেমে পড়লাম। এরপর পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটা পথ। লতা টুক টুক করে কথা বলে যাচ্ছে। গভীর মনোযোগে শোনার ভান করে এই মানবীর পাশাপাশি চলছি। সে বলে যাচ্ছে, তাদের দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার বন্দোবস্ত সব হয়ে এসেছে। আজকে ডাক্তার যদি বলে দেয়, যে আর ক্রাচ লাগবে না, পা ঠিক হয়ে এসেছে, তাহলে সে বাসায় ফিরেই টিকিট কেটে ফেলবে। তারপর চট করে ক্রাচটা হাতে ধরিয়ে দুই কদম হেঁটে দেখাল, আসলেই ক্রাচের প্রয়োজন তার ফুরিয়েছে। আনন্দে হতবাক হয়ে গেলাম। লতার পা ভালো হয়ে গেছে তাহলে। এখন সে যেখানে ভালো লাগে ঘুরে আসুক। সেদিনের মতো আর রাগ লাগল না। বরং একটা হতবিহ্বল ভালো লাগা বুকের ডান থেকে দৌড়ে বামে হৃৎপিণ্ড বরাবর আছড়ে পড়ল।

ওয়েটিং রুমে কোট না খুলে বসে আছি। এদের হিটার বন্ধ নাকি। অনেক অপেক্ষার পর লতার ডাক পড়েছে। কিন্তু সেও কতকাল আগে। সেই যে ভেতরে ঢুকেছে, আর বেরোবার লক্ষণ নেই। নাকি সে আমাকে বসিয়ে রেখে পেছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিয়েছে? ইতং বিতং ভাবছি। এমন সময়ে দরজা খুলে দুরদার করে বেরিয়ে এল লতা। ফরসা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে লিফটের কাছে পৌঁছে বোতাম টিপে দিয়েছে। তারপর মত পাল্টে ক্রাচে ভর দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকল। আমিও ছুটলাম পিছু পিছু। কিন্তু ঘাবড়ে গেছি। ঘটনা পুরো মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। থামতে বললেও এই জেদি মেয়ে শুনছে না। বাইরে এসে ধরে ফেলেছি লতাকে প্রায়, কিন্তু অসাবধানে বরফে পিছলে হোঁচট খেলাম। লতা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। ধাতস্থ হয়ে আবার লতাকে পাকড়াও করতে ছুটলাম। লতা বেহিসাবির মতো রাস্তা পার হচ্ছে। বিরক্ত লোকজন গাড়ি থেকে হর্ন চেপে মাথা বের করে গালি দিচ্ছে। আর না পেরে এবার চিৎকার করলাম, ‘শার্লট, থামো প্লিজ!’

নিজেও কয়েকটা গালাগাল খেয়ে ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে লতাকে ধরে ফেললাম। কোনো কিছুর পরোয়া না করে লতার কাঁধ দেয়ালে ঠেসে গর্জে উঠলাম, ‘এসব পাগলামির মানে কী, হ্যাঁ? মরার শখ জেগেছে খুব, না? যত্তসব নাটুকেপনা!’ লতা কোনো কিছু না বলে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। লম্বা একটা দম নিয়ে দেখি লতা চোখের সীমানায় টলমল সাগর আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় ঠোঁট কামড়ে রেখেছে। দপ করে আমার রাগ জল হয়ে গেল। কাঁধ ছেড়ে দিলাম। লতা অস্ফুট স্বরে যান্ত্রিক গলায় বলে গেল, ‘অনীক, আমি আর কোনো দিন হাঁটতে পারব না। ডাক্তার বলে দিয়েছে।’ তারপর ভেঙে ভেঙে আরও যা যা বলল, তার মানে দাঁড়ায়, হাঁটতে গেলে হাড়ে মারাত্মক চাপ পড়বে। জটিল অপারেশনও কাজে আসবে না। তখন বাকি জীবন হুইল চেয়ারে কাটাতে হবে। তাই যত সহজে এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া যায়, সেটাই মঙ্গল।

নিশ্চল আমি লতার এই কঠিন বাস্তবতার সামনে কী বলা উচিত ভেবে পেলাম না। লতার হাত দুটো ধরলাম আলতো করে। চমকে উঠলাম। বরফের মতো শীতল। এই প্রথম খেয়াল হলো, লতার গায়ে কোট নেই। সব সে ফেলে এসেছে তাড়াহুড়ায়। শীতে কাঁপছে মেয়েটা। নিজের ওভারকোট, মাফলার, টুপি খুলে পরিয়ে দিলাম জোর করে। লতা আর আর পারল না। অতলান্তিক মহাসাগর দুই চোখের কূল ছাপিয়ে উপচে পড়ছে। পেঁজা তুলোর মতো তুষারকণা তাতে মিশে বৃষ্টি হয়ে নামল ঝরঝরিয়ে। আলতো হাতে সযত্নে মুছে দিলাম প্রতিটা মুক্তোদানা। কাছেই কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়ল। ভয়ে কেঁপে উঠল লতা। আর আমি? বুকের সমস্তটা উষ্ণতা দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম এই ব্যথাতুর মানবীকে।

২১.
পালকের মতো হালকা টাইটানিয়ামের ফোল্ডিং ক্রাচটা নেড়েচেড়ে দেখে লতার হাতে ফিরিয়ে দিলাম। সে এক ঝটকায় সেটা খুলে পরে নিল। নীলচে ধাতব ফ্যাশনেবল ক্রাচে লতাকে বায়োনিক ওম্যান বায়োনিক ওম্যান লাগছে। ঝকঝকে চেহারায় মন খারাপের চিহ্নমাত্র নেই। নিয়তিকে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার জন্য লতাকে মেডেল দেওয়া উচিত। সেখানে লেখা থাকবে, ‘ফিনিক্স পাখির জন্য এক আকাশ ভালোবাসা।’ না না, ‘শুভেচ্ছা’; শুভেচ্ছাই ভালো। নিরীহ শব্দ। উল্টোপাল্টা কথা লিখে আবার ‘মেড ইন জার্মানি’ টাইটানিয়াম ক্রাচের আঘাতে বেঘোরে প্রাণ হারাবার ইচ্ছে নেই।

লতার এই চেহারার সঙ্গে সেদিনের চেহারা আকাশ আর পাতাল। আমি পঁচাত্তর ভাগ নিশ্চিত এই মেয়ের বাই পোলার গোছের অসুখ আছে। গত এক সপ্তাহ নাওয়াখাওয়া ছেড়ে একঘরে নিজেকে বন্দী করে রাখা লতার কাণ্ডকারখানায় অতিষ্ঠ হয়ে ফ্রাউ কেলনার খবর দিয়েছিলেন। চাপাচাপিতে গিয়েছিলাম বটে। কিন্তু লতার ঘরে শখানেক টোকা দেওয়ার পর লাভের লাভ যা হলো, সে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন ওজনের এক ডাক্তারি বই ছুড়ে মারল। চট করে মাথা সরিয়ে স্পট ডেড হওয়ার হাত থেকে বাঁচলাম। রণে ভঙ্গ দিয়ে কোনোমতে জান হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল সেদিন।

তাই আজকে যখন সে নিজ থেকে দেখা করতে চাইল, তখন অবাকই হলাম। কিন্তু খুশিমনেই লাঞ্চের সময়টুকু তার জন্য বরাদ্দ রাখলাম। টাই খুলে ফাঁসমুক্ত হয়ে জ্যাক উলফস্কিনের স্পোর্টস জ্যাকেটটা চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কাছের ক্যাফেটেরিয়ায় টুকটাক কিছু খেয়ে নিয়ে কাগজের কফি কাপ হাতে এগোচ্ছি দুজন। সামনের ট্রাম স্টেশনে লতাকে বিদায় জানিয়ে ফিরে যাব। এই লতাবিহীন সাতটা দিনকে মনে হয়েছে যেন সাত বছর। সে খবর কি কেউ রাখে? থাক, মামুলি খবর রাষ্ট্র করে কাজ নেই। তার চেয়ে লতার কথা শোনায় মন দিলাম। এই এক সপ্তাহ লতা নাকি ঘরে বসে নেট ঘেঁটে বিস্তর গবেষণা করে এই ক্রাচ খুঁজে বের করে আমাজন থেকে অর্ডার দিয়ে অপেক্ষায় ছিল। আজকে পার্সেল হাতে পৌঁছাতেই সে আড়মোড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে। আগের হোৎকা বেঢপ ক্রাচে নাকি অসুখ অসুখ গন্ধ।

লতার চলার গতি এতই স্বাভাবিক যে বোঝাই যাচ্ছে না, ক্রাচের আশ্রয়ে চলছে তার এক পা। ভালো জিনিসই খুঁজে বের করেছে দেখা যাচ্ছে। উৎফুল্লচিত্তে মাথা নেড়ে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিশোরীর চপলতায় কথা বলে যাচ্ছে লতা। তার আনন্দটুকু আস্তে আস্তে আমার পুরো ভেতরটা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সেটুকু লুকানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় যখন অস্থির, তখন হঠাৎ কোথা থেকে বেয়াড়া বাতাস এসে লতার খোলা চুল উড়িয়ে এনে মুখের ওপর ফেলল। সোনালি রেশমের নরম ছোঁয়ায় আর ল্যাভেন্ডারের তীব্র ঘ্রাণে মুহূর্তেই মাতাল হয়ে টলে উঠলাম যেন। সব কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। থমকে গিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস নিতে চাইলাম। লতা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘অনীক, শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’ ‘নাহ্ তো!’ সামলে নিতে নিতে হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম।

সহজ হয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি যোগ করলাম, ‘তোমাদের যাওয়া কবে?’ লতা রহস্য করে বলল, ‘সেটা বললে কী দেবে?’ মনের কোণে হালকা আশা যে, লতা বলবে তার যাওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তাজ্জব করে দিয়ে লতার উত্তর এল তারা এবারও বাংলাদেশ যাচ্ছে। সামনের সপ্তাহে। শেষ মুহূর্তে ওরা সিদ্ধান্ত বদলেছে। নতুন দেশে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার দরকার নেই। বরং আগের অভিজ্ঞতা থাকায় বাংলাদেশে গিয়ে কাজটা সহজ হবে, এই যুক্তি তাদের।

জায়গাটার নাম ‘কারিগ্রাম’। লতা সাগ্রহে বলেই চলছে, ‘নামটা কারিগ্রাম কেন, সেখানে কি ভালো কারি পাওয়া যায়?’ আমি তখনো খবরটা হজম করে উঠতে পারিনি। তার মধ্যেই বললাম, ‘নামটা বোধ হয় কুড়িগ্রাম হবে।’ আর মনে মনে বাংলাদেশের মানচিত্র ঘেঁটে বের করার চেষ্টা করছি কুড়িগ্রামটা কোথায়। আহ্, পেয়েছি, কুড়িগ্রাম, রংপুর বিভাগ, উত্তরবঙ্গ। কিন্তু লতারা দল বেঁধে বাংলাদেশে গেলে আমি কী করব? আমার তো ছুটি মিলবে না এবার। তাই উদাস দৃষ্টি ছুড়ে দুপুরের নীল আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর ভেতর হাতি-ঘোড়া খুঁজতে লাগলাম। আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে আর কী লাভ? তবুও নেহাত ভদ্রতা করে জানতে চাইলাম, ‘কত দিনের জন্য যাওয়া হচ্ছে?’ আমার নির্লিপ্ততায় আহত হয়েই কিনা জানি না, ছোট করে উত্তর এল, ‘তিন সপ্তাহ।’ তার মানে একুশ দিন?! তত দিনে মিউনিখের রাস্তায় কোনো একজনকে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেতে খেতে ঘুরতে দেখা যাবে।

লতাকেও আর বেশি কিছু বলতে শোনা গেল না। এর মানে কী ভেবে কুলাতে পারলাম না। আমার ছুটির কথা তো লতার জানার কথা। ট্রাম এসে গেছে। ট্রামকে এখানে বলে স্ট্রাসে বান। বায়োনিক ওম্যান ফ্রাউ শার্লট তার টাইটানিয়াম ক্রাচে ভর দিয়ে অবলীলায় তাতে চেপে বসল। ফুরিয়ে যাওয়া কফি কাপটা সামান্য তুলে তাকে বিদায় জানালাম। স্ট্রাসে বান বিন্দু হয়ে ছুটে চলল। নিখুঁত নিশানায় কাপটা ঝুড়িতে ছুড়ে অফিস বরাবর পা চালাব, কিন্তু শ্বাসকষ্টটা আবার পেয়ে বসল। ভারী উৎপাত তো! কোন অগোচরে কে যে কার নিশ্বাসের বাতাসটুকু কেড়ে নিয়ে পালায়, কে তা বলতে পারে?

পকেটে মুঠোফোনটা কেঁপে উঠে জানান দিল, হাওয়ায় উড়ে ছোট্ট একটা চিঠি এসেছে। আঙুলের স্পর্শে মেলে ধরে দেখি তাতে লেখা, ‘শনিবারে ফ্লাইট। এয়ারপোর্ট অবধি কি পৌঁছে দেওয়া যায়?’ ঠোঁটের কোণে অব্যক্ত হাসি ফুটিয়ে লিখে দিলাম, ‘জো হুকুম, মহারানি!’ তারপর আরও একটা লাইন জুড়ে দিলাম। কী ভেবে আবার মুছেও দিলাম। বলা আর না বলা কথার চিঠি পায়ে বেঁধে উড়ে গেল অদৃশ্য শ্বেত পায়রাটা।

দেখতে দেখতে শনির পিঠে ভর করে শনিবার চলে এল। অফিস ছুটির দিন বলে সুবিধে হয়েছে। কিন্তু ইচ্ছেমতো তুষার পড়ে শহরের অবস্থা দফারফা। ছোট ছোট কমলা প্লাউ ট্রাকগুলো রাস্তার বরফ সরিয়ে কুল পাচ্ছে না। ফ্রাউ কেলনারের গাড়ি করে লতাকে নিয়ে এসেছি। গাড়িতে দুই নারী প্রচুর কথা বলে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। সাবধানে চালাতে গিয়ে শিরা দপদপ করছে রীতিমতো। সুবিধামতো পার্ক করে টার্মিনাল ১-এ ঢুকে দেখি লতাদের দলটা জন্ডিস রঙের কটকটে জ্যাকেট পরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। হলুদ জ্যাকেটের বুকে বড় বড় করে লেখা ‘অ্যার্জটে ওনে গ্রেনজেন’। মানে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস। লাগেজ ড্রপ আর চেক-ইন করবে বলে লতা তাদের সঙ্গে চলে গেল। বলে গেল, আবার এসে বিদায় নিয়ে যাবে।

ফ্রাউ কেলনারের জন্য দৌড়ে গিয়ে ডোনাট আর আইস টি নিয়ে আসতে হয়েছে। এই শীতে কেউ আইস টি খেতে পারে জানা ছিল না। চুকচুক করে আইস টি খেতে খেতে ভদ্রমহিলা বকবক করেই চলছেন, বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকলে নাকি তার সুগার কমে গিয়ে মাথা ঘোরে, হ্যানো ত্যানো কী সব। হঠাৎ বলে বসলেন, ‘তোমরা কয় ভাইবোন, অনীক?’ ফ্রাউ কেলনারের লো সুগারের সঙ্গে আমার ভাইবোনের কী সম্পর্ক বুঝলাম না। তা–ও বললাম, বড় তিন বোন, আর সবার ছোট আমি। কেন বলুন তো?’ ফ্রাউ কেলনার লতারা যেদিকে গিয়েছে সেদিকে ইশারা করে দুষ্টুমি হাসি হেসে বললেন, ‘এ জন্যই কি তুমি এত সেনসিটিভ?’ প্রায় এক হালি বোন থাকলে যে লোকে সেনসিটিভ হয়ে যায়, এই তথ্য উনি কোথায় পেলেন? ধুৎ, কী সব হাতির মাথা, ব্যাঙের ছাতা মার্কা কথাবার্তা। বিরক্ত হয়ে বিড়ি ধরানো ভঙ্গিতে ঠোঁটে দুই আঙুল চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালাম লতার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

লতা দলছুট হয়ে তাড়াহুড়া করে ছুটে আসছে। হাতে বেশি সময় নেই আর। তার গায়েও জন্ডিস জ্যাকেট। আর লাল কোট হাতে ধরা। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, এটা বেশি ভারী হবে, গায়েরটা দিয়েই চলবে। বঙ্গদেশের শীতের দৌড় তার জানা আছে। রোবটের মতো হাত বাড়িয়ে লতার কোটটা নিলাম। হায়, কে কার দেশে যাচ্ছে আর কে কার দেশে পড়ে থাকছে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। লতাও দেখি ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লতার এই কথাবিহীন খেলাটা আমি জানি। কিন্তু আজকে সে সেই খেলায় গেল না। মুখ ফুটে বলে বসল, ‘আচ্ছা, তাহলে, আসি।’ ভাঙাচোরা হাসি ফুটিয়ে শুধু বলতে পারলাম, ‘হুমম্…’। লতার ফোন বেজে উঠতে এক পাশে সরে গিয়ে বাঁচলাম।

ম্যাক্স আর মায়ের সঙ্গে দুই কথা সেরে লতা পায়ে-পায়ে এদিকেই এগিয়ে এল। আসতে থাকল, আসতেই থাকল। তার চোখে গভীর দুরভিসন্ধি। বেগতিক দেখে এক পা, দু পা করে পেছোতে থাকলাম। এ কোন বিপদ! এমন সময় মুশকিল আসান হয়ে ফ্রাউ কেলনার এসে সামনে দাঁড়ালেন। জানে পানি ফিরে পেলাম। লতা অগ্নিদৃষ্টি হেনে আমাকে ভস্ম করে দিয়ে ফ্রাউ কেলনারের সঙ্গে কিচিরমিচির কী সব বলে উঠল। আমিও যেচে পড়ে মুখস্থ আওড়ে গেলাম, ‘ভালো থাকা হয় যেন, মজার মজার ছবি তুলে পাঠানো হয় যেন, ইত্যাদি ইত্যাদি’। আসল কথা, এখান থেকে বেরোতে পারলে হয় এখন। ছটফট লাগছে। হাত ঘামছে।

অস্বস্তিকর বিদায়পর্ব শেষ হলো অবশেষে। মনেপ্রাণে চাইছি লতা যেন একবারও পেছন ফিরে না তাকায়। তাকালেই জারিজুরি ফাঁস। তার ওপর ফ্রাউ কেলনার আজকে জহুরির চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন আমাকে। কিন্তু ভোগান্তির আরও বাকি ছিল। টার্মিনালের পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে মিনিট দশেক পর একটা বিরতি না নিয়ে আর পারা যাচ্ছিল না। ওয়াইপার চলছে ডানে–বাঁয়ে। তবুও উইন্ডশিল্ড অস্পষ্ট আর ঝাপসা লাগছিল। বুঝলাম, সমস্যাটা ওয়াইপারের না। অন্য কোথাও। এক পাশে গাড়ি থামিয়ে ফ্রাউ কেলনারকে ‘আসছি একটু’ বলে নেমে পড়লাম। আজকে শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারলে ভালো লাগত। ‘এই অনীক, দেরি হচ্ছে যে। গাছে পানি দিচ্ছ নাকি?’ কথার বাহার দেখে চিলিক দিয়ে মাথায় রক্ত উঠে গেল। আমি বাঁচি না আমার জ্বালায়, আর উনি মজা লুটছেন। জোর করে বাষ্পটা গিলে ফেলে সেনসিটিভিটির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে গাড়িতে এসে বসলাম। সাঁই শব্দে মাথা বের করে তাকালাম। দেখলাম, অতিকায় ধাতব রাজহাঁসটা তার অ্যালুমিনিয়ামের ডানায় উড়িয়ে নিয়ে গেল লতাকে।

২২.
চড়ুই পাখিটা আকাশে পা তুলে চিৎ হয়ে পড়ে আছে সাদা বরফের চাতালে। কাছে এগিয়ে গেলাম দেখার জন্য, সত্যিই মরে গেছে নাকি পায়ের শব্দের ফুরত উড়াল দেয়। কিন্তু এগোনোর আগেই সম্পূর্ণ অকারণে দাঁতে-ঠোঁটে কামড় লেগে বাজেভাবে কেটে গেল। পকেটে রুমাল বা টিস্যু কিছু নেই। খুব বেশি ব্যস্ত না হয়ে ধবধবে এক মুঠো বরফ তুলে ঠোঁটে চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ে চড়ুইটাকে টোকা দিলাম। বেঁচে থাকলে টুপিতে তুলে বাসায় নিয়ে যাব। কিন্তু নাহ, জ্যান্ত নেই। অথচ শরীরটা কী গরম এখনো। হাঁটু মুড়ে বসে সামান্য খুঁড়ে তুষার চাপা দিয়ে ঢেকে দিলাম ওটাকে। কাটা ঠোঁট থেকে গড়িয়ে দুই ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল ছোট্ট কবরের ওপরে। দৃশ্যটা যেন কেমন অতিপ্রাকৃত। কী দরকার ছিল চড়ুইটা চোখে পড়ার?

এমনিতেই আজকে মন খাঁ খাঁ করছে। তার ওপর ঝিং করে সেই যে মাথা ধরেছে। লতার কোটটা টুক করে নাকে চেপে ধরেছিলাম ফ্রাউ কেলনারের হাতে ফেরত দেওয়ার আগে। নির্ঘাত এক কেজি বিস্কুটের নির্যাস থেকে এই পারফিউম তৈরি। আর যদি ভুল করেও কোনো দিন মেয়েদের কাপড়চোপড় শুঁকতে গিয়েছি! কী যে সব অদ্ভুতুড়ে কাজকারবার পারফিউম কোম্পানিগুলোর। এখন সারা দিন মাথায় বিস্কুটের টিন নিয়ে ঘুরতে হবে। বিনা দোষের শাস্তি আর কী!

বাসায় এসে দেখি আরও শাস্তি অপেক্ষা করছে। ঘরের কোণে ঝুড়ি উপচে পড়া কাপড়গুলো ক্রুর হাসি হাসছে। মেঝের এক ইঞ্চি পুরু ধুলো ধূসর রঙা ইরানি কার্পেটের ছদ্মবেশ নিয়েছে। এ দেশে তো আর ময়নার মা নেই যে ঝুড়ি উপচানো কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করে দেবে। তাই সপ্তাহান্তে নিজেকেই ময়নার মা, না মানে, ময়নার বাপ সাজতে হয়। ঘরটাও ভ্যাকিউম করতে হয় মাথা নিচু করে, অভিযোগবিহীন। কিন্তু আজকে যে কিছুতেই মন লাগছে না কোনো কাজে। জুতার ফিতাটাও না খুলে কী এক শোকে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছি ধুলার ভেতর। বিড়ালছানা হারিয়ে ফেলা বাচ্চা ছেলের মতো। মুশকিল একটাই। এই ছেলেটা আর ছোট নেই। ছাব্বিশ বসন্ত পাড়ি দিয়ে কখন যে সে হাতে-পায়ে কত বড় হয়ে গেছে। ছেলেমানুষি মন খারাপ তাকে মানায় না। তা ছাড়া, বিড়ালছানা সপ্তাহখানেক পর পথ চিনে ঠিক ফিরে আসবে নিশ্চয়ই। তখন তাকে খপ করে ধরে বুক পকেটের ওমের ভেতর পুরে ফেলা হবে।

ভ্লাদিমিরের বাজখাঁই গলা শোনা গেল। ‘বউ মরা চেহারা করে আর কতক্ষণ কাত হয়ে থাকবে? এদিকে এসে হাত লাগালে কী হয় রাজপুত্রের?’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজপুত্র উঁকি দিয়ে দেখল, কোটাল পুত্র ভ্লাদিমির প্রকাণ্ড বায়ান্ন ইঞ্চি টিভিটা দেয়ালে লাগাবার তোড়জোড় করছে। ওপরের চায়নিজ ছেলেটা গ্র্যাজুয়েশন শেষে দেশে ফিরে যাচ্ছে। এত দিন বড়লোক বাপের পয়সা বেহিসাবি উড়িয়ে যাওয়ার কালে বেচারা তার সহায়-সম্পত্তি দরাজ হাতে বিলিয়ে কুল পাচ্ছে না। ভ্লাদিমির আর আমার এই ফ্ল্যাটে কোনো টিভি ছিল না। অভাবও বোধ করিনি এতকাল। তবুও ছেলেটার চাপাচাপিতে একরকম নিমরাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ড্রিল মেশিন নিয়ে আধা ঘণ্টা ধস্তাধস্তির পর ঘেমে–নেয়ে ক্লান্ত হাতে রিমোট নিয়ে বসলাম। ভ্লাদিমির দুই কাপ কফি বানাতে গেছে কিচেনে।

উল্টাপাল্টা বোতাম চেপে যাচ্ছি উদ্দেশ্যবিহীন। খবরে এসে থামলাম। ‘অমুক এয়ারলাইনসের শেয়ারধসের প্রথম ধাক্কাটি লেগেছে নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্টক এক্সচেঞ্জে। সেই সঙ্গে এয়ারলাইনসটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে...।’ অপ্রয়োজনীয় খবর। চ্যানেল উল্টে যেতে যেতে মনে পড়ে গেল, লতার ফ্লাইট স্ট্যাটাসটা একবার ফোনে চেক করে দেখা দরকার। তাদের যাত্রা মিউনিখ-টু-ঢাকা ভায়া দুবাই। তারপর শুরু হবে আসল খেলা। ঢাকা-টু-কুড়িগ্রাম ভায়া বগুড়া। জার্নি বাই লক্কড়ঝক্কড় হানিফ বাস। কেন যে লতাকে যেতে দিলাম! কিন্তু দেওয়া না দেওয়ার আমি কে?

যাক গে, এতক্ষণে তো তাদের দুবাই পৌঁছে যাওয়ার কথা। দলটা বড় থাকায় লম্বা বিরতির ট্রানজিট খুঁজেছিল তারা। কিন্তু পায়নি। দেড় ঘণ্টার ট্রানজিটে ঢাকার প্লেন ঠিকঠাক মতো ধরতে পেরেছে কিনা লতারা, দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তাড়াহুড়ায় লতার অসুবিধা হয়নি তো? আর ঝাঁকড়া চুলের ওই গাট্টাগোট্টা ছেলেটা যে কিনা বারবার দৌড়ে লতার খোঁজ নিচ্ছিল এয়ারপোর্টে, সে আবার লতার পিছে পিছে ঘুরঘুর করছে নাতো? পিনপিনে একটা জ্বলুনি টের পেলাম কোথায় যেন। মনে মনে ছেলেটাকে বার দুই ল্যাং মেরে ফেলে দিলাম। আবার লতার কাছে-পিঠে দেখা গেলে সত্যি সত্যিই তাকে বাংলা মাইরের প্রকারভেদ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

ফোনে লতাদের ফ্লাইট স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে না। ৪০৪ নট ফাউন্ড দেখাচ্ছে। ল্যাপটপ খুলে বসলাম। বড় বড় লাল হরফে একটা লেখা ‘অনিবার্য কারণবশত ফ্লাইট ইএক্স ৬৮৫–এর গতিবিধি প্রদান বন্ধ আছে। ধাঁধায় পড়ে গেলাম। কী হলো আবার? অবচেতনভাবে রিমোট হাতড়ে খুঁজে খবরে ফিরে এলাম। ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ইএক্স ৬৮৫ যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে কবলিত হয়েছে। উড্ডয়নের পর সামনের চাকা গুটিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা বিমানটি যেকোনো সময়ে দুবাই অথবা পার্শ্ববর্তী বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’ ধড়াস করে ধাক্কার মতো খেলাম যেন। হাত গলে রিমোট পড়ে গেল মেঝেতে। শব্দ শুনে কফির মগ হাতে ভ্লাদিমির এসে দেখে ফ্যাকাশে চেহারায় পর্দায় তাকিয়ে আছি। সব রক্ত সরে গিয়েছে মুখ থেকে।

ভ্লাদিমির যখন খবরটা হজম করছে, ততক্ষণে কোথা থেকে যেন শক্তি জোগাড় করে উঠে দাঁড়িয়েছি। যুক্তি-বুদ্ধি গুলিয়ে সব একাকার। কিন্তু কী করতে হবে যেন বুঝে গিয়েছি। লতার কাছে যেতে হবে। আর যেতেই হবে। প্লেন নামুক আর নাই নামুক। হাতে সময় নেই একদম। ছোঁ মেরে কাঁধের ব্যাগে পাসপোর্ট আর ক্রেডিট কার্ড পুরে জ্যাকেটটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে উড়ে গেলাম। ভ্লাদিমির লাফিয়ে উঠে বাধা দিতে চাইল বুঝি। কিন্তু না, বরং উল্টোটা। ‘এক মিনিট! ট্যাক্সি ডাকছি, তাড়াতাড়ি হবে। বাস-ট্রেন ঠেঙিয়ে কতক্ষণে যাবে এয়ারপোর্ট?’ বিপদে বন্ধু চেনা যায়। আমি ভ্লাদিমিরকে চিনলাম।

ফোনের স্ক্রিনে পড়ছি, ‘বিমানটিতে জার্মানিসহ তেরো দেশের নাগরিক মিলিয়ে দুই শ আটাশজন যাত্রী রয়েছেন।’ ট্যাক্সির ভেতরটা এত বদ্ধ কেন? নিশ্বাসের জন্য মরিয়া হয়ে কাচ নামিয়ে দিলাম। হাতে চাপ লেগেছে ভেবে নিয়ে আফগানি ড্রাইভার আবার বোতাম টিপে কাচ তুলে দিল। তার রিফিউজি হয়ে এ দেশে আসার গল্প আর দেশে রেখে আসা বউ-বাচ্চার কেচ্ছা এখন যন্ত্রণা ঠেকছে। প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে ফোনে হাত চলে যাচ্ছে। আতঙ্কে দিশেহারা।

‘আজকের কোনো ফ্লাইটে সিট পাবেন না। অল বুকড আউট। দুঃখিত।’ নির্বিকারভাবে আওড়ে গেলেন এয়ারপোর্টের টিকিট অফিসের মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। দপ করে নিভে গেলাম। কিন্তু নিভে যাওয়া চেহারাতেও স্পষ্ট একটা অনুনয় ছিল বোধ হয়। ভদ্রমহিলা সামান্য নরম হয়ে বললেন, ‘আবার দেখছি। সময় দিন।’ তারপর দুই মিনিট না যেন দুই বছর পর কম্পিউটার থেকে মুখ তুলে জানালেন, ‘বিজনেস ক্লাসের একজন ফ্লাইট ক্যান্সেল করেছেন এইমাত্র। আপনি কি আগ্রহী? টিকিটের দাম কিন্তু ইকোনমির চেয়ে আড়াই গুণ।’ বিনা বাক্যব্যয়ে ক্রেডিট কার্ড বের করে দিয়ে অস্থিরভাবে ফোনটা নিলাম। ‘বিমানটি অবতরণজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে জ্বালানি কমানোর উদ্দেশ্যে আধা ঘণ্টা ধরে আট হাজার ফুট উচ্চতায় আকাশে উড়ছে।’ ভয়ংকর একটা অবিশ্বাস জেঁকে ধরেছে আমাকে। আর বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা অসহায়ের মতো ডানা জাপটাচ্ছে বিরামহীন।

প্লেনে চড়ে অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে সিট খুঁজে নিয়ে ভাবছি, আদৌ লতার কাছে আমার পৌঁছানো হবে কিনা। দুবাই এয়ারপোর্টের অর্ধেকটা নাকি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অবস্থা বুঝে অনেক ফ্লাইট ঘুরে গিয়ে বিকল্প বন্দরে নামবে। ঘোষণা ভেসে এল, ‘আমরা টেকঅফ করতে যাচ্ছি। সিটবেল্ট বাঁধুন আর দয়া করে মোবাইল ডিভাইস বন্ধ করুন কিংবা এয়ারপ্লেন মোডে রাখুন।’ নিরুপায় হয়ে শেষবারের মতো দেখে নিলাম। ‘এইমাত্র জানা গেছে, নব্বই মিনিট ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি খরচ করে ইএক্স ৬৮৫ এই মুহূর্তে জরুরি অবতরণের জন্য প্রস্তুত...।’ ঝাপসা চোখে বাকিটুকু আর পড়া হলো না। চুরমার হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা।

কাচ ঢাকা স্বচ্ছ সুবিশাল দুবাই বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না দূরের ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা লতাদের প্লেন থেকে উড়ছে। রানওয়ে থেকে ছিটকে অনেক দূর ঘেঁষে গিয়ে থেমেছে বিরাট উড়ুক্কু তিমিটা। বাঁ–দিকের ভাঙা ডানার ওপর কাত হয়ে আছে অতিকায় শরীর। নিহত ব্যক্তির সংখ্যা শূন্য শুনে হাঁপ ছাড়ছি কী ছাড়িনি, আবার শুনলাম, আহত ব্যক্তির সংখ্যাটা যথেষ্টই বড়। জনা তিরিশেক গুরুতর। তাঁদের ভাগে ভাগে হাসপাতালে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাকিদের এখানেই চিকিৎসা চলছে। কিন্তু অগুনতি ফ্লাইট বাতিল হয়ে জায়গাটা এখন লোকে লোকারণ্য। এর ভেতর আমি কোথায় লতাকে খুঁজব? গলা বুজে এল নতুন শঙ্কায়। তবু এলোমেলো পা ফেলে এগোলাম সামনে।

এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি আর পুলিশের কাছে অনেক অনুরোধের কাঠখড় পুড়িয়ে আর অজস্র জিজ্ঞাসাবাদ পেরিয়ে অবশেষে হাতের পাসপোর্ট জমা দিয়ে পৌঁছালাম ইএক্স ৬৮৫ ফ্লাইটের যাত্রীদের যেখানে রাখা হয়েছে। প্যারামেডিক, স্ট্রেচার আর আহত ব্যক্তিদের বহর মিলে এ যেন হাশরের ময়দান। সব দেখেশুনে পাগল পাগল লাগছে। দিগ্বিদিক দৌড়ে তন্ন তন্ন করে বিশাল এলাকা খুঁজে খুঁজে হয়রান হলাম। তবুও লতারদের জন্ডিস জ্যাকেটের কোনো দল বা কাউকে দেখতে পেলাম না। প্রায় ধরে নিয়েছি লতা নেই এখানে। মন তবু মানছে না তার কিছু হয়েছে আর তাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে বাইরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা লাল-নীল-সাদা রঙের কোনো অ্যাম্বুলেন্স। হতাশায় নুয়ে পড়ে আবারও এগিয়ে গেলাম দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটির লোকগুলোর কাছে।

লাউড স্পিকারে জরুরি কণ্ঠ একটানা বলে চলছে, ‘জার্মানি থেকে আগত মিস শার্লট স্নাইডারকে ইনফো ডেস্কের কাছে আসতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এখানে অনীক আহমেদ অপেক্ষা করছে…।’ লতা যেন মেলায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট মেয়ে। কিন্তু এল না কেউ। মাথার ভেতর তখনো চলছে তুফানমেইল, আর কোথায় খুঁজব তাকে? লতাকে যে পেতেই হবে আজকে। বাকি থাকে হাসপাতাল। কিন্তু ট্রানজিট যাত্রীর তো অনুমতি নেই এয়ারপোর্টের বাইরে যাওয়ার। এতটা অসহায় আর পঙ্গু সময় এই অনীকের জীবনে আর আসেনি। হাঁটু ভেঙে আসতে চাইছে যেন।

গাঢ় অবসাদে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো চারদিক যেন ছেয়ে গেছে বিস্কুটের মুচমুচে ঘ্রাণে। এয়ারপোর্ট বদলে গিয়ে হয়ে গেছে অতিকায় বিস্কুটের ফ্যাক্টরি। বুঝলাম, অবচেতন মনের খেলা। কী অদ্ভুত, মস্তিষ্কের অলিতে–গলিতে ছড়িয়ে পড়া লতার ঘ্রাণটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসা হাঁটু জোড়া আবার সোজা করে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল। কপালের ঘেমে যাওয়া চুলগুলো সরিয়ে সামনে তাকালাম কী এক আশায়। ভুল দেখছি, একদম ভুল। মরীচিকা ভেবে চোখ বুজে আবার খুললাম। না, লতাই তো। বাঁ গালে রক্ত জমে নীলচে কালশিটে। আর ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান হাতটা গলায় ঝোলানো আর্ম স্লিংয়ের ভাঁজে। তাই নিয়ে ক্রাচে খুঁড়িয়ে যেন উল্কার বেগে ছুটে আসছে লতা। হা হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চল আমিও ধূমকেতু হয়ে ছুটলাম লতার দিকে। হুঁশই হয়নি যে, দুম করে একটা গলফ কার্টের সামনে চলে এসেছি। সজোর ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পড়লাম। তারপর ব্ল্যাকহোলে ব্ল্যাকআউট।

বৃষ্টির টুপটাপ ফোঁটাগুলো ক্রমশ বড় হতে থাকল। বন্ধ চোখেই হাত বাড়িয়ে ছাতাটা খুঁজলাম। কিন্তু রেশম নরম কী যেন ঠেকল। লতাদের ধড়িবাজ পারিবারিক বিড়াল কাঠমুন্ডু না তো? লেজ দিয়ে কান চুলকে দিচ্ছে নাকি? হ্যাঁচকা টান দিলাম বদমাশটার লেজ ধরে। কেউ উহ্ করে উঠল। মাথার ওপর তীব্র আলো সয়ে নিয়ে পিটপিটিয়ে চেয়ে দেখি কোথায় কাঠমুন্ডুর ধুমসো লেজ? এ যে লতার আধখোলা এলো বেণি। আর বৃষ্টিটা যে এক জোড়া সবুজ মেঘের আকুল কারসাজি! মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেও কথা সরল না আমার। তারপর আরেক হ্যাঁচকা টানে লতার ভেজা মুখটা নামিয়ে আনলাম বুকের ওপর।

পাশার দানে হিসাব উল্টে গন্তব্য পাল্টে গেছে। কুড়িগ্রাম-বুড়িগ্রাম সব বাদ। আমরা যাচ্ছি টাঙ্গাইল। আমার বাড়ি। ঢাকা নেমে লতাদের টুকটাক চোট পাওয়া প্রায় অক্ষত দলকে বিদায় জানিয়ে সোজা বাস ধরব এখন। গাট্টাগোট্টা ছেলেটা লতার সঙ্গে সেলফি তুলতে এসেছিল। দুজনের মধ্যে মাথা গলিয়ে সেটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি।

অফিসে ই–মেইল লিখে পাঠিয়েছি, ‘কাম শার্প, মাদার সিরিয়াস’ শুনে তড়িঘড়ি করে দেশে আসতে হয়েছে। ফিরতে দিন কয়েক। কথা তো মিথ্যা না। মাদার সিরিয়াস নেই, কিন্তু সিরিয়াস তো নির্ঘাত হবে খানিক বাদে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিদেশি মেম নিয়ে উৎপাতের অপরাধে মা বাংলা সিনেমার কায়দায় পুরোনো জুতা ছুড়ে মারছে।

আসন্ন জুতা বর্ষণের দুর্ভোগ ভাবতে ভাবতে আড়চোখে লতার দিকে তাকালাম। একটু আগে অনেক সাহস জড়ো করে গুঁজে দেওয়া কাগজের টুকরোটা সে পড়েছে কিনা বোঝার উপায় নেই। লেখা ছিল ‘শার্লট স্নাইডার আহমেদ’ নামটা কেমন? উত্তরের থোড়াই না করে সোনালি চুলের লাজুক লতা রহস্যময় এক রুপালি হাসিতে শীতের সকালটা ভাসিয়ে দিল। এই মেয়েলি হেঁয়ালির মানে আমি ধরতে পারছি না। অপমান অপমান লাগছে। আর পাঁচ মিনিটের ভেতর মনমতো উত্তর না পেলে হানিফ বাস থামিয়ে নেমে যাব। (সমাপ্ত)

-রিম সাবরিনা জাহান সরকার
মিউনিখ, জার্মানি, ২০১৯
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ৩:২৪
১৩টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন কাওসার চৌধুরী ও তার গল্পগুচ্ছ 'পুতুলনাচ' (বই রিভিউ)

লিখেছেন আকতার আর হোসাইন, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ২:১৫



লেখকের প্রথম বই--- বায়স্কোপ: যে বইয়ে কাওসার চৌধুরী এঁকেছেন জীবনের বায়স্কোপ

আর সবার মতন একজন লেখকেরও রয়েছে স্বাধীনতা। যার যে বিষয়ে ইচ্ছে সে সেই বিষয়েই লিখবে। জোড় করে কোন লেখকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

যীশুর রহস্যময় বাল্যকালঃ মিশর অবস্থান কাল বার বছর পর্যন্ত

লিখেছেন শের শায়রী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৩:৩০



যীশুর জীবনের অন্যতম রহস্যময় ঘটনা হিসাবে যা আমার কাছে মনে হয় তা হল যীশুর বাল্যকাল। ইতিহাস প্রসিদ্ধ ধর্মপ্রচারকদের মাঝে যীশুর জীবনির একটা অংশ নিয়ে আজো কোন কুল কিনারা পাওয়া যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাড়ী ভাড়া বিষয়ক সাহায্য পোস্ট - সাময়িক, হেল্প/অ্যাডভাইজ নিয়েই ফুটে যাবো মতান্তরে ডিলিটাবো

লিখেছেন বিষন্ন পথিক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:১৭

ফেসবুক নাই, তাই এখানে পোস্টাইতে হৈল, দয়া করে দাত শক্ত করে 'এটা ফেসবুক না' বৈলেন্না, খুব জরুরী সহায়তা প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা...
আমার মায়ের নামে ঢাকায় একটা ফ্লাট আছে (রিং রোডের দিকে), ১৬০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৪৫


জীবনানন্দ দাস লিখেছেন- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...। বনলতা সেন কবিতার অসাধারণ এই লাইনসহ শেষ প্যারাটা খুবই রোমান্টিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের রোমান্টিসিজমে সন্ধ্যার আলাদা একটা যায়গাই রয়ে গেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৪৪



"বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!", এই কথাটি আমাকে বলেছিলেন আমাদের গ্রামের একজন নতুন বধু; ইহা আমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছিলো।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণীত, গ্রাম্য এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×