নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন শোধ করার জন্য পুরান ঢাকার অলিগলিতে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পিরোজপুরের এক খামারি, কাঞ্চন শিকদার। ২০১১ সালে বাবা মারা যাওয়ার আগে জানিয়ে যাওয়া ঋণের দেনা শোধ করতে আজ যখন তাঁর সামর্থ্য হয়েছে, তিনি বাবার আত্মাকে মুক্ত করতে পাওনাদারকে খুঁজে ফিরছেন।

আর অন্যদিকে সংবাদপত্রের অন্য পৃষ্ঠায় চোখ রাখলে দেখা যায়—দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি! বিতরণ করা ঋণের প্রতি ১০০ টাকার ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। অথচ মজার বিষয় হলো, এই বিশাল খেলাপি ঋণের সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত মাত্র গুটিকয়েক বড় ব্যাংকে এবং অল্প কিছু নামীদামী শিল্পগোষ্ঠীর হাতে।

এই দুটি চিত্র পাশাপাশি রাখলে আমাদের দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি উল্টো ও নির্মম সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি যে, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা বা সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাংকের নিয়মকানুনের খড়্গ সবসময়ই চড়া। কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী বা মধ্যবিত্ত মানুষ ঋণ নিতে গেলে গ্যারান্টার, জামানত আর নথিপত্রের হাজারো চক্করে পিষ্ট হতে হয়। কিস্তি আদায়েও তাদের ওপর ব্যাংকের চাপ থাকে আকাশচুম্বী। আর কাঞ্চন শিকদারদের মতো মানুষরা তো নিজের নৈতিকতার তাড়নায় দেনা শোধ করতে জীবনের শেষ সম্বলটুকু নিয়েও পাওনাদারের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন।

কিন্তু বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে গল্পটা একদম উল্টো! সেখানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা এমডি মহোদয়েরা নিজেরা গিয়ে নামীদামী গ্রাহকের এসি রুমে বসে সৌজন্য চা খেতে খেতে অফার দিয়ে আসেন—"স্যার, আমাদের ব্যাংক থেকে কয়শ কোটি টাকা লোন নেবেন বলুন? এই এই প্রদেয় সুবিধা আমরা গুছিয়ে দিচ্ছি।"

পরিণাম? এই পরম আদরে দেওয়া বড় বড় লোনগুলোর বড় একটা অংশই শেষ পর্যন্ত আর ফেরত আসে না। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে এই বড় ঋণগ্রহীতারা পার পেয়ে যান, আর খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা এসে পড়ে সাধারণ আমানতকারীদের ঘাড়ে।

অর্থনীতির মৌলিক নীতি বলে—বড় বড় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বা মেগা প্রজেক্টের জন্য ব্যাংক কখনোই আদর্শ স্থান হতে পারে না। ব্যাংক মূলত স্বল্পমেয়াদী আমানত বা ডিপোজিট নিয়ে কাজ করে, তাই তাদের কাজ হওয়া উচিত স্বল্পমেয়াদী বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন দেওয়া।

বিশ্বের যেকোনো সুসংগঠিত অর্থনীতিতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আসে শেয়ারবাজার (Capital Market) থেকে। সেখানে বড় বড় কোম্পানি তাদের শেয়ার বা বন্ডের অংশ বাজারে ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ তোলে। এতে ব্যাংকের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঋণের চাপ তৈরি হয় না।

কিন্তু আমাদের দেশের ট্র্যাজেডি হলো—আমাদের পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকিং খাত দুটিই যেন এক গভীর বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে!

একদিকে আমাদের শেয়ারবাজার সুশাসনের অভাবে পরিণত হয়েছে এক ধরনের ফটকাবাজির আখড়ায়, যেখানে ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ার ছেড়ে মূলধন তোলার ভরসা পায় না। আর অন্যদিকে, পুঁজিবাজারের সেই বিকল্প পথ বন্ধ থাকায় দেশের পুরো দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের চাপ এসে পড়েছে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর। ফলে ব্যাংকগুলো একদিকে ভুল জায়গায় বড় ঋণ দিয়ে খেলাপি ঋণের সাগরে ডুবছে, আর অন্যদিকে ছোট উদ্যোক্তারা তাদের প্রয়োজনীয় মূলধন না পেয়ে ধুঁকছে।

তবে এই আঁধারের মাঝেও কিছুটা আলোর ঝলক দেখা যায় সেই ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকে, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে (যেমন ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ইত্যাদি)। তাদের সাফল্য এটাই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক বিবেচনা বা অনৈতিক চাপ এড়িয়ে যদি নিরপেক্ষভাবে প্রফেশনাল ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Assessment) করা যায় এবং এসএমই (SME) ও ভোক্তা ঋণে বেশি জোর দেওয়া হয়, তবে ব্যাংক খাতকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।

কাঞ্চন শিকদারের ২৮ বছর পর বাবার ঋণ শোধের আকুলতা আমাদের শেখায় সাধারণ মানুষের সততা আর নৈতিকতার জোর কতটা গভীর। অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার খেলাপির পাহাড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা।

যেদিন আমাদের ব্যাংকগুলো বড় বড় খেলাপিকারীদের কাছে জিম্মি হওয়া বন্ধ করে কাঠামোগত সুশাসন নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের জন্য একটি সুস্থ ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে—একমাত্র সেদিনই এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নইলে সততার জয় কেবল কাঞ্চন শিকদারদের গল্পের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, আর অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি আটকে থাকবে অসাধু খেলাপিকারীদের পকেটে।

মন্তব্য ৫ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আমাদের শেয়ারবাজার সুশাসনের অভাবে পরিণত হয়েছে এক ধরনের ফটকাবাজির আখড়ায়,
যেখানে ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ার ছেড়ে মূলধন তোলার ভরসা পায় না।
আর অন্যদিকে, পুঁজিবাজারের সেই বিকল্প পথ বন্ধ থাকায় দেশের পুরো দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের চাপ
এসে পড়েছে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর।

......................................................................................................
বক্তব্যে সহমত, কিন্ত বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে ?
সবাই আশা করেছিলো , সব প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আসবে, কমপক্ষে
দূর্ণীতি বিদায় হবে ।
সবার আস্হা গড়ে উঠবে আমরা আবার সুন্দর একটি রাষ্ট্র পাবো ।

......................................................................................................
যেদিন দেখলাম বিচার ব্যবস্হা পৃথকীকরণ সচিবালয় স্হগিত করা হলো
সেদিন থেকে আমার মনে দুশ্চিন্তা আসল, এখন তো অবস্হা আরও খারাপ হচ্ছে ।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনার অত্যন্ত স্পর্শকাতর, নাগরিক সচেতনতায় ভরা এবং গভীর চিন্তাশীল মন্তব্যের জন্য অশেষ ধন্যবাদ!

'বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?'—আপনার এই প্রশ্নটি আসলে আজ দেশের প্রতিটি সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের মনের আকুল প্রশ্ন। আমরা সবাই স্বপ্ন দেখেছিলাম এক আমূল সংস্কারের, আশা করেছিলাম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন ফিরবে এবং সর্বস্তরে দুর্নীতি কমে সাধারণ মানুষের আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রক্রিয়াগুলো যখন কোনো কারণে থমকে যায়—যেমন বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া—তখন সচেতন মনে দুশ্চিন্তা ও আশাহানির মেঘ জমাই স্বাভাবিক। কারণ শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংস্কারের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

তবে সব হতাশার মাঝেও নাগরিকদের এই সচেতনতা ও প্রশ্ন তোলার মানসিকতাই আমাদের আসল শক্তি। রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখতে হলে সমাজ ও সাধারণ মানুষের এই সোচ্চার কণ্ঠস্বরগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি।

এমন গভীর ও সুচিন্তিত মতামত যুক্ত করে আলোচনাকে সমৃদ্ধ করার জন্য আবারও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন, সবসময় পাশে থাকবেন!

২| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৩

জুল ভার্ন বলেছেন: মোটামুটি ব্যবসার সাথে জড়িত থেকে বুঝেছি- ব্যবসায়ীদের ঋণ খেলাপী বানায় ব্যাংক। যা বলতে এক মহা ভারত লিখতে হবে।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৪

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ!

আপনার এই এক লাইনের মন্তব্যটি আসলে এক বিরাট সত্যকে ছুঁয়ে গেছে। আমরা বাইরে থেকে শুধু খেলাপির সংখ্যা বা অঙ্কের হিসাবটাই দেখি, কিন্তু ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হার, জটিল ও অনমনীয় নীতি, কিংবা সময়ে ঋণ ছাড় না করার মতো আমলাতান্ত্রিক বাধাগুলো যে অনেক সময় একজন সৎ উদ্যোক্তাকেও বিপদে ফেলে অপ্রয়োজনীয় খেলাপিতে পরিণত করে—সেই ভেতরের গল্পটা প্রায়ই আড়ালেই থেকে যায়।

বাস্তব ব্যবসার অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা এই 'মহাভারত' আসলেই অনেক দীর্ঘ এবং জটিল। সৎ ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার এই অদৃশ্য লড়াই এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার নীতিগত ত্রুটিগুলো নিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ হবে।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ভিন্নমাত্রার প্র্যাকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে পোস্টটি সমৃদ্ধ করার জন্য আবারও ধন্যবাদ। সবসময় পাশে থাকবেন, শুভকামনা!

৩| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৮

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পড়লাম । হাজার বচর ধরে নিয়ে একটু ভেবে দেখবেন ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.