নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি শোনান যা এখানে মির্জা গালিবের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে দিয়ে আলোচনা শুরু করব ।
ছবি-১ - মোঘল রাজদরবারে উর্দূ কবি মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ(১৮৬৮ এ মির্জা গালিব) মির্জা গালিব নামে অধিক পরিচিত

মির্জা গালিবের বিখ্যাত শের-
জাহিদ শরাব পিনে দে মসজিদ মে ব্যায়ঠ কর,
ইয়া ওহ জাগা বাতা দে যাঁহা খুদা নেহি।

ভাবানুবাদ
(খোদার ঘরে বসেই আমায় পান করতে দাও শরাব,
নয়তো এমন জায়গা দেখাও, যেখানে নাই আমার রব।)
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…

কী আশ্চর্য এক প্রশ্ন!এ যেন কোনো কবির মুখ থেকে উচ্চারিত সাধারণ বাক্য নয় এ যেন একজন পথিকের হাতে তুলে দেওয়া এমন একটি প্রদীপ, যার আলো বাইরে পড়ার আগে নিজের মুখটিকেই আলোকিত করে।

মির্জা গালিবের এই শেরকে যদি কেবল মদ্যপানের পক্ষে একটি রসিক যুক্তি হিসেবে পড়ি, তবে আমরা হয়তো শব্দের শরীরটুকু দেখব; কিন্তু তার অন্তর্নিহিত রহস্যের দরজা খুলবে না।

কারণ সুফি কাব্যের জগতে শরাব সবসময় শরাব নয়, মসজিদ সবসময় মসজিদ নয়, কাফের সবসময় কাফের নয়, আর জান্নাতও কেবল কোনো দূরবর্তী বাগান নয়।
এসব কখনো কখনো মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক।
শরাব -ইশ্‌কের নেশা।
সাকি -রহমতের বাহক।
মসজিদ -অন্তরের মেহরাব।
কাবা -হৃদয়ের কেন্দ্র।
কাফের -অজ্ঞাত নফস।
জান্নাত -বিচ্ছিন্নতার অবসান।
আর খোদা -সেই হকিকত, যার বাইরে আর কোনো হকিকত নেই।


তখন গালিবের প্রশ্নটি হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যায় এমন কোনো জায়গা দেখাও, যেখানে তিনি নেই।
মানুষের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে সে জানতে চায় খোদার ঠিকানা কোথায়?

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে খোঁজে, পাহাড়ে যায়, মরুভূমিতে যায়, মসজিদে যায়, খানকাহে যায়, দরগাহে যায়, কাবার দিকে মুখ ফেরায়, তসবিহ গোনে, জিকির করে, কিতাব পড়ে।সবই সুন্দর।কিন্তু কখনো কখনো সে নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে ভুলে যায়।

সে জানতে চায় আল্লাহ কোথায়?কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে আমার অন্তর কোথায়?
আমার অন্তর কি সত্যিই তাঁর দিকে মুখ করে আছে? নাকি কেবল আমার শরীর সিজদায় যায়, আর আমার নফস দাঁড়িয়ে থাকে অহংকারের মসনদে?আমি কি সত্যিই তাঁকে চাই?নাকি তাঁর কাছ থেকে শুধু তাঁর দানগুলো চাই?আমি কি তাঁকে ভালোবাসি? নাকি তাঁর দেওয়া জান্নাতকে ভালোবাসি?আমি কি তাঁর সন্তুষ্টি চাই?নাকি মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়ার সম্মান চাই?
এই প্রশ্নগুলোই সুফির পথের শুরু।

কারণ শরিয়ত মানুষকে পথ দেখায়, তরীকত তাকে পথে হাঁটায়, মারিফাত তাকে পথের অর্থ বোঝায়, আর হকিকত তাকে দেখায় পথিক, পথ ও গন্তব্যের রহস্য কত গভীর।
মসজিদ বাইরে, মেহরাব ভেতরে, মসজিদ অবশ্য অবশ্যই পবিত্র স্থান।সিজদা সেও অবশ্যই পবিত্র।ইবাদতের স্থান অবশ্যই সম্মানের।

কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন যে হৃদয় সিজদা করছে, সেই হৃদয়টির অবস্থা কী?কারণ মানুষ মসজিদের মেঝে পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু নিজের অন্তরের ধুলো পরিষ্কার করা অনেক কঠিন।সে অজু করতে পারে পানিতে, কিন্তু নফসের অহংকার ধুতে পারে কি?সে কিবলার দিকে মুখ করতে পারে,কিন্তু নিজের স্বার্থপরতার দিক থেকে মুখ ফিরাতে পারে কি?সে কোরআন পড়তে পারে,কিন্তু কোরআনের আয়না নিজের ওপর ধরতে পারে কি?সে তসবিহ গুনতে পারে,কিন্তু এমন একটি মুহূর্ত আসে কি, যখন তসবিহের দানা গোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনই জিকির হয়ে ওঠে?এইখানেই বাহ্যিক ইবাদত আর অন্তরের ইহসান একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।

নফস অন্তরের সবচেয়ে গোপন পর্দা সুফি সাধনায় সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বাইরে নয়।সে বসে আছে ভেতরে।তার নাম নফস।নফস সবসময় বলে আম আমি জ্ঞানী, আমি ধার্মিক, আমি পবিত্র, আমি সত্যের মালিক, আমি অন্যদের চেয়ে ভালো,আমি জানি কে কাফের, আমি জানি কে মুমিন, আমি জানি কে পাপী, আমি জানি কে জান্নাতে যাবে।

কিন্তু মারিফাতের দরজায় এসে মানুষ যখন সত্যিই নিজের দিকে তাকায়, তখন সে বুঝতে শুরু করে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা অন্যকে না চেনা নয়;নিজেকে না চেনা।লালনের ভাবনার সঙ্গে এখানেই সুফি পথের আশ্চর্য মিল।লালন বলেন মনের মানুষ কে খুঁজতে হলে আগে নিজের মনকে চিনতে হবে।
কারণ যে নিজের ঘর চেনে না, সে কীভাবে পরমের ঠিকানা চিনবে? আমরা সারাজীবন খোদা শব্দটি উচ্চারণ করি, কিন্তু যে আমি শব্দটি উচ্চারণ করে খোদাকে ডাকছি সেই ‘আমি’ কে?
এই প্রশ্নের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতেই শুরু হয় নফসের পর্দা সরানোর কাজ।

ইশ্‌ক যেখানে যুক্তির প্রদীপ নিভে যায় রুমি-প্রেরিত সুফি ভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল শব্দগুলোর একটি ইশ্‌ক।
ছবি : তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ১৩শ শতাব্দীর একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম, কবি,
আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী এবং সুফী ছিলেন

রুমির মরমি কাব্যের সেই চিরন্তন সুর
ইশ্‌কের কসাইখানায়
কেবল শ্রেষ্ঠরাই নিহত হয়;
দুর্বলদের জন্য সেখানে কোনো স্থান নেই।
প্রেমের এই মৃত্যুকে ভয় পেয়ো না-
যে প্রেমে নিহত হয়নি,
সে তো এখনও সত্যিকার অর্থে বাঁচেনি।

এখানে ‘মৃত্যু’ দেহের মৃত্যু নয়; এটি নফসের মৃত্যুঅহংকারের মৃত্যু, পৃথক আমি’-র মৃত্যু। সুফির কাছে এটাই ফানা নিজেকে হারিয়ে ফেলা সেই পরম প্রেমে, যার মধ্যে হারিয়েই আবার বাকা বা নতুন অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়।
তাই রুমির ইশ্‌ক যেন বলে-
তুমি প্রেমকে পেতে যেও না;
প্রেমের হাতে নিজেকে সমর্পণ করো।
কারণ প্রেম যখন সত্যিই আসে,
সে তোমাকে তোমার কাছ থেকেই নিয়ে যায়।
আর তখন প্রশ্ন থাকে না;
আমি কোথায় তাঁকে খুঁজব?
কারণ ইশ্‌কের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আবিষ্কার করে;
যাঁকে এতদিন বাইরে খুঁজেছি,
তাঁরই নূর আমার অন্তরের গভীরে
নীরবে জ্বলে ছিল।


তাই ইশ্‌ক কেবল ভালোবাসা নয়।এ এমন আগুন, যেখানে প্রেমিকের পুরোনো পরিচয় পুড়ে যায়।ইশ্‌ক বলে তুমি যতক্ষণ বলছ আমি, ,ততক্ষণ তুমি দূরে।যেদিন তোমার আমি ধীরে ধীরে গলে গিয়ে শুধু তুমি থাকে সেদিন দূরত্বের অর্থ বদলে যায়।
রুমি-সুলভ সেই প্রেমে মানুষ খোদাকে ভালোবাসতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের অহংকারকে হারায়।
এ কারণেই সুফি পথের প্রেম কখনো আরামদায়ক নয়।এ প্রেম নীজকে ভেঙে দেবে।নীজ অহংকার ভাঙবে।নীজের মিথ্যা নিরাপত্তা ভাঙবে। নিজের সম্পর্কে বানানো গল্প ভাঙবে।

মানুষ যে নিজেকে এতদিন খুব ধার্মিক, খুব জ্ঞানী, খুব ভালো মানুষ মনে করেছিলে ইশ্‌ক এসে সেই আয়নাটি তার সামনে ধরে বলবে এবার নিজের সত্যিকারের মুখটি দেখো।
শরাব কোন নেশার কথা বলে কবি? হাফিজের কাব্যজগৎ আমাদের শেখায়, সুফি কবিতার “মদ”কে আক্ষরিক অর্থে পড়লে তার বহুস্তরীয় প্রতীকী ভাষা হারিয়ে যায়।সেখানে ময়খানা হতে পারে অন্তরের গোপন আঙিনা।সাকি হতে পারে রহমতের বার্তাবাহক।
ছবি : হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ

হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ, আসল নাম শামসুদ্দিন মোহাম্মদ হলেন একজন ইরানী বা ফার্সি কবি যিনি বুলবুল-ই-শিরাজ উপাধিতে ভূষিত হন।

আমাদের আলোচনার ইশ্‌ক, মদ, সাকি, প্রিয়তম এবং বাহ্যিক ধর্মের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের সত্যের সন্ধান এই ধারার সঙ্গে হাফিজের একটি বিখ্যাত গজল বিশেষভাবে মানানসই। এটি তাঁর দেওয়ান-এর অন্যতম প্রসিদ্ধ গজল, যার প্রথম পংক্তি শুরু হয় শিরাজের তুর্ক যদি আমার হৃদয় জয় করে… দিয়ে।
হাফিজের গজল যদি সেই শিরাজি তুর্ক…
اگر آن ترک شیرازی به دست آرد دل ما را
به خال هندویش بخشم سمرقند و بخارا را
بده ساقی می باقی که در جنت نخواهی یافت
کنار آب رکن آباد و گلگشت مصلی را
ز عشق ناتمام ما جمال یار مستغنی است
به آب و رنگ و خال و خط چه حاجت روی زیبا را
حدیث از مطرب و می گو و راز دهر کمتر جو
که کس نگشود و نگشاید به حکمت این معما را
এর একটি ভাবানুবাদ হতে পারে-
হাফিজের ইশ্‌ক প্রিয়তমের কাছে সবকিছু বিসর্জন
যদি সেই শিরাজি তুর্ক আমার হৃদয়টি জয় করে নেয়,
তার মুখের একটি কালো তিলের বিনিময়ে
আমি দিয়ে দেব সমরকন্দ ও বুখারা।

হে সাকি, ঢেলে দাও সেই অবশিষ্ট মদ-
কারণ স্বর্গেও তো পাওয়া যাবে না
রুকনাবাদের তীর,
মুসাল্লার সেই ফুলে-ভরা পথ।
আমাদের অসম্পূর্ণ প্রেমের তো
প্রিয়তমের সৌন্দর্যের কোনো প্রয়োজনই নেই;
এত সুন্দর যে মুখ,
তার আবার রং, অলংকার, তিল কিংবা রেখারই বা কী প্রয়োজন?
তাই আজ গায়ক আর মদের কথা বলো,
জগতের রহস্যের হিসাব কষো না এত;
কারণ এই মহারহস্য
বুদ্ধির দ্বারা কেউ খুলতে পারেনি,কেউ পারবেও না।

হাফিজের কবিতার বিশেষ সৌন্দর্য এখানেই প্রিয়তমএকই সঙ্গে মানবপ্রেমের এবং সুফি-ভাবনায় পরম প্রিয়তমের প্রতীক হতে পারে। তাঁর “মদ”ও তাই কেবল পানীয় হিসেবে পড়লে কবিতার একটি স্তর ধরা পড়ে; সুফি পাঠে তা ইশ্‌কের নেশা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যাত হয়েছে। তবে হাফিজের কবিতাকে সম্পূর্ণভাবে কেবল সুফি রূপক হিসেবে পড়া নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।

আর আমাদের আগের ইবনুল আরাবি–রুমি–লালন প্রসঙ্গে সবচেয়ে সুন্দর সংযোগটি সম্ভবত এই জায়গায়:
ইবনুল আরাবির কাছে হৃদয় হয়ে ওঠে এমন এক স্থান, যেখানে অসংখ্য রূপে তাজাল্লি ঘটে; রুমির কাছে ইশ্‌ক মানুষকে তার ‘আমি’ থেকে মুক্ত করে; আর হাফিজের কাছে প্রেম এমন এক আগুন, যেখানে সমরকন্দ-বুখারার মতো সমগ্র জগতের মূল্যও প্রিয়তমের এক বিন্দু সৌন্দর্যের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।[/sb
অর্থাৎ তিনজনের ভাষা আলাদা হলেও অন্তর্গত প্রশ্নটি একই-

যাকে ভালোবেসেছি, তার কাছে আমি শেষ পর্যন্ত কী রেখে দিব আমার সম্পদ, আমার অহংকার, নাকি আমার ‘আমি’-টুকুও?
শরাব হতে পারে ইশ্‌কের সুধা।আর নেশা হতে পারে আত্মবিস্মৃতি।কিন্তু কেমন আত্মবিস্মৃতি?দুনিয়া ভুলে যাওয়ার নয়-
নিজের অহংকার ভুলে যাওয়ার যে নেশায় মানুষ অন্যকে তুচ্ছ করতে শেখে, তা নফসের নেশা।যে নেশায় মানুষ নিজের অহংকার ভুলে গিয়ে অন্যের জন্য কাঁদতে শেখে, তা ইশ্‌কের নেশা।এক নেশা মানুষকে অন্ধ করে।আরেক নেশা মানুষের অন্তরের চোখ খুলে দেয়।এক নেশা বলে আমি। অন্য নেশা বলে তুমি।আর ইশ্‌কের সর্বোচ্চ মুহূর্তে আমি আরতুমি। -র ব্যবধানও যেন এক রহস্যে বিলীন হতে থাকে।

ফানা-আমি কোথায় গেলাম? সুফি দর্শনের একটি গভীর শব্দ ফানা।ফানা মানে নিছক অস্তিত্বের ধ্বংস নয়।আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম অহংকারের বিলয়, পৃথকত্বের দাবির ক্ষয়, নিজের ‘আমি’-কেন্দ্রিকতার অবসান।যে মানুষ এতদিন বলত আমার জ্ঞান,আমার সম্পদ,আমার মর্যাদা, আমার ধর্মীয় পরিচয়, আমার সাধনা, আমার পুণ্য।একদিন সে বুঝতে শুরু করে কিছুই তো সত্যিকার অর্থে ‘আমার’ নয়।শ্বাসটিও ধার করা।

জীবনটিও আমানত।প্রতিভাটিও দান।সুযোগটিও দান।ভালোবাসার ক্ষমতাটিও দান।এমনকি তাঁকে খোঁজার আকাঙ্ক্ষাটিও তাঁরই দেওয়া।তখন মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে বলে আমি যে ‘আমি’কে এতদিন সত্য বলে ধরে রেখেছিলাম, সে আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী!এই উপলব্ধির আগুনেই নফসের অনেক পর্দা পুড়তে থাকে।

কিন্তু ফানার পরে? বাকা , সুফি পথ শুধু বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলে না।আছে-
বাকা। অর্থাৎ সেই উপলব্ধির মধ্যে স্থিত হওয়া; এমনভাবে ফিরে আসা, যেখানে মানুষ পৃথিবী থেকে পালিয়ে যায় না, বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেই অন্যভাবে বাঁচতে শেখে।ফানার পরে মানুষ আর বলে না আমি সবার ওপরে।বরং বলে আমি সবার সেবক।ফানার পরে জ্ঞান অহংকার হয় না হয়ে ওঠে বিনয়।ধর্ম বিচার করার অস্ত্র হয় না হয়ে ওঠে করুণা।ইবাদত আত্মম্ভরিতা হয় না হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞতা।আর মানুষ অন্যের ভুল দেখার আগে নিজের অন্তরের আয়না পরিষ্কার করে।

ইকবাল, ফারাজ ও সেই অন্তরের দরজা।

মুহাম্মদ ইকবাল বা আল্লামা/স্যার মুহাম্মদ ইকবাল

ধর্মীয় ও ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত
মির্জা গালিবের শের এর প্রেক্ষিতে ইকবালের জবাব-
মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়, পিনে কি জাগা নেহি,
কাফির কে দিল মে যা, যাঁহা পার খুদা না হো।

ভাবানুবাদ
(মসজিদ খোদার ঘর, হেথা মদ্যপান মানা,
যাও কাফেরের দিলে, যেথায় খোদার নেই ঠিকানা)

এটি বাহ্যিক আদব ও পবিত্রতার কথা মনে করিয়ে দেয়।এটি গুরুত্বপূর্ণ।কারণ সুফিবাদ কখনো নৈতিকতা বা ধর্মীয় শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ অস্বীকার নয়।

কিন্তু ফারাজের জবাব যেন আরেকটি জানালা খুলে দেয়।
ছবি : ফারাজ ওয়ারসি

ফারাজ ওয়ারসি তিনি একজন সুপরিচিত তরুণ সুফি কবি ও গীতিকার। Sufinama-এর মতো সুফি সাহিত্য প্ল্যাটফর্মে তাঁর আধ্যাত্মিক মনকবত, গজল এবং সুফি ঘরানার কালাম বেশ জনপ্রিয়।
কাফির কে দিল সে আয়া হুঁ মেঁ এ দেখ কার,
খুদা মওজুদ হ্যায় ওয়াহাঁ, পার উসে পতা নেহি।

ভাবানুবাদ
(কাফেরের মনে দিয়ে উঁকি এসেছি দেখে,
সেখানেও খোদা আছে, জানেই নেই কাফেরের।)
যাকে তুমি কাফের বলে দূরে সরিয়ে দিলে, তার হৃদয়ের গোপন কক্ষে হয়তো এমন এক নূর আছে, যার খবর সে নিজেও জানে না।কী গভীর কথা!

মানুষ নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতরের নূর সম্পর্কে অজ্ঞ।তার মধ্যে যে করুণা আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে প্রেম আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে অনুতাপ আছে, সে জানে না। তার মধ্যে যে সত্যের ক্ষুধা আছে, সে জানে না।সে শুধু নিজের পরিচয়ের খোলসটুকু জানে।আর খোদা হয়তো খোলসের চেয়ে গভীরে তাকান।

তাজাল্লি হঠাৎ আলো এসে পড়ে ইবনে আরাবির( ১১৬৫ খৃষ্টাব্দে আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনের মূর্সিয়া নগরী তে জন্ম গ্রহণ করায় তাকে আন্দালুসি ও আল-মূর্সি বলা হয়।) সুফিতত্ত্বে তার অনবদ্য অবদানের কারণে তিনি শেখ আল আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি নামেই সমধিক পরিচিত ।
ছবিঃ সুফি কবি ইবনে আরাবি


ভাবনার আলোয় তাজাল্লি পরম সত্যের প্রকাশ বা উদ্ভাসএক গভীর রহস্য।
ইবনুল আরাবির সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাংশগুলোর একটি:
لَقَدْ صَارَ قَلْبِي قَابِلًا كُلَّ صُورَةٍ
فَمَرْعًى لِغِزْلَانٍ وَدَيْرٌ لِرُهْبَانِ
وَبَيْتٌ لِأَوْثَانٍ وَكَعْبَةُ طَائِفٍ
وَأَلْوَاحُ تَوْرَاةٍ وَمُصْحَفُ قُرْآنِ
أَدِينُ بِدِينِ الْحُبِّ أَنَّى تَوَجَّهَتْ
رَكَائِبُهُ فَالْحُبُّ دِينِي وَإِيمَانِي
এর একটি প্রচলিত ইংরেজি অনুবাদ হলো: My heart has become capable of every form…এবং শেষে: I follow the religion of Love… Love is my religion and my faith. এটি Tarjumān al-Ashwāq, কবিতা XI-এর ১৩–১৫ নম্বর পঙ্‌ক্তি হিসেবে সংরক্ষিত।
এর ভাবানুবাদ বাংলায় করলে দাঁড়ায়-
আমার হৃদয় এখন প্রত্যেক রূপ ধারণের উপযোগী-
সে কখনো হরিণের চারণভূমি, কখনো সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়,
কখনো মূর্তির মন্দির, কখনো তীর্থযাত্রীর কাবা,
কখনো তাওরাতের ফলক, কখনো কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠা।
আমি প্রেমের ধর্ম অনুসরণ করি
প্রেমের উটের কাফেলা যেদিকে মুখ ফেরায়,
সেদিকেই আমার ধর্ম,
সেদিকেই আমার ঈমান।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইবনুল আরাবির নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তিগুলোকে পড়লে সব ধর্ম একই এমন সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। তাঁর ব্যাখ্যায় ধর্ম-ই-ইশ্‌কমূলত আল্লাহর প্রতি প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার আধ্যাত্মিক অবস্থাকে নির্দেশ করে; তাঁর Dhakhā’ir al-A‘lāq-এর ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তির সম্পর্কও গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মানুষ অনেক সময় ভাবে, আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানে অনেক কিছু জানা।কিন্তু কখনো কখনো মারিফাত জ্ঞান সঞ্চয় নয়; বরং পর্দা সরে যাওয়া।যেমন সূর্য সবসময় ছিল,মেঘ সরে গেল, সূর্য নতুন করে জন্মাল না।তেমনি হয়তো হৃদয়ের গভীরে নূরের সম্ভাবনা সবসময় ছিল।শুধু নফসের মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছিল।একদিন কোনো অশ্রু,কোনো বিচ্ছেদ,কোনো দুঃখ,কোনো প্রেম,কোনো নিঃসঙ্গ রাত,কোনো গভীর সিজদা,অথবা কোনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে একটি পর্দা সরে গেল, আর মানুষ বলল আহা! তিনি তো এখানেই ছিলেন!

হয়তো এটাই সেই হৃদয়, যার সন্ধান লালনের মনের মানুষএর কাছে;
হয়তো এটাই রুমির ইশ্‌কএর আগুনে পুড়ে স্বচ্ছ হওয়া হৃদয়;হয়তো এটাই ইবনুল আরাবির সেই ক্বালবযেখানে তাজাল্লির অসংখ্য রূপ প্রতিফলিত হয়।

হৃদয় যখন নফসের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়, তখন সে আর কেবল একটি পরিচয়ের ঘর থাকে না সে হয়ে ওঠে এক আয়না। আর সেই আয়নায় যত রূপই ফুটে উঠুক, প্রেমিকের চোখ শেষ পর্যন্ত এক নূরেরই সন্ধান করে।
এই জায়গাতেই গালিবের প্রশ্ন আবার ফিরে আসে
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই?
আর ইবনুল আরাবির হৃদয় যেন নীরবে উত্তর দেয়;
যে হৃদয় সত্যিকারের ইশ্‌কে প্রশস্ত হয়েছে,
সেখানে তাঁর নিদর্শনের জন্য আর কোনো স্থানই পর নয়।

১০. লালনের মনের মানুষ[/sb
লালনের মনের মানুষ ধারণার মধ্যে যে অন্তর্মুখী রহস্য আছে, সেটিই এই আলোচনার সবচেয়ে মানবিক সেতু।
মনের মানুষকে বাইরে খুঁজে কী হবে?দরবেশের পোশাক পরলেই কি দরবেশ হওয়া যায়?জটা রাখলেই কি সাধু হওয়া যায়?তসবিহ হাতে নিলেই কি অন্তর জিকিরে ভরে যায়?মসজিদে গেলেই কি হৃদয় মসজিদ হয়ে যায়? না। ঘর বানানো আর ঘরকে পবিত্র করা এক কথা নয়।হৃদয়ও তেমন।তার মধ্যে হিংসা থাকতে পারে।অহংকার থাকতে পারে।লোভ থাকতে পারে।বিচারপ্রবণতা থাকতে পারে।কিন্তু তার মধ্যেই আবার প্রেম জন্মাতে পারে।ক্ষমা জন্মাতে পারে।করুণা জন্মাতে পারে।অনুতাপ জন্মাতে পারে।আর সেই অনুতাপ থেকেই শুরু হতে পারে প্রত্যাবর্তন।এই প্রত্যাবর্তনের নামই হয়তো তওবা।

আমরা সবাই পথিক এই পৃথিবীতে কেউই সম্পূর্ণ পথিক নয়।কেউ শরিয়তের পথে হাঁটছে।কেউ তরীকতের দরজায়।কেউ মারিফাতের সন্ধানে।কেউ কেবল নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।কেউ আবার এখনো জানেই না যে তার ভেতরে কোনো পথ আছে।তাই অন্যের অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়া কত সহজ!

কিন্তু নিজের অবস্থান জানা কত কঠিন!আমি জানি না অন্যের অন্তরে কী আছে।তাই আমার কাজ বিচারক হওয়া নয়।আমার কাজ নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়ানো।নিজেকে জিজ্ঞেস করা আমার ইবাদত আমাকে কতটা নম্র করেছে? আমার জ্ঞান আমাকে কতটা বিনয়ী করেছে?আমার ধর্ম আমাকে কতটা দয়ালু করেছে?আমার জিকির আমাকে কতটা মানবিক করেছে?আমার সিজদা আমাকে কতটা অহংকারমুক্ত করেছে?যদি ইবাদতের পরও আমার মধ্যে ঘৃণা বাড়ে,যদি জ্ঞানের পরও অহংকার বাড়ে, যদি ধর্মের পরও মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা বাড়ে তবে হয়তো আমাকে আরও গভীরে যেতে হবে।কারণ sb]আচার শেষ হওয়ার পর যে মানুষটি বেরিয়ে আসে, আধ্যাত্মিকতার আসল পরীক্ষা তার মধ্যেই।


ছবি - লালন শাহ'র জীবদ্দশায় তৈরি করা একমাত্র চিত্র, ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

খোদাকে পেতে হলে খোদার সৃষ্টি থেকে মুখ ফেরানো যায় না। এখানে এসে সুফি দর্শন এক গভীর মানবিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়।তুমি যদি বলো “আমি আল্লাহকে ভালোবাসি,”তবে তাঁর সৃষ্ট মানুষের প্রতি তোমার আচরণেও সেই ভালোবাসার ছায়া থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি নূর দেখেছি,”তবে তোমার আচরণে অন্যের অন্ধকারের প্রতি একটু করুণা থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি মারিফাত পেয়েছি,”তবে তোমার ভাষায় অহংকার কমার কথা।তুমি যদি বলো “আমি ইশ্‌কের পথে,”তবে তোমার হৃদয় আরও কোমল হওয়ার কথা।কারণ সত্যিকারের তাজাল্লির একটি চিহ্ন হলো [মানুষের হৃদয় নরম হয়ে যায়।সে অন্যের কষ্টে কষ্ট পায়।
অন্যের ভুলে শুধু ঘৃণা করে না সংশোধনের সম্ভাবনাও দেখে।অন্যের পতনে আনন্দ পায় না।কারণ সে জানে আজ যে পড়ে আছে, কাল সে উঠতে পারে;আর আজ যে দাঁড়িয়ে আছে, কাল সে নিজেই পড়ে যেতে পারে।

জান্নাত কোথায়?আমরা জান্নাত চাই।এটি মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন তুমি জান্নাত চাও, না জান্নাতের মালিককে? তুমি দান চাও, না দাতাকে?তুমি আলো চাও, না আলোর উৎসকে? তুমি শান্তি চাও, না সেই সত্তাকে, যার স্মরণে হৃদয় প্রশান্ত হয়?এখানেই প্রেম আর লেনদেনের পার্থক্য।লেনদেনের মানুষ বলে আমি এত ইবাদত করলাম, বিনিময়ে কী পেলাম?
প্রেমিক বলে তুমি আছ এটাই তো যথেষ্ট।এই জায়গায় এসে ইবাদতও বদলে যায়।ভয় থেকে ভালোবাসায়।দাবি থেকে কৃতজ্ঞতায়।লেনদেন থেকে আত্মসমর্পণে।

আর সেই অজ্ঞাত কবির শেষ শের?
পীতা হুঁ সাকি
গাম-এ-দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে
জান্নাত মে কৌনসা গাম হ্যায়,
ইস লিয়ে ওঁয়াহা মাজা নেহি।

ভাবানুবাদ -
(পান করি হে সাকি, সংসারের দুঃখ ভুলে যেতে;
জান্নাতে নেই দুঃখই কোনো,
তাই সেথায় মধ্যপানে মজা নাই।)
কী আশ্চর্য মানবিক স্বীকারোক্তি!মানুষ দুঃখ থেকে পালাতে চায়।কেউ মদে পালায়।কেউ অর্থে।
কেউ ক্ষমতায়।কেউ প্রেমে।কেউ ধর্মীয় অহংকারে।কেউ ব্যস্ততায়।কেউ নিঃসঙ্গতায়।কেউ আবার নিজের তৈরি কোনো পরিচয়ের আড়ালে।কিন্তু দুঃখকে যতই ভুলতে চাই, দুঃখ আমাদের ভেতরে থেকে যায়।

সুফি পথ অন্য কিছু শেখায় দুঃখকে ভুলে যেও না।দুঃখের কাছে বসো।তাকে জিজ্ঞেস করো“তুমি কেন এসেছ?”হয়তো সে বলবে তোমার নফস ভাঙতে।হয়তো বলবে তোমাকে মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখাতে। হয়তো বলবে তোমাকে সেই দরজায় নিয়ে যেতে, যেখানে তোমার সমস্ত অহংকারের কোনো মূল্য নেই। তখন দুঃখ শত্রু থাকে না।দুঃখ হয়ে ওঠে মুর্শিদ।

শেষ পর্যন্ত মদ নয় প্রশ্নটাই আসল এই পুরো শায়েরির আসল সৌন্দর্য হয়তো এখানেই এটি আমাদের মদ্যপান শেখাতে আসে না। বরং দেখতে শেখায়।বাহ্যিকতার আড়ালে অন্তরকে।নামের আড়ালে নামহীনকে।রীতির আড়ালে রহস্যকে।শব্দের আড়ালে নীরবতাকে।আর ‘আমি’-এর আড়ালে সেই অসীম সত্যকে, যার সামনে সমস্ত অহংকার ক্ষুদ্র।তাই গালিবের প্রশ্নটি আজও আমাদের পিছু নেয়-
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই।
কারণ যতদূর তাকাই নূর।নূরের মধ্যে নূর।সৃষ্টির মধ্যে নিদর্শন।নিঃশ্বাসে রহস্য।অশ্রুতে ভাষা।প্রেমে তাজাল্লি।আর নীরবতায় এক গভীর উপস্থিতি।

হয়তো খোদার সবচেয়ে কাছের জায়গাটিই আমার অজানা, হয়তো আমি মসজিদের মেহরাব চিনি, কিন্তু নিজের হৃদয়ের মেহরাব চিনি না।হয়তো আমি কাবার দিক জানি,কিন্তু আমার নফস কোন দিকে ছুটছে তা জানি না।হয়তো আমি তসবিহের দানা গুনি,কিন্তু নিজের অহংকারের দানা গুনি না।হয়তো আমি অন্যের ঈমান মাপি,কিন্তু নিজের অন্তরের অন্ধকার মাপি না।হয়তো আমি জান্নাতের দরজা খুঁজি,কিন্তু আমার হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে রেখেছি।আর হয়তো-
খোদা সেই দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন,
যে দরজা খুলতে চাবি হিসেবে লাগে না কোনো সম্পদ,
লাগে শুধু আত্মসমর্পণ।


শেষ কথা: আমি থেকে তুমি সুফি পথের সমস্ত শব্দকে যদি এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাই
নফস,ইশ্‌ক,মারিফাত,হকিকত,তাজাল্লি,ফানা,বাকা,তবে হয়তো এদের অন্তর্নিহিত যাত্রাটি এমন প্রথমে মানুষ বলে আমি আছি।তারপর ইশ্‌ক এসে প্রশ্ন করে এই আমি কে?মারিফাত এসে বলে নিজেকে চিনো।হকিকত এসে বলে যা সত্য, তার সামনে নিজের ধারণাগুলো ছোট করো।তাজাল্লি এসে বলে পর্দার ফাঁকে আলো দেখো।ফানা এসে বলে অহংকারকে বিলীন হতে দাও।আর বাকা এসে শেখায় এবার ফিরে যাও মানুষের কাছে কিন্তু আগের মানুষ হয়ে নয়।এবার তোমার চোখে করুণা থাকবে।কণ্ঠে কোমলতা থাকবে।হৃদয়ে বিনয় থাকবে।অন্যের জন্য দোয়া থাকবে।নিজের জন্য অশ্রু থাকবে।আর সর্বোপরি থাকবে ইশক

তাই আজ গালিবের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আর মসজিদ, ময়খানা, কাফের কিংবা জান্নাতের মানচিত্র আঁকতে চাই না। আমি শুধু নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে চাই।একবার নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করতে চাই;
হে আমার অন্তরের অচেনা পরিচিত,
আমি সারাজীবন তোমাকে কোথায় কোথায় খুঁজেছি!
মসজিদে খুঁজেছি, কাবায় খুঁজেছি, কিতাবে খুঁজেছি, মানুষের মুখে খুঁজেছি, কবিতায় খুঁজেছি, অশ্রুতে খুঁজেছি, প্রেমে খুঁজেছি, কিন্তু কখনো কি সত্যিই নিজের অন্তরে ফিরে এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তুমি কি এখানেই ছিলে?

হয়তো কোনো উত্তর আসবে না।হয়তো শুধু চোখের কোণে জল জমবে।হয়তো বুকের ভেতর নিঃশব্দে কিছু একটা কেঁপে উঠবে।আর সেই কাঁপনই হয়তো হবে প্রথম তাজাল্লি।সেই অশ্রুই হয়তো হবে প্রথম জিকির।সেই আত্মসমর্পণই হয়তো হবে প্রথম ফানা।আর সেই নীরব প্রশান্তিই হয়তো হবে বাকার প্রথম স্বাদ।তখন বুঝব খোদাকে খুঁজতে গিয়ে আমি যে পৃথিবী ঘুরেছি,তিনি কখনোই আমার কাছ থেকে দূরে ছিলেন না। আমি দূরে ছিলাম।আমার নফসের পর্দা দূরত্ব তৈরি করেছিল।আমার অহংকার দেয়াল তুলেছিল।আমার অজ্ঞতা তাঁকে আড়াল করেছিল।তিনি হারিয়ে যাননি আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম।
আর তাই সুফির শেষ যাত্রা খোদার দিকে নয় নিজের মিথ্যা ‘আমি’ থেকে বেরিয়ে সেই সত্যের দিকে,যার আলোয় আমিও একদিন নীরব হয়ে যায়।তখন আর বলা যায় না খোদা কোথায়?
বরং হৃদয় ধীরে ধীরে বলে ওঠে যেদিকে তাকাই, তাঁরই নিদর্শন।যেদিকে ফিরি, তাঁরই দরজা।
যে হৃদয়কে এতদিন নিজের বলে জানতাম সেখানেও তাঁরই আমানত।

আর তখন লালনের মনের মানুষ, রুমির ইশ্‌ক, ইবনে আরাবির হকিকত, হাফিজের মদখানা সব যেন এসে একই নীরব বিন্দুতে মিলিত হয়।শব্দ আলাদা, পথ আলাদা, উপমা আলাদা কিন্তু আকুলতা এক।সেই আকুলতার নাম ইশক।সেই ইশ্‌কের আগুনে নফস পুড়ুক,অহংকার গলুক,পর্দা সরুক,নূর প্রকাশিত হোক।

আর মানুষ একদিন নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে করে বলুক আমি তোমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম শেষে আবিষ্কার করলাম,আমার খোঁজাটিও তোমারই দেওয়া।হয়তো এটাই মারিফাতের প্রথম বিস্ময়।এটাই ইশ্‌কের প্রথম অশ্রু।এটাই হকিকতের প্রথম দরজা।আর এটাই মানুষের দীর্ঘতম সফরের সবচেয়ে নীরব গন্তব্য।
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…হয়তো উত্তরটি কোনো কবিতায় নেই।হয়তো উত্তরটি আমাদের নিজের হৃদয়ের গভীরতম নীরবতায়।

ছবি সুত্র : গুগল উইকিপিডিয়া ।

মন্তব্য ১২ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৩

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই?
................................................................................
যারা নাস্তিক , তাদের অন্তরে তো খোদা নেই !!!
সহজ প্রশ্ন , উত্তর দিন ।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




মহজ প্রশ্ন , সহজ উত্তর
নাস্তিকের মনেও উঁকি দিয়ে দেখে এসেছি
সেখানেও খোদা আছে, তা জানেনা নাস্তিক।
যাকে তুমি নাস্তিক বলে দূরে সরিয়ে দাও, তার হৃদয়ের গোপন কক্ষে হয়তো এমন এক নূর আছে,
যার খবর সে নিজেও জানে না।

মানুষ নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতরের নূর সম্পর্কে অজ্ঞ।তার মধ্যে যে করুণা আছে,
সে জানে না।তার মধ্যে যে প্রেম আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে অনুতাপ আছে, সে জানে না। তার
মধ্যে যে সত্যের ক্ষুধা আছে, সে জানে না।সে শুধু নিজের পরিচয়ের খোলসটুকু জানে।আর খোদা হয়তো
খোলসের চেয়ে গভীরে তাকান। তাইতো সে অনেক আস্তিকের চেয়েও ভাল আছে এ ভবে ।

শুভেচ্ছা রইল

২| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০৫

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:




এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই।
======================

ভাইয়া,
খোদা ও খোদার - দুটো জিনিস।

খোদাই নূর। আর, নূর হতে সৃষ্ট কিছু মহামানব।
অর্থাৎ, মহামানবদের সৃষ্টি উপাদান নূর।
আর, সাধারণ মানুষ মাটির তৈরী।

এখন, প্রশ্ন, যে মাটি দিয়ে মানুষ তৈরী হয়েছে, সেই মাটি কোথা থেকে আসলো? সেই মাটির সৃষ্টি উপাদান কি?

গোলকধাঁধাটি এখানেই।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:১৩

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



ভাইয়া, আপনার প্রশ্নটি আসলে খুব গভীর মানুষ যদি মাটি দিয়ে তৈরি হয়, তবে সেই মাটি কোথা থেকে এলো?
আর মাটির সৃষ্টি-উপাদান কী?

প্রথমেই একটি জায়গা পরিষ্কার করা দরকার। ইসলামী আকীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ্‌ ও তাঁর সৃষ্টি এ দুটি এক জিনিস
নয়। আল্লাহ স্রষ্টা; নূর, মাটি, পানি, আগুন, মানুষ সবই তাঁর সৃষ্টি। তাই খোদা নূর এবং নূর থেকে সৃষ্টি মহামানব
এই দুই বাক্যকে একই অর্থে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।

কুরআনে বলা হয়েছে
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর নূর।

এটি সূরা আন-নূর ২৪:৩৫-এর সূচনা। কিন্তু একই আয়াতে আল্লাহ তাঁর নূর এর একটি উপমা দিয়েছেন
একটি কুলুঙ্গির মধ্যে প্রদীপ, প্রদীপটি কাঁচের মধ্যে, এবং বলা হয়েছে, নূরুন ‘আলা নূর নূরের উপর নূর।
অর্থাৎ এখানে নূর কে নিছক কোনো বস্তুগত পদার্থ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তাফসিরে এর অর্থ
আল্লাহর হিদায়াত, আলোকপ্রদান ও পথনির্দেশ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অতএব, আল্লাহ নূর মানেই আল্লাহ কোনো আলোক-কণা বা পদার্থ দিয়ে তৈরি এমন অর্থ ইসলামী বক্তব্যে নেই।
বরং আল্লাহ সৃষ্ট পদার্থের ঊর্ধ্বে; নূরও তাঁর সৃষ্টি-জগতের একটি ধারণা, আর তাঁর নূর মানুষের অন্তরে হিদায়াত
ও জ্ঞানের আলো হিসেবেও প্রকাশিত হতে পারে।

এবার আসি মহামানব নূর থেকে সৃষ্টি প্রসঙ্গে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।

সহিহ মুসলিমের একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা।) বলেছেন-
ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে
সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে।

অর্থাৎ নূর থেকে সৃষ্টির কথা সরাসরি ফেরেশতাদের ব্যাপারে সহিহ হাদিসে এসেছে। আদম (আ.)-এর ক্ষেত্রে
এসেছে মাটি/কাদামাটির কথা।এখানে তাই নূর থেকে সৃষ্টি এবং মাটি থেকে সৃষ্টি দুটিকে মানুষের মর্যাদার
মাপকাঠি বানানোর প্রয়োজন নেই।কারণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার কাঁচামালে নয়, তার আত্মিক অবস্থানে।

মাটি দিয়ে তৈরি মানুষই জ্ঞানী হতে পারে, প্রেমিক হতে পারে, আরিফ হতে পারে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে।
আবার সেই মানুষই অহংকার, জুলুম ও প্রবৃত্তির দাস হতে পারে।
অর্থাৎ মাটি মানুষের শরীরের উৎস হতে পারে;কিন্তু মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চেতনা, আমল, তাকওয়া
ও আল্লাহ-সচেতনতার দ্বারা।

এবার আসল প্রশ্ন সেই মাটি কোথা থেকে এলো?”এখানেই প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে যায় সৃষ্টিতত্ত্বের গভীরে।
ইসলামী দৃষ্টিতে উত্তরটি হলো মাটি নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি; মাটিও আল্লাহর সৃষ্টি।

কুরআন মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় মাটি, ধূলি, কাদামাটি ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ মানুষের জৈবিক
দেহের উপাদান পৃথিবীর উপাদান-জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে আবার প্রশ্ন করা যায় তাহলে পৃথিবী কোথা থেকে এলো?উত্তর:পৃথিবীও সৃষ্টি।

তারপর প্রশ্ন মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? ইসলামী বিশ্বাসের উত্তর মহাবিশ্বও সৃষ্টি।

তাহলে আবার যদি প্রশ্ন করি সৃষ্টির আগে কী ছিল? এখানে এসে আমাদের চিন্তার একটি মৌলিক সীমা স্পষ্ট হয়।
কারণ আগে শব্দটিই সময়ের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সময় নিজেই যদি সৃষ্ট জগতের অংশ হয়, তাহলে
সৃষ্টির বাইরে দাঁড়িয়ে সৃষ্টির আগে কী ছিল? প্রশ্নটি আমাদের পরিচিত সময়-ধারণায় সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করা
যায় না।

ইসলামী তাওহিদের মূল বক্তব্য তাই হলো সৃষ্ট জগতের প্রতিটি কিছুর জন্য কোনো না কোনো কারণ আছে;
কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি স্রষ্টা।

অর্থাৎ মাটি, পৃথিবী,মহাবিশ্ব সবই সৃষ্টির ধারার অন্তর্গত।আল্লাহ সেই ধারার আরেকটি বস্তু নন; তিনিই সেই ধারার স্রষ্টা।

কিন্তু এখানেই সুফি সাধনার আরেকটি দরজা খুলে যা বাহ্যিকভাবে মানুষ মাটি।অন্তরে সে নূরের সন্ধানী।

কুরআনের নূর কে যদি হিদায়াত ও ঈশ্বরীয় আলোকপ্রাপ্তির অর্থে বুঝি, তাহলে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা হয়ে ওঠে
মাটির শরীর থেকে নূরের দিকে যাত্রা।
এখানে নূর কোনো শারীরিক পদার্থ নয়; এটি হিদায়াত, জ্ঞান, ইশ্‌ক, মারিফাত ও অন্তরের জাগরণের প্রতীক
হিসেবেও বোঝা যায়। কুরআনের নূরের আয়াতের বিভিন্ন তাফসিরে এই আলোক-উপমার সঙ্গে অন্তরের ঈমান
ও হিদায়াতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তাই একজন মানুষকে মাটির তৈরি” বলা তার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে ছোট করে না।বরং সুফির কাছে এখানেই রহস্য
মাটির মানুষই নূর খোঁজে। মাটির মানুষই প্রেমে জ্বলে।মাটির মানুষই আমি কে অতিক্রম করতে চায়।
মাটির মানুষই একদিন নিজের অন্তরে হিদায়াতের আলো অনুভব করতে পারে।

এই কারণেই সুফি সাহিত্যে মাটি কখনো কেবল নিম্নতার প্রতীক নয়।মাটি নম্র, মাটি ধারণ করে।
মাটি পায়ের নিচে থাকে, মাটি থেকে ফুল জন্মায়, মাটিতে বীজ চাপা পড়ে, তারপর সেই বীজ থেকেই বৃক্ষ
উঠে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়।

মানুষও যেন তেমনই শরীরে মাটি,প্রাণে জীবন,চেতনায় প্রশ্ন,হৃদয়ে প্রেম,আর পথের শেষে নূরের সন্ধান।

আর আপনার গোলকধাঁধা-র সবচেয়ে গভীর উত্তরটি সম্ভবত এখানেই

আপনি যদি প্রশ্ন করেন মাটির সৃষ্টি-উপাদান কী? বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা বলতে পারি, মাটি কোনো একক মৌল
নয়; এটি খনিজ কণা, জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের জটিল সমষ্টি।

আর যদি আবার জিজ্ঞেস করেন এই উপাদানগুলো কোথা থেকে এলো? তাহলে আমরা পৌঁছে যাব পৃথিবীর
ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পদার্থবিজ্ঞানের কাছে।

কিন্তু যদি আরও এক ধাপ পিছিয়ে জিজ্ঞেস করি সেই মহাবিশ্বের অস্তিত্বই বা কেন?
তখন প্রশ্নটি আর কেবল বিজ্ঞানের নয়; এটি হয়ে ওঠে মেটাফিজিক্স ও দর্শনের প্রশ্ন।

আর তাওহিদের উত্তর সেখানে খুব সরল সৃষ্টি নিজের স্রষ্টা নয়।মাটি সৃষ্ট, মানুষ সৃষ্ট।
নূরও সৃষ্ট জগতের ধারণা ও নিদর্শনের অংশ।

কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট নন।
সুতরাং মাটি কোথা থেকে এলো? প্রশ্নের উত্তর আমাদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় মাটিরও একজন স্রষ্টা আছেন।

আর সুফির ভাষায় সেই উপলব্ধি আরও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে আমি মাটি থেকে এসেছি তাই আমার অহংকারের
কীসের ভিত্তি?আমি নশ্বর তাই আমার আমি-র এত গর্ব কেন?আর যদি আমার অন্তরে নূরের জন্য আকুলতা
জেগে থাকে,তবে সেই আকুলতাই হয়তো আমার পথের প্রথম প্রদীপ।

অতএব, মাটি ও নূরকে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পদার্থ হিসেবে না দেখে একটিকে সৃষ্টির বস্তুগত দিক এবং অন্যটিকে
হিদায়াত/আধ্যাত্মিক আলোর প্রতীক হিসেবে দেখলে প্রশ্নটির অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায়।
মোদ্দাকথা মানুষ মাটির বলে তুচ্ছ নয়;বরং মাটির হয়েও সে নূরের সন্ধান করতে পারে
এইটিই মানুষের রহস্য।

সুন্দর একটি প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ ।

শুভেচ্ছা রইল

৩| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০০

শায়মা বলেছেন: বাপরে মির্জা গালিব থেকে লালন শাহ!
সবাই আধ্যাত্মিক পথের পথিক ও অন্য জগতের আলোয় আলোকিত!
যা আমরা দেখতেও পাই না শুনতেও পাইনা তা তারা দেখে ফেলে কোন দিব্য দৃষ্টির আলোয়!

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



আপু তোমার মন্তব্যটির মধ্যে খানিকটা রসিকতা, খানিকটা সংশয় এবং গভীর একটি দার্শনিক প্রশ্ন আছে। :)
যা আমরা দেখি না, শুনি না তারা কী করে তা দেখে? এই প্রশ্নটিই তো যুগে যুগে সাধক, দার্শনিক ও কবিদের
ভাবিয়েছে।

তবে আমি মনে করি, মির্জা গালিব, লালন, রুমি কিংবা ইবনুল আরাবির মতো মানুষদের অন্য জগতের আলোয়
আলোকিত বলার আগে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার তাঁরা কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার দাবি করেছেন,
এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁদের অনেকের সাধনা ছিল বাইরের চোখ দিয়ে অদৃশ্য কোনো বস্তু দেখা নয়;
বরং নিজের অন্তরের পর্দাগুলো সরিয়ে বাস্তবতাকে অন্যভাবে অনুভব করার চেষ্টা।

আমরা চোখ দিয়ে মানুষ দেখি, কান দিয়ে শব্দ শুনি; কিন্তু ভালোবাসা, বিবেক, সৌন্দর্য, বেদনা, সত্য এসবের
কতটুকুই বা চোখে দেখা যায়?

একজন মা সন্তানের মুখ দেখে শুধু মুখটি দেখেন না তার মধ্যে নিজের সমগ্র পৃথিবীকে অনুভব করেন। একজন
কবি বৃষ্টিতে শুধু জল দেখেন না স্মৃতি, বিরহ কিংবা প্রেমও দেখতে পান। সেই দেখা চোখের দেখা নয়
অন্তরের দেখা।

সুফিরা সেই অন্তর্দৃষ্টিকেই কখনো বাসিরাত, কখনো মারিফাত, কখনো নূর বলে ভাষা দিয়েছেন।

তাই গালিব যখন প্রশ্ন করেন যেখানে খোদা নেই, এমন জায়গা দেখাও, আর লালন যখন মানুষ ও মনের মানুষের
সন্ধানে ফিরে যান, তখন তাঁরা আমাদের এমন কোনো জগতের মানচিত্র দিচ্ছেন না যা আমরা চোখে দেখতে পাই না।
বরং তাঁরা প্রশ্ন করছেন আমরা যে জগতটি প্রতিদিন চোখের সামনে দেখি, তার গভীরতাটুকু কি সত্যিই দেখতে
শিখেছি?

হয়তো দিব্যদৃষ্টি মানে আকাশের ওপারে কোনো অদৃশ্য জগত দেখা নয়।হয়তো দিব্যদৃষ্টি মানে চোখ একই থাকে,
কিন্তু দেখার মানুষটি বদলে যায়।

আর সেখানেই কবিতা, দর্শন ও সাধনার মিলন।

তাই গালিব থেকে লালন এ যাত্রা বাপরে! বলার মতো রহস্যময় যতটা, তার চেয়েও বেশি নিজেকে
দেখার একটি আমন্ত্রণ।

তা এখন নীজকে কেমন দেখলে একটু বলে যেও ।

শুভেচ্ছা রইল

৪| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩২

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:




ধন্যবাদ, ভাইয়া।
অনেক সুন্দর করে উত্তর দিয়েছেন।

আমি স্বীকার করি যে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই এক খোদার সৃষ্টি।

কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সকল খোদার সৃষ্টি যেহেতু এবং প্রতিটি সৃষ্টির উপাদান আছে, সেগুলো কি খোদার অস্তিত্বের বাইরে যেতে পারে?

এক খোদা ছাড়া বাকি সব কিছুই খোদার সৃষ্টি যেহেতু, সেই বাকি সব কিছুর অস্তিত্বে আসলো কি করে? সেগুলোর কোন না কোন 'সৃষ্টি উপাদান' থাকতেই হবে যে!

আরও গভীরে গেলে, সেই সকল প্রাণ ও বস্তুর 'সৃষ্টি উপাদান'-এর পিছনে আরেকটি সৃষ্টি উপাদান আছে।
যদি সৃষ্টি উপাদান না থাকে, তাহলে, খোদা কি দিয়ে সেগুলো সৃষ্টি করলেন??!!!

এখন প্রশ্ন, সকল সৃষ্ট'র সেই প্রাইমারী 'সৃষ্টি উপাদান' কি?

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




ভাইয়া, এখন আর পারছিনা । ঘুমে চোখ ডুলু। সেই গতকাল সন্ধা থেকে শুরু করে সারা রাত ধরে এখন পর্যন্ত
লিখেই চলেছি। পোস্টের লেখা , পরের পোস্টে মন্তব্য করা , নীজের পোস্টে বিস্তারিত মন্তব্য করা সেযে
সময় সাপেক্ষ্য। কখন যে রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি । যাক একঘুম দিয়ে উঠে আপনার
এই কঠীন প্রশ্নের কী উত্তর দেয়া যায় তা ভাবব । এর মাঝে দেখলাম আপনি ২ টি পোস্ট দিয়েছেন সেখানেও
কিছু কথা বলার আছে ।

শুভেচ্ছা রইল

৫| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২২

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: সুফিইজম আর পালনকে এক সুতোয় গাঁথা কখনোই ঠিক নয়।

৬| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫

নতুন বলেছেন: সে জানতে চায় আল্লাহ কোথায়?কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে আমার অন্তর কোথায়? আমার অন্তর কি সত্যিই তাঁর দিকে মুখ করে আছে? নাকি কেবল আমার শরীর সিজদায় যায়, আর আমার নফস দাঁড়িয়ে থাকে অহংকারের মসনদে?আমি কি সত্যিই তাঁকে চাই?নাকি তাঁর কাছ থেকে শুধু তাঁর দানগুলো চাই?আমি কি তাঁকে ভালোবাসি? নাকি তাঁর দেওয়া জান্নাতকে ভালোবাসি?আমি কি তাঁর সন্তুষ্টি চাই?নাকি মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়ার সম্মান চাই? এই প্রশ্নগুলোই সুফির পথের শুরু।

শরিয়াতের ঠিকাদারী এখন ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে। শরিয়াত ধর্মের কমিটির হাতে। মসজিদ, মন্দির, মাজার, খানকা আয়ের উতস। সেখানে কমিটি দেখে কত মানুষ আসলো, কত খরচ করলো সেটাই কমিটির মানুষের ধান্দা। যেটা পৃথিবিতে প্রায় ৪-১০ হাজার ধর্মের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

মারেফত-সুফীবাদ মানুষকে সৃস্টিকর্তার বিশালতার সাথে মেলানোর চেস্টা করে। সেটা এক অর্থে ঠিকই আছে।

কার্ল সাগান বলেছিলো "We are all star stuff," এক অর্থ মানুষের প্রতিটি অনু মহাবিশ্বের প্রতিটি অনুর সমান বয়স। সেই অর্থে মানুষ আর মহাবিশ্ব একই জিনিস।

কিন্তু সমস্যা আসে সৃস্টিকর্তার আইডিয়া থেকে।
আসলে কি সৃস্টিকর্তা ১ জন বলে কেউ আছে?
আর থাকলেও সেই সৃস্টিকর্তাই ইসলাম ধর্মের নবী/রাসুল দের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

৭| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: এত বড়ো লেখা ঠান্ডা মাথায় লেখা খুবই কঠিন । এত কিছু একসাথে মনে রাখা সম্ভব হয় না । আপনার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই । আপনি বলতে চেয়েছেন নিজের ভেতরের কু-প্রবৃত্তি কে জয় করাই আসল জয় এটা কোনো নতুন ধারনা ছিলো না । রুমি , হাফিজ , লালন এরা ছিলেন গ্রেট অবজারভার । এরা সবসময় খেয়াল করতেন তাদের মনের অবস্থা কেমন হয় যখন কাম আসে , লোভ আসে , হিংসা অনুভূত হয় । এগুলো মানুষের ডোপামিন বাড়িয়ে দিতো । এরা লক্ষ্য করতেন মানুষ ক্রোধের বশে কিভাবে আরেকজনের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করছে । নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় নিজের অন্তরে অনুভূতিকে খেয়াল করতেন । শায়েরীর মাধ্যমে এসব বিষয় লিখে যাওয়ায় তা পড়তে ভালো লাগে । আমি হিন্দুধর্মের একটা লেখায় পেয়েছিলাম যে ভগবান পৃথিবীর সবকিছুর মাঝে বিরাজমান । এটাও সুফিবাদের একটা কোর আইডোলজী । ভালো লিখেছেন ।

৮| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:২৫

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মসজিদের ওই কোণে বসে, শুধাই আমি বারে বার
হে গালিব, ঢালিতে দাও সাকি শরাবের ওই ধার।
তুমি তো বলিছ খোদার ঘরে পাপের ছোঁয়া বারণ অতি,
তবে দেখাও আমায় এমন ভুবন, যেখানে নেইকো
তাহার জ্যোতি (কেরামতি )?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.