ঝিক ঝিক শব্দে ট্রেনটা এগিয়ে যাচ্ছে। গতি কিছুটা কমে এসেছে। সামনে কোন স্টেশন হয়তো। আনিতা কম্বলের ভেতর শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না তার। কিন্তু চোখ বন্ধ করে আছে। একপাশে কাত হতে গিয়ে তার গা থেকে কম্বলটা সরে যায়। আনিতার একটু একটু শীত লাগছিল না যে তা না, কিন্তু সে কম্বলটা ঠিক করে না। বেশ খানিক্ষন এভাবেই শুয়ে থাকে আনিকা। ক্ষণিক পরে রাহাত কবির উঠে আসে তার কাছে। আনিতার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আনিতা বুঝতে পারে। পর পর দুইটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আনিতার কম্বল টা সাবধানে তার বুকের উপর তুলে দেয়। আলতো করে আনিতার গালে হাত দেয়। কপালে একটা চুমু দেয়। আনিতার সারা শরীরে একটা স্রত বয়ে যায়। আনন্দ-বেদনা মেশানো সেই স্রত তার শরীরের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পরে।
এই পাগলাটে ধরনের স্যার টা যে কিনা সবসময় আনিতা কে বকাবকি করতো সেও আনিতাকে ভালবাসে!! কিন্তু পরমুহূর্তে তামিমের কথা মনে পরে যায় আনিতার। কোনদিন কি তামিম আনিতার কপালে এরকম করে চুমু দিএছিল? সৃতির পাতা হাতরিয়েও কিছু খুজে পায়না আনিতা। তামিমকে কি সে ধোঁকা দিচ্ছে রাহাত কবিরকে তার পাশে আসতে দিয়ে? আনিতার মনে প্রশ্ন আসতে থাকে নানানটা। বুক চিড়ে একটা কান্নার দমক আসে তার। সেটা আটকে রাখতে বার বার কেপে কেপে উঠছিল আনিতা। রাহাত তার পাশথেকে দূরে সরে যায়। আনিতা বুঝতে পারে, তার খুব ইচ্ছা করে রাহাতের হাত দুটো ধরে তার পাসে বসিয়ে রাখতে সারা রাত। দুইজন দুইজনকে প্রান ভরে দেখবে তারা। কিন্তু আনিতা শুয়ে থাকে।
ট্রেনটার গতি কমে আসতে আসতে এক সময় থেমে যায়। আনিতার ভেতরের স্রোত এখনো প্রবাহমান। জেবা হুড়মুড় করে আপার বাঙ্ক থেকে নেমে নাঈম কে তুলে। নাঈম বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বলেঃ
- কি হইছে? এতো রাতে ডাকিস ক্যান?
- দেখ আমরা একটা স্টেশনে আছি। চল না চা খায়ে আসি।
- এই এতো রাতে চা খাবি?
নাঈমের কণ্ঠে বিরক্তি আর রাগ দুটাই স্পষ্ট।
- কই কতো রাত? সবে তো ভোর সাড়েতিনটা বাজে। তুই না গেলে নাই আমি একাই যাচ্ছি।
একথা শুনার পর নাঈম আর বসে থাকবে না জেবা জানে। হলও তাই। রাগে গোঁজ গোঁজ করতে করতে অবশেষে নাঈম বাঙ্ক ছাড়ল। জেবা খানিক্ষন আনিতা কে ডেকে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু আনিতার গুম ভাঙ্গাতে না পেরে ওরা দুজনেই ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে যায়। আনিতা আসলে ঘুমায়নি। জেগেই ছিল। কিন্তু তার এখন কথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। জেবা এটা মানত না। তাকে জড় করে স্টেশনে গিয়ে চা খেতে হতো। আনিতা শুয়ে শুয়ে জেবা আর নাঈমের চলেযাওয়ার শব্দ শুনল। দিলিপ, রাই, আঁখি আরও কয়েকজন নাঈমদের সাথে নিচে নেমেছে চা খেতে। আনিতা সব শুনছে শুয়ে শুয়ে।
বুকের ভেতর সেই পাগল বুড়ো টা আবার ঢাক বাজাতে শুরু করেছে। দ্রিম দ্রিম আওয়াজ পাচ্ছে আনিতা। রাহাত কবির আর সে একা একটা ক্যাবিনে! একটা স্পর্শ তাকে শিউড়ে দেয়। রাহাত কবির তার গালে হাত দিয়েছে। আনিতা যেন পাথর হয়ে গেছে। একটুও শক্তি নেই তার।
- আনিতা! আমি জানি তুমি জেগে আছ। একটু কি চখ খুলে আমার দিকে তাকাবে?
আনিতা রাহাত কবিরের কণ্ঠ শুনতে পায়। কিন্তু ঠিক যেন বুঝতে পারে না। তার মনে হয় বহু দূর থেকে কেউ তাকে ডাকছে। আবারো ডাকঃ
- আনিতা! আনিতা!
বহু কষ্টে চখ মেলে আনিতা দেখতে পায় রাহাত কবির তার দিকে ঝুকে তাকে ডাকছে। আনিতা কোন মতে উঠে বসে। রাহাত তার পায়ের কাছে ধপ করে বসে পরে।
- কোন সমস্যা হয়েছে কি স্যার?
আনিতা একটু যেন দিশেহারা।
- তুমি আমাকে ক্ষমা করে দেও আনিতা। আমি আসলে তোমার সাথে নিজেকে জড়াতে চাইনা কিন্তু আজ আমি যা করেছি তা ঠিক হয়নি।
- কি করেছেন আপনি?
আনিতার প্রশ্ন।
- আমি কি করেছি তুমি খুব ভালো করেই জান। আমি জানি যখন আমি তোমার কপালে চুমু দিয়েছি তখন তুমি জেগেই ছিলে। আমি খুব সরি।
- সরি কেন? আমি যেহেতু কোন কিছু বলিনি তার মানে আমি এটাতে কোন কিছু মনে করিনি।
- কিন্তু তার পরেও। আমি তোমাকে আমার এই ছন্নছাড়া জীবনের অংশ করতে পারব না। আমি তমাকে খুব পছন্দ করি। প্রতি সপ্তাহের দুইদিনের জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকি। তোমার হাসি, কথা বলা, সব কিছুই আমার খুব ভাল লাগে। এটা যদি ভালবাসা হয় তবে তোমাকে...... তোমাকে...
রাহাতের কথা আটকে যায়। নিজেকে সংযত করে নেয়।
- তোমাকে কি?
আনিতা বেকুল হয়ে প্রশ্ন করে রাহাতকে।
- না কিছু না। ঘুমিয়ে পর। আর আজকের ঘটনাটা প্লিজ ভুলে যাও। মনে কর এরকম কোনকিছু ঘটেনি তোমার জীবনে।
- ভুলে যাবো? আপনি ভুলতে পারবেন? আপনি তো বুঝতেই পেরেছিলেন আমি আপনাকে ভালবাসতে শুরু করেছি তাই না? আপনিও আমাকে ভালবাসেন এটা বলতে ভয় পাচ্ছেন কেন?
আনিতা নিয়ন্ত্রণহীনের মতো কাঁপতে থাকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। রাহাত আনিতার দিকথেকে চখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়। আনিতা আবারো প্রশ্ন করে আরও তীব্র সুরেঃ
- কি বলেন আপনি আমাকে ভালবাসেন কি না!
- না আমি ভালবাসিনা। আমি কাউকে ভালবাসিনা।
রাহাত অন্য দিকে তাকিয়ে আনিতার প্রশ্নের উত্তর দেয়।
- এভাবে না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন আপনি আমাকে ভালবাসেন না।
আনিতা রাহাত কবিরের দিকে ঝুকে আসে। রাহাতের চোখে চোখ রাখে। রাহাত একটু যেন দিশেহারা।
- না আমি তোমাকে ভালবাসিনা।
রাহাত চোখ বন্ধ করে বলে ফেলে। আনিতা একটু যেন কেঁপে উঠে। কান্নার দমকে বার বার আনিতা কেঁপে কেঁপে উঠছে। আগে যখন জানতো রাহাত কবির তাকে এক জন ছাত্রীর মতই দেখে তখন এতোটা কষ্ট পায়নি সে। কিন্তু আজকে এই এখন যখন রাহাত নিজের মুখে এই কথা টা বলছে তখন এতো কষ্ট হচ্ছে আনিতার সেটা ব্যাক্ত করার মতো না। বড় বড় অশ্রু তার গাল বেয়ে নেমে জামার এক অংশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। তাহলে কেন রাহাত আজ তার কপালে চুমু খেল? কেন তাকে ডেকে তুলল ঘুম থেকে?
পর্ব ১ Click This Link পর্ব ২ Click This Link পর্ব ৩ Click This Link পর্ব ৪ Click This Link পর্ব ৫ Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১৩ রাত ১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



