রাহাত আর আনিতা কতক্ষণ এভাবে ছিল সেটা যানে না। তারা একজন আর একজন কে জড়িয়ে ধরে যেন অনন্ত কাল পার করে দিয়েছে। দুজনেরই সংবিৎ ফিরে ট্রেনের হুইসেলের সব্দে। একজন আরেকজনকে ছেড়ে নিজের নিজের জায়গায় ফিরে যায়। আনিতা কম্বল গায়ে শুয়ে পরে আবার। রাহাতও শুয়ে পরে। তারা কেউ কাউকে বলেনি। কিন্তু দুইজনই জানে তাদের এই সম্পর্কটা আর সবার কাছে গোপন রাখতে হবে।
আনিতা করিডোরে তার বন্ধুদের পায়ের আওয়াজ আর কথা শুনতে পায়। আনিতা শেষবার রাহাতের দিকে তাকায়। রাহাত ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে। আনিতা নিজের চোখ বন্ধ করে ফেলল। নাঈম আর জেবা কোন একটা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছে। আনিতা তাও মটকী মেরে ঘুমিয়ে থাকার ভান করে। রাহাত কবির বিরক্ত ভরে নাঈম আর জেবা কে ঘুমোতে বলে। রাহাতের কণ্ঠে রাজ্যের ঘুম। আনিতার হাসি উঠে যায়। এই একটু আগেও তাকে জড়িয়ে ধরে কতো রোমান্টিক কথা বলছিল আর এখন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে গেছে।
ধড়মড়করে আনিতা উঠে বসে। এখন কয়টা বাজে? জানালা গলে ভোরের নরম আলো এসে ঢুকছে ক্যাবিনটায়। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমোতে পারেনি। শেষ রাতে একটু তন্দ্রা মতো এসেছিলো। এখন এতো ভোরে আনিতার ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রথমে আনিতার বুঝতে একটু সময় লাগলো কথায় আছে। ছাদ টা অনেক নিচে যেন মাথার উপর ভেঙ্গে পরবে। কামরা টা অদ্ভুত ভঙ্গিতে দুলছে। একটা ঝিক ঝিক সব্দ আসছে। আনিতা ভয় পেয়ে তারাতারি উঠে বসে। পাশে তাকিয়ে রাহাত কে দেখে। তখন তার সবকিছু মনে পরে যায়। কালকে রাতের কথা, রাহাতের স্পর্শ, রাহাতের ভালবাসা। সব যেন একটা স্বপ্ন মনে হয় আনিতার। এক অদ্ভুত কিন্তু খুব সুন্দর স্বপ্নের জগতে ঘুরে বেরাতে বেরাতে রাহাত নামের এই রাজকুমারের সাথে দেখা হয়েছে আনিতার।
আনিতা তার বাঙ্ক থেকে নামে। গুটি পায়ে ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে আসে। ব্রাশ আর চিরুনি হাতে ওয়াস-রুমে যায়। ফ্রেশ হয়ে হাতের চিরুনি দিয়ে মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে ট্রেনের নংরা আয়নায় নিজেকে দেখে। নির্ঘুমের জন্য চোখের নিচে কালি, চোখ ইসদ ফোলা ফোলা। হাত ব্যাগটা হাতড়ে আনিতা আই-লাইনার খুঁজে বের করে। চোখের পাতার উপর আই-লাইনারের হাল্কা আঁচড় দেয়। আনিতা ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখতে থাকে। সে খুব সুন্দরী না হলেও তাকে আকর্ষণীয়া বলা যায়। ভরাট গাল, খাঁড়া নাক, খুব ফর্সা না হলেও গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল, চোখে কাজল দিলে একটা মায়া কাড়া ভাব আসে।
আনিতা আবার ক্যাবিনে ফিরে আসে। একটা জামা টেনে বের করে। সাদা আর গোলাপি রঙ মিশান জামা টা হাতে নিয়ে আবার ওয়াশ রুমে ফিরে যায়। জামা বদলে বাইরে বেরতেই দেখে রাহাত ক্যাবিনের দরজার বাইরে দাঁড়ানো। মুখে এক গাল হাসি। আনিতার দিকে তাকিয়ে সেই হাসি আরও প্রসারিত হল।
আনিতা কিছুটা বিব্রত বধ করলো। এই সাত সকালে এতো সাজি-গুজি তো রাহাতের জন্যই, কিন্তু এভাবে ধরা পরতে চায়নি সে। লুকিয়ে লুকিয়ে সেজে আবার তার বাঙ্কে শুয়ে পরতে চেয়েছিল আনিতা। কিন্তু রাহাত ধরে ফেলল। আনিতা কিছুটা লজ্জা পেলো। কিন্তু সেটা আর প্রকাশ পেতে দিলো না। রাহাতকে পাশ কাটিয়ে ক্যাবিনে ঢুকতে গেল। রাহাত আনিতার একটা হাত ধরে তাকে থামায়। নিজের দিকে ফেরায়
- দেখি কেমন দেখাচ্ছে আমার আনু কে!
রাহাতের কণ্ঠে ঠাট্টার সুর। আনিতা নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
- আহঃ কি হচ্ছে? কেউ দেখে ফেলবে যে! আর আমি কি কিছু করেছি নাকি যে আমাকে কিছু দেখাবে?
আনিতা একটু লজ্জা পায়। রাহাত তার ফাঁকি ধরে ফেলে।
- এই যে তুমি আমার জন্য এতো ভোরে উঠে সাজলে সেটা আমি দেখব না?
- আমি কি সেজেছি নাকি?
- সাজনি? কাল তো তুমি একটা নীল জামা পরে ছিলে আর এখন লাল জামা পরেছ। আবার চোখে কাজল।
রাহাতের ঠোঁটের কোনায় হাসি। আনিতা একটু ক্ষেপে যায়। রাহাতের জন্য এতো সাজি-গুজি করলো আর ও এটা নিয়ে হাসছে!
- For your kind information, এটা লাল রঙ না। এটা পিঙ্ক। আর আপনার জন্য সাজতে আমার বয়েই গেছে! আমি রোজ সকালে উঠে রেডি হয়ে যাই। অনেক ছোটবেলার অভ্যাস।
আনিতা রাগে একজাএকটু কাঁপছে। রাহাত তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে দেখে রাগটা বেড়ে যাচ্ছে। আনিতা ক্যাবিনে ঢুকতে যায় কিন্তু রাহাত এবার আনিতাকে টেনে আনে। আনিতার গালে ঠোঁট স্পর্শ করে। আনিতার রাগ উবে যায়। একটু লজ্জা পায়। কাল রাতে যা হয়েছে সেটা একটা আবেগের জন্য , যখন প্রথম ভালবাসার প্রকাশ ঘটলো। কিন্তু আজ এই দিনের আলোয় রাহাতকে তার এতো কাছে দেখে কেমন জানি অস্বস্তি হতে থাকে। ইশ কালকে কি বোকার মতোই না কেঁদে দিয়েছিল! কেঁদেছিল বলেই এই মানুষটা এখন তার কাছে।
রাই কথা থেকে যেন এসে উপস্থিত। আনিতা আর রাহাত তখনো ক্যাবিনের দরজা ধরে এক জন অপরজনের দিকে তাকিয়ে আছে। রাই খানিকক্ষণ তাদের দূর থেকে দেখে কাছে আসলো। আনিতার ঘাড়ে একটা হাত রাখল। আনিতা চমকে পেছনে ফিরে।
- কি রে রাই তুই এখানে কি জন্য?
আনিতা একটু বিব্রত হয়ে প্রশ্ন করে রাই কে।
- না মানে আমার টুথপেস্টটা আনতে ভুলে গেছি। আর ঐ ওরা এখনো ঘুমোচ্ছে। তুই তো অনেক তারাতারি ঘুম থেকে জাগিস, তাই ভাবলাম তোরটা আপাতত নেই।
- ওহ আচ্ছা! দাড়া আমি নিয়ে আসছি।
আনিতা একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে। যাক বাবা রাই কিছু দেখেনি। ইউনিভার্সিটি কত্রিপক্ষ যদি জানতে পারে যে রাহাত কবির তার ছাত্রীর সাথে কোন একটা রিলেশনে জড়িয়ে পরেছে তাহলে হয়তো রাহাতকে তার চাকরিটা হারাতে হবে। তার নিজের সুখের জন্য রাহাতের এতো বড় ক্ষতি আনিতা করতে পারে না। তাই যতদিন আনিতার গ্রাজুয়েশন টা শেষ না হচ্ছে এটা গোপন রাখতে হবে।
পেস্টের টিউব টা রাই এর হাতে দিলো আনিতা। রাই চলে জাচ্ছিল। ফিরে আসে আবার। -- থাঙ্কস রে।
- আরে কোন ব্যাপার না।
রাই একবার রাহাতের দিকে আর একবার আনিতার দিকে তাকায়। আবার চলে যেতে গিয়ে ফিরে আসে।
- কি রে কিছু বলবি?
আনিতা জিজ্ঞেস করে।
- না মানে তুই কি রাতে ঘুমাসনি?
- হ্যাঁ ঘুমিয়েছি। কেন?
- ওহ আচ্ছা। না কিছু না। By the way তোরা কি নিয়ে আলাপ করছিলি? আমি অনেক কাছে আসেও কিছুই শুনলাম না।
আনিতার বুকে একটা ধাক্কা মতো লাগে। রাই যে তাদের এই প্রশ্ন করবে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে। সে রাহাতের দিকে তাকায়। রাহাত তাকে উদ্ধার করল।
- আসলে রাই তোমার বান্ধবি আমার কাছে তার খাতায় কত নাম্বার দিয়েছি সেটা জানতে চায়। সেটা কি আর বলা যায় বল?
- ওহ আচ্ছা। আনিতা বরাবরই এরকম। পরীক্ষা নিয়ে খুব চিন্তিত। আচ্ছা স্যার আমি এখন যাই।
রাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আনিতা এতক্ষণ চেপে রাখা শ্বাস টা বের করে দেয়। না এই ভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। তাদের একটু সাবধান হতে হবে। তার নিজের জন্য না রাহাতের জন্য।
পর্ব ১ Click This Link পর্ব ২ Click This Link পর্ব ৩ Click This Link পর্ব ৪ Click This Link পর্ব ৫ Click This Link পর্ব ৬ Click This Link পর্ব ৭ Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



