[এই সিরিজের অন্যান্য পর্বের লিংক লেখার শেষে দেয়া হলো।]
মধ্যবিত্তের চিন্তাশীল অংশটি অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা যুগ যুগ ধরে সততা, সত্যবাদিতা, ন্যয়পরায়নতা, দেশপ্রেম, মানবকল্যাণ ইত্যাদি মূল্যবোধ সৃষ্টি ও তা রক্ষা করার উপায় নিয়ে কথা বলে আসছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব নীতিবাক্য প্রায়ই মাঠে মারা যাচ্ছে। যারা এগুলো বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, স্বয়ং তাদের সন্তানরাই এগুলোর থোড়াই কেয়ার করে। তারা সত্যবাদিতাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, সততাকে মনে করে বোকামী, ন্যায়পরায়নতাকে মনে করে দুর্বলতা আর দেশপ্রেমকে মনে করে কুপমণ্ডকতা। এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে - মধ্যবিত্তের প্রথম জেনারেশনে এসব নীতিবাক্য বেশ কাজ দিলেও, দ্বিতীয় প্রজন্মই এর মধ্যেকার ফাঁকফোকরগুলো ধরে ফেলে এবং আবিষ্কার করে যে, একটু চালাকচতুর হলে আর এসব মূল্যবোধকে খানিকটা সরিয়ে রাখতে পারলেই মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙ্গিয়ে উচ্চবিত্তের উজ্জ্বল জগতে প্রবেশ করা যায়। অর্থাৎ 'ওপরে' ওঠা যায়। (দেখা যাচ্ছে, যারা ওপরে উঠতে চায় তারাই এসব মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখায়। মধ্যবিত্তের এই অংশটিই স্বাধীনতার পর নীতিহীন লুটতরাজে অংশ নিয়েছিলো।) ওপরে ওঠার সিঁড়িটি যে খুবই সরু, একসঙ্গে একজনের বেশি ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায় না, সে অচিরেই সেটাও আবিষ্কার করে ফেলে। ফলে প্রথমেই তাকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। ওঠার সময় পেছন থেকে কেউ তার পাশে আসার চেষ্টা করলে সে তাকে কনুই মারে, ধাক্কা মারে; সামনে থাকা লোকটিকে ল্যাং মারে আর পেছনে উঠতে থাকা লোকটিকে মারে পিছ-লাথি। এতসব কনুই, ধাক্কা, ল্যাং, পিছলাথি মারতে গেলে প্রথম তার জন্য যেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে এতকাল ধরে শিখে আসা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ। ফলে ওপরে ওঠার জন্য তাকে অনিবার্যভাবেই এসব মূল্যবোধ ঝেড়ে ফেলতে হয় - আর এভাবেই জন্ম নেয় (সামাজিক ভাষ্যমতে) নীতিবিবর্জিত, লুটেরা, আদর্শহীন (এই নীতি ও আদর্শের মানদণ্ডটি কিন্তু মধ্যবিত্তের তৈরি করা) উচ্চবিত্ত সমপ্রদায়। এর ফলে কি মধ্যবিত্তের মূল্যবোধগুলো সমাজ থেকে উধাও হয়ে যায়? না, যায় না। নীতিবাগিশ অনড় পুরনো চিন্তাবিদদের পাশাপাশি নতুন নতুন চিন্তাবিদদের উদ্ভব হয় মধ্যবিত্তদের ভেতর থেকেই। এদের কথাবার্তা তার নিজ শ্রেণীকে প্রভাবিত করুক আর নাই করুক, নিম্নবিত্ত থেকে যারা মধ্যবিত্ত হতে চাইছে তাদের কাছে এগুলো খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে - কারণ তার সমাজে এগুলো নেই, সে মনে করে এগুলো শিখলেই সে তার স্বপ্নের মধ্যবিত্তে পরিণত হতে পারবে। ফলে এসব নীতিবাক্য, মূল্যবোধ কিংবা আদর্শের আবেদন সহসা ফুরিয়ে যায় না। অতএব বলা যায় - মধ্যবিত্ত হচ্ছে একটা ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। নিম্নবিত্তরা স্বপ্ন দেখে মধ্যবিত্ত হবার, আবার মধ্যবিত্ত হয়েই বড়জোর এক বা দুই প্রজন্ম - তারপর উচ্চবিত্ত হবার জন্য তোড়জোর শুরু করে সে - অর্থাৎ মধ্যবিত্ত অবস্থানটিতে কেউ দীর্ঘদিন থাকতে চায় না।
মধ্যবিত্তদের নিয়ে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে সাধারণ যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো - এই শ্রেণীর ভবিষ্যৎ কি? মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা মধ্যবিত্তকে কোনো শ্রেণী হিসেবেই মানতে নারাজ। কেউ যদি মানেনও তাহলে সঙ্গে সঙ্গে গলার রগ ফুলিয়ে উচ্চকণ্ঠে এ কথাও বলতে ভোলেন না যে, এই শ্রেণীর অবস্থা মুমূর্ষু এবং অচিরেই এরা মৃতু্যবরণ করবে। যুগের পর যুগ ধরে তারা এই কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে - মধ্যবিত্ত তো মরছেই না বরং তাদের আকার ও আয়তন দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, বরং বেশ দাপটের সঙ্গে বেঁচে আছে। অবশ্য বিশ বছর আগের মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্যরা যে এখনো মধ্যবিত্তই আছে তা বলা যায় না। কেউ চেষ্টাচরিত্র করে উচ্চবিত্তের জগতে চলে গেছে, কেউ বা যুদ্ধে টিকতে না পেরে নিম্নবিত্ত হয়ে গেছে। এই নিম্নবিত্তকেই মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে। বিত্তের বিচারে এরা নিম্নবিত্তই, কিন্তু যেহেতু মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো তারা বেশ শক্তভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকে তাই তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে অমন একটি সমাসবদ্ধ নামে ডাকতে হয়। অন্যদিকে যারা উচ্চবিত্ত হবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে - অর্থাৎ যথেষ্ট বিত্তবান হলেও যারা মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো এখনও পুরোপুরি বিসর্জন দিতে পারেনি তাদেরকে বলা হচ্ছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত। আর দু-তিন প্রজন্ম ধরে যারা স্রেফ মধ্যবিত্তই রয়ে গেছে তারাই আসলে মধ্যবিত্ত বলে পরিচিতি পাচ্ছে। মধ্যবিত্তের চরিত্র বুঝতে হলে বুঝতে হবে এদেরকেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এতসব রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে তারা কতদিন তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে? বলা বাহুল্য মধ্যবিত্ত অবস্থাটি বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য - যে কোনো সময় নিম্নবিত্তের কাতারে চলে যাবার একটি ভয় থাকে। অনেক সময় দেখা যায় মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। এরকম দু-একটি উদাহরণ দেখে অবশ্য - এই শ্রেণী মৃত্যুমুখে পতিত - এমনটি ভাবার কোনো মানে হয় না। কারণ, যতদিন পর্যন্ত সমাজে নিম্নবিত্তরা থাকবে এবং তাদের জন্য শিক্ষার দ্বার স্থায়ীভবে বন্ধ করে দেয়া না হবে - ততদিন পর্যন্ত নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না। আর বন্ধ হবে না বলেই নতুন করে মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাবে - অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার আয়তন বাড়তে থাকবে। এ-দিক থেকে দেখলে বলতেই হয় - মধ্যবিত্তরা অমর ও অক্ষয় - কোনোদিনই এদের মৃত্যু হবে না।
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৫
Click This Link
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৪
Click This Link
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৩
Click This Link
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২
Click This Link
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
Click This Link
যারা সম্পূর্ণ লেখাটি একসঙ্গে পড়তে চান, তাঁরা এই লিংক থেকে (আমার ওয়েবসাইটের) পড়তে পারেন।
লিংক : Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


