এগুলো ছিল খুবই বুদ্ধিদৃপ্ত তর্ক-বিতর্ক যা কুরাইশদের ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে খন্ডন করার জন্য
উপস্থাপন করা হয়েছিল। এ যুক্তিগুলো কতটা গভীর এবং প্রাসঙ্গিক ছিল তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্য একজনকে অবশ্যই তৎকালীন মক্কার সম্পূর্ণ ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো বুঝতে হবে। মক্কায় বসবাসকারী যেকোন মুশরিক (বহুত্ববাদী) অথবা মুসলিম উপরোক্ত বিবৃতিগুলোর পুরো সত্যটাকে উপলব্ধি করতে না পারলেও এর ভেতরকার মূল সত্য উপাদানটাকে অন্তত চিনতে পারত।
মক্কার অভিজাত সম্প্রদায় খুবই ধনী ছিল এবং ব্যবসা বাণিজ্যে তাদের ছিল এক ধরণের
বিবেকবর্জিত আধিপত্য। তারা কাফেলা ব্যবহার করে আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্য করত। এসব
বাণিজ্য কাফেলা শীত মৌসুমে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্ম মৌসুমে সিরিয়ায় ভ্রমণ করত। ওকাজ মেলার মত তাদের কতগুলো মৌসুমি মেলা হত যা অনুষ্ঠিত হত হজ্বের মৌসুমে। তাদের ব্যবসার এক বিরাট অংশ হাজ্বীদেরকে প্রতারণার প্রতি কেন্দ্রিভূত ছিল। এটি হয়ত সবাই করত না, কিন্তু এটি ছিল এমন একটি চর্চা যা সমাজ সাধারণভাবে মেনে নিয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা সরাসরি প্রতারণার এ কর্মটি এবং প্রতারকদেরকে নির্দেশ করে খুব তীক্ষ্ম বাণী নাযিল করলেন যা মক্কার নাগরিকদের মনে, যারা মূলতঃ এ ঘটনাটিকে ঘটতে দিচ্ছিল, তাদের মনে ব্যাপক প্রশ্নের ও ক্রোধের জন্ম দিয়েছিল।
و
“যারা মাপে কম দেয় তাদের জন্য দুর্ভোগ। যারা লোকদের কাছ থেকে যখন নেয় তখন
পূর্ণমাত্রায় নেয়। এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে
দেয়।” [সূরা আল্ মুতাফ্ফিফীন: ১-৩]
এই সমালোচনাগুলোর মধ্যে এমন কিছু প্রখর বুদ্ধিদীপ্ততা ছিল যার মাধ্যমে তৎকালীন মক্কী
সমাজের সাধারণ জনগণ কোন ঘটনা, প্রথা বা চিন্তাকে নির্দেশ করে এসব আয়াত নাযিল হয়েছে তা সহজেই বুঝে ফেলত। কুরাইশদের আভিজাত্যবাদী আর্থ-সামাজিক দর্শন সূরা আল-মাউনে কঠোরভাবে অভিযুক্ত হয়েছিল,
َأ
“আপনি কি তাকে দেখেছেন যে বিচার দিবসকে অস্বীকার করে? সে হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে এতিমকে গলা ধাক্কা দেয় এবং মিসকীনকে অন্ন দিতে উৎসাহিত করে না।” [সূরা- মাউন:১-৩]
আল-ওয়াহিদি আসবাব আল-নুযুল আল-কুরআন’এ উল্লেখ করেন যে এই সূরাটি আবু
সুফিয়ানকে সম্পর্কযুক্ত করে নাযিল হয়েছিল। একবার সে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন
করেছিল যার জন্য দুইটি ভেড়া জবাই করা হয়েছিল। এক এতিম তার বাড়িতে এসে খাবার চেয়েছিল। আবু সুফিয়ান এই এতিমের অনাহূত প্রবেশে ভীষণভাবে যুদ্ধ হল এবং এতিম বালকটিকে গালাগালি করল এবং একটি লাঠি দিয়ে এতিমের মাথায় আঘাত করল। সূরা
আত-তাকাছুর ও সূরা হুমাজাহ্’তেও এই অভিজাততান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো সমালোচিত হয়েছে,
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। যতক্ষণ না তোমরা কবরে গমন কর। এটা কখনো উচিত নয়। তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে।”
[সূরা আত্-তাকাসুর:১-৩]
“দুর্ভোগ তার জন্য যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে । যে অর্থ জমা করে ও বার বার গণনা করে। সে মনে করে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে।” [সূরা আল্ হুমাযাহ্: ১-৩]
তাছাড়া এই দু’টি আয়াতের মাধ্যমে বস্তুবাদ এবং পরনিন্দাকেও আঘাত করা হয়েছে। উপরোক্ত তিনটি আয়াতই মক্কী যুগের শুরুতেই নাযিল হয়েছিল। কুরাইশদের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক মূল্যবোধ থেকে জন্ম নেয়া এক ভয়ঙ্কর প্রথা ছিল শিশুহত্যা। দারিদ্র অথবা লোকলজ্জার ভয়ে কুরাইশরা তাদের শিশুকন্যাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। আর এই কর্ম এবং একে প্রভাবিত করার পেছনের পুরো চিন্তার শৃঙ্খলকে কুরআনে আঘাত করা হয়েছে,
“যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো দুঃসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রাখে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে (কন্যা সন্তান) বেঁচে থাকতে দেবে, না মাটির নীচে পুঁতে ফেলবে। (শুনে রাখ) তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট!” [সূরা আন্- নাহলঃ ৫৮-৫৯]
“দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে
আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি।” [সূরা আল- ইসরাঃ ৩১]
“যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হল?”
[সূরা আত্- তাক্বীরঃ ৮-৯]
এটি মুশরিকদের অন্য আরেকটি ব্যবহার বা প্রচলিত চিন্তার দিকেও আমাদের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করে আর তা হল মেয়েদের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আল্লাহ্ সুবহানাহুতা’য়ালা কুরাইশরা যেভাবে মেয়েদের সাথে আচরণ করত আর অপর দিকে তারা যেভাবে তাদের ধর্মীয় প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করত এ দুয়ের মাঝে স্পষ্ট বিরোধকে তুলে ধরেছেন,
و
“তারা আল্লাহ জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারণ করে- তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত এবং নিজেদের
জন্য ওরা তাই নির্ধারণ করে যা ওরা চায় (পুত্র)।” [সূরা আন্- নাহল ঃ ৫৭ ]
َأَ
“তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওয্যা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি-মানাত সম্পর্কে? পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য এবং কন্যাসন্তান আল্লাহ্ জন্য ? এমতাবস্থায় এটাতো খুবই অসঙ্গত বন্টন!” [সূরা আন-নজমঃ ১৯-২২]
َأ
“তাঁর কি শুধুমাত্র কন্যা সন্তান আছে আর তোমাদের পুত্র সন্তান ?” [সূরা আত্ তূ-রঃ ৩৯]।
এভাবে উপরোক্ত আয়াতগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন জাহেল সমাজে প্রচলিত প্রভাবশালী চিন্তা, বিশ্বাস,আবেগ ও অনুভূতিগুলোকে আঘাত করে সেগুলোকে পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হয়েছে।
[চলবে]
আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার ইসলামি পদ্ধতি (পর্ব -১)- [ View this link]
আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার ইসলামি পদ্ধতি (পর্ব -২)- [ View this link]
আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার ইসলামি পদ্ধতি (পর্ব -১)- [ View this link]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০০৯ বিকাল ৪:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



