somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যক্তিগত দর্শন সমগ্র - ১ [১৮+]

২৫ শে মে, ২০১৩ রাত ১০:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শ্রেণী সংগ্রাম বলতে বর্তমানে আমাদের বামপন্থীরা যা বোঝান তার সাথে আমি প্রায়সই তার সাথে এক মত হতে পারি না। মার্ক্স যে সময়ে আপেক্ষিকতায় শ্রমিক শ্রেনীকে প্রত্যক্ষ করেছেন সে সময় আর বর্তমান সময়ের আপেক্ষিকতায় বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যায় , একটি আধা সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজে শ্রমিকের যে শ্রেনী চরিত্র বিদ্যমান , একটি আধা গণতান্ত্রিক অথবা গণতন্ত্রের উত্তরনের পথে ধাবমান সমাজের শ্রমিকের শ্রেনী চরিত্র তার থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। কিন্তু শ্রমিকের শোষনের ধরণ এবং পদ্ধতি প্রায় একই থেকে যায়। কারন পুঁজির বিকাশ এবং পুজিপতিদের চিন্তার ধারা সেই আদি কাল থেকে এক ই বৃত্তে ক্রমশ রং পাল্টে গেছে, এবং পুঁজি অর্থাৎ টাকার বা মূলধনের তারল্য সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণে পুজিবাদ তথা পুঁজিপতিদের ফ্ল্যাক্সিব্যলিটি, ইলাস্টিসিটি সবসময়ই বেশি, যে কারনে যে কোন সমাজ বাস্তবতায় তারা তাদের সহজেই অভিযোজিত করে নিতে পেরেছে, মহাজন থেকে হয়েছে ব্যাংক। এ ছাড়া অধিক সামাজিক সুবিধা পাওয়ায়, একজন পুঁজিপতির চিন্তার বিকাশে আধিপত্যের ছাপ স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় ।

তা ছাড়া যে সকল দেশ, সমাজ কলোনিয়েল বা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বাস্তবতার মধ্য দিয়ে উন্নত সভ্যতার পথে যাত্রা করেছে বা সভ্যতাকে আত্মীকররণ করেছে তাদের ক্ষেত্রে শ্রমিকের এবং শোষকের শ্রেণী চরিত্রের বিশাল পার্থক্য দেখা যায় সে সকল পুঁজিবাদী ও শ্রমিকের থেকে যেখানে পুঁজির উদ্ভব স্বতস্ফূর্ত ঘটেছে সেখানে সেই সাথে শোষক ও শ্রমিকের শ্রেনী চরিত্রের মাঝে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। এ ছাড়া সমতল ভূমিতে যেখানে সভ্যতার ক্রমবর্ধমান বিকাশের ধারা ধীর এবং ভাববাদ ও আধ্যাত্মবাদের বিকাশ পূর্নমাত্রায় ঘটেছে সেখানে শ্রমিক শ্রেনীর বিকাশ অন্যান্য বস্তুবাদী সমাজের বিকাশের ধারা থেকে সম্পূর্ণ সতন্ত্র।

মার্ক্সবাদী দর্শনে বলা হয় শ্রমিক শ্রেনী হলো সেই শ্রেনী, যে শ্রেনী সাম্যবাদী বিপ্লবকে অন্যান্য শ্রেনীগুলোর সাথে সংঘাত করে সামনে থেকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বিপ্লবের চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে শ্রমিক এই আন্দোলন কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং সে যখন নেতৃত্বে চলে আসবে এবং তার উপরে যখন পুঁজিবাদের ভুত সাওয়ার হবে, তখন নেতৃস্থানীয় শ্রমিক শ্রেনীই হবে পুঁজির টারশিয়ারী বা চূড়ান্ত ধারক। আর বিপ্লবের সংজ্ঞায় বলা হয়, যখন উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদক ক্ষমতার মাঝে পারস্পরিক সংঘাত ঘটে তখনই বিপ্লব শুরু হবে। অর্থাৎ সেই সাম্যবাদী সমাজ তার স্ট্যবিলিটি হারাবে। আর স্ট্যবিলিটি হারান মানে সেখানে পুনরায় বিভিন্ন শ্রেনীর বিকাশ ঘটবে এবং গণ অব্যুত্থান ঘটবে। এর বড় উদাহরণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। শ্রমিকের অধিকারের কথা, সাম্য, ভাতৃত্বের কথা বললেও প্রথম দিককার কিছু সময় বাদ দিয়ে সোভিয়েত শাসন ছিলো মূলত পুঁজিবাদের অ শোষনের নয়া রূপ। তাই সোভিয়েত শাসন একদিনের জন্যও স্ট্যবিলিটি পায় নি, শুধু এটাই নয় বিশাল সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং বিশাল ভূখন্ড এই পতনের পেছনে বিশাল ভাবে দায়ী। সে যাই হোক। এবার আসি মোদ্দা কথায়,

মার্ক্সবাদীদের মতে আদি মানব সমাজ ছিলো সাম্যবাদী সমাজ। হ্যা, আমি এই কথার সাথে শতভাগ সহমত। কারণ আদি মানব সমাজ ছিলো খাদ্য সংগ্রহকদের সমাজ। তারা জানতো না কী করে খাদ্য উৎপাদন এবং পশু পালন করা যায়। সুতরাং সেই সমাজে ব্যাক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ লাভ করে নি। সেটাও Palaeolithic Age এবং Mesolithic Age এর কথা। কিন্তু Neolithic Age এ এই ধারণার পরিবর্তন ঘটে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের ফলে কৃষি ও পশুপালন যুগের উদ্ভব ঘটার সাথে সাথেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ লাভ করে। গর্ডন চাইল্ডের মতে “The first revolution that transformed human economy gave man control over his own food supply. Man began to plant, cultivate and improve selection edible grasses, roots and trees.” এই সময় থেকেই খাদ্য উৎপাদন ও মজুদের ধারণা গড়ে উঠে। অর্থাৎ প্রথম পুঁজির জন্ম হয়, এখান থেকেই। এই সময় ই মানুষ গুহাবাসী থেকে Barbarism অর্থাৎ বন্যতার পর্যায়ে উন্নিত হয়। যার ফলে ব্যক্তিগত অথবা গোত্রগত বাসস্থান তৈরী করতে শেখে। এবং এ সকল উন্নত সাংস্কৃতির বিকাশের ফলেই ধর্মের উদ্ভব হয়। যা শ্রেনী সংগ্রাম আর সাম্যবাদের মাঝে পার্থক্য রেখা টেনে দেয়, সেই সাথে প্রথমিক শ্রেনী যেমন কৃষক, গৃহনির্মানকারী, শিকারী, পশুপালকে ভাগ করে দেয়।


ধর্মের বিকাশের ফলে আধ্যত্মিক শক্তির প্রতি বিশ্বাস বাড়ে প্রাথমিক উন্নত মানব সমাজের। এর ফলে ইশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট এবং অভিশপ্ত শ্রেনীতে বিভক্ত হয়ে যায় মানব সমাজ। যার ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় বর্ণবাদ, যা সেমেটিক ও ননসেমেটিক উভয় ধর্ম বিশ্বাসেই এখনো বিদ্যমান। আর এভাবেই ইশ্বরের আশির্বাদ পুষ্ট শ্রেনীটি নিজেদের সমৃদ্ধ করতে থাকে সম্পদে। যার ফলে দলিত শ্রেণী এবং তাদের মাঝে সংঘাত ঘটে, এবং আদিপত্যবাদ আরেকটু বেশি সময়ের জন্য জেঁকে বসে।

মার্ক্সসের সেই আদি সমাজ কাঠামো অর্থাৎ সাম্যবাদী সমাজের ধারনা এখানেই মার খেয়ে যায়। যখন ব্যক্তিগত সম্পদের বিকাশ ঘটে না সেখানে সভ্যতার বিকাশ ও ধীর হয়ে যায়। কারণ মানুষের জীনগত স্ট্রাকচারেই ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণাটা চলে এসেছে। ধর্মগ্রান্থ গুলোতে হাবিল ও কাবিলের সংঘাতের কারণ হিসাবে এই ব্যক্তিগত সম্পদের উপর স্বীয় অধিকারকেই তুলে ধরা হয়েছে।


অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো অভাব, যখন সাম্যবাদী সমাজ বাস্তবায়ন হবে, তখন প্রত্যের মানুষ তার কাজের অনুপাতে রেশন এবং অন্যান্য বস্তুগত সুবিধা লাভ করবে, সে সাথে পূঁজীড় বিলোপ ঘটবে। যদি অসম প্রতিযোগীতাই সৃষ্টি না, সব রাষ্ট্রীয় জবাবদিহীতার মধ্যে চলে আসে তা হলে অভাবের উদ্ভব কী করে হবে, আর চাহিদা না থাকলে, ফেয়ার প্লে হলে অর্ত্থনীতির মূল শক্তিই, চাহিদা ও যোগান ভেঙ্গে পড়বে। যার ফলে একটি ঝুলন্ত অর্থনৈতিক সংকোচন নীতিতে সমাজকে চলতে হবে। আর যদি মুল্যস্ফিতি দেখা দেয় তার প্রভাব ভুগতে হবে সমাজ বা রাষ্ট্রের জনগনকে। উদাহরণ হিসেবে জিম্বাবুয়ে আর সোভিয়েতের মুদ্রাস্ফীতির কথা বলতে পারি।


যেখানে Homo Sapience (Man the Wise) জ্ঞানী মানুষ পুঁজিকে নিজের টিকে থাকার অনুসংগ করে নিয়েছে সেখানে আমরা কেন ফিরে যেতে চাইছি Palaeolithic Age এ? আমি অস্বীকার করছি না সময়ের সাথে সাথে বস্তুবাদী ও ভাববাদী চিন্তাধারার বিকাশ কে এক সাথে তারিয়ে নিয়ে যেতে হবে দূরে। আর সে সাথে প্রত্যেক মানুষ কে তার নিজের শ্রেনীকে সংহত করতে হবে। কারণ যত কিছুই বলুন সেই আদি শ্রেনীগত অবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে। মধ্যবিত্ত কখনোই শ্রমিকের নেতা হতে পারবে না। সে যাই বলুক না কেন সে তার নিজের শ্রেনী স্বার্থই রক্ষা করবে তার জানা অজানায়। কৃষকের ছেলে ভাসানী হতে পেরেছিলেন কৃষকের নেতা। বংগবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন মধ্যবিত্তের নেতা তার চলন বলন এবং চারিত্রিক অস্থিরতা থেকে তার মধ্যবিত্তীয় আদর্শিকতার পরিপূর্ণ প্রমান পাওয়া যায়। মুজিব হাজার চেষ্টা করেও শ্রমিকের নেতা হতে পারেন নি। তিনি অথবা তার প্রতিভূ রাজনৈতিক দল আজ ও মধ্যবিত্তের শ্রেনী স্বার্থ রক্ষা করে আসছে।

তা হলে প্রশ্ন আসে, পঁজিবাদের অভিসাপ থেকে বেরিয়া আসার কি কোন উপায় নেই? আছে নিজের শ্রেনীকে সংহত করা, নিজের অবস্থানকে সঙ্ঘত করা। নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বোঝাপরা ঠিক করে, অন্যান্য শ্রেনীর সাথে মার্জ করে এগিয়ে চলা, এতে শ্রেনী গুলো টিকে থাকবে। আর সে সাথে তাদের পারস্পরিক বৈষম্যের মাত্রা কিছুটা হলেও কমবে, যেহেতু মানব সমাজ থেকে পুঁজিকে কোন ভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয় সেহেতু আমাদের পুঁজিবাদের বিলোপের দিকে নয় সম্পদের বন্টনের দিকে নজর দিতে হবে। যদি আনুপাতিক হারে সম্পদের বন্টন নিতি বাস্তবায়ন করা যায় তা হলে সব গুলো শ্রেনীকই প্রায় সাম্যাবস্থা বজায় রেখে পাশাপাশি চলতে পারবে। ন্যশের গেম থিওরি এই কথাই বলে।

যাই হোক আজ থামছি, সময় পেলে আবার লিখবো হয়তো কখনো। বিপ্লব দীর্ঘজিবি হোক। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিপ্লব
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০১৩ রাত ৮:২৬
১৪টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×