যেখানে ভয়ের বসতি: ১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশীদেরকে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। এখন তারা যুদ্ধ ও গণহত্যার প্রভাব কাটিয়ে উঠার পথে আছে। ছবির এই গ্রাম্য মেয়েটি ক্ষেত থেকে তামাক সংগ্রহ করছে। আগন্তুকদের দেখে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, হাত দিয়ে অন্য কাজ করতে থাকায় দাঁত দিয়েই কামড়ে ধরে আছে তার শালটি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের এক সমবেত সঙ্গীত বলা যায়।
[১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে এক দল সাংবাদিক এসেছিলেন। নতুন দেশের জনগণ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গণহত্যার প্রভাব কিভাবে কাটিয়ে উঠছে, তা দেখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। সফর শেষে দেশে ফিরে গিয়ে উইলিয়াম এস এলিস এ নিয়ে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর, ১৯৭২ সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়।]
বিশাল প্রান্তরে আড়াই লক্ষ মানুষ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলো। অবশেষে তাদের নেতা ক্লান্ত শরীরে এসে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। তিনি প্রথমে কি বলবেন তা সবাই জানতো। তারা যেন উত্তর দেয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিলো।
নেতা চিৎকার করে বললেন, "জয় বাংলা"। সাথে সাথে লক্ষ মানুষের লক্ষ কণ্ঠ থেকে প্রত্যুত্তর এলো। মুখে মুখে প্রতিধ্বনিত হলো, "জয় বাংলা"। প্রতিধ্বনিগুলো যেন বজ্রের গর্জনে রূপ নিলো।
তারা এই নেতাকে "বঙ্গবন্ধু" ডাকে। বঙ্গবন্ধুর সাথে তার জনতার এই বাক্য বিনিময়কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের এক সমবেত সঙ্গীত বলা যায়। সেই সঙ্গীত, যার গায়েনেরা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়েছে, তারপরও মাথা নত করেনি; অবশেষে পৃথিবীতে একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। জয় বাংলার ধ্বনি মিলিয়ে যেতে না যেতেই বঙ্গবন্ধু সবার উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
"আপনাদের কি আগামী দুই, এমনকি তিন বছরেও আমার কাছে আর কিছু না চাইবার ইচ্ছা আছে?"
হ্যাঁ, সবাই চিৎকার করে উঠল। ক্ষুধা আর রোগ-শোকে অনেকের চিৎকার করার শক্তিটুকুও ছিল না। তারপরও নিজেদের ইচ্ছাটুকু পুরোপুরি প্রকাশ করার জন্য তারা এটুকু করল।
বঙ্গবন্ধু হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, এই দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জাতির জনক। দেশটির আয়তন প্রায় উইসকনসিনের সমান, সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ছোট্ট রাষ্ট্রটি একসময় পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পেতো। আজ তারা স্বাধীন। আজ তারা নেতৃত্ব আর অনুপ্রেরণার আশায় এই শেখ মুজিবুর রহমানের দিকেই চেয়ে আছে। ক্ষুধার তাড়নায় বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই তাদের জন্য এখন মুখ্য, এমন অবস্থাতেও তারা নেতার দিকে মুখ ফিরিয়েছে। কোন র্যালিতে শেখ মুজিব উপস্থিত হওয়া মানেই অতীন্দ্রিয় এক কনসার্ট শুরু হয়ে যাওয়া। ময়মনসিংহ শহরের এক র্যালিতে আমি এটাই লক্ষ্য করলাম। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে তার অনুসারীরা মরতে বসেছে, তারপরও নেতার মধ্য দিয়ে তারা স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পাচ্ছে।
ঐ দিনই, র্যালিতে যাওয়ার আগে শেখ মুজিব ময়মনসিংহের কয়েক মাইল দক্ষিণে টর্নেডোর আঘাতে বিধ্বস্ত এক গ্রাম পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। আমিও তার সাথে ছিলাম। গিয়ে দেখেছিলাম, টর্নেডো প্রায় আধ ডজন গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। কয়েক শত মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তাদের বাঁশ আর ছনে তৈরী বাড়িগুলো ঘণ্টায় ১৫০ মাইল বেগের ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, এর সাথে আছে কলেরার আতংক। এপ্রিলের তীব্র গরমে মৃত পশুগুলোর শরীর গলে পড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হাটছিলেন, তার চেহারায় দুঃখ আর ১৮ ঘণ্টার একটানা খাটুনির ছাপ সুস্পষ্ট। এই অবস্থাতেও তার আগমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো গ্রাম যেন জেগে উঠলো। হাজার হাজার গ্রামবাসী জড়ো হয়ে গেল।
একটা আম গাছের গুড়ির উপর দাড়িয়ে আমি তাদের দিকে তাকালাম, আমি দেখলাম, আমি এমন কিছু মানুষকে একসাথে দেখলাম যাদের মধ্যে এক ধরণের একমুখীনতার প্রবণতা খুব প্রকট ছিল। সেই মিলনমেলায় ছিল: লুঙ্গি পরিহিত পুরুষেরা- যাদের হাতে এদেশের সোনার ফসল ফলে, বাচ্চা কোলে রমণীরা, ছোট ছোট ছেলেমেয়ের দল যাদের ফিকফিকে হাসিতে ছিল কেবলই উচ্ছ্বাস।
হঠাৎ করে এতো লোক জড়ো হয়ে যাওয়াটা বাংলাদেশে বেশ স্বাভাবিক। কারণ, এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,৩০০ জন। পৃথিবীর সব মানুষকে যদি যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরসংলগ্ন ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে বাস করতে দেয়া হয় তারপরও সেখানকার জনসংখ্যার ঘনত্ব এত বেশি হবে না।
শেখ মুজিব তাদেরকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। চাপাচাপি করে যারা যথেষ্ট কাছে আসতে পারছিলো তারাই কেবল তার কথাগুলো শুনতে পারছিলো। কিন্তু এক্ষেত্রেও শেখ মুজিব আগের মতো রইলেন, কোন প্রতিশ্রুতি দিলেন না। জানালেন, যে ক্ষত নিয়ে দেশের জন্ম হয়েছে তা শুকোনোর আগে কোন প্রতিশ্রুতিই দেয়া সম্ভব না। এর পাশাপাশি "জয় বাংলা" শ্লোগান চলল। এখানকার আর একটি ঘটনাই উল্লেখ করার মতো- এক বৃদ্ধা তার হাত আর হাটুতে ভর করে বাতাসের তোড়ে উত্তপ্ত মাটিতে ছড়িয়ে পড়া চাল কুড়োচ্ছিলেন, একটি একটি করে। তাই দেখে প্রধানমন্ত্রীর দলের এক সদস্য বললেন, "আল্লাহ তাদের শক্তি দান করুন!"
বাংলাদেশ: আশায় নতুন জীবনের বসতি - অখণ্ড
Click This Link
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
Click This Link
১৩ নভেম্বর ১৯৭১ :::ভয়ই পূর্ব পাকিস্তানে একমাত্র আইন /দ্য বাল্টিমোর সান
Click This Link
৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তাজউদ্দীন আহমদ লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি
Click This Link
শেখ মুজিবুর রহমান : বন্দি থেকে বাদশা / টাইম সাময়িকী ১২ জানুয়ারি ১৯৭২
Click This Link
৩০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ বিহারিদের বিরুদ্ধে মিরপুর অপারেশন
Click This Link
বাংলাদেশ গণপরিষদ [১০ এপ্রিল, ১৯৭২] ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিব নগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল তার সঙ্গে এই গণপরিষদ একাত্মতা প্রকাশ করছে।বাংলাদেশ গণপরিষদ [১০ এপ্রিল, ১৯৭২] :
Click This Link
মুজিব।। স্থপতির মৃত্যু Time Magizine USA আগষ্ট ২৫,১৯৭৫
Click This Link
একজন তাজউদ্দিন ও একটি আত্মবিস্মৃত জাতি-১
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০১১ সকাল ৮:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


