
এটা খুব পরিচিত একটা গল্প। একটা মেয়ে মেঘ আর একটা ছেলে নভোর গল্প। গল্পের মূল কাহিনীটাও নতুন কিছু নয়। সেই পুরনো প্রেম, বিরহ, বেদনা ও শেষমেশ ভালবাসা। কিন্তু তারপরেও এটা নিছক কোন কাঁচা প্রেমের ইঁচড়েপাকা গল্প নয়। এটা কেবল এবং কেবলমাত্র কিছু অনুভূতির গল্প। যে অনুভুতিগুলোকে যত বুঝতে গিয়েছি ততই দুর্বোধ্য, ততই জটিল মনে হয়েছে। ক্ষান্ত হয়ে শেষে মনে মনে ভেবেছি এতসব জটিলতার ধারক যে মন, সে কতোই না জানি জটিল।
রোদ রোদ মেঘ মেঘ খেলা
"মেঘ শুনতে পাচ্ছিস"?
"হুম"
"মেঘ আমি তোকে ভালবাসিনা। I don’t love you. সেদিন যা বলেছিলাম ঘোরের মধ্যে বলে ফেলেছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, কাজটা ঠিক করিনি। আমি আসলেও তোকে ভালবাসিনা। আমি খুব খারাপ; খুব খুব খারাপ। এমন একটা ছেলের পাশে তোকে মানায় না। তুই আরো অনেক ভালো ছেলে ডিজার্ভ করিস। আমার মতো কালপ্রিট না"।
কিছুক্ষন নিরবতা ফোনের দু পাশে।
"মেঘ"
"হুম"
"আমার খুব চমৎকার একটা বন্ধু ছিলো। আমার প্রতিটা কান্নায় সে আমার পাশে ছিলো। আমার সব মন খারাপের একমাত্র সাথী ছিলো। আজ সেই বন্ধুটাকে আমি হারিয়ে ফেললাম। সেই বন্ধুটার মন ভেঙ্গে একদম গুড়ো গুড়ো করে দিলাম। আমার তো হাবিয়াতেও জায়গা হবে না। তাই না ....মেঘ"!!
"হুম"
"কিছু বলবিনা? কিছু বল! কুৎসিত কিছু গালি দিবি আমাকে? দেনা প্লিজ! আমি কিচ্ছু বলবোনা। আমার এখন কোন কিছুই গায়ে লাগেনারে। নিজেকে রাস্তার তুচ্ছ একটা প্রানী মনে হয়। আল্লাহ এতো মানুষকে উঠায়ে নিয়ে যায়। আমাকে নেয়না ক্যান। এই দুনিয়াতে আর দম নিতে ইচ্ছে করেনা............মেঘ"!!
"হুম"
"কিছুই কি বলবিনা"?
"হ্যাঁ, না, ইয়ে আসলে বুঝতে পারছিনা কি বলবো, কেমন যেন লাগছে। যাই হোক ব্যপার না"। মেঘ খুব কষ্ট করে হাসার মতো এক ধরনের খটমটে শব্দ করে। "আচ্ছা আমি রাখি এখন; আম্মু ডাকছে"।
আবারো নীরবতা তবে এবারের দৈর্ঘ্য কিছুটা বেশি।
"ফোন রাখলিনা যে"?
"তুই ফোন রাখ, ফোন তুই দিয়েছিস"।
"কিন্তু আন্টি তো তোকে ডাকছে, আমাকে না.
"ফোনটা প্লিজ রাখ নভো, আর ভালো লাগছেনা এসব"।
"তুই কি বুঝতে পারছিস আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আর কখনো সম্ভব না"।
"সেটা পাঁচদিন আগে থেকেই সম্ভব ছিলোনা। কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই, ফোনটা রাখ"। মেঘ কন্ঠটা যতদুর সম্ভব দৃঢ় রাখতে চায়। কিন্তু কেন যেন দৃঢ়তায় কমতি রয়ে যায়।
"আমি অনেক দুর্বল মেঘ। আমার এত শক্তি নেই। সম্ভবত এটাই আমার শেষ ফোন। আর কখনোই ফোন দিবোনা তোকে। শেষবারের এই ফোনটা প্লিজ তুই রাখ"।
"আচ্ছা, আল্লাহ হাফেজ"।
বলেই মেঘ এক সেকেন্ডও দেরী করলোনা। ঠাস করে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখলো। আল্লাহ হাফেয বলতে কি গলাটা একটু কেঁপে উঠেছিলো? হয়তোবা; কিন্তু তাতে কি আসে যায়। মেঘ কিছুক্ষন ফাঁকা দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন লাগছে কেন ওর। নভো তো একটা ফ্রেন্ড ছিলো কেবল। যেমন স্নিগ্ধা ওর ফ্রেন্ড, আয়েশা ওর ফ্রেন্ড। কি আসে যায় নভোর মতো এমন একটা ভাববাজ ফ্রেন্ড না থাকলে। কথা না বলতে চাইলে নাই। ফ্রেন্ডের কি অভাব পড়েছে। কিন্তু তারপরও; এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন নিজেকে। বার বার মনে হচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে ছিড়ে বের করে নিয়ে গেলো। কি অদ্ভুত গালের পাশটা আবার এমন লাগছে কেন? মেঘ খুব নিষ্ঠুর ভাবে গাল ঘসতে গিয়ে অবাক হল। ওর আঙ্গুলের ডগায় ততক্ষনে জমা হয়েছে বেশ কিছু নোনা জল। ও কি তবে কাঁদছে? কিন্তু কেন? এমন তো হবার কথা ছিলোনা।
শেষ এপ্রিলের এক দুপুরে মেঘের মা একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন; মেঘ মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে। হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা টেলিফোনটা। চোখের পানিতে বালিশের অর্ধেকই ভেজা। মেঘ কাঁদছে। আকুল হয়ে কাঁদছে। যেন ভীষণ অভিমানী কোন মেঘমালার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে। আজ বৃষ্টি ঝরবে; অঝোর বৃষ্টি।
এটা এই গল্পের একেবারে মাঝামাঝি একটা অংশ। এবার চলে যাই বছর খানেক আগে। গল্পের যেখান থেকে শুরু সেখানে। মেঘের চোখে তখন জল ছিলোনা, বরং রঙ বেরঙের স্বপ্ন ছিলো। যদিও খুব ছোটবেলা থেকেই জানা ছিলো স্বপ্ন কখনো পূরণ হয়না। তারপরও স্বপ্ন দেখতে হয়, কারণ স্বপ্ন ছাড়া বাঁচাও যে যায়না। মেঘের খুব স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবে। বুয়েটের ময়দানে দাপিয়ে বেড়াবে। কিন্তু সেই স্বপ্নে গুড়েবালি। সাইন্সে পড়তে হলে নাকি অনেক প্রাইভেট পড়তে হয়। মেয়েকে প্রাইভেট পড়ানোর টাকা নেই বাবার কাছে। টানাটানির সেই সংসারে একটি অতিরিক্ত পয়সা খরচও যে কল্পনাতীত। বাবার জমি বিক্রির টাকা দিয়ে কি প্রাইভেট পড়া যায়? মেঘ তাই আর কোন শব্দ করেনি। বাবার ইচ্ছে পূরন করেছিলো। বান্ধবীরা অবাক, ক্লাসের টিচাররাও অবাক এতো ভালো রেজাল্ট নিয়ে কেউ কি কখনো কমার্সে আসে! কিন্তু মেঘ এসেছিলো; নিরস বইয়ের পাতাগুলোতেই নতুন স্বপ্ন খুঁজে নিয়েছিলো। তারপরও এক স্বপ্নের লাশের উপর নতুন স্বপ্ন সাজাতে গেলে কষ্ট কিছু হয় বৈকি। মেঘেরও হতো, হিসাববিজ্ঞান বইয়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেও যে জাবেদার বড় বড় ছকগুলো চোখে আঁটতে চাইতোনা। বাসার সামনে দিয়ে হেলেদুলে চলে যাওয়া বুয়েটের বাসের ছবিটাই চোখে ভাসতো।
বাবার সিদ্ধান্ত মেঘকে নিরাশ করেনি। মেঘও বাবাকে নিরাশ করেনি। সর্বোচ্চ রেজাল্টটি মুঠোয় পুরেই কলেজে পা রেখেছিলো। এরপর থেকে যখনি বাসার সামনের বুয়েটের বাসের সাথে দেখা হতো, ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে ভাবতো, হতচ্ছাড়া বাসটার রুট চেঞ্জ হয়না কেন এখনো।
কলেজে জমজমাট রেজাল্ট করার পর মেঘ যখন একটু জাঁকিয়ে বসেছে তখনই খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটলো। সেটা দুর্ঘটনা নাকি সুঘটনা তা মেঘ আজো বলতে পারেনা। সে শুধু জানে একটা ছেলেমানুষি খেলা তার জীবনটাকে একেবারে উলটপালট করে দেয়। মেঘের আকাশে হঠাৎ করেই নভোর উদয় হয়।
মেঘ আর নভো বন্ধু হল। তাদের বন্ধত্বের শুরুর কাহিনী বলতে গেলে গল্পটাকে আর গল্পের পর্যায়ে রাখা যাবেনা, উপন্যাসে পদোন্নতি দিতে হবে। আমরা বরং সেদিকে আর না যাই। বন্ধত্ব থেকেই শুরু করি। মেঘ আর নভো বন্ধু হলো। কিন্তু এদের মধ্যে কোন বন্ধুত্ব হবার কথা ছিলোনা। কিন্তু তারপরেও হলো। নভোর ভারী, জমাট এবং আশ্চর্য ধরনের শান্ত মোহিত কন্ঠস্বর সদ্য অষ্টাদশীর গোছানো আকাশে রীতিমতো ঝড় তুললো। গতানুগতিক মোবাইল নির্ভর বন্ধুত্ব তাদের ছিলোনা। আবার পাশের বেঞ্চে বসা অন্তরঙ্গ ক্লাসমেটও সে নয়। তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো বাসার একমাত্র ল্যান্ডফোনটা। মুঠোফোন নামক জিনিসটি তখনো মেঘের হস্তগত হয়নি। মনযোগী পাঠককুল নিশ্চয়ই ধরতে পারছেন নেপথ্যের কারণ কি হতে পারে।
রোজার মাস চলছিলো তখন, মেঘের বাবা তারাবী পড়তে প্রয়শই মসজিদে যান। নভোর বাসায়ও একই কাহিনী । এই দুই বাবার অনুপস্থিতিতে টেলিফোনের উপর চলতো বিষম অত্যাচার। মেঘের চোখে নভো ছিলো ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বাস্তবিক একজন ছেলে। একটু মুডি ছিলো যদিও, তারপরও মেঘের মনে হয়েছিলো তথাকথিত তারুন্যের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়া নব্য তরুন সে নয়। আর নভোর চোখে মেঘও তখন শরতের নিস্পাপ মেঘের মতোই নির্মল ও শুভ্র। প্রায় প্রতিদিনই টেলিফোনে কথা হতো তাদের। কতো রঙের আলাপের দিন ছিলো সেগুলো, কতো খুনসুটি, অভিমান, রাগ ভাঙ্গানো। এরকমই আবজাব কথার ফাঁকে মেঘ জানতে পারে, নভো এক মেয়েকে পছন্দ করে। গল্পের প্রয়োজনেই ধরে নেয়া যাক, মেয়েটির নাম কমলা বানু। যেহেতু চরিত্রটি খুব একটা মুখ্য নয়, তাই এরকম নাম করন। মেঘ মনে মনে চমকে উঠে, এমন মুডি ছেলেও তাহলে প্রেমে পড়তে পারে। প্রেম জিনিসটা তো তাহলে ব্যপক জটিল। এরপর চলে ভালবাসার গল্প শোনার পালা। নভো কমলা বানুকে অদ্ভুত রকম ভালোবাসতো। কিন্তু কমলা বানু ততদিনে হীরক দেশের রাজার প্রেমে বিভোর। মেঘ চোখ বন্ধ করে শুনতো সেই ভালবাসার গল্প। নভোর কষ্টের গল্প; তার মন খারাপের গল্প। নভোর মন খারাপগুলো যেন তাকে ভেতর থেকে ছুঁয়ে যেতো। মেঘও যেন নভোর সাথে মন খারাপ করে বসে থাকতো। অন্ধকারে শুয়ে রেডিওতে গান শুনতো। নভো যদিও তাহসানের স্লো মোশনের গান বেশি শুনতো, কিন্তু রেডিও তো আর মেঘের মর্জি মতো চলেনা। তাই যা শুনায়, তাই শুনতে হতো। মেঘও যেন ঠিক আগের মতো নেই আর। রোমান্টিক বইগুলো আগের মতো আর বোরিং লাগেনা। প্রেমের হালকা চালের নাটকগুলোও অনেক ইন্টারেস্টিং লাগে। খুব জানতে ইচ্ছা করে এখন ভালবাসা কেমন, খুব বুঝতে ইচ্ছে করে ভালবাসা কি।
(চলবে)
জলমেঘের আবছায়ায় ২
জলমেঘের আবছায়ায় ৩
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



