
জলমেঘের আবছায়ায় ১
জলমেঘের আবছায়ায় ২
সাদাকালো রংধনু
এর পরের দিনগুলো খুব অদ্ভুত গেলো। একটা বিকেল যেনো বদলে দিলো দুটো ভিন্ন ভিন্ন জীবনের কক্ষপথ। দুটো ভিন্ন ভিন্ন রেখা যেন কনভার্জ হয়ে এগিয়ে গেল অন্য আরেকটি স্থির বিন্দুর দিকে। মেঘ ভাবলো সে প্রতারনা করছে। সেতো নভোকে ভালবাসেনা। ভালবাসা কি এমন হয় নাকি? এতো সহজে ভালোবাসা হয় কারো? হলে তো টিভিতে এতো বড় বড় সিরিয়াল হতোনা, বিশাল বিশাল উপন্যাসও হতোনা। এভাবে ফোনে বছরখানেক কথা বলে ভালোবাসা কি করে সম্ভব। তারই বা কি দরকার ছিলো ফোনে সেদিন সেসব হাবি জাবি বলার। কিন্তু আর কিই বা করার ছিলো। নভো তখন চলে যাচ্ছিলো। ওকে তো তাহলে আটকে রাখা যেতনা। নভোকে তো যেতে দেয়া যায় না। ওর কন্ঠটা একবার না শুনে রাতে যে স্বস্তিতে ঘুমানো যায় না। তাই বলে তার আবেগ নিয়ে খেলাটাও তো ঠিক নয়। ছেলেটা যদি সত্যি সত্যি তাকে ভালবেসে ফেলে, কি হবে তখন? মেঘ মনে মনে নিজেকে শত সহস্র গালি দেয়।
অথচ ঘটনার প্রেক্ষাপট পাল্টে যেতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনা। মাত্র পাচঁদিনের মাথায়ই নভো পাল্টে গেলো। তার ভালবাসাও উল্টে গেলো।
"মেঘ"
"কি ব্যপার? কিছু বলবি? গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন"? ( তখনও কিন্তু তুই তুই চলছিলো। আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসাটা যতোটা সহজ; তুই থেকে তুমিতে উঠা কিন্তু অত সহজ না)
"মেঘ আমি অনেক ভেবে দেখলাম। আমাদের মধ্যে আসলেও কোন সম্পর্ক সম্ভব না। তুই জানিস আমি আরেকটা মেয়েকে ভালোবাসি। আমি তাকে ভুলতে পারছিনা; মনে হয়না কখনো পারবো। আমি ওই মেয়েটাকেই ভালোবাসি। আমার প্রথম ভালোবাসা। অন্য কাউকে তার জায়গায় বসানো কখনোই সম্ভব নয়। জানি তাকে কোনদিনও পাবোনা। আমাকে আমার পথে একাই চলতে হবে। সঙ্গীহীন। এটাই আমার শাস্তি"।
"ও"
"মেঘ শুনতে পাচ্ছিস"?
"হুম"
"মেঘ আমি তোকে ভালবাসিনা। I don’t love you............."
এর পরের কাহিনী গল্পের শুরুতেই একবার বলে এসেছি। তাই সে কথার আর পুনারাবৃত্তি করলাম না।
এই ঘটনার পরের দিন যে মেঘ ঘুম থেকে উঠলো, সে ছিলো সম্পুর্ন বদলে যাওয়া অন্যরকম এক মেঘ। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি তার জানা হয়ে গিয়েছে। সে নভোকে ভালোবাসে, আজ থেকে নয়, কাল থেকে নয়, এমনকি পাচঁদিন আগে থেকেও নয়। সে সেদিন থেকেই নভোকে ভালবেসেছে যেদিন থেকে তার হৃদস্পন্দন ভালবাসাকে অনুভব করতে শিখেছে। যেদিন থেকে তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ভালবাসাকে জানতে শিখেছে। কখন যে কমলা বানুর জন্য নভোর আবেগগুলোকে নিজের মধ্যে ঠাঁই দিয়ে ফেলেছিলো, মেঘ তা নিজেও জানেনা। যতদিন নভো পাশে ছিলো কখনো ইচ্ছে হয়নি মনের কোনায় একবার উকি দিয়ে দেখতে। আর যখন কিনা সে নেই তখন ভালোবাসাগুলো নিজে নিজেই নিজেকে প্রকাশ করে দিলো? এখন এই অভিশপ্ত আবেগগুলোর নতুন গন্তব্য কি হবে? রেডিওতে শ্রীকান্ত সাহেব গেয়ে চলেন, "বধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায়, বিনা কারনে"। আর অন্যদিকে মেঘের চোখে ক্রমাগত জল জমতে থাকে। শ্রীকান্ত সাহেব কেমন করে জানলেন, জলগুলো যে আসলেও বিনা কারনে ঝরে।
মেঘ আগে তিন ঘন্টা পড়তো আর এখন ১০ ঘন্টা পড়ে। এর জন্য না যে আর দশ দিন পর তার এইচ এস সি পরীক্ষা, বরং এর জন্য যে নভোকে ভুলে থাকার একটা উপলক্ষ্য খুব জরুরী। ফোনটা এখনো মাঝে মাঝেই ঠ্যা ঠ্যা করে বেজে উঠে। কিন্তু সেখানে নভোর গলা শোনা যায়না। তারপরও মেঘ দৌড়ে ফোন ধরতে যায়। ভুল করে হলেও কখনো যদি নভো ফোন দিয়ে ফেলে। কিন্তু প্রতিবারই ক্লান্ত হয়ে ফিরতে হয়। নভো কথা রেখেছে। সে মেঘকে আর কখনো ফোন দেয়নি। হয়তো কখনোই আর দিবেনা। মেঘ কি তবে ফিরিয়ে আনতে যাবে নভোকে? না কখনোই না। যে যেতে চায় তাকে আটকে রাখা যায়না। তাকে ফেরানো যায় না। ভুল তো বলেনি নভো, প্রথম ভালবাসার জ্বালা এতো সহজে ভোলার নয়। সে কি পারছে ভুলতে? না! তবে কেন? কেন এই ছেলেটা এইভাবে ভালবাসার কথা বলতে এলো? না বললে হয়তো কখনো জানাই হতোনা ভালোবাসা কত কষ্টের জিনিস।
এমন একটা মেয়ে যে কিনা তার খোঁজটাও কোনকালে ঠিক মতো নেয়নি, তার জন্য মেঘকে ভুলে যেতে পারলো নভো। কি করেনি এই মেঘ মেয়েটা তার জন্য। ঘন্টার পর ঘন্টা পড়া বাদ দিয়ে কথা বলেছে। হাজার টাকার বিল উঠিয়েছে। তারপর আগামীর চিন্তায় চিন্তিত বাবার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে থেকেছে। নাহ; বাবা মেঘকে তেমন কিছুই বলেন নি, কখনোই বলেন না। পৃথিবীর সব ভালাবাসা কি আর নিষ্ঠুর হয়? বাবা মেয়ের ভালবাসাও তেমন একটা ভালোবাসা। কিন্তু বলা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো এমন আগুনে পড়ে জলসে যেতে হতোনা। কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছে যে। নভোকে ভালোবেসে ফেলেছে মেঘ। নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে সে ভালবাসার জানান দিয়ে ফেলেছে। এর পরেও কি ছেলেতার বুঝতে কষ্ট হয় যে মেঘ তাকে পাগলের মতো চায়? তার কাঁধে মাথা রেখে একটু কাঁদতে চায়। তার হাতটা ধরে একটু স্বপ্ন দেখতে চায়। খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে এখন, “" কেমন আছিস নভো? আমাকে ধবংস করে খুব ভালো আছিস তাইনা? এই যে দেখ আমি জ্বলছি, তুই ও জ্বলছিস। দুই জনেই যে জীবনের প্রথম ম্যাচে গো হারা হারলাম। আমাকে হারতে দেখে তোর কি একটুও আমাকে শ্বান্তনা দিতে ইচ্ছে হয়না? এতো নিষ্ঠুর কেন তুই"?
কিন্তু মেঘ কখনোই নভোকে এসব বলবেনা। কখনো ভালবাসার আকুলতা নিয়ে নভোকে ফিরিয়ে আনবেনা। ফিরতে যদি হয়, তবে নভোকে একাই ফিরতে হবে। সে তো তাকে চলে যেতে বলেনি। সে তো বলেনি, "আমাকে I love you বলো"। সে তো বলেনি, "মনের দুটো ভাগ করে এক ভাগ কমলা বানুকে, আরেকভাগ আমাকে দাও"। জ্বলতে যখন হবেই একা জ্বলাই ভালো; একপ্রান্তে মেঘ আর অন্যপ্রান্তে নভো। একসাথে জ্বলে কি লাভ? আগ্নেয়গিরির সেই উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা কারো নেই; মেঘেরও নেই, নভোর নেই।
মেঘ ঝাপসা চোখে আরেকবার ফোনের দিকে তাকায়। না কোন ফোন আর কখনোই আসবেনা। নভো আর কখনো ফিরে আসবেনা। জল হয়ে ঝরে ঝরে মেঘকেই নিঃশেষ হয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তা’'আলা চোখের ভাণ্ডারে না জানি কত সাগর মহাসাগর ভরে দিয়েছিলেন। এতো ঝরে এতো ঝরে তাও কখনো ফুরায় না।
(চলবে)
জলমেঘের আবছায়ায় ৪
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



