
জলমেঘের আবছায়ায়
জলমেঘের আবছায়ায় ২
জলমেঘের আবছায়ায় ৩
মেঘলা পুর্নিমা
মেঘ জানালার কাঁচের সাথে গাল ঠেকিয়ে অপলক চোখে আকাশ দেখছে। রাতের মেঘলা আকাশ কেমন যেন অধিভৌতিক লাগে। মেঘের ওপারে হয়তো থালার মতো বিশাল একটা চাঁদ, অথচ বোঝার কোন উপায় নেই। বাতাসে বৃষ্টি বৃষ্টি গন্ধ। মেঘ চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ঘ্রান নেয়ার চেস্টা করে। সারাদিনের চেঁচামেচি হট্টগোলের পর এমন নিস্তব্ধতা মনটাকে কেমন যেন অন্যরকম করে দেয়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে; মেঘ হাত বাড়িয়ে দেয়। সেই আবছা আলো আধারিতেও মেঘের হাতের মেহেদির আল্পনাগুলো বৃষ্টির মিহি পরশেই জ্বল জ্বল করে উঠে।
"মেঘ"
মেঘ না তকিয়েই বলে, "কি হইসে"?
"কি করো"?
"নাচতেসি", বলেই মেঘ ঘুরে তাকায়। এই দশ বছরে নভো আরও মোটা হয়েছে। সামনে বিশাল একটা ভুরি, আর মাথার উপরে পিচ্চি একটা টাক। সুখী মানুষের সব লক্ষণই প্রকটভাবে প্রকাশমান, ব্যাতিক্রম শুধু কাঁচুমাচু করে রাখা মুখটা। সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে মেঘ হঠাৎ হেসে ফেলে।
"হাসো ক্যান"?
"বিশ্বাস হচ্ছেনা মাত্র তিন ঘণ্টা আগেই আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। অদ্ভুত লাগছে ভাবতে। আচ্ছা এইটা কোন স্বপ্ন নয়তো? দশ দশটা বছর কিভাবে পার করে এলাম"?
"না, এটা কোন স্বপ্ন নয়"। নভো আলতো করে মেঘের হাত স্পর্শ করে। "যদি স্বপ্ন হতো তাহলে দেখতা আমরা তখনো ঝগড়া ঝাঁটি করছি। যেহেতু করছিনা; তাই এইটা স্বপ্ন না। এই পুরোটাই খুব সুন্দর একটা বাস্তব। ও আর একটা কথা, যেটা প্রায়ই বলি বলি করেও বলা হয়না.........মেঘ.........খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে"।
"বাহ লাগবেনা, জানো কতোগুলা টাকা ঢেলে সেজে আসতে হইসে। পুরা এক সপ্তাহ আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখসিলাম আর............"।
"আরে, বিয়ের সময়ের কথা তো বলছিনা; তখন তো তোমাকে পুরাই ডিসটেম্পার মারা সাদা ভুত লাগছিলো"। নভো তার ভুরি নাচিয়ে হাসতে হাসতে একপাশে কাত হয়ে যায়।
"অই, কি বল্লা তুমি, আমার দশ হাজার সাজ........."।
নভো হঠাৎ হাসি থামিয়ে মেঘের হাত চেপে ধরে, "তোমাকে দশ কোটি টাকা দিয়ে সাজালেও এতো সুন্দর লাগবেনা যতটা এখন লাগছে। বুঝলা কিছু"?
নভোর এই ধরনের কথাগুলোর কাছে মেঘ বরাবরই অসহায়। সে টের পায় তার কানের পেছনটা গরম হয়ে উঠছে। একেই কি বলে কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়া?
"আমি জানিনা আমি কতদিন বাঁচবো, কতদিন পর্যন্ত আমার শ্বাস চলবে,কিন্তু এটা জানি জীবনের প্রতিটি নিশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে একবার করেও যদি তোমাকে সরি বলি তারপরেও তোমাকে দেয়া কস্টগুলোর সমান হবেনা। আমি তার সমান সমান হিসাব করতেও চাইনা। শুধু আমার ভালবাসা দিয়ে তাকে ঢেকে দিতে চাই। যাতে কস্টগুলো কখনোই যেন তোমার চোখের জল হয়ে গড়িয়ে না পড়ে"।
"ইশ! কি রোমান্স করা হচ্ছে! ওরকম করে I DON’T LOVE YOU বলে যাওয়ার পর যেদিন ফিরে এলে যদি মেনে না নিতাম! কেমন হতো তখন? জানো কত কষ্ট হয়েছিলো সেদিন! আজকে যখন কাজি কানের সামনে ঘ্যান ঘ্যান করছিলো ইচ্ছে করছিলো ঠাস করে বলে দেই,I DON’T কবুল YOU. কি করতে তখন শুনি"।
"কি আর করতাম, এখন তুমি নিশ্চয়ই কোন মুছো পালোয়ানের টাকে তেল ঢালতে আর আমি কোন দর্জাল বউয়ের পা টিপে দিতাম"।
"তুমি আর তোমার সব অদ্ভুত কথা বার্তা"
"শুধু অদ্ভুত কথা বার্তাই নয়, অদ্ভুত কাজকর্মও আছে"
"সেটা আর নতুন কি"
"তারপরও আজকের স্পেশাল ইভেন্ট উপলক্ষে স্পেশাল পাগলামি"
"সেটা কি রকম"
নভো বিছানার উপর থেকে তিনটা টকটকে গোলাপ তুলে নেয়। তারপর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ঝুলিয়ে বলে, "প্রথম গোলাপ আমার সেই বন্ধুটির জন্য, যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা পুরোদস্তুর গবেট বন্ধুর হাত ধরে রেখেছিলো। সেই বন্ধুটির জন্য যে নিজের চোখে পানি ঠেসে রেখে আমার মুখে হাসি ঝুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমার এতো লাফালাফির পরেও যে মেয়েটি সেই বন্ধুত্বের বাঁধন একটুও আলগা করেনি তাকে বলছি, সারাজীবন এই গবেটটার পাশে এমন বন্ধু হয়ে থাকবে তো"?
মেঘ কতক্ষণ চোখ গোল গোল করে নভোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কি বলবে খুঁজে না পেয়ে যখন বিকট একটা ঝাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছিলো তখনই নভো হা হা করে উঠে, "আরে দাঁড়াও এখনি ঝাড়ি মেরে বসোনা। পাগলামির এইতো মাত্র শুরু। শেষ হলে একবারে ঝাড়ি মেরো"। তারপর সেই অদ্ভুত ঠোঁটচাপা হাসি। এইবার দ্বিতীয় গোলাপটি এগিয়ে দিয়ে বলে, "এই গোলাপটা সেই গর্দভ রমণীর জন্য, যে তার ভালবাসার মহাসাগরে হাবুডুবু খাওয়ার জন্য আমার মতো গর্দভ রমণ যোগাড় করে নিয়েছিলো। যে আমাকে শিখিয়েছিলো ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয়। পুর্ন ভালবাসা মানে দেয়া। যে মেয়েটা আমার শত সহস্র অন্যায় কষ্ট সহ্য করেও চোখ বন্ধ করে আমাকে ভালোবাসা দিয়েছিলো, অথচ বিনিময়ে কিছুই চায়নি। এমন সুপার গ্লু টাইপের ভালোবাসা তো সত্যিকারের গর্দভও উপেক্ষা করতে পারবেনা, আর আমি তো ডামি গর্দভ। আমি কেমন করে পারবো। তাই ফিরে এসেছিলাম; এবং আবারো আসবো, বার বার আসবো, প্রতিবার আমাকে তুমি গ্রহন করে নেবে তো? আর এই যে তিন নাম্বার গোলাপ, বলতো এইটা কিসের জন্য। আচ্ছা আমিই বলি, তোমাকে মুখ খুলতে দিলেই শুধু ঝাড়ি দিবা। এই গোলাপটা হচ্ছে সেই মেয়েটার জন্য যে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলো, আমার সত্যিকারের ভালবাসার মানুষ ছিলো, এবং যাকে আজ আমি রীতিমতো দলিলপত্রে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছি। আমার প্রশ্ন সেই সদ্যপ্রাপ্ত বিবিজানের কাছে, আমাকে আপনার ওয়ান এন্ড অনলি স্বামী হিসেবে মেনে নিতে আজ্ঞা হয়"?
আমি দেখতে পাচ্ছি মেঘের চোখ ভিজে উঠেছে, গালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। কি অদ্ভুত, আজকেও কি কাঁদতে হবে তাকে? আচ্ছা কাঁদুক। আমরা বরং আজকে মেঘকে মন খুলে কাঁদতে দেই। কে বলেছে মেঘের সবগুলো জল সবসময় কষ্টের হতে হবে।
(শেষ)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



