
১ম পর্ব
ঝড়ো হাওয়ার বিকেল
রঙ ছিটালেই রংধনু হয়না, সাথে ঝিরি ঝিরি বৃস্টিও লাগে। আর বৃষ্টির জন্য লাগে একটুকরো শুভ্র নির্মল মেঘ। মেঘ যে কখন নভোর এমন এতো ভালো বন্ধু হয়ে গেলো, সে নিজেও তা জানেনা। মেঘের রিনরিনে কন্ঠটা শুনলেই প্রথমে যে ছবিটি চোখে ভাসে তা হলো সদ্য ডিম ফুটে বের হওয়া আলাভোলা এক বাচ্চা মুরগী। দৈবক্রমে কোন বাচ্চা মুরগী যদি কথা বলে উঠতো তাহলে যে তার কণ্ঠটা যে রকম শুনাতো, মেঘের গলাটাও ঠিক সেই রকম, কিচির মিচির কিচির মিচির। স্বভাবটাও একই খেয়ালী খেয়ালী আবার মায়াবী মায়াবী। এতো যে কানের কাছে কাছে ভ্যান ভ্যান করে, অথচ একটুও বিরক্ত হয়না। এতো মায়া কেন মেয়েটার মাঝে। নভো ভাবনার দৌড়ে এবার লাগাম টানে। মেঘকে নিয়ে এভাবে আর ভাব্বেনা সে। মেঘ কেবলমাত্র একজন ভালো বন্ধু। খুব ভালো বন্ধু। খুব সৌভাগ্যবান মানুষই মেঘের মতো একজন বন্ধু পায়। তবে কি সে সেই সৌভাগ্যবানদের একজন? নভো আবার মাথা চুলকে ভাবতে বসে। কিন্তু মেঘের যদি কোন মোছু পালোয়ানের সাথে বিয়ে হয়ে যায়। সেই মোছু পালোয়ান নিশ্চয়ই মেঘের সাথে এমন ঘণ্টার পর ঘন্টা কথা বলতে দিবেনা। তাহলে কি করা? আচ্ছা সে মেঘকে নিয়ে এতো ভাবছে কেন? মেঘের সাথে এতো কথা বলারই বা দরকার কি? সে কি তবে মেঘকে ভালবাসে। কিন্তু তা কি করে সম্ভব সেতো কমলা বানুকে ভালবাসে। তবে? তবে হঠাৎ হঠাৎ তার চিন্তা ভাবনাগুলোর মাঝে মেঘ কেন চলে আসে। কেন তার ভালবাসার মানুষটির জন্য লেখা চিঠির মধ্যে মেঘের নাম চলে আসে। কেনইবা পৃথিবীর সবকিছু এক পাশে ফেলে সে মেঘের কাছে ছুটে আসে একটু স্বস্তি পাবার জন্য। নভোর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। খুব কঠিন একটা স্বিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়েছে। সে কি পারবে সেরকম কঠিন হতে?
প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দে টনক নড়ে মেঘের। জানালার কপাট লাগাতে এসেছিলো। তারপর নভোমণ্ডলের ভীষণ রাগ দেখে সেও নভোর ভাবনায় ডুবে যায়। কয়েকদিন ধরে নভোর আচরণ খুব অদ্ভুত ঠেকছে। কিছুই যেন মিলছেনা। কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ হঠাৎ রেগে যায়। দেবদাস টাইপের কথা বার্তাও ইদানিং বেশ বেড়ে গিয়েছে। কমলা বানু নিয়ে নতুন কোন সমস্যা নাতো? মেঘ বিভ্রান্ত হয়, আবার বিরক্তও হয়। এই এক কমলা বানু ছাড়া এই ধরিত্রীতে আর কি কোন আম বানু জাম বানু নাই। তাদের প্রেমে পড়তে পারেনা গাধা ছেলেটা।
ঠ্যা ঠ্যা করে ফোন বেজে উঠলো। ফোন কখনো ঠ্যা ঠ্যা করে বাজেনা, কিন্তু তাদের এই ফোন সেটটা বেশ কয়দিন ধরেই নষ্ট। এটা যে এখনো ঠ্যা ঠ্যা করে বাজে, সেই অনেক। আচ্ছা এই ঝড়ের মধ্যে কে ফোন করলো, নভো নয়তো? হ্যাঁ নভোরই ফোন। হঠাৎ এক আদিগন্ত বিস্তৃত ভয় গ্রাস করে তাকে। যেন আজ কিছু একটা হবে। এমন কিছু একটা যার জন্য সে কখনো প্রস্তুত ছিলোনা, আর কখনো প্রস্তুত হওয়াও হবেওনা।
"মেঘ"?
"নভো, এমন টাইমে ফোন দিলি যে"।
"মেঘ আজ তোকে কিছু কথা বলবো"।
মেঘের বুকটা ধড়াস করে উঠে; হৃদপিণ্ড গলার কাছাকছি এসে ঠেকে; নভোর গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেনো?
"আমি জানি আমি এখন যে কথাটা বলবো, সেটা শোনার পর আমার প্রতি তোর এতদিন যে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর আস্থা ছিলো সব এক ঝটকায় শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরেও আমি বলবো। নিজের ভেতর আর চেপে রাখতে পারছিনা। মেঘ, (একটু নিরবতা) আমি তোর প্রতি অনেক উইক হয়ে গিয়েছি............may be I am in love with you"
জানালার কপাটগুলো ঠাস ঠাস করে বাড়ি খেতে থাকে। কিন্তু সেই মুহুর্মুহু শব্দ কি করে যেন শুনতে হয় মেঘ ভুলে গিয়েছে। কি করে যেন কথা বলতে হয় তাও মনে পড়ছেনা। আচ্ছা শ্বাস কি ঠিক আছে নাকি তাও বন্ধ।
"আমি তোর কাছ থেকে কোন উত্তর চাইনা মেঘ। আমি জানিওনা তোকে এসব কেনো বলছি। শুধু জানি আমি ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। আর এখন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলাম। জানি আজকের পর থেকে তুই আমার সাথে আর যোগাযোগ রাখতে চাইবিনা। তোর কাজটা আমি সহজ করে দিতে চাই। আমি নিজেই চলে যাচ্ছি মেঘ। আর কখনো জ্বালাবোনা তোকে। আর কখনোই আমার গলা শুনে তোর কপাল কুচঁকাবেনা। আমাকে বিদায় দেয়ার আগেই আমি বিদায় নিয়ে নিচ্ছি মেঘ। পারলে একটু চেষ্টা করিস ক্ষমা করার। তোর বন্ধুত্বের মর্যাদা আমি রাখতে পারিনি"।
"নভো কথা শোন"
"প্লিজ, আমি জানি কি বলবি তুই। আমি নিজেও জানি সবকিছু জানার পর এই সম্পর্ক তুই কেন, পৃথিবীর কোন নরমাল মেয়েই মেনে নেবেনা। সো বাদ দে......"।
"নভো আমাকে একটু বলতে দিবি তো"
"না দিবোনা। আমি জানি আমি ঠিক করিনি। তোকে এভাবে বলে আমি তোকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছি। আর দিতে চাইনা"।
"নভো প্লিজ"
"আমি রাখি মেঘ, আমি অনেক নিচে নেমে গিয়েছি। এতোটা নিচুস্তরের কারো সাথে কথা বলা ঠিক না"।
"নভো.................I LOVE YOU TOO.................."
ফোনের দুইপাশেই এখন নিরবতা। মাঝে মাঝে রাগান্বিত ঝড়ের শোঁ শোঁ শব্দ। ঝড় কি এখন কেবলমাত্র বাহিরে? নাহ! ফোনের দুপাশে দুটি হৃদয়েও চলছে অন্যরকম ঝড়। সেই ঝড় আরো জটিল; আরো ভয়ানক।
"মেঘ কি বললি"
"কিছু না"
"না তুই বলেছিস, কি বললি আবার বল"
"আ আ আমি বললাম যে আ আ আই লা লা লাভ........."। মেঘ শেষ করতে পারলোনা। সে দেখলো তার হাত কাঁপছে, গলা কাঁপছে, পায়ের নিচের মাটিটাও কি কাঁপছিলো? ভুমিকম্প হচ্ছে নাকি আবার?
(চলবে)
জলমেঘের আবছায়ায় ৩
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



