বন্ধুরা বাসায় এলেই বাবা গল্প জুরে দিতেন। চিরস্থায়ী বিষয় ছিলো বন্ধুদের মাধ্যমে সন্তানকে শাষনের প্রচেষ্টা চালানো। আমরা বন্ধুরা এর সাথে পরিচিত ছিলাম। যে আমার বাসায় এলো সে বাবার সামনে বসে বেশ শাষণমূলক কথা বলতো, যেমন, ঠিক কৌশিক, তোর এইটা করা ঠিক না, ওইটা করা উচিত। মনে মনে হাসতাম, কারণ একটু পরে ওর বাসায় গিয়ে আমারও এই কাজটি করতে হবে। তার মা বলবে, বাবা তুমি কত ভাল, অথচ আমার ছেলেটি দেখো কত বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে! তোমারই তো বন্ধু, আমাদের কথা তো শোনে না, তুমি একটু বলে দেখো, দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা তো ভালো না! বাবা-মায়ের নাগাল থেকে মুক্তি পেয়ে এক চোট হেসে নিতাম।
গভঃ ল্যাবের ছাত্র ক্লাস নাইনের মুতাসিম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। নগর বালক নামে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের জন্য চমৎকার একটা বাংলা ব্লগের নির্মাতা ও পরিচালক। মুতাসিম তার স্কুলে বুধবার গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করবে বলে কিছু ফর্ম দিয়ে আসতে গিয়েছিলাম। হালকা-পাতলা ৬ফিট উচ্চতার মুতাসিম যখন বললো আমার বাবা আপনার সাথে কথা বলবে তখন সেই ছোটবেলার মত ভয় গ্রাস করলো। মুতাসিমের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য কমপক্ষে বিশ বছর হবে, সেসূত্রে তার চাচাগোত্রীয়, কিন্তু তারপরেও তার বাবা কথা বলতে চাইলেন শুনে একটু দমেই গেলাম।
মুতাসিমের বাবা বললেন সেই কথাই। আমাদের কথা তো শোনে না, আপনারা যদি একটু বলেন। সারাদিন ইন্টারনেটে ডুবে থাকে। আমিও সেই আদ্যিকালের বন্ধুদের মত উপদেশ দিয়ে এলাম। মুতাসিম ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে একটা পোস্টার করেছে। দেয়ালিকা টাইপের। কালো ক্যানভাসের উপরে আইরিনের যুদ্ধপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নোত্তর কালার প্রিন্ট-আউট নিয়ে তৈরী করা। দেখে পুরো থ বনে গেলাম। এতো উচ্ছ্বাস কল্পনাও করতে পারি নাই। মুতাসিমের বাবা ছেলের লেখালেখিতে সন্তুষ্ট, কেবল যদি একটু খাওয়া-দাওয়া করতো। আমার অবশ্য তাই মনে হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইতে হলে তো একটু শক্ত-পোক্ত হতে হবে। তবে এই বয়সটায় নিজে কি করেছি সে কথা আর মুতাসিমের বাবাকে বলললাম না। খাবার নিয়ে অরুচি, ধান্দাবাজি থাকায় প্রতিদিন সমপরিমাণ পুষ্টি আসতো বাবা-মার ভিটামিনযুক্ত পিটুনি থেকে।
তবে মুতাসিম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় - এটা ভাবলেই আমি নড়েচড়ে বসি। মুতাসিমের বয়সের একজন ছাত্রও চায়! আমরা এক আদর্শিক শূণ্যকালে কৈশোর কাটিয়েছি। নব্বই থেকে এদেশে কেমন যেন ইতিহাস স্থবির হয়ে আছে, ছাত্র রাজনীতি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাস ও সহজে উপার্জনের মিডিয়াম। নতুন প্রজন্মকে কোন আদর্শিক পৃষ্ঠপোষকতা করা যায়নি। ওদিকে রাজাকাররা ঠিকই চালিয়ে গেছে তাদের রাজাকারী আদর্শবাদের প্রচার।
এজন্য মুতাসিমের প্রজন্মের উচ্ছ্বাস আর বাবামাদের আগ্রহ দেখে অবাক হই। আশ্চর্য হই। বন্যার্তদের জন্য ফান্ড-রেইজ করতে গেলেও আমার বাবামা হাজার বার ভাবতেন, আর মুতাসিমের বাবা কেবল ছেলের পড়াশুনা ঠিক রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণস্বাক্ষরের জন্য কাজ করা যেতে পারে বলে পরিপূর্ণ সমর্থন দিলেন।
দিনকাল পাল্টেছে। একজন মুতাসিম যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার হয়, তখন আশাবাদী হওয়াই যায়। মুতাসিমের বাবাকে শ্রদ্ধা জানাই, যোগ্য সন্তান গড়ে তুলছেন তিনি দেশের জন্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



