আমার প্রিয় পোস্ট

প্রান্তিক জনগোষ্ঠিগুলোর ভাষা ও জাতিগত অস্তিত্বের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমমর্যাদা দাবী করছি

পৌরেই

১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:০১

শেয়ার করুন:                   Facebook

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সমাজের লোকমুখে প্রচলিত শ্লেষাত্মক বা হাস্যরসাত্মক উপমা বা তুলনাগুলোকে পৌরেই বলা হয়। পৌরেইগুলোকে বাংলা প্রবাদ প্রবচন বা বাগধারার সাথে মেলানোর একটা চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণত মিলবে না। পৌরেই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে আগেকার কাহিনী। মানে ইতিহাস। প্রতিটি পৌরেই এর পেছনে কালিক ও স্থানিক নানান প্রেক্ষিত যুক্ত আছে। সম্পর্কিত আছে এক একটি ইতিহাস। পৌরেইগুলোকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির লোকইতিহাস বলা চলে। ইতিহাসের কোন এক সময়ে ঘটে যাওয়া বিশেষ কোন ঘটনা কালক্রমে পৌরেই হিসাবে রূপ নিয়েছে। যেমন "স্বরূপার কীর্তন" - পৌরেইটি সেই ঘটনার কথা স্মরন করিয়ে দেয়, যখন স্বরূপা নামের এক ব্যক্তি কীর্তন (বৃহাদাকারের ধর্মীয় উৎসব) আয়োজন করেছে বলে সবাইকে নিমন্ত্রন করে শেষে দেখা যায় কোন আয়োজনই নেই। এখনও এরকম সমান্তরাল কোন ঘটনাকে "স্বরূপার কীর্তন" বলা হয়।

পৌরেইগুলোকে পরম্পরায় পাওয়া সমাজের অভিজ্ঞতা বলা যায়। এগুলো সাধারন ভাষায় বলা সাধারন মানুষের কথা নয়, অসাধারন মানুষগুলোর অসাধারন কথাগুলোকে সাধারন করে সহজ করে বলা হয়েছে। রচয়িতারা একেকজন বড় মাপের শিল্পকার। দীর্ঘ একটি গল্প বা বক্তৃতা দিয়ে যা বুঝানো সম্ভব নয় একলাইনের একটি পৌরেই তাকে পৌঁছে দেয় মগজে ও মননে। "দরায় লাম লইলা, চাকালায় বনে হমেইলা" ( ঢোরা সাপ রাজত্ব কিনলো, গোখরা বনবাসী হলো) - এই পৌরেইটি মণিপুরীদের আদিভুমি মণিপুরের আদিইতিহাসের একটি গুরুত্তপুর্ণ অধ্যায়ের কথা স্মরন করিয়ে দেয়, যখন খুমল রাজ্য ও রাজবংশ বেদখল হয়ে যায় নিংথৌজা রাজ্যের নিকট, যারা বরাবরই যুদ্ধে পরাজিত হত। পৌরেইগুলোতে ব্যপক সমাজচেতনার নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন " মি থাইতে মিয়াঙগই কিয়া বকসা বয়া হিমপেইতইতা" - এখানে নিজের হীনমন্যতাকে বিদ্রুপ করা হয়েছে, উদ্দেশ্য আঘাত দিয়ে সমাজকে সচেতন করা। এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পৌরেইগুলো দর্পনের মতো সমাজের নানান কাহিনী, ঘটনা, দর্শন, অভিজ্ঞতা, চেতনা ও রুচিবোধকে প্রতিফলিত করেছে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাটি কতখানি প্রাচীন, কতখানি ব্যবহারিক ছিল তার পরিচয় আমরা পাই পৌরেই থেকে।



বহুমাত্রিক লেখক ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ ও কথাসাহিত্যিক বিমল সিংহ যৌথভাবে মণিপুরী জনপদগুলো চষে এসব পৌরেই সংগ্রহ ও সম্পাদনার কাজটি হাতে নিয়েছিলেন। তাদের সংগ্রহ করা প্রায় দুই সহস্রাধিক পৌরেই থেকে নির্বাচিত কয়েকটি এখানে মুল ভাষায় পেশ করা হলো। সাথে বাংলা অনুবাদ এবং সমার্থক বাংলা প্রবাদ অথবা অর্থ। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে।

ইমফামে দুকগাস উঠানি
অনুবাদঃ ভিটায় দুর্ব্বাঘাস গজানো
সমার্থকঃ ভিটায় ঘু ঘু চড়া

কৃষ্ণরে পেইলেউ লেইসি খানা
অনুবাদঃ সামনে পেলে শ্রীকৃষ্ণকেও ফর্মাস খাটানো
অর্থঃ চরম ধান্দাবাজি

এগদে আনলে হৌগতে নেই
অনুবাদঃ এদিকে আনতে ওদিকে খালি
সমার্থকঃ নুন আনতে পান্তা ফুরোয়

বলর বাপকর লাইমংসিং ঠেলানি
অনুবাদঃ বলর বাপের রবিবার দেখানো
অর্থঃ টাকা কর্জ নিয়ে দেবার সময় গড়িমসি করা

অঙার বার নঙারাং সেচানি
অনুবাদঃ অঙার দোষ নঙার উপর চাপানো
সমার্থকঃ উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে

হরপগো দেখলেউ বিনি বুলানি
অনুবাদঃ সাপ দেখলেও দুলাভাই ডাকা
অর্থঃ অর্থলোভে অপাত্রে বিয়ে দেয়া

ইনচেল হানলো পানি থেৎকরানি
অনুবাদঃ জাল দিয়ে পানি আটকানো
অর্থঃ ভ্রান্ত নীতি গ্রহন করা

কাকাড়া ধরতেগা হরপ দরানি
অনুবাদঃ কাকড়া ধরতে গিয়ে সাপের গর্তে হাত
সমার্থকঃ কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুনো

ধবারে ফুতিসুপানি বাগাদেনা
অনুবাদঃ ধোপাকে কাপড় কাঁচা শেখানো
সমার্থকঃ মার কাছে মামাবাড়ীর গল্প

বরনর ফুটার হাদিয়েদে দাপদানি
অনুবাদঃ বৃস্টির ফোঁটার মাঝখান দিয়ে পলায়ন
অর্থঃ চরম চালাকি

গরগো লেপ নেই দুয়ারর কৌলি
অনুবাদঃ ঘর ঠিক নেই, দরজা নিয়ে যুদ্ধ
অর্থঃ অকারণ আস্ফালন

কুকুরগই দলেইহাত চরলেউ গুচারি দেহিয়া ফালদের
অনুবাদঃ কুকুরকে পালকিতে উঠালেও মল দেখলে নামতে চায়
সমার্থকঃ কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না।

ডুফাই রাজা ডুফাই মন্ত্রী
অনুবাদঃ ডুফা (কল্পিত চরিত্র)র রাজা মন্ত্রী উভয় পদ গ্রহন
অর্থঃ এক ব্যক্তির সর্বময় ক্ষমতা



সহায়তাঃ
* পৌরেই। ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ ও বিমল সিংহ সম্পাদিত। আগরতলা, ১৯৮৬
* প্রবন্ধ-মালা (৩য় খন্ড)। ড. কালীপ্রসাদ সিংহ। শিলচর, ১৮৮৪

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): আদিবাসী লোকসাহিত্যবিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীপৌরেই ;
প্রকাশ করা হয়েছে: বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৮

 

  • ১৩ টি মন্তব্য
  • ২৬০ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১৩ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:১৬
comment by: আতিকুল হক বলেছেন: ভালো লাগলো। আমি কিন্তু বাংলার সাথে ভালোই মিল পাচ্ছি। প্রবাদ-প্রবচনের শুরু সব ভাষাতেই সম্ভবত একই রকম হয়। সাধারনের অভিজ্ঞতা কোন অসাধারন শিল্পীর হাতে কালজয়ী রূপ পায়, যেমন - খনার বচন। আবার ইতিহাস, পূরান থেকে আসে অনেক। যেমন - বাংলা অনেক প্রবাদ-প্রবচন কিন্তু রামায়ন, মহাভারতের সাথে সম্পর্কিত।

টিকে থাকুক আমাদের ইতিহাস, ভাষা আমাদেরই মুখে মুখে।
১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:২২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মূল্যবান মতামতের জন্য। ...মিল তো থাকবেই তবে বড় পার্থক্যটা হলো পৌরেইগুলোর অধিকাংশ এ জাতির ইতিহাস এবং জীবন সংগ্রামের ঘটনাক্রমের সাথে জড়িত।

২. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৩
comment by: ঊশৃংখল ঝড়কন্যা বলেছেন: অনেক কিছু জানলাম লেখাটা পড়ে! সুন্দর ঝকঝকে বর্ণনা পড়তে ভাল লাগলো। খুব ভাল থাকবেন!
১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:১৯

লেখক বলেছেন: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

৩. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:৪৩
comment by: সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র বলেছেন: দারুন

ধন্যবাদ আপনাকে।
১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৪

লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

৪. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:২৯
comment by: আরিফ থেকে আনা বলেছেন: কুকুরগই দলেইহাত চরলেউ গুচারি দেহিয়া ফালদের /:)
২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:১৬

লেখক বলেছেন: ... ধন্যবাদ।

৫. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:৪৭
comment by: আলমগীর কুমকুম বলেছেন: প্লাসাইতে হৈল।
৬. ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৬:৫৯
comment by: অচন্দ্রচেতন বলেছেন: একই সঙ্গে এন্টারটেইন্ড!!! অনেক ধন্যবাদ।
২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:১৭

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ, অচন্দ্রচেতন।

৭. ২৩ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:০১
comment by: েজবীন বলেছেন: দারুন উপভোগ্য লেখা, আপনার অন্যান্য লেখাগুলোর মতোনই.... :)

সাধারন ভাষায় বলা সাধারন মানুষের কথা নয়, অসাধারন মানুষগুলোর অসাধারন কথাগুলোকে সাধারন করে সহজ করে বলা হয়েছে ..... আসলেই :)
২৩ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৪

লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জেবীন। ভাল থাকবেন।

 

 


কনাকে মি লেইরিক তামকরানির বিপক্ষে আসিলু ।এবাকা বারো কাম করানির বিপক্ষৎ মি... বিপক্ষৎ থানা এহানেই জিঙতা অনিহান ।বিপক্ষৎ থানা এহানেই...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ