somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বুড়ো-বুড়ি ও শেয়ালের গল্প : একটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লোকগল্প

০৩ রা এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেকদিন আগের কথা। গ্রামের এক প্রান্তে এক বুড়োবুড়ি দম্পতি বাস করতো। তাদের কোন ছেলেমেয়ে ছিল না তাই নিজেরাই কৃষিকাজ করে যা পেতো তাই দিয়ে খেয়েপরে বাচঁতো।

সামনে কচুমুখি লাগানোর সময়। বুড়োবুড়ি ঠিক করলো বাড়ির পেছনের ছোট্ট জমিতে মুখির চাষ করবে। বুড়োবুড়ি দুজনে কোদাল নিয়ে কাজে লেগে গেল। পাশের জঙ্গলের এক দুষ্ট শেয়াল সেদিন বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বুড়োবুড়ির কচু লাগানো দেখে শেয়ালের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। সে বুড়োবুড়ির কাছে গিয়ে বলল, তোমরা করছো কি? এভাবে লাগালে তো বড়ো হতে মেলা সময় লাগবে। কচুমুখি একদিনে বড় করার নিয়মটাও দেখি শেখোনি! বুড়োবুড়ি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, নিয়মটা কি? শেয়াল বিজ্ঞের মতো জবাব দিল, নিয়মটা হলো প্রত্যেক বীজের সাথে একটা করে টাকি মাছের মাথা, এক মুঠো ভাত আর একটা করে চ্যাপাশুটকি লাগাতে হবে। এমনি করে লাগালে একদিনেই দেখবে কচু কেমন বড়ো হয়ে গেছে। বুড়োবুড়ি ছিল খুব সরল প্রকৃতির। তারা শেয়ালের কথা বিশ্বাস করে তার কথামতো বাড়ী থেকে ভাত, টাকিমাছ ও শুটকি যা ছিল সব এনে বীজের সাথে লাগিয়ে খুশীমনে বাড়ী ফিরে গেল।

রাত গভীর হলে শেয়ালের দল জঙ্গল থেকে এসে কচুবীজের সাথে লাগানো সব খাবার চেটেপুটে খেয়ে নিল আর শিয়ালসর্দারের বুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগলো। এরপর তারা জঙ্গল থেকে বড় বড় বুনো কচু উপড়ে এনে জায়গামতো লাগিয়ে চলে গেল। পরদিন ভোরে কচুক্ষেতে গিয়ে বুড়ো তো অবাক। এত বড় বড় কচু, তাও একরাতের মধ্যেই! বুড়ো দৌড়ে ছুটে গিয়ে বুড়িকে জানালো। দুজনেই শেয়ালের তারিফ করতে লাগলো।

বুড়ো কাস্তে দিয়ে কয়েকটা কচুশাক কেটে বুড়ির হাতে দিয়ে বলল, আজ নতুন কচুশাকের তরকারি রাধঁবে। আমি শেয়ালদের নেমতন্ন করে আসি। বুড়ো শেয়ালদের নতুন কচুশাক খাবার নিমন্ত্রন করতে গেলে শেয়ালসর্দার বলল, আজ থাক। তোমরাই খেয়ে নিও। বুড়ো গোসল করে বাড়ী এসে দেখে বুড়ির রান্না শেষ। দুজনে আয়োজন করে খেতে বসলো। বাড়ীতে পালিত বেড়াল এবং কুকুরকেও ভাগ দেয়া হলো। হঠাৎ কুকুর খেতে খেতে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলো। বেড়ালও ম্যাঁও ম্যাঁও শুরু করে দিল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার আগেই বুড়োর গলায় বুনো কচুশাকের কেরামতি শুরু হয়ে গেছে। বুড়িও চুলকানিতে অস্থির হয়ে জোরে জোরে চিৎকার করা শুরু করলো, ও মাগো ও বাবাগো, গলা চুলকাতে চুলকাতে মরে গেলাম গো! বুড়োবুড়ি অবশেষে বুঝতে পারলো দুষ্ট শেয়াল তাদেরকে ঠকিয়েছে । সবাই মিলে ঠিক করলো এর একটা বিহিত করতে হবে। দুষ্ট শেয়ালের দলকে সমুচিৎ শিক্ষা দিতে হবে।

পরের রাতে বুনো কচুশাক খেয়ে বুড়োবুড়ির কি দশা হলো দেখার জন্য শেয়ালের দল বাড়ির পাশে জড়ো হলো। টের পাওয়া মাত্র আগে থেকে করা পরিকল্পনা অনুসারে বুড়ো বাড়ির উঠোনের কোণে তুলসীতলায় মরার মতো শুয়ে পড়ে থাকলো আর বুড়ি, বেড়াল ও কুকুর তিনজনে মিলে বিকট স্বরে কান্না শুরু জুড়ে দিল। শেয়ালের দল প্রথম প্রথম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পরে কৌতুহলী হয়ে কি হয়েছে কি হয়েছে বলে উঠোনে জড়ো হলো। বুড়োকে মরার মতো পড়ে থাকতে দেখে শেয়ালের সর্দার ভারিক্কি গলায় বলে উঠলো, হা করে দেখছিস কি? যা একটু সেবাযত্ন কর। শিয়ালের দল কাছে যেতেই হাতের কাছে লুকোনো লাঠি দিয়ে বুড়ো উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার ছাড়লো, আমার যথেষ্ঠ সেবাযত্ন করেছো বাছারা, এবার তোমাদের একটু সেবাযত্ন করতে দাও! এই তোরা কে কোথায় আছিস? ...সংগে সংগে বুড়ি মগুর নিয়ে, বেড়াল আর কুকুর তাদের নোখ থাবা নিয়ে শেয়ালদের উপর ঝাপিয়ে পড়লো...

চতুর্মুখী আক্রমন চললো, - ডুপ ডাপ! ধাম ধুম! ঠুস ঠকাস! ঘেউ ঘেউ!

শেয়ালের দল কি আর সেখানে দাড়াঁয়? ঠ্যাং ভেঙে, ঘাড় ভেঙে যে যেদিকে পারে ছুট লাগালো। সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা শেয়ালসর্দারের। তার লেজ ছিঁড়ে গেছে আর লেজ ছিড়ে যাওয়া মানেতো শেয়ালসমাজে ভীষন লজ্জার কথা। অপমানে দুঃখে শেয়ালসর্দার দশগ্রাম পার হয়ে বিরাট এক গর্তে সেই যে ঢুকলো, আর বেরোয়নি।


* লেখ্যরূপ দিয়েছেন সুমন সিংহ ।
* গল্পটি ছোটদের সামহোয়্যার ইন গ্রুপেরজন্য

____________________________________________
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বাংলাদেশের প্রায় ষাট হাজার মানুষের মাতৃভাষা। এ ভাষায় যারা কথা বলে তাদের কাছে ভাষাটি ‘ইমার ঠার’ নামে পরিচিত যার অর্থ হলো ‘আমার মায়ের ভাষা’। ভাষাটির সমৃদ্ধ প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য রয়েছে। মুলত শিশুদের বিনোদনের জন্য লোকমুখে রচিত লোকগল্পগুলো বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী প্রাচীন সাহিত্যের গুরুত্তপুর্ণ দিক। গল্পগুলো থেকে মণিপুরীদের প্রাচীন সমাজব্যবস্থা ও জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায়।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১২:২৬
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×