পৌর সংসারেও নয়, সৌর সংসারেও নয়
সকলেই কবি নন, কেউ কেউ কবি। সেই কেউ কেউ কবিদের মধ্যে সাবদার সিদ্দিকী (১৯৫০-১৯৯৪)একজন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অনেকাংশে বদলে যাওয়া আপন বৈশিষ্ট্যে অনুপম। চটের আলখাল্লা, গোল চশমা, খালি পা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, ব্যাগের ভেতরে মাটির পাত্র, আর মগজের ভেতর কবিতার পঙক্তি। হুট করে আড্ডা থেকে ওঠে যেতেন। সমস্তের ভেতরে একাকীত্ব দখল করেছিল তাঁকে। ১৮৩১ সালের তরুণ ফ্রান্সদের মতো প্রথা বিরোধী সামাজিক শাসন বিরোধী মুক্ত মানুষ সাবদার। চুয়াল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনকে উড়িয়ে দিয়েছেন একটা রঙিন বেলুনের মতো। শুধু রয়ে গেছে জীবাশ্ম শিল্পিত ফলক----একগুচ্ছ কবিতা ও ক্যালিগ্রাফি, যা তার জীবনের সারাৎসার। সৃষ্টিছাড়া, প্রকৃত বোহেমিয়ান এ কবির কবিতা ক্যালিগ্রাফগুচ্ছের ভেতরে প্রজ্জ্বলিত তাঁর অন্তরের হিরন্ময় দ্যূতি। আশির দশকের গোড়ার দিকে সাবদার সিদ্দিকি ছিলেন আড্ডায় উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত পদচারণায় শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন অনেকের কাছেই। হেথা নয় হোথা নয় , অন্য কোথাও অন্য কিছুর সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন। হিয়েনসাঙ এর মতো ভ্রমন আর বোহেমিয়ান স্রোতে ভেসে যাওয়ার মধ্যে কবিতার ভাবনা তাকে দাহন করত।
শৈল্পিক সৃষ্টি এমনই মানসিক প্রক্রিয়া যা অস্পষ্টভাবে ইন্দ্রিয় গোচর অনুভূতি এমন স্পষ্ট করে তোলে যা অন্য মানুষের মনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া সকলের মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু কেউ কেউ আছেন যারা হয়তো হঠাৎ করেই এমন কিছু উপলব্ধি করেন যা অশ্রুতপূর্ব বলেই মনে হয়। এই নতুন বিষয়টি তাকে আলোড়িত করে এবং তিনি তা অপরকে জানাতে ব্যাকুল হন। শিল্পী তার নিজের সৃষ্টির মধ্যে যেসব বিষয় প্রকাশ করেন তা তার মনোসিজ বিষয় নয়। তা তার চারপাশে বিরাজমান জীবন-সমাজ- ও ঘটনা প্রবাহ যা তার চৈতন্য, তার বৃদ্ধিবৃত্তি ও সংবেদকে, তার স্নায়ু ও মস্কিষ্ককে নানাভাবে আলোড়িত করে। বার্থ বলেছেন, একজন লেখক তার সমাজ সভ্যতার মাঝে অবস্থানকারী ভাব ব্যবস্থা থেকে উপকরণ নিয়ে কোনো বিষয়কে উপস্থাপন করেন মাত্র। আমরা দেখতে পাই আমাদের চারপাশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপেক্ষিত বিষয় সাবদার সিদ্দীকির কবিতার বিষয়বস্তু।
ম্যাচবাক্সহীন শহরের ক্রুদ্ধযুবক
দড়ির আগুনে জ্বেলে নেয় সর্বশেষ সিগারেট।'
সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে অতিক্রম করে সাবদার সিদ্দিকী হয়ে ওঠেন একজন কবি, কম্পাসহীন কলম্বাস।
‘অথচ আমার ঘরে কোনো ক্যালেন্ডার নেই
কোনো ঘড়ি কাঁটা কম্পাস নেই
তালা নেই, চাবি নেই
শুধু আছি আমি আর আমার ছায়া কায়া’
রেস্তোরায় নিঃসঙ্গ চেয়ারের চেয়েও একাকী মানুষ বলে মনে করতেন নিজেকে। আর তাই বোধহয় তার পে স্বচ্ছন্দ নদীর অধিক সহজ কবিতালেখা সম্ভব হয়েছে,
স্বর্গ ত্যাগের সময় কি কি ছিল মনে আছে?
ধর্ম-অর্থ-মোক্ষ-কাম
ছিল না কিছুই
কেবল নিঠুর ঈশ্বব-মাটি-তুমি-আমি'
(স্বর্গ ত্যাগের পর)
প্রত্যেকেই দুরত্ব চায়
একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষ
অন্ততঃ একমানুষ দুরত্ব চায়
(এক মানুষ দুরত)¡
কবি সাবদার সিদ্দিকি এমনই একজন মানুষ যিনি সমাজের নানা সুদৃঢ় প্রতিরোধের ব্যূহ ভেদ করে এই সংগ্রামী ও প্রতিবাদী আত্মপ্রকাশ করেন। যিনি সজ্ঞান ও সংবেদে তাঁর প্রেয়োতাড়না' ও শ্রেয়োবোধ'কে উপস্থাপন করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে---উপহার দিয়েছেন তার কাব্যে। উপমার বেলায় সাবদার প্রচলিত ধারাকে উপেক্ষা করেছেন সচেতনে। তার উপমাগুলো সব আধুনিক। চাঁদ-ফুল-নদীর বদলে এসেছে ইস্পাত, শঙ্খনীল জিনস, তারার আকুপাংচার।
কলকাতা আমি এক তরুণ মহাপুরুষ
কৃষ্ণের বাঁশির মতো আমার হাতে কৃষ্ণ পাইপগান, পকেটে পেটো
........................................................
বিবেকানন্দের গৈরিক নাগরিক কলকাতা
আজকাল কেমন আছ?
.......................................
হাওড়া ব্রীজ যেন লোহার ব্রেসিয়ার তোমার
কলকাতা, যন্ত্রের সমান বয়সী তুমি
কলকাতা , তোমার ইতিহাস
বাইবেলের পিছনে গাদা বন্দুক
বাংলা গদ্যের সমান বয়সী
আমার কিশোর কলকাতা
সন্ন্যাসীর লিঙ্গের মতো নিস্পৃহ তুমি আজ
প্রচণ্ড দ্রোহে অভিমানী কিশোরের মতো এ উচ্চারণ কবিতাটিতে বড়ো বেশি উদ্বেলিত। চিন্তা চেতনায় আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক তার পুরোপুরি বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি তার কবিতায়। আত্মঅভিমানী এ যুবক স্ব উচ্চারণে বার বার জানিয়েছেন তিনি একজন কবি।
সাবদার সিদ্দিকি এন্টি এস্টাবলিশমেন্টর কবি। মধ্যবিত্ত খোলস ভেঙে বুকে আগুন নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন, যে আগুন পোড়ায় নি কাউকেই কেবল তাকেই বিনাশ করেছে। আজ তিনি কেবলই স্মৃতি। তবে তাকে বিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছে ঘাস ফুল নদী । প্রকাশ করেছে সাবদার সিদ্দিকি কবিতা সংগ্রহ। এটি তার ১ম কাব্য গ্রন্থ। এর আগে তাঁর লেখাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এখানে সেখানে।
১৯৯৭ এর ফেব্রুয়ারীতে বইটির আত্মপ্রকাশ।
সাবদার জানান..
অক্ষরগণ শব্দ হবে
শব্দগণ কাব্য
ব্যাকরণ ধ্বনি আর ধ্বনি হবে প্রতিধ্বনি।
সাবদার সিদ্দিকীর মতো আমরাও জানবো..
যেখানেই পা রাখি
ভিনগ্রহে কিংবা ভিন গায়ে দেখি
পায়ের নীচে টুকরো দুই জমি
হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি।
........................................................................................................লেখাটি ১৯৯৭ সালে ফ্রেব্রুয়ারীতে বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত।
শ্রদ্ধেয় কবিবর গেওর্গে আব্বাস এর বাড়ি পরিভ্রমনে যেয়ে আবার তিনি উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। শ্রদ্ধেয় কবিবর তার ভাষায় সাবদার সিদ্দিকি সম্পর্কে আমাদের জানাবেন এ প্রত্যাশা করছি। আমি নিশ্চিত তিনি আমাকে বিমুখ করবেন না।
যেহেতু এটি সংবাদ পত্রের জন্য লেখা হয়েছিল তাই এতে অনেক তথ্যগত ঘাটতি রয়ে গেছে। সময় এবং স্থান অভাবে। আমি আশা করবো যারা সাবদার সিদ্দিকি সম্পর্কে জানেন কিংবা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন তারা আমার লেখার সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন।
সংযুক্তি:
সাবদার সিদ্দিকির জন্ম ১৯৫০ কোলকাতায়। বাবার নাম গোলাম মাওলা সিদ্দিকি। পেশায় আইন ব্যাবসায়ী। চার বোন এক ভাই। গোলাম মাওলা সিদ্দিকির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সাবদার ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান এবং একমাত্র পুত্র সন্তান। ১৯৬৪ তে কোলকাতায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে তার পুরো পরিবার চলে আসে সাতক্ষীরায়। ১৯৭১ সালে আবার পুরো পরিবার কলকাতায় চলে যায়। কিন্তু সাবদার রয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে আট নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন। পরে কোলকাতায় চলে যান।
সাবদার সিদ্দিকির মৃত্যুর পর তার অনুজ প্রতিম পুলক হাসান এর বর্ণনায় সাবদার সম্পর্কে কিছুটা জানা যায়।
তরুণ ভাস্কর রাশার সাথে সাবদার সিদ্দিকির সম্পর্ক ছিল অভ্যাসগত। আর আর মরহুম ওস্তাদ ফজলুল হকের সাথে গুণীর সম্পর্ক। ওস্তাদ ফজলুর হক বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে শিক আর রাশা তখন একাডেমীর পশ্চিম পাশের একটি কে নিয়মিত কাঠের বাটালি ছেলে ভাস্কর্য তৈরি করেন। আর প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত নটা দশটা পর্যন্ত একঝাঁক তরুণের উপস্থিতিতে আড্ডা জমাতেন। এ আড্ডায় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে খোলামেলা আলাপ আলোচনা থেকে রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় হতো। ...আমার সাথে কবি সাবদার সিদ্দিকির পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আশির দশকের গোড়ায় হলেও তা বিস্তৃত হয় ঐ একাডেমীর আড্ডাতেই।
.......................................................................................................
কোনো স্থায়ী জীবিকা গ্রহণ করেননি তিনি। দু একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করেছেন। দৈনিক আজাদে ছিলেন কিছু দিন তারপর আবার স্বাধীন জীবনযাপন। ১৯৯১ এর কয়েকমাস পিজির ভেতরে আমগাছের নীচে ছিল তার বাস। ১৯৯৪ সালে ঘুরতে ঘুরতে চলে গিয়েছিলেন দিল্লিতে । সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা নিয়েই কোলকাতা আসেন। বাংলাদেশে আসার জন্য ব্যাকুল হন। অথচ কোলকাতেই থেকে যেতে পারতেন। সাতক্ষিরার সীমানে এসে অসুস্থতা চূড়ান্তে পৌঁছায়। সীমান্ত পার হতে পারেননি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অজ্ঞাত নির্জন এক পল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন। কবি সেখানেই সমাহিত।
শুধু রেখে যান কিছু অক্ষর.............................
সাবদার সিদ্দিকির কবিতা
এক
কবি ও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড
কেননা একজন কবি কোন রাষ্ট্র নন।
নির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড নেই একজন কবির
সৌর সংসারেও নয়
পৌর সংসারেও নয়।
একজন কবি, কম্পাসহীন কলম্বাস।
যে রকম ধর্মের নিজস্ব নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড নেই
সে রকম ধর্মের কবিতার নেই কবির নেই
সৌর সংসারেও নেই
পৌর সংসারেও নেই
কবি ও কবিতার তাই নিজস্ব ভূখণ্ড নেই
ধর্মেরও তাই নিজস্ব ভূখণ্ড নেই
একজন কবি তাই চতুর্থ বিশ্বের নিঃসঙ্গ নাগরিক।
দুই
কবির শোকসভায় ভাষণ
প্রথম বক্তাঃ
বড়ই ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত ছিলেন তিনি
সাত সমুদ্র তেরো নদী তৃষ্ণা ছিল তাঁর
অথচ কোমরে ছিল তাঁর
নদীর মতো বাঁকা উজ্জ্বল তীক্ষ্ণ তলোয়ার।
ঝুলন্ত -পকেটে তাঁর
স্বদেশী বিদেশী মুদ্রার ছিল না ঝনৎকার
কেবলই চোখে ছিল চোখ
লক্ষ লক্ষ মানবিক পারমাণবিক চোখ।
দ্বিতীয় বক্তাঃ
তিনি ছিলেন কবিতার যুবরাজ
আগুনের আত্মার
সাথে আত্মীয়তা ছিল তাঁর।
নারী একটি প্রাচীন মাংশখণ্ডের নাম
]এইতো সেদিন আমরা জানলাম।
তিনি বললেন, বলে গেলেন
আমরা শুনলাম।
তৃতীয় বক্তাঃ
আসলে তিনি আমার বন্ধু ছিলেন
অতঃপর আমরা পরষ্পর
রুটির এপিঠ-ওপিঠ ছিলাম
আমরা পরষ্পর বন্ধু ছিলাম।
রাজপথের ক্ষতচিহ্নে হাত রেখে
তিনি বললেন একবার
নাম তার চিৎকার।
তিন
কয়েকটা শব্দ
কয়েকটা বাক্য
১. একজন পুলিশ একটি রাষ্ট্র।
২. কাক ও সাম্রাজ্যবাদ মূলত জ্ঞাতিভাই।
৩. গৌতমবুদ্ধ কয়েক কোটি লোককে /গৃহহারা করেছেন এটা সুমহান সত্য।
৪. মিসেস ইসাবেলা পেরন একজন মহিলা ফ্যাসিস্ট।
৫. গোলাপ মূলত চরিত্রহীন ফুল/গোলাপের শ্রেণী চরিত্র বিশ্লেষণ করা যাক।
৬. শন্তির পিকাসো পারাবত/ এযাবত কোন ডিম্ব প্রসব/ করেননি, একথা জেনে/ দুঃখ পাওয়া ভাল
৭. জাতিসংঘের বদলে-একটি কম্পিউটার যথেষ্ট
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



