মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
রাসূল (সা.) কি উৎসমূল ছিলেন?
কেউ এই যুক্তি দেখাতে পারেন যে, ঐ প্রজন্মের উৎকর্ষের পিছনে সম্ভবত রাসূলের (সা.) অস্তিত্ব, শিক্ষা এবং নেতৃত্ব ইত্যাদিই ছিল প্রধান কারণ - সুতরাং তাঁদের ঐ বিশাল পরিবর্তনের মূলে রয়েছে তাঁদের মাঝে রাসূলের (সা.) উপস্থিতি। এটা প্রশ্নাতীত যে, রাসূল (সা.) এবং তাঁর দৃষ্টান্ত তাঁর অনুসারীদের উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কোন জনগোষ্ঠীর উপর পবিত্র কুর’আনের কাঙ্খিত ফলাফলের জন্য তাঁর শারীরিক উপস্থিতি অনিবার্য! পরবর্তী প্রজন্মের উপরও কুর’আন একই রকম প্রভাব ফেলতে সক্ষম, এমনকি রাসূলের (সা.) অনুপস্থিতিতেও। সাইয়েদ কুতুব তার ‘মাইল স্টোন্স’ বইতে এই ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন :
“যে কুর’আন এই বাণী ধারণ করে, তা এখনো আমাদের হাতে আছে। আর প্রথম প্রজন্মের মুসলিমগণ, যাঁদের ইতিহাসে কোন জুড়ি নেই, তাঁদের কাছে যেমন বাস্তব জীবনের কর্মকান্ডে রাসূলের (সা.) দিক নির্দেশনা বর্তমান ছিল, তেমনি সেসব এবং তাঁর পবিত্র জীবনের ঘটনাবলী এখনও অক্ষত অবস্থায় হাদীসের আকারে সংকলিত রয়েছে। পার্থক্য শুধু এই যে, এখন নবী (সা.) নেই - কিন্তু এটাই কি গূঢ় রহস্য? যদি ব্যক্তি রাসূলের (সা.) উপস্থিতি এই বাণীর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের জন্য অনিবার্যই হতো, তাহলে আল্লাহ্ ইসলামকে এক বিশ্বজনীন বাণী হিসেবে নির্ধারিত করতেন না, গোটা মানবতার জন্য এটাকে ধর্ম হিসাবে নির্ধারণ করতেন না, এই বাণীকে মানবতার জন্য সর্বশেষ ঐশী বাণী হিসাবে মর্যাদা দিতেন না এবং সময়ের সমাপ্তি পর্যন্ত এই গ্রহের সকল অধিবাসীর জন্য এটাকে পথ নির্দেশক হিসেবে ঠিক করে দিতেন না।
আল্লাহ্ পবিত্র কুর’আনের সংরক্ষণের দায়-দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। কেননা তিনি জানেন যে, এমনকি নবীর (সা.) যুগের পরেও, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তা থেকে মানবকুল লাভবান হওয়া সম্ভব। সেজন্যই তেইশ বছরের নবুওয়্যতের জীবনের পরে, তিনি তাঁর নবীকে তাঁর করুণার ছায়াতলে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন এবং এই দ্বীনকে শেষ সময় পর্যন্ত প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করেছেন। নবীর(সা.) অনুপস্থিতি তাই এ ব্যাপারের (অর্থাৎ বর্তমান অবক্ষয়ের) কোন কারণ বা ব্যাখ্যা নয়।”
পবিত্র কুর’আন এবং রাসূল(সা.) এ ব্যাপারে জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলামের শিক্ষা দ্বারা মানবকুলকে পথ-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এবং মানুষের উপর এর কাঙ্খিত সুফলের জন্য, রাসূলের (সা.) ব্যক্তিগত উপস্থিতি অনিবার্য নয়। কুর’আন সম্বন্ধে বলতে গিয়ে আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুর’আনে বলেন:
“হে আহলে কিতাব! তোমাদের কাছে আমাদের রাসূল এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা কিছু লুকিয়ে রাখতে তা প্রকাশ করতে এবং যা কিছু অপ্রয়োজনীয় তা বাদ দিতে। আল্লাহর কাছ থেকে তোমাদের কাছে এক (নতুন) আলো এবং হেদায়েত দানকারী গ্রন্থ এসেছে। যা দিয়ে আল্লাহ্ তাদের সকলকে পথ নিদের্শনা দেন যারা শান্তি ও নিরাপত্তার পথে তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তাদের তাঁর ইচ্ছামত অন্ধকার থেকে সেই আলোতে বের করে নিয়ে এসে সেই পথে পরিচালিত করেন যা সরল।” (সূরা মায়িদা, ৫:১৫-১৬)
এই আয়াতদ্বয় স্পষ্টত বলছে যে, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য এক পথনির্দেশক হিসাবে কুর’আন স্বয়ংসম্পূর্ণ - যা মানুষকে আঁধার থেকে আলোতে নিয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, যার পরে তোমরা আর কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, সেটি হচ্ছে আল্লাহ্্র কিতাব।”(মুসলিম)
সুতরাং, মুহাম্মাদ কুতুব যেমন বলেছেন, একটা নির্ভেজাল মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূলের (সা.) উপস্থিতি কোন পূর্বশর্ত নয়। যদিও একভাবে ভাবতে গেলে শারীরিকভাবে মৃত হয়েও রাসূল (দঃ) আমাদের মাঝেই রয়েছেন, কেননা তাঁর উদাহরণ এবং তাঁর শিক্ষা এমন স্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে যে, যে কেউ চাইলে আজো তাঁর শিক্ষা ও তাঁর দিক-নির্দেশনা এমনভাবে জানতে পারবে, ঠিক যেমনটি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে দেখে জানা যেতো।
আল্লাহ্ যেভাবে কুর’আনকে সংরক্ষণ করেছেন, সেরকম ভাবেই রাসূলের (সা.) উদাহরণের এই দিকটিকে তিনিই হেফাজত করেছেন। তাই প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা যেভাবে রাসূলের (সা.) উদাহরণের দিকে ফিরে যেতেন - সেভাবে আজো কেউ চাইলে কোন ফায়সালার জন্য রাসূলের (সা.) উদাহরণের দিকে ফিরে যেতে পারে।
রাসূল (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। মানুষজনের জন্য সত্য জানতে ও তা অনুসরণ করতে প্রতিটি প্রজন্মে তাঁর শারীরিক উপস্থিতির আবশ্যকতা নেই। উপরন্তু কুর’আন থেকে এবং তিনি যে সত্য নিয়ে এসেছিলেন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবার জন্য তাঁর মৃত্যুটা কোন অজুহাত হতে পারে না, যেমন আল্লাহ্ বলেন :
“মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছুই নন, তার আগেও এমন অনেক রাসূল প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তোমরা কি তাহলে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে (এবং কুর’আনের ও তাঁর সুন্নাহর দিক নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করবে)? কেউ পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করলে সে আল্লাহর বিন্দুমাত্র ক্ষতিও করতে পারবে না।.....” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৪৪)
নবী মুহাম্মাদ (সা.) যেহেতু শেষ নবী ও রাসূল ছিলেন, সেহেতু এরকম না হলে তো আল্লাহ্ তাঁকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত জীবিত থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন, যাতে বিচার দিবসে মানুষের তরফ থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধে অবিচারের কোন অভিযোগ করার অবকাশ না থাকে। মানুষ দাবী করতে পারতো যে, তাদের সঠিক দিক নির্দেশনার জন্য যা অত্যাবশ্যকীয় ছিল, আল্লাহ্ তাদের জন্য তা দান করেননি বা সংরক্ষণ করেননি।
কিন্তু পবিত্র কুর’আন তার মূল রূপে আজো বর্তমান এবং নবীর (সা.) সুন্নাহও সংরক্ষিত রয়েছে। তাহলে আজকালকার কুর’আনে বিশ্বাসীদের মাঝে এবং অতীতে যারা কুর’আনে বিশ্বাস এনেছিলেন, তাদের মাঝে এত দুস্তর ব্যবধান কেন? এখন তাহলে এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা আবশ্যক।
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



