[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]
..............পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:
কুর’আনের প্রতি একজন মুসলিমের দায়দায়িত্ব
দ্বীন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাসমূহের একটি হচ্ছে ‘আল ওয়ালার’ ধারণা - আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ধারণা - আল্লাহর জন্য ভালবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা করার ধারণা। রাসূল (সা.) বলেছেন :
“ঈমানের সবচেয়ে শক্ত বন্ধন হচ্ছে আল্লাহর ওয়াস্তে আনুগত্য, আল্লাহর জন্য অন্যের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করা, আল্লাহর জন্য (কাউকে) ভালবাসা এবং আল্লাহর জন্য (কাউকে) ঘৃণা করা।” (আল তায়ালিসী, আল-হাকিম, আল-তাবারানী ইত্যাদি - আলবানীর মতে সহীহ)
আবদুল গণি মনে করেন, কারো মাঝে এই প্রয়োজনীয় আনুগত্য থাকার জন্য একটা প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে আল্লাহর কিতাবের প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসা থাকা - যা কিনা আল্লাহর বাণী এবং মানুষের কাছে প্রেরিত তাঁর ওহী। তাই সর্বাগ্রে একজন মুসলিমের পবিত্র কুর’আনের প্রতি গভীর ভালবাসা থাকতে হবে। কিন্তু এই ভালবাসা কেবল একটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে থাকাটা পর্যাপ্ত নয়। কুর’আনের প্রতি আমাদের আচরণে তা প্রতিফলিত হতে হবে - যার আওতায় কুর’আন পড়া, তা শিক্ষা করা (বা তা নিয়ে গবেষণা করা), তা মুখস্থ করা, কুর’আনের উপর কোন আক্রমণ প্রতিহত করা এবং কুর’আন অনুযায়ী জীবন যাপন করা - সবই এসে যাবে।
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের(সা.) প্রতি একজন ব্যক্তির যে ভালবাসা, তাই হচ্ছে কুর’আনের প্রতি তার ভালবাসার উৎস। কারো পক্ষে এরকম হওয়া সম্ভব নয় যে, সে আল্লাহকে ভালবাসবে অথচ আল্লাহর বাণী এবং মানবকুলের কাছে তাঁর ওহীকে ভালবাসবে না। বরং কেউ যে কুর’আনকে ভালবাসে, তাতে এটাই প্রমাণ হয় যে, সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকেও (সা.) ভালবাসে। বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, “কেউ যদি পরখ করতে চায় যে, সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল(সা.)-কে ভালবাসে কিনা, তবে তার উচিত এই ব্যাপারটা যাচাই করা যে সে কুর’আন ভালবাসে কিনা - যদি সে কুর’আন ভালবাসে, তবে সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে।” (আল-তাবারানী)
কুর’আন ভালবাসার সাথে সাথে, একজন ব্যক্তির এইজন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, আল্লাহ্ আমাদের জন্য কুর’আন নাযিল করেছেন এবং তাঁর রাসূল(সা.)-কে পাঠিয়েছেন আমাদেরকে তাঁর কিতাব শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আল্লাহ্ নিজেই বিশ্বাসীদের তাঁর এই বিরাট নিয়ামতের কথা মনে করিয়ে দেন এবং সেই সাথে এও মনে করিয়ে দেন যে, এই কিতাব নাযিল হওয়ার পূর্বে বিশ্বাসীরা সত্য সম্বন্ধে জানত না এবং তারা বিপথগামী ছিল। আল্লাহ্ বলেন :
“বিশ্বাসীদের মাঝে, আল্লাহ্ তাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করে তাদের উপর এক বিরাট অনুগ্রহ করেছেন, যিনি তাদের মাঝে আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শোনান, তাদের পবিত্র করেন, তাদেরকে হিকমত শিক্ষা দেন, অথচ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্টত বিপথগামী ছিল।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৬৪)
আমাদের কাছে যে কুর’আন রয়েছে - এই বিশেষ অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে আমাদের উচিত কুর’আন পড়া ও শিক্ষা লাভ করা এবং কুর’আন ও এর শিক্ষার প্রতি পরবর্তীতে বিশ্বস্ত থাকা।
কুর’আনের প্রতি কারো দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে রাসূলের (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে তিনি বলেন :
“দ্বীন হচ্ছে নসীহাত।” লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো, “কার প্রতি?” নবী (সা.) উত্তর দিলেন, “আল্লাহর প্রতি ও তাঁর কিতাবের প্রতি, এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ও মুসলিমদের নেতৃবৃন্দের প্রতি এবং সাধারণ মুসলিমদের প্রতি।” (মুসলিম)
এই হাদীসে রাসূল (সা.) বলেছেন, যে কারো আল্লাহর কিতাবের নসীহাত করা উচিত। দুর্ভাগ্যবশত, নসীহাত হচ্ছে এমন একটি শব্দ যার ভাষান্তর করা দুরূহ। শব্দটির ভাষাগত মূল ও কুর’আনে এর ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে আল রাগিব আল ইসফাহানী এর শরীয়াভিত্তিক সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে : “নসীহাত হচ্ছে এমন একটা কর্মপন্থা বা বক্তব্যের সন্ধান করা যাতে অপর ব্যক্তির জন্য কল্যাণ ও উৎকর্ষের ব্যাপার রয়েছে।” ইবনে আল সালাহ বলেছেন যে, নসীহাতের অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে এরকম যে, যিনি নসীহাত (বিশ্বস্তভাবে অন্যের মঙ্গল কামনা করা) করছেন, তিনি সত্যি সত্যি যাকে নসীহাত করছেন, তার জন্য সম্ভাব্য সর্বোত্তম কল্যাণ কামনা করছেন। আরেকভাবে বলতে গেলে তার নিয়তে ও তার কর্মে তিনি অপর সেই ব্যক্তির জন্য সর্বোত্তম মঙ্গল কামনা করছেন।
কুর’আনের প্রতি বিশ্বাসীদের এই ধরনের মনোভাব থাকা উচিত। অর্থাৎ, কুর’আনের প্রতি আচরণে একজন বিশ্বাসীর বিশ্বস্ত হওয়া উচিত এবং এমন কাজ করা উচিত যা “এর জন্য কল্যাণকর” - এখানে যার অর্থ হবে এটা পড়া, এটা বোঝা, এবং জীবনে এর প্রয়োজন ইত্যাদি ইত্যাদি। আল্লাহর কিতাবের প্রতি নসীহাতের কিছু অবশ্যকরণীয় দিক তুলে ধরে মুহাম্মাদ আল মারুযী বলেন:
“আল্লাহর কিতাবের জন্য নসীহাত বলতে বোঝায় এর প্রতি এক গভীর ভালবাসা ও বিরাট সম্মান পোষণ করা, যা এর প্রাপ্য - যেহেতু এটা সৃষ্টিকর্তার বাণী। এটা বোঝার জন্য প্রবল আগ্রহ এবং পড়তে গিয়ে এ থেকে, ‘কারো-প্রভু-কাউকে-যা-বোঝাতে-চেয়েছেন’, তা বুঝতে চেয়ে অবকাশ নিয়ে ভেবে দেখার জন্য বিরতি নেয়া - এ সবই নসীহাতের আওতায় আসে। তারপর একজন তা বোঝার পরে তাকে তা প্রয়োগও করতে হবে। কেউ যখন অন্যের কাছ থেকে নসীহাত লাভ করে, তখনও একই কথা প্রযোজ্য - সে যে উপদেশ লাভ করছে তা বুঝতে চেষ্টা করে। একইভাবে, সে যদি অন্য কোন ব্যক্তির কাছ থেকে লিখিতভাবে কোন কিছু পেয়ে থাকে, তবে সে চেষ্টা করবে সেই লেখাকে যথাসম্ভব ভালভাবে বুঝতে, যেন সে তা প্রয়োগ করতে পারে। আল্লাহর কিতাবের কাছ থেকে যে পরামর্শ গ্রহণ করছে, তার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য - সে তা বোঝার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, যাতে সে আল্লাহর ওয়াস্তে তা এমনভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়, যা আল্লাহর কাছে সন্তোষজনক ও পছন্দনীয় দুটোই হবে। তারপর সে যা বুঝল তা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। অতঃপর সে এর প্রতি ভালবাসা থেকে এর অধ্যয়ন চালিয়ে যেতে থাকে - এর শিক্ষা দেয়া আচরণবিধি অনুযায়ী সে কাজ করে এবং এর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী সে আচরণ করে।”
উপরে আল মারুযী যা বলেছেন, তা ছাড়াও আল্লাহর কিতাবের প্রতি নসীহাতের অংশ হিসাবে কুর’আনের প্রতি সঠিক বিশ্বাসও উল্লেখযোগ্য: অর্থাৎ তা যে আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হয়েছে, তা যে আল্লাহর বাণী এবং তা আল্লাহর কথা - যা সৃষ্টি নয় - অর্থাৎ, এটা মানুষের কথার মত কোন কথা নয়। উপরন্তু আল্লাহর কিতাবের প্রতি সম্পূর্ণ নসীহাত এই দাবী রাখে যে, কেউ তার সামর্থ অনুযায়ী তা সঠিকভাবে পড়বে, প্রয়োগ করবে - এর সতর্কবাণী, শিক্ষা ও উপমা ইত্যাদি থেকে শিক্ষ গ্রহণ করবে। আল্লাহর কিতাবে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য অন্যদের প্রতি আহ্বানও এই নসীহাতের অংশ।
আল্লাহর কিতাবের প্রতি একজন বিশ্বাসীর আরেকটা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য হচ্ছে এই যে, যে কোন বিষয়ে সে এটাকে চূড়ান্ত বিচারক বা ফায়সালাকারী হিসাবে মেনে নেবে - এটাই হবে সেই আইন, যা সে জীবনের সব ক্ষেত্রে মেনে চলবে। এই কিতাব যা কিছুকে হালাল বলে, সে সেটাকেই হালাল বলে গণ্য করে। এই কিতাব যা কিছুকে হারাম বলে, সে সেটাকেই হারাম বলে গণ্য করে। ধর্মীয় ও জাগতিক সব ব্যাপারই, অবশ্যই এই কিতাবের দিক নির্দেশনার আওতাধীন হতে হবে। আল্লাহ্ বলেন :
“......তোমরা যদি কোন বিষয়ে মতবিরোধ পোষণ কর, তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের কাছে নিয়ে যাও, যদি তোমরা আল্লাহয় ও শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাসী হয়ে থাক। চূড়ান্ত বিচারে সেটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম ও সবচেয়ে উপযোগী।” (সূরা নিসা, ৪:৫৯)
আল্লাহ্ আরো বলেন :
“কেউ যদি আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন, তা দ্বারা (অর্থাৎ তার আলোকে) বিচার করতে ব্যর্থ হয়, তারাই হচ্ছে (অবিশ্বাসী) কাফির।” (সূরা মায়িদা, ৫:৪৪)
এ বিষয়ে আবদুল গণি বলেন যে, আল্লাহর কিতাবের প্রতি বিশ্বস্ততার সর্বোচ্চ নিদর্শনের একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব দ্বারা শাসন কার্য পরিচালনা করা। এটা হচ্ছে এই কিতাবের প্রতি একজন মুসলিমের বিশ্বস্ততার প্রকাশ্য ঘোষণা। একজন মুসলিম এই কিতাবখানিকে কতখানি ভালবাসে এবং কতখানি সম্মান করে তা বোঝানোর জন্য এটা (কুর’আন অনুযায়ী শাসন) হচ্ছে এক বাস্তব ও প্রায়োগিক প্রচেষ্টা। আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা এবং তাঁর পবিত্র গ্রন্থ দ্বারা শাসন করা হচ্ছে ঈমানের এক অবশ্যকরণীয় দাবী, আকীদার এক উদ্দিষ্ট লক্ষ্য এবং তাওহীদের একটা ভিত্তি। এ থেকে মূর্খ ব্যক্তি, যার মূর্খতা ক্ষমা করা যায় না, অথবা একজন মুনাফিক, যার মুনাফিকী সর্বজনবিদিত, অথবা একজন কাফির যে তার প্রভুর প্রভুত্বকে অস্বীকার করে - এরা ছাড়া আর কেউ বিচ্যুত হবে না। কেননা, আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী শাসন করা হচ্ছে ইবাদতের কর্মকাণ্ডের মধ্য থেকে সর্ববৃহৎ একটি, যা দ্বারা মানুষ তার প্রভুর ইবাদত করে। এবং এটা হচ্ছে সবচেয়ে মহান কাজের একটি যা কাউকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে।
উপরে আমরা যা বললাম, তা ছাড়াও (কিন্তু তা সহ) আমাদের এই প্রচেষ্টার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আমরা চেষ্টা করছি আল্লাহর কিতাবের প্রতি কারো অবশ্যকরণীয় যে নসীহাত তা পালন করতে - যখন আল্লাহর কিতাবের সাথে লেগে থাকা হয় না, যখন তা নিয়মিত অথবা গুরুত্বের সাথে পাঠ করা হয় না, যখন তার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয় অথবা সেটাকে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়, যখন এর সুমহান প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয়, যখন এর আইনসমূহকে আত্মসাৎ করা হয় ও মানবরচিত আইন দ্বারা সে সবকে প্রতিস্থাপিত করা হয় - তখন কারো অবশ্যকরণীয় হচ্ছে এই ট্র্যাজেডির অবসানকল্পে উঠে দাঁড়ানো এবং রুখে দাঁড়ানো। যা এই ট্র্যাজেডিকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে যায় এবং যার মেরামত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, তা হচ্ছে এই যে, প্রায়শই যারা কুর’আনে বিশ্বাস করেন তারা ভুল পন্থায় কুর’আনের নিকটবর্তী হন এবং একই সময়ে মনে করতে থাকেন যে, তারা তো কুর’আনকে সর্ববৃহৎ মর্যাদার আসন দান করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের সম্মান প্রদর্শনের পন্থাও অনেক সময় ভ্রান্ত হয়ে থাকে। আমরা উপরে কুর’আনের প্রতি বিশ্বাসীদের যে দায়-দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছি, তা যদি তারা পালন না করেন, তবে বাস্তবে তারা আল্লাহর কিতাবের প্রতি নসীহাত করার অবশ্যকরণীয় কর্তব্য করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
(চলবে......... ইনশা'আল্লাহ্!)
[এই পর্বের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



