somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাই-ফি
যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

আমরা এমন কেন?

০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার রয়েছে, শুধু একটি ড্রাম ছাড়া। নরক পরিদর্শনে আসা একজন বিশেষ দূত পাহারাদারদের প্রধানকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ড্রামের সামনে কোনো পাহারাদার নেই কেন? যদি কোনো পাপী সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়?” প্রধান পাহারাদার হেসে উত্তর দিল, “চিন্তার কিছু নেই। এই ড্রামে শুধু বাঙালিরা আছে। এখান থেকে কেউ যদি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, অন্যরাই তার পা ধরে টেনে আবার ভেতরে ফেলে দেবে। নিজেরা শাস্তি ভোগ করবে, কিন্তু অন্য কেউ মুক্তি পাক, সেটা তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। তাই এই ড্রামের সামনে আলাদা পাহারার প্রয়োজন হয় না।” এটি নিছক একটি কৌতুক। কিন্তু কৌতুকের আড়ালেও কখনো কখনো কিছু অস্বস্তিকর সত্য লুকিয়ে থাকে। আমাদের সমাজের কিছু প্রবণতা, কিছু দুর্বলতা এবং কিছু আত্মঘাতী আচরণ হয়তো এই গল্পটিকে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

কেন আমরা ব্যক্তি হিসেবে কিংবা জাতি হিসেবে আমাদের সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারি না? কেন এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হই? এর উত্তর একক কোনো কারণে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে কিছু প্রবণতা বারবার চোখে পড়ে। ঈর্ষা, পরচর্চা, ব্যক্তিগত রেষারেষি, স্বল্পমেয়াদি চিন্তা, ঝুঁকি নিতে অনীহা এবং দক্ষতার চেয়ে শর্টকাটের প্রতি আকর্ষণ তার মধ্যে অন্যতম।

প্রথমেই আসা যাক শিক্ষা ব্যবস্থার কথায়।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্ন ও বহুধাবিভক্ত। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, ক্যামব্রিজ কারিকুলাম, বিভিন্ন ধরণের মাদ্রাসা শিক্ষা, ক্যাডেট শিক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি শিক্ষা, উন্মুক্ত শিক্ষা—সব মিলিয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে দেশের সব শিক্ষার্থী একটি অভিন্ন মানদণ্ডে গড়ে ওঠে না। ফলাফল হচ্ছে, শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতা তৈরির পরিবর্তে সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ সীমিত সম্পদ নিয়েও তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করেছে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে তারা বিনিয়োগ করেছে। আমরা সেই পথ ধরতে পেরেছি আংশিকভাবে, কিন্তু এখনো অনেক দূর যেতে হবে। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সেখানেই জন্ম নেয় নতুন ধারণা, নতুন গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষক নিয়োগ থেকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত যদি মেধার পরিবর্তে আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্বমানের গবেষক বা উদ্ভাবক বের হওয়া কঠিন।

অন্যদিকে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা।

ইতিহাস বলছে, যারা প্রচলিত পথের বাইরে হাঁটার সাহস করেছে, তারাই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো নিরাপদ পথের প্রতি এক ধরনের অতিরিক্ত আকর্ষণ দেখা যায়। তরুণদের অনেকেই নতুন কিছু করার চেয়ে নিশ্চিত চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্যবসা, গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গঠনের চেয়ে দ্রুত আয়ের সুযোগ অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
এই মানসিকতার একটি প্রতিফলন দেখা যায় বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও।

প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উন্নত দেশে পড়াশোনা করতে যায়। তাদের অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের খরচ চালায়, কাজ করে, সংগ্রাম করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে দক্ষতা উন্নয়নের পরিবর্তে অনেক সময় তাৎক্ষণিক আয়ের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ ভবিষ্যতের বড় সুযোগগুলোকে সীমিত করে ফেলে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ দক্ষতা।
বর্তমান বিশ্বে শুধু মেধাবী হলেই হয় না। নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে জানতে হয়। দলগতভাবে কাজ করতে জানতে হয়। নেতৃত্ব দিতে জানতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এসব দক্ষতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

আমাদের সামাজিক আচরণেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আমরা প্রায়ই আবেগকে বাস্তবতার উপরে স্থান দিই। ছোট অর্জনকে বড় সাফল্য হিসেবে উদযাপন করি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কঠিন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাই। আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো ব্যক্তি যেমন উন্নতি করতে পারে না, তেমনি কোনো সমাজও পারে না। আমাদের মধ্যে অতীত নিয়ে গর্ব করার প্রবণতা প্রবল। অতীতের গৌরব অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু শুধুমাত্র অতীত স্মরণ করে বর্তমানের দুর্বলতাকে ঢেকে রাখা যায় না। একটি জাতির পরিচয় নির্ধারিত হয় তার বর্তমান অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দিয়ে।

সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো পারস্পরিক ঈর্ষা।

অনেক সময় আমরা নিজের উন্নতির চেয়ে অন্যের ব্যর্থতায় বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ি। সহকর্মী, প্রতিবেশী কিংবা প্রতিযোগীর সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নেওয়ার পরিবর্তে সন্দেহ কিংবা বিরক্তির চোখে দেখি। এই মানসিকতা ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। কোনো সমাজ তখনই এগিয়ে যায় যখন মানুষ একে অপরের সাফল্যকে সম্মান করতে শেখে, সহযোগিতা করতে শেখে এবং দলগতভাবে বড় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। তবে পুরো চিত্রটি হতাশার নয়।

এই সমাজ থেকেই বেরিয়ে এসেছেন এমন মানুষ, যারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। কেউ বিজ্ঞানী হয়েছেন, কেউ স্থপতি, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ সমাজসেবক। তারা দেখিয়েছেন যে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সাফল্য সম্ভব। পার্থক্য শুধু একটি জায়গায়। তারা নিজেদের দুর্বলতাকে অজুহাত বানাননি। তারা পরিশ্রম করেছেন, শিখেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।

সাফল্যের কোনো গোপন সূত্র নেই। মেধা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মেধার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যবসায়। সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সুযোগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিভার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত পরিশ্রম। যে ব্যক্তি নিজের কাজকে গুরুত্ব দেয়, নিজের দক্ষতা প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নত করে এবং অন্যের সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত না হয়ে অনুপ্রাণিত হয়, সাফল্য একদিন তার কাছেই ধরা দেয়।

জাতি হিসেবেও আমাদের সামনে পথ একটাই। শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা, শৃঙ্খলা এবং কঠোর পরিশ্রমকে মূল্য দিতে হবে। আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকে, অজুহাতের চেয়ে কর্মকে এবং শর্টকাটের চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তখনই হয়তো আমরা শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে বাঁচব না, ভবিষ্যতের জন্যও নতুন গৌরব সৃষ্টি করতে পারব।


আশরাফুল মাহমুদ তাইফ
ঢাকা, বাংলাদেশ।

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×