somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইন্ডিয়া ট্যুর ৬ : স্টেশনে নেমে দেখি ১৭ জন মিসিং!!:-/

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্বের লিংক- তাজমহল: ফটক পর্ব
যে স্টেশনে এসে নামলাম তার নাম খড়গপুর- ফাহিম ভাই জানালেন। এ খানে আবার ট্রেন পাল্টাতে হবে জেনে আমরা যার পর নাই বিরক্ত। দিল্লী থেকে রওয়ানা দিয়েছি একদিনেরও বেশী আগে। পথে কোথায় যেন কি সমস্যা হয়েছে, ট্রেন থেমে ছিল প্রায় ৪-৫ ঘন্টা। এমনিতেই দেরী হওয়ায় আমাদের মেজাজ খারাপ। এখন আবার এখানে এই রাতের বেলা ট্রেন পাল্টাতে হবে।

আমরা প্ল্যাটফর্মের যে জায়গাটায় নেমেছি, তার থেকে বেশ খানিকটা দূরের আরেকটা প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে হাওড়াগামী ট্রেনটি। দিল্লী থেকে আসা ট্রেন থেকে নেমে ব্যাগ গুছিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়তেই দেখি ঐ প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটি চলে এসেছে। ফাহিম ভাই তাগাদা দিলেন, ৫ মিনিটের মধ্যে ঐ ট্রেনটি ছেড়ে যাবে। তার আগেই আমাদের ট্রেনটিতে উঠতে হবে। কারণ, ঐ রাতে ওটাই শেষ ট্রেন। এই ট্রেন মিস করলে রাত কাটাতে হবে খড়গপুরেই। খড়গপুরে আমাদের থাকার কোন অ্যারেঞ্জমেন্ট নেই। এই অচেনা জায়গায় হুট করে ৭৫ জনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা খুবই কঠিন হবে।

আমরা দ্রুত কাজে নেমে পড়লাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফিয়ে কিছুটা নিচের রেললাইনে নামলাম। উপর থেকে ব্যাগ ছুঁড়ে দিল অন্য কেউ। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রেললাইনের উপর দিয়ে, পাথর আর মাটির রাস্তা পেরিয়ে ছুটলাম দূরের ঐ প্ল্যাটফর্মের দিকে। সেখানে গিয়ে আবার ঐ ট্রেনের একদম সামনে দিয়ে ঘুরে উল্টোদিকে যেতে হলো। কারণ, ট্রেনে ঢোকার দরজাটি ঐ দিকে।

ফাহিম ভাই বললেন, যে যেই কামরায় সম্ভব যেন উঠে যাই। টিকিটের ব্যাপার পরে ফাহিম ভাই ম্যানেজ করবেন।
ট্রেনের হুইসেল বেজে গেছে ততক্ষণে । আমরা ভারী ভারী ব্যাগগুলো হাতে-কাঁধে নিয়ে পড়ি মড়ি করে ছুটলাম ট্রেনের বিভিন্ন কামরা লক্ষ্য করে।

ফেরার পথ । তাই প্রত্যেকের ব্যাগ এখন দু-তিনটা করে। গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হয়ে উঠলাম এক একটা কামরায়।
কে যেন ব্যাগ নিচে ফেলেই উঠে গেছে। কার ব্যাগ পরে দেখা যাবে, আমাদেরই তো কারো, আগে ট্রেনে তুলে ফেলা হোক। আরেকজনের সহায়তায় ব্যাগটা উপরে তুলে দিয়ে যখন পাদানীতে পা দিলাম, ট্রেন ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। শেষবারের মতো পিছনে তাকিয়ে দেখে নিলাম- নাহ, আমাদের কেউ বা কিছু প্ল্যাটফর্মে পড়ে নেই; ফাহিম ভাই আর আমার রুমমেট সজীবও সব চেক করে সবার শেষে লাফ দিয়ে উঠে পড়লো চলন্ত ট্রেনে।

এবার ভেতরে ঢুকে জায়গার সন্ধান। প্রথমে ব্যাগগুলো একসাথে জড়ো করে গুছিয়ে রাখলাম। বসার কোন জায়গা নেই। ছেলেরা দাঁড়িয়েই রইলাম। স্থানীয় লোকজন অবশ্য দয়া করে মেয়েদের অনেককে বসতে দিল। তিনজনের সীটে চারজন চাপাচাপি করে, স্থানীয়দের মাঝে মাঝে আমাদের দুএকজন করে। ছেলেরা ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম মেয়েদের ঐসব সীটের পাশেই, যাতে কোন অঘটন না ঘটে।

অসহ্য গুমোট আর ভীড়টাও একসময় সয়ে এলো। ঘন্টা দুয়েকের জার্নি শেষে আমরা অবশেষে কলকাতায় পৌঁছলাম।
আবার ব্যাগ নামানোর পালা। আমাদের কামরার ব্যাগ নামিয়ে আমি আর আসাদ সবার শেষে নামলাম। নেমে দেখি, নিলা কাঁদছে।
কি ব্যাপার?
বন্যাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মানে?
বন্যা ট্রেন থেকে নামেনি এখনও। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ট্রেন থেকে সব যাত্রী নেমে গেছে, বন্যা নেই। শুধু বন্যা না, আরো অনেককেই দেখা যাচ্ছে না।
হিসাব করে দেখা গেল, ১৭ জন মিসিং।
কিভাবে?

আমরা তাদের খড়গপুরেই রেখে এসেছি।

ঘটনা জানা গেল, খড়গপুরে যে প্ল্যাটফর্মে আমরা নেমেছিলাম, সেখান থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার আরেকটা রাস্তা ছিল। রাস্তাটা একটু ঘুরপথে, একটা ব্রীজ পার হয়ে। একটু সময় লাগলেও রেললাইনের উপর দিয়ে যাওয়ার চেয়ে আরামদায়ক। ট্রেন থেকে নামার পর পরই ব্রীজ দিয়ে যাব নাকি রেললাইন পার হয়ে এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। এরই মাঝে আমাদের সাথে যাওয়া শিক্ষক আর ফাহিম ভাই যখন কয়েকজনকে ঐ ব্রীজ দিয়ে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন, তখনও ঐ প্ল্যাটফর্মে অন্য ট্রেনটি আসেনি। বাকীরা প্রস্তুতি নেয়ার সময় হঠাৎ ট্রেনটি চলে আসায় রেললাইন টপকানোর সিদ্ধান্ত হয়। এবং ব্যস্ততায় ফাহিম ভাই, স্যার এবং অন্য দু-একজন যারা জানতো, অনেকে ব্রীজ পার হয়ে আসছে, তারা সবাই কথাটা ভুলে যায়।

আমাদের সবার মুখ শুকিয়ে আসে। মেয়েদের প্রায় সবার চোখে জল। কয়েকজন তো ডুকরে কাঁদছে। অচেনা-অজানা জায়গায় বিপদাশংকাটাই আগে মনে আসে। সতের জন কি একসাথে আছে? এক সাথে থাকলে ভয় কম, কিন্তু যদি কেউ আলাদা থেকে যায়, তার কি হবে? আজ তো আর ওরা ফিরতে পারবে না। কাল কি পারবে? যোগাযোগের কোন মাধ্যম নেই। ওদের ছাড়াই কি ফিরতে হবে দেশে? ফাহিম ভাই সাহস যোগানোর চেষ্টা করেন, কালই তিনি ওদের বের করার ব্যবস্থা করবেন; কেউ হারাবে না, সবাইকে নিয়েই তিনি দেশে ফিরবেন। আমরা আশ্বস্ত হতে পারি না। যদিও ছেলেরা কয়েকজন নিজেদের স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি। যুক্তি দেই, ওরা তো প্ল্যাটফর্মেই আসবে শেষ পর্যন্ত । সুতরাং, সতেরোজন একসাথেই থাকবে। আর আমাদের নেপালী সহপাঠীও আছে ঐ সতেরোজনের মধ্যে। অন্যদের না হয় ঘোরার অভিজ্ঞতা নেই, ওর তো অচেনা –অজানা জায়গায় খাপ খাওয়ানোর অভিজ্ঞতা আছে; ও ঠিকই ম্যানেজ করে নেবে। কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজেদের কথা মন থেকে বিশ্বাস করতে পারি না।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি স্টেশনেই। হোটেলে ফিরতেও মন চায় না। কিন্তু কি করবো? এখানে থেকেও তো কিছু করতে পারবো না। কয়েকজন বাকীদের বুঝিয়ে আতংকিত, ভাঙ্গা মন নিয়ে অনেকক্ষণ পর হোটেলের দিকে রওয়ানা দেই।

আমরা কি আর জানতাম, হোটেলে আমাদের জন্য কি বিস্ময় অপেক্ষা করছে! হোটেলের ভেতর ঢুকে দেখি, সেই ১৭ জন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। খানিকক্ষণ বিস্ময়। এরপর আমাদের আনন্দ বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মেয়েরা একে –অপরকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এ কান্না আনন্দের, খুশীর , স্বস্তির। ওদের কেউ কেউ আমাদের উপর রেগে ওঠে। ওদেরকে ফেলে এসেছি এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। আমরা কিছু মনে করি না। আমরা ওদের ফিরে পেয়ে কি যে স্বস্তি পেয়েছি, তা বলে বোঝানোর না।

কিন্তু কিভাবে ওরা এলো? আমাদের আগেই বা কিভাবে?

আমাদের জানায় কিছুটা ভুল ছিল। আমরা যে ট্রেনটায় খড়গপুর থেকে এসেছি সেটা ঐ রাতের শেষ ট্রেন ছিল না। ফাহিম ভাই সেটা জানতেন না। সেখান থেকে আরো রাত অবধি দশ-পনের মিনিট পর পর-ই ট্রেন ছাড়ে। ওদের একজন দূর থেকে আমাদের সবাইকে ট্রেনে উঠে পড়তে দেখেছিল। একত্র হওয়ার ওরাও পরের ট্রেনে চড়েই চলে আসে।

কলকাতায় ওরা নেমেছিল অন্য প্ল্যাটফর্মে। আমরা যেখানে নেমেছিলাম, সেখান থেকে দূরে। আমরা ওদের দেখতে পাইনি, ওরাও আমাদেরকে দেখেনি। আমরা স্টেশনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু ওরা ট্রেন থেকে নেমে সোজা চলে এসেছে হোটেলে।

কলকাতায় কোন হোটেলে আমাদের বুকিং দেয়া আছে, তা দু-একজন জানতো বলে রক্ষা।
.................................
আগের পর্বগুলোর লিংক -
তাজমহল: প্রস্তুতি পর্ব , ইন্ডিয়া ট্যুর ৩: যেদিন আগে রেডি হলাম, ইন্ডিয়া ট্যুর ২ : রমণীগণ.., ইন্ডিয়া ট্যুর - ১ : ভিনদেশে হিজড়ার খপ্পরে

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৯
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×