Click This Link
দিন গড়ায়, মাস গড়ায়। চোখের জ্বলে ভাটি পড়ে লীনার। অথর্ব মানুষের যেমন সুখ-দুঃখের হিসেব থাকেনা, তারও তেমনি! আসিফের মুখটা ঠিক মত মনে পড়েনা। স্রেফ একটা মাদল গন্ধ যেন তাড়া করে ওকে। রাতের নিঃসঙ্গতার মাঝে লাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আসিফকে ডাকে সে। তখন হয়ত আসিফ ঘুমিয়ে থাকে নিদ্রাদেবীর কোলে। জানতেও পারেনা কেউ একজন তাকেই ভেবে জগৎ সংসারের মালিককে অযাচিত দোষারোপে নিঃস্ব করছে নিজেকে!
নিদ্রাহীন লীনা ছুটে চলে........কোথায় যায়, কী ভাবে, কোন সাগরে ডুব দেয় তার যেন কোন ঠিক ঠিকানা নেই। বুকের ভেতর সেই অস্বস্তি! ঐ বুঝি আসিফ এলো, ঐ বুঝি বলছে "এস সোনা, আবার এক হই!" লীনার ভেতর জন্ম নেয় আরেক"লীনা"। একটু একটু করে বাড়তে থাকে সে.......। এক লীনা চায় আসিফ কে, আরেক লীনা চায়না, একজন ভালবাসে তো আরেকজন ঘৃনা, একজন ছুঁতে চায় তো আরেকজন দূরে থাকতে! শরীর চলে যায় মনের দখলে। মনের সকল ক্ষোভ যেন শরীরের উপর। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই এমনি করে কাটে দিন! শরীরটাও বড় বেয়াড়া, যেন ভাঙ্গতেই চায়না! প্রথম প্রথম শুমের ওষুধ খেলে ঘুম পেত। এখন তাও পায়না।
খবর পায় আসিফ নাকি খুব ভাল আছে। সবাই কে নাকি বলেও যে সে খুব ভাল আছে! লীনা অবাক হয়! কেমন করে পারে সে! স্রেফ লীনাই কি ভালবাসার বলি? বারান্দায় বসে ভাবছে লীনা। জীবনটা কে কেন যে বোঝা মনে হয় কে জানে। মনরোগ বিশেষজ্ঞের দারস্থ হয়েছিল সেদিন...................
:তুমি ১০০ ভাগ বিশ্বাস রেখেই আমাকে সব বলতে পার। এসব কথা কেউ কখনও জানবেনা। লুকাবেনা কিছুই। ডাক্তার বলেছিল লিনাকে। লীনা শুরু করে ৩বছর বয়স থেকে.............শেষ করে ২৩এ! সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাক্তার জিজ্ঞেস করে
:আসিফ কি জানত সব?
:হ্যা জানতো। আমি ওকে বলেছিলাম "আমায় অর্থ না দাও স্বস্তি দিও" দেয়নি। চলে গেল আমাকে একা ফেলে। কখনও ভাবেনি আমার কথা। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে।
ছোটকাল থেকে লীনার চেহারায় কী যেন মায়া আছে, সবাই খুব আদর করে তাকে। ডাক্তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে
:তুমি জীবনে সবথেকে বেশি ভালবাস কাকে?
:বাবা কে
:কখনও মরে যেতে ইচ্ছে করলে তার কথা ভাববে। মৃত্যু কোন কিছুর সমাধান নয় মা! মৃত্যু তো পরিণতি! একবার ভাব, জগৎ সংসারকে তুমি কি দিয়েছ! জগৎ সংসার তোমাকে কি দিয়েছে! তোমার পরনে আছে বহুমূল্য পোশাক, তুমি শিক্ষিত, তোমাকে ক্ষুধার কথা ভাবতে হয়না। অথচ চারদিকে তাকিয়ে দেখ, কারও খাবার নেই কারও পরার পোশাক কিংবা কারও নেই থাকার জায়গা, শিক্ষার কথা তো বললামই না! ওদের জন্য কিছু কর। যে তোমার এত ভালবাসার বিনিময়ে তোমায় স্রেফ ব্যাথায়ই দিয়েছে তার জন্য এত ভাবা কেন? তাকে যেতে দাও! ঐ খাদ্য, বস্ত্রহীন মানুষগুলোর পাশে এসে দাঁড়া।ওরা তোমায় ঠকাবেনা। ওরা ঠকাতে জানেনা। ভালবাসার বিনিময় কোনদিন আঘাত হতেই পারেনা। যে আঘাত করে সে হয় "ভালবাসা" কী বোঝেনা, নয়ত সে ভালবাসারই যোগ্য নয়! অযোগ্য মানুষ ভালবাসা পাবার অধিকার রাখেনা মা! কেন তার জন্য নিজেকে নিঃশেষ করবে? সে তো ভাল আছে। তবে তুমি কেন ভাল থাকবেনা?তোমাকে ভাল থাকতেই হবে।
লীনার চোখ ফেটে ঢল নামে। "তাইতো, কেন আসিফের জন্য নিজেকে শেষ করবো? সে তো কোনদিন ভালোই বাসেনি আমায়। কই ছ'মাসে একবারও তো বলেনি "এস নুতন করে শুরু করি" তবে কেন এই অপেক্ষা! আসিফ ভাল আছে, আমি কেন পারিনা। আমি কিছু পাইনি বলেই কী পাবার অধিকারও হারিয়েছি? কখনই না! আমি বাঁচবই। আসিফই হবে আমার পরশ পাথর! পুড়ে আমি খাঁটি হব! সমস্ত জগৎ-সংসারকে একদিন চীৎকার করে বলবো "শোন সবাই, আসিফ হ্যা আসিফই সেই মানুষ যার কারনে আমি আজকের লীনা! যে লীনা মানুষকে ভালবাসে, যে লীনা অপরের দুঃখে কাঁদতে পারে, নিজের খাবার অবলীলায় অন্যের মুখে তুলে দিতে পারে, ঝুপড়িতে বসে তোমাদের তৈরী "নোংরা বস্তির মানুষ"দের সানকিতে পান্তা খেতে পারে, তার ঘেন্নায় নাক সিঁটকে আসে না। বরং সেই অচ্ছুত নারীর আনন্দের অস্রুফোটার স্বাধে তৃপ্তিতে খায় লীনা! আমি আজ থেকে আসিফের নই। স্রেফ মানুষের, নীঃস্ব মানুষের!"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



