সকাল থেকে শূন্যতার মাত্রাটা আরও বাড়লো লীনার। আসিফের যেখানে যত ছবি ছিল সব কুড়িয়ে নিয়ে সারা বিছানায় ছড়িয়ে তারই উপর হাত রেখে শুয়ে ছিল সে। ক্লাশে যেতে ভাল লাগেনা ওর। সকালে নাস্তা হয়নি। টেষ্ট রীপোর্ট গুলো হাতে পেয়েছে কাল। ওষুধের ঝাঁপি নিয়ে বাসায় ফিরলেও সময়মত ছুঁয়ে দেখবার বেলায় অলসতার কমতি করে না সে! হঠাৎ মনে হল আসিফ কে চিঠি লিখবে। উঠে ডায়রীটা টেনে নিল সে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আসিফ,
কেমন আছ? খুব যে ভাল আছ সে না বললেও বুঝি। আমি? চেষ্টা করছি, পারছি কিনা সে জানতে চেওনা! গত পরশু ১৯ তারিখ চলে গেল। তোমার আমার বিচ্ছেদের ৩ মাস পূর্ণ হল। দেখতে দেখতে তিনটি মাস কেটে গেল। এখন আমার থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি পাবার আইনত আর কোন বাঁধা থাকলো না তোমার। একদিন আত্মার যে বন্ধনটা সবাই মহাসমারোহে খুব ধুমধাম করে জুড়ে দিয়েছিল তাকে তুমি কোন আইনে আলাদা করবে বলতে পার আসিফ?
তুমি আমায় যা কিছু দিয়েছ তাই ই আমি মহা যত্নে তুলে রেখেছি। তোমার মনে আছে আসিফ? আমি প্রায়ই তুমি অফিস যাবার পর ক্লাশের মাঝখানে তোমাকে এস এম এস করতাম "ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি"। তুমি কখনও জবাবে বলনি "আমিও"। তবু কোন ক্ষোভ ছিল না সে সময়। আজ কেন তবে রাজ্যের অভিমান এসে মনে ভর করে? তবে বিশ্বাস কর, তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকা শিখে গেছি আমি! সেই শিখবার সময় টুকু যে কত ভয়ংকর ছিল সে তুমি বুঝবেনা.........................................
এটুকু লিখেই কলম আর চলেনা লীনার। আজ যেন বিধাতার কাছ থেকে সকল কান্নার বায়না নিয়েছে সে। আজ কেন জানি ভীষণ ছুঁতে ইচ্ছে করছে আসিফকে, অনেক মায়ায় বুকে হাত বুলিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে "ভালবাসি, এখনও ভালবাসি"!
নির্ঝর কে ফোন করে লীনা।
: কি করিস?
:কিছু না রে। কি খবর তোর?
:এই তো বেঁচে আছি।
:আসিফ ভাই যোগাযোগ করে?
:নাহ, কি হবে আর যোগাযোগ করে?
:হুমমম। তারপর বল সব খবর কি?
:জানিনা। নিঝু? ঐ কবিতাটা আবৃত্তি কর তো!
:কোনটা? মেহেদী পাতা?
:হ্যা।
একটু হেসে শুরু করে নিঝু................
অনন্ত, মেহেদী পাতা দেখেছ নিশ্চয়
ওপরে সবুজ, ভেতরে রক্তাক্ত ক্ষত, বিক্ষত
নিজেকে আজকাল বড় বেশি মেহেদী পাতার মনে হয় কেন
ওপরে আমি, ভেতরে কষ্টের যন্ত্রনার এমন সব বড় বড় গর্ত যে
তার সামনে দাঁড়াতে নিজেরই ভয় হয় অনন্ত!
অনন্ত, তুমি কেমন আছ
বিরক্ত হচ্ছ না তো....................................
থেমে যায় নির্ঝর, লীনা আর কথা বলতে পারেনা। লাইনটা কেটে দেয়। নিজের ভেতরে মেহেদী পাতার মত লুকিয়ে রাখা ক্ষতগুলো জ্বালা করে ওঠে। মনের অগোচরে কল্পনাগুলো ঠায় নেয় মনের ভেতর। আরেকটা স্বাক্ষর করবার দিন ঘনিয়ে আসছে। তারপর জীবনের আর কোন কালবেলায় আসিফের দেখা পাবেনা সে। আসিফও গড়বে নুতন জীবন। ঘর বাঁধবে, অফিস শেষে বাজারে যাবে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কোমর পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরবে অন্য কাউকে, কামার্ত চূম্বনে রাতের শয্যার উষ্ণতা বাড়াবে, অন্য কারও হাতের রান্নার প্রশংসায় মুখরিত করবে খাবার ঘরের পরিবেশ "ভীষণ মজা হয়েছে" বলে, সকাল সকাল কারও দিকে নিজের ধোয়া শার্ট টা এগিয়ে দিয়ে বলবে "একটু ইস্ত্রী কর তো এটা!" কিংবা অফিস থেকে ফেরার পথে বলবে "কিছু আনতে হবে?"। তখন দৈনিক দিন যাপনে এক বারও মনে পড়বে না লীনার কথা। নুতন সঙ্গীর মাঝে খুঁজে নিবে লীনার সমস্ত অসম্পূর্ন কর্তব্য গুলোকে। সারারাত আরেকটা শরীর জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকবে আসিফ। তখন একবারও কি লীনা স্বপ্নে এসে হানা দেবে না? বলবে না? " এভাবেই, এভাবেই একদিন ঘুমাতাম আমি"??? চমকে আসিফের ঘুমটা কি ভাঙবে? কোনদিন কি ভুল করে আসিফ নুতন সঙ্গিনীকে "লিনা" বলে ডেকে উঠবে না? কখনও সখনও আসিফের মনটা কি লীনার দুষ্টুমী ভরা ছেলেমনুষি গুলোকে খুঁজবে? কোনদিন কি আসিফের মনে হবে না, লীনাই ভাল ছিল?!! এমন সব সম্ভাবনার খোঁজে হাতড়ে বেড়ায় লীনা। কোথাও কোন স্বস্তি নেই। এ ব্যথার যেন উপশম নেই, কোন অভিব্যক্তিও না। নীরবে সয়ে যাওয়া শুধু!
অস্ফুঠে শুধু বলে ওঠা "উহ!!!"
(অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



