পূর্বে প্রকাশের পর
.........................
দরজা খুলে দেখি শ্রাবণী দাঁড়িয়ে। আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম। বললাম, তুমি? ও বলল কেন আসতে কি নিষেধ? আমি কি তোমার কাছে আসতে পারিনা? ও মিটি মিটি দুষ্ট হাসি হাসছে। ও কে ভিতরে এসে বসতে বললাম। শ্রাবণী না বসেই আমার অগোছালো সংসার দেখতে লাগলো দুই ঘর ঘুরে। আমিও ওর পিছন পিছন ঘুরতে লাগলাম। টেবিলের এলোমেলো কাগজ গুলো সাজিয়ে দিলো। গৃহিনীর মত ঘর গোছাতে শুরু করলো।
বললাম, কি করছ এসব? উত্তরে বলল, কেন গুছিয়ে দিচ্ছি বলে কি রাগ করছো নাকি? না না রাগ করবো কেন? এই ছন্নছাড়া জীবনে এত আদর পেতে নেই। ও বলল, আজ আমি বিকেল পর্যন্ত তোমার এখানে থাকবো। আমি নিজ হাতে রান্না করবো। খাবো একসাথে, গল্প করবো। তারপর বিকেলে বেড়াতে যাবো। বললাম, ঠিক আছে। তোমার যা ইচ্ছা। প্রশ্ন করলাম, কিন্তু শ্রাবণী এসব কি ঠিক হচ্ছে?
প্রশ্ন করার সাথে সাথে শ্রাবণী উত্তর দিলো, সেটা আমার ব্যাপার। তুমি কোন কথা বলবে না। লক্ষ্য করলাম ওর সব কথাতেই একটা অধিকার অধিকার ভাব আছে। মনে মনে ভাবলাম এ কিসের অধিকার।
এভাবে দুপুর পর্যন্ত কেটে গেলো। আমি গোসল সেরে খেতে বসলাম। রান্নাটাও বেশ চমৎকার হয়েছিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম। ও খাটের কোনায় বসে আমার সাথে কথা বলছে। এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে শ্রাবণী আমার বুকে মাথা রেখেছে তা খেয়ালই করিনি। ও নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। সপে দিলো আমার কাছে। আমি ওর বুকে হারিয়ে গেলাম। ওর উষ্ণ ঠোঁট দিয়ে আমার ঠোঁটে বিষ ঢেলে দিলো। আমি বিষের যন্ত্রনায় নীল হয়ে গেলাম। ভুলে গেলাম সবকিছু। ভুলে গেলাম আমার অতীত। স্বপ্নের সীমানায় ভাসতে শুরু করলাম। লক্ষ্য করলাম, শ্রাবণী কাঁপছে। ও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। কক্ষচুত্য হলাম ভারসাম্যের জগত থেকে।
ভুলটা বুঝতে পারলাম যখন সম্বিত ফিরে পেলাম। কি করতে কি করে ফেললাম। শ্রাবণীও লজ্জা পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে পাঁচটা বাজে। সেদিন আর দেরী না করে শ্রাবণী তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় শার্টের কলার ধরে হালকা টান দিয়ে বলল, "তোমার অপেক্ষায় থাকলাম।" শ্রাবণী চলে গেল। আমি চিন্তায় পড়লাম ও আমাকে কি বলতে চাইলো।
যাই হোক আর মাত্র সাতদিন আছে আমার জাপান যাওয়ার। অফিসে রিজাইন দিয়েছি। এখন শ্রাবণী কাঁদাকাটি করে ফোনে, বলে তাকে বিয়ে করতে। কিন্তু এখন কিভাবে সম্ভব? বিদেশ যাচ্ছি, কবে পড়ালেখা শেষ করতে পারবো, কবে দেশে আসবো? এসব ভেবে কুল পাইনা। পাছে শ্রাবণীর ভেজা ভালবাসা আমাকে তাড়া করে ফেরে। আমি ভুলতে পারিনা ওর ঠোঁট, উষ্ণ শরীর। তবে কি ওকে বিয়ে করে তবে জাপান যাবো, নাকি ফিরে এসে বিয়ে করবো। আবার এত কিছুর পরে কি ওকে বিয়ে করা ঠিক হবে? সমাজ বলেও তো একটা কথা আছে। ওর পরিবার থেকে আমি বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছি।
ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কি করবো? ওদিকে শ্রাবণী ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কণা খালাও আমাকে, ও কে বিয়ে করার জন্য চাপ দিচ্ছে। সময় এতই কম যে, ভাল ভাবে চিন্তা করে ডিসিশন নিবো তাও হচ্ছে না। শ্রাবণী কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করতে চায়। আমি তাকে বুঝাই যে, স্কলারশীপটা শেষ হলেই আমি ফিরে এসে ব্যাবস্থা নিবো। ও কিছুই মানতে চায় না। শুধু কাঁদে আর বলে "একবার তো আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে, তোমার সাথে দেখা হয়ে আবার জীবনের যে স্বাদ খুঁজে পেয়েছি সেটা তুমি নষ্ট করে দিও না।" আমি পড়ে যাই মহাসমুদ্রে, চারিদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। একদিকে শ্রাবণী, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার।
........................
আজ ৩০ তারিখ। আমার ফ্লাইট সন্ধ্যা ৭টায়। সব রেডি। ২ ঘন্টা আগে রিপোর্টিং আওয়ার। বিকেল ৩টায় বেরিয়ে যাবো। ৩ টা লাগেজ হয়েছে। শীতের কাপড় কিনতে হয়েছে। কারণ ওখানে শীত। শ্রাবণী আমাকে এয়ারপোর্টে বিমানে তুলে দিতে যাবে। ও এখানে আসবে সকাল ১০টার দিকে।
শ্রাবণী এলো সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। ওর মনটা খুবই খারাপ। হওটাই স্বাভাবিক। এক তোরা ফুল নিয়ে এসেছে আমার জন্য। ওকে বসতে বললাম। বললাম, শ্রাবণী আমার কাছে এসো। তোমার কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি তার চেয়ে অনেক অনেক কম তোমাকে দিয়েছি। তুমি মোটেও চিন্তা করোনা। আমি আমার কোন মত একটা ব্যাবস্থা করে দেশে আসবো। তখন সব হবে। একটা কথা মনে রেখো, তুমি আমার ছিলে, আমারই আছো আর আমারই রবে।
ও আমার বুকে মাথা গুঁজে কাঁদছে। আমি ওর মাথায় বুলিয়ে বোঝালাম অনেক কিছুই। আমি জানি শ্রাবণী কেন এমন করছে। কারণ, ও আর ওর জীবনটা এরকম ছন্নছাড়া রাখতে চায় না। আমি সবই বুঝি কিন্তু কিছুই করার নেই এই অল্প সময়ে। ওকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। ওর চোখের পানিতে আমার শার্ট ভিজে যাচ্ছিল। আমার ভিতরটা যে কত কাঁদছে তা ওকে একবারের জন্যও বুঝতে দেইনি। তাহলে ও আরও ভেঙ্গে পড়বে। এভাবে দেখতে দেখতে সময় চলে এলো। যাবার জন্য উঠলাম। শ্রাবণী আমার বুকে হারিয়ে গেলো। ওর উষ্ণ ঠোঁট দিয়ে আমাকে সিক্ত করলো। আমি ওর কপালে একটা আর্শীবাদ এঁকে দিলাম।
রহমত চাচা হলুদ টেক্সিক্যাবে আমার লাগেজ গুলো তুলে দিলো। রহমত চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর শ্রাবণী এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছালাম। শ্রাবণীর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় ও যে কিভাবে কাঁদছিল তা ভাবলে সত্যিই এখন খুবই কষ্ট হয়। আমাকে বলল, "ভাল থেকো। তোমার দেয়া উপহার আমি এখন আমার শরীরে বহন করছি। সে একটু একটু করে বড় হবে আর তার অস্তিত্ব জানান দিবে আমাকে। তোমার অপেক্ষায় থাকলাম।"
.........................
শ্রাবণীকে পেছনে ফেলে আমি আজ অনেক দুরে। জাপানে এসে সবসময় শ্রাবণীর কথা মনে হয়। ওর সাথে একদিন পর পর ফোনে কথা হয়। ভাবি, আমাদের জীবনটাতো অনেক সুন্দর হতে পারতো! হারানো ভালবাসা ফিরে পেলাম ঠিকই কিন্তু অনেক পরে। এমন জীবন তো চাইনি। এমন ভালবাসা তো চাইনি!!
সমাপ্ত
১ম পর্ব ২য় পর্ব ৩য় পর্ব ৪র্থ পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ২:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



