ভালবাসার সুখ-দুখ! - পর্ব ৩
ঘুমহীন চোখে চাদঁ আর মেঘের লুকোচুরী দেখতে দেখতে আকাশ আজ দেখল চাদেঁর অস্ত যাওয়া। সুর্যাস্ত সে অনেক দেখেছে কিন্তু চাদেঁর ডুবে যাওয়া! এই প্রথম দেখল সে। কিছুক্ষন আগের আলো আধারি ভাবটা হারিয়ে গিয়ে আবছা একটা অন্ধকার চারিদিকে বিরাজ করছে। যে কোন প্রস্হানেই যে বিরহের একটা আবহ তৈরী হয়, প্রকৃতিও যেন সেটাই জানান দিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের বিরহে প্রকৃতি যেন ব্যাথায় খানিকটা কাতর। সাদাকালো মেঘেরা যেন খেলার সাথী হারিয়ে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে গুমরা মুখে চুপটি মেরে আছে। বসে বসে আকাশ প্রকৃতির সেই অপার সৌন্দর্য্য অবলোকন করছে নিবীড়ভাবে আর মুগ্ধ হচ্ছে। সত্যিই! বিধাতা তার সৃষ্টিকে কি অপরূপ মায়া দিয়ে তৈরী করেছেন..........
আবছা অন্ধকারেই মাথাটা খানিক পিছন দিকে হেলে দিয়ে চোখ বুঝে চেয়ারটায় বসে আছে আকাশ। ঘুমহীন চোখে উথাল পাতাল সব চিন্তা করে যাচ্ছে সে। আজ যে তার কি হল, নিজেও বুঝে উঠতে পারছেনা। একে একে অতীতের সব স্মৃতিচিহ্নই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সবই তার মনে পড়ছে। সেতো চেয়েছিল মুছে ফেলতে জীবনের ঐ কাল অধ্যায়টি, দু:সহ সব সুখ-দুখের স্মৃতিচিহ্নগুলি। প্রতিজ্ঞা করেছিল পিছনে ফিরে আর যাবে না কিন্তু কি আশ্চর্য মানুষের মেমোরীসেল! ইচ্ছে করলেই মানুষ কোন কিছু চিরতরে মুছে ফেলতে পারে না বা আদৌ ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এই বিশ্ব সংসারে একমাত্র মানুষকেই বিধাতা এই আশ্চর্য গুণাবলী! দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, দিয়েছেন আশ্চর্য্য এক হৃদয়। যেখানে সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনা অনুভুত হয়। স্পষ্ট মনে আছে আকাশের জীবনের প্রথম শিহরনের কথা, প্রিয় অনুভুতির কথা, জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্খিত, অযাচিত চিরকুটটির কথা, মনে আছে তার সব, সব............
শামীম আর আকাশরা থাকত একই মহল্লায়। শামীম অনার্স পড়ত ঢাকা কলেজে আর আকাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বর্ষে । তবে সুযোগ পেলেই শামীম চলে যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আকাশদের সাথে আড্ডা দিতে। সেই সুবাদেই তাদের বন্ধুত্বটা ছিল প্রখর, পারিবারিক বন্ধনটাও ছিল বেশ সুদৃঢ়। শামিমের ছোট ভাই শাওন ছিল ঢাকা কমার্স কলেজের ছাত্র। বৃষ্টিও পড়ত শাওনের সাথে একই কলেজে। সেখান থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। সেই সুবাধেই শাওন আড়ষ্টভাবে তাকে একদিন ধরিয়ে দিয়েছিল চিরকুটটা। সেটা পেয়ে প্রথমে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি আকাশ। নামবিহীন তিন শব্দের চিরকুটটি তাকে বেশ উত্তেজিত করলেও আগ্রহটা চেপে রেখেছিল ইচ্ছে করেই। বেশ কিছুদিন পর পেল দ্বিতীয়টি, তখন খানিকটা আগ্রহ না দেখিয়ে আর পারলনা। শাওনের কাছ থেকে অবহেলায় জেনে নিল তার বৃতান্ত। বিষযটি নিয়ে সুমন আর শামীমের সাথে শেয়ার করায় তার আগ্রহেরর মাত্রাটা যেন খানিক বাড়ল। সুমনের মিশনের সাথে এর যোগসুত্র যখন খুজে পাওয়া গেল তখন আগ্রহের মাত্রাটা আর চেপে রাখতে পারেনি। একটি মেয়ে হয়ে যেভাবে বার বার তার আগ্রহের মাত্রাটা তার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল তখন আর সে পারেনি তাকে ফিরিয়ে দিতে। যা সে কখনও পেতে চায়নি, তাই যখন পেতে যাচ্ছে তখন পারেনি তাকে প্রত্যাখান করতে। আস্তে আস্তে জন্ম নিল একটি ভালবাসা, তৈরী হতে লাগল একটি উপাখ্যান।
শাওনের মধ্যস্হ্যতায় ঠিক হল বৃষ্টির সাথে সাক্ষাতের দিনক্ষন। তারপর থেকেই যেন উথাল পাতাল সব চিন্তা সার্বক্ষনিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আকাশকে। সারাক্ষন একটা অস্হিরতায় কাটছে তার সময়। আগের চেয়ে জীবনটাকে কেমন যেন রঙ্গীন আর মধুর মনে হচ্ছে আকাশের!! এখন সুযোগ পেলেই তার চোখেমুখে ভর করে রাশি রাশি স্বপ্ন। এর আগে তার কখনও এমন হয়নি। বন্ধু বান্ধবের অনেককে সে এই কারনে অনেক উদ্বেলিত হতে দেখেছে কিন্তু কখনও সেটা তার বুঝে আসেনি। এখন নিজেই নিজের ভিতরে কেমন একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছে। ছন্দ পতন ঘটছে তার চালচলনে। তাহলে কি বদলে যাচ্ছে আকাশ? পড়াশুনা, বন্ধু বান্ধব আর আড্ডা এর বাইরে যে আর কিছু চিন্তা করতনা, তার মাথায় এখন নতুন চিন্তা। দেখা হলে কি বলবে সে বৃষ্টিকে? এই এক চিন্তাই সারাক্ষন সে নিবীড় ভাবে করে যাচ্ছে, আর ততই শিহরিত হচ্ছে, অস্হিরতা ভর করছে।
শামীম, সুমনকে না নিয়ে সোহেলকে সাথে নিয়ে গেল দেখা করতে। বৃষ্টি আসবে তার কোন এক বান্ধবীকে নিয়ে। পুর্ব নির্ধারিত একটি রেষ্টুরেন্টে বসে আছে আকাশ আর সোহেল। যতই সময় ফুরোচ্ছে ততই আকাশের অস্হিরতা বাড়ছে। সত্যিই কি সে আসবে? এই এক চিন্তাই সারাক্ষন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রেমে পড়লে পুরুষ নাকি খানিকটা বোকা হয়ে যায়!! কথাটি এতদিন দুর্ভেদ্য মনে হত আকাশের কাছে। কিন্তু এখন নিজেকেই কেমন যেন বোকা বোকা লাগছে সেই সাথে বাড়ছে আড়ষ্টতা, অস্হিরতা। কয়েকবার চলে যাওয়ার জন্যে সে উঠে দাড়িয়েছে। কথা বলে বলে সোহেলই তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। সময় যাচ্ছে...কথা ফুরোচ্ছে কিন্তু প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হয়না। কখন আসবে? বা আদৌ সে আসবে কিনা, তাও ঠিক জানা নেই। একটা অস্হিরতা নিয়ে কথা বলে চলছে দুজন। হঠাৎ!! কি একটা কথা বলতে যেয়ে থমকে গেল আকাশ। তার চোখ স্হির হয়ে আটকে গেছে, কথা বলতে পারছেনা, তন্ময় হয়ে অপলক চোখে চেয়ে আছে সন্মুখপানে...............................
মাইকের শব্দে সম্বিত ফিরে পেল আকাশ। ফজরের আযান হচ্ছে। আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করছে, ফুরফুরে বাতাস এসে গায়ে লাগছে, চারিদিকে বিরাজ করছে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি........ এর কিছুই খেয়ালে ছিল না আকাশের।
(চলবে.......)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০১০ সকাল ১১:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



