(আগের অংশটুকু জন্যে এখান থেকে পড়ে আসতে হবে।)
আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি। সে ডাকে সাড়া দিই না।
মেয়েটি আবার ডাকে,"এক্সকিউজ মি স্যার, আপনি কি জেগে আছেন?"
বুঝলাম নাছোড়বান্দার হাতে পড়েছি। সাড়া দিতেই হোল। "কি ব্যাপার?"
"আমি তোমার ফ্রিজটা পরীক্ষা করতে এসেছি।"
আমি এর কিছুই বুঝতে পারিনা। আমি আবার ফ্রিজ পাবো কোথায়? আচ্ছা-তর্কের খাতিরে নাহয় মেনে নিলাম যে আমার একটা ফ্রিজ আছে, কিন্তু সেটা পরীক্ষা করার দরকারটাই বা কি? এমনিতেই সবকিছু ছেঁড়েছুড়ে এসেছি, মেজাজ খারাপ। তার উপর যদি এই ধরণের ধোঁয়াশা আলাপ করতে হয় তাহলে মাথা গরম হবারই কথা।
"কিসের ফ্রিজ?" বিরক্ত গলায় আমি শুধোই।
মেয়েটি ঘরের এক কোণার দিকে অংগুলিনির্দেশ করে। সেদিকে তাকিয়ে দেখি সাদা চৌকোণা কি একটি জিনিস ঘরের মধ্যে রয়েছে বটে। ওটা কি ফ্রিজ নাকি? খেয়ালই করিনি আগে।
কথা না বাড়িয়ে ঘাড় কাত করি। ওটা তো তোদেরই ফ্রিজ, খামাখা আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন বাপু? যত পরীক্ষা করতে চাস কর।
মেয়েটি ফ্রিজ খুলে কিসব খুটখাট করে, তারপরে "থ্যাংক ইউ" বলে উধাও হয়। আমারও জানে পানি আসে। বিদেশযাত্রার পয়লা রাতেই ঘরে যদি মেয়েমানুষ ঢোকে, তাহলে পরে যে আরো কি সব হবে তা চিন্তা করেই মনে মনে শিউরে উঠি। এ আমি কিসের মধ্যে এসে পড়লাম?
ঝনঝন করে ঘড়ির এ্যালার্ম বাজে। সে শব্দে চমকে উঠি। একই সাথে বিকট আওয়াজে বেজে ওঠে ফোনটিও। আবারও চমকাই। বুঝি হোটেলের লোকেরা আমার ঘুম ভাঙ্গাতে ফোন করেছে। আর শুয়ে থাকার কোন মানে হয়না।
জানালার পর্দা সরাতেই সকালের আলোয় ভরে যায় ঘরটি। আমি বাইরে তাকাই। দিনের আলোয় এইই প্রথম আমার বিদেশ দেখা।
আমাদের বিরাট হোটেলের পাশেই একটি দোতলা বড় বাড়ী। সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম যে সেটি একটি পোস্ট অফিস। অত ভোর বলে তখনো খোলেনি অফিসটি। অফিসটির বারান্দায় একটি ছোট পরিবার। বাচ্চা-বুড়ো মিলিয়ে জনা ছয়েক হবে। ছোট বাটিতে করে তার স্যুপ জাতীয় কোন কিছু চুমুক দিয়ে খাচ্ছে। আশেপাশে পোটলা-পুঁটলি দেখে বুঝলাম যে তারা রাতে এখানেই ঘুমায়।
একটা বড় ভুল ধারণা ভাংলো সেই মুহুর্তে। বিদেশ মানেই সব সময় ভাল জীবন নয়। বিদেশেও গরীব মানুষ আছে। তারাও আমাদের মতোন আশ্রয়হীন জীবন কাটায়। শেওলার মতোন তারাও পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। পরে আমেরিকার যে কটি শহরে আমি গিয়েছি তার প্রতিটিতেই এই জিনিসের দেখা মিলেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার কাছ থেকে সরে আসি। হাতে সময় নেই বেশী। গোসল করতে হবে, জামাকাপড় পরতে হবে, নীচে গিয়ে নাস্তা খেতে হবে এবং তারপর পৌঁছুতে হবে এয়ারপোর্টে। একটু আগেভাগে যাওয়াই ভাল, আমার শেষমুহুর্তে দৌড়ঝাঁপ করতে ভাল লাগেনা।
হোটেলের নাস্তাটা অবশ্য ভালই ছিল। মাখন লাগানো রুটি, সাথে ডিম, ফলের রস আর আরো বেশ কয়েক রকম স্বাদের খাবার। আবার প্লেনে গিয়ে কপালে খাবার বলতে কি জোটে তারতো কোন ঠিক-ঠিকানা নেই, অতএব যতটা পারি খেয়ে নিলাম। সিদ্ধ বরবটির ভয়ে আমি এমনিতেই সিঁটিয়ে আছি।
হোটেল থেকে চেক আউট করতে গিয়ে মনে পড়লো সকালের ঘটনাটি। ভাবলাম জিজ্ঞেস করা দরকার কেন আমার ঘরে মেয়েটি ঢুকেছিল।
হোটেলের ক্লার্ক তো আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো। "বলো কি? তোমার ঘরে আমাদের হোটেলের মেয়ে কেন ঢুকবে? আর তাছাড়া ঢুকবেই বা কেমন করে? তোমার ঘরের দরজায় নিশ্চয়ই ডেডবোল্ট লাগানো ছিল। তাহলে বাইরে থেকে দরজা খুলতে পারার কথা না। তুমি ভিতর থেকে না খুললে কারো কাছে ঘরের চাবি থাকলেও তো সে দরজা খুলতে পারবে না।"
ডেডবোল্ট আবার কোন জিনিস হে? পরে বুঝলাম যে সে ছিটকিনির কথা বলছে। এটা অবশ্য ঠিক যে আমি সে রাতে ছিটকিনি লাগাইনি দরজায়। কিন্তু তাতে কি? ছিটকিনি না লাগালেই বা আমার ঘরে সুবেহ-সাদেকের সময় মেয়েমানুষ ঢুকবে কেন? আর ঘরের ফ্রিজটিই বা কেন সে চেক করছিল?
এ প্রশ্নে ক্লার্কটি আমতা-আমতা করতে থাকে। "আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে কি যে আমাদের হোটেলে প্রতিটি ঘরেই একটি ছোট্ট ফ্রিজ থাকে, সেখান নানারকমের পানীয় বা হাল্কা খাবার-দাবার থাকে। অতিথীরা চেক-আউট করার আগে আমরা ফ্রিজটি চেক করে নিই যে কে কত টুকু খাবার খেয়েছে সেখান থেকে, এবং তার দামটুকু বিলের সাথে যোগ করে দেই। কিন্তু সাধারণতঃ ফ্রিজ চেকাররা ঘরে না বলে ঢোকে না। হয়তোবা মেয়েটি নতুন ছিল, বা দরজায় ডেডবোল্ট লাগানো ছিলনা বলে ভেবেছে ঘরে কেউ নেই। কিন্তু তার পরেও এটা তার করা উচিত হয়নি। আমি নিশ্চয়ই তোমার কমপ্লেইনটি ম্যানেজমেন্টের কাছে জানিয়ে দেবো। আমি কি তোমার এই অসুবিধে লাঘব করার জন্যে কোন কিছু করতে পারি?"
আমি ঘাড় নাড়ি। কিই আর করবি তোরা? যাক- তবু ব্যাপারটা জানা হোল।
আগের দিন ব্যাংকক এয়ারপোর্টে পৌছেছিলাম রাতের বেলা। তার উপর তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম বলে ভাল করে দেখা হয়নি এই বিশাল এয়ারপোর্টটিকে। এবার দিনের আলোয় ভালকরে ডেখলাম। ঢাকার এয়ারপোর্টের তুলনায় অনেক বড়। কত দোকানপাট, কত লোকজন। আমি ভ্যাবলার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকি।
আমার পরবর্তী গন্তব্য টোকিও। যাবো আবার সেই আগের থাই এয়ারওয়েজে। ছ' ঘন্টার ফ্লাইট। টোকিওতে প্লেন বদলাতে হবে। থাই ছেড়ে প্যান-অ্যাম। এই এয়ারলাইনটি এখন আর নেই। টোকিওতে হাতে সময় থাকবে খুবই কম। মাত্র পয়তাল্লিশ মিনিট। এর মধ্যেই এক প্লেন থেকে নেমে অন্য প্লেনে উঠতে হবে। বুকের মধ্য হাল্কা গুরুগুরু করা শুরু করে দিল। ঠিকমতো পারবো তো?
টিকিট হাতে অন্য যাত্রীদের সাথে লাইনে দাঁড়াই। বোর্ডিং-কার্ডটি হাতে পেয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার নিশ্চিন্ত মনে ঘোরাঘুরি করা যায়।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেট খুঁজি। পকেট ফাঁকা, তার মানে ঢাকার বন্ধুরা যে ক'টি সিগারেট কিনে দিয়েছিল, তা আমি ইতিমধ্যেই ফুঁকে দিয়েছি। ভাগ্য ভাল যে প্লেন ওঠার আগেই ব্যাপারটা ধরা পড়লো। তাড়াতাড়ি সিগারেট কিনে ফেলা দরকার।
গুটিগুটি পায়ে ডিউটিফ্রি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ঝকঝকে দোকানের ভিতর শেলফে সাজানো কতরকম সিগারেটের কার্টন, নানানরঙ্গা মদের বোতল।
কয়টা সিগারেট কিনবো? ঢাকাতে তো চিরটাকাল তিন-চার শলা করে সিগারেট কিনতাম। গোটা প্যাকেট তো কোনদিন কিনেছি বলে মনে পড়েনা। কোন প্রয়োজন ছিলনা আসলে। সবসময়েই হাতের কাছে কোন না কোন দোকান ছিলই। পকেটের সিগারেট ফুরিয়ে গেলেই আবার কিনতাম। আর তাছাড়া ধূমপায়ী বন্ধুদের অভাবও ছিলনা। ঠেকায়-বেঠেকায় তারাতো ছিলই। কিন্তু আজকে মনে হয় গোটা একটা প্যাকেটই কিনতে হবে। কম কিনলে পথে কোথায় আবার ফুরিয়ে যাবে, তখন হবে আর এক নতুন ঝামেলা।
সামনে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে বলি,"আমি কি এক প্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনতে পারি?"
লোকটি কি এক অজানা কারণে থতোমতো খায়। তারপরেও সে হাসিমুখেই উত্তর দেয়," আমি কি তোমাকে এক কার্টন ডানহিল দিতে পারি?"
দেখেছি ব্যাটার কান্ড! সিগারেট বেচার জন্যে একদম হাঁ করে বসে আছে। আমি চাইলাম এক প্যাকেট, আর সে কিনা আমাকে সরল-সোজা গাঁইয়া পেয়ে পুরো এক কার্টন গছাতে চাইছে।
কিন্তু হুঁ হুঁ বাবা- আমিও বাংলাদেশী ছেলে। অত সহজে কাবু হইনে। একটা কিছু ভক্কিচক্কি দিয়ে আমাকে বোঝানো যাবেনা।
এবার একটু শক্ত গলায় বলি,"না-এক কার্টন না, আমি মাত্র একপ্যাকেট ডানহিল সিগারেট কিনতে চাই।"
লোকটির মুখ থেকে এবার হাসিটি উধাও হয়। কে জানে হয়তো এক কার্টন বেচতে না পারা দুঃখেই হয়তোবা।
"আমি তোমার কথাটি ঠিক বুঝতে পারলাম না।"
এতে না বোঝার কি আছে হে, উজবুক? আমি এক প্যাকেট ডানহিল কিনতে চাই। সেটা দিয়ে দে, আমি দাম চুকিয়ে চলে যাই।
"আমি এক প্যাকেট ডানহিল কিনতে চাই।"
"স্যার-" লোকটির গলাও এবার একটু কঠিন মনে হয়। "আপনি বোধহয় ভুল করছেন। এটি ব্যাংকক শহরের কোন খুচরো দোকান নয়। আমরা খুচরো সিগারেট বেচিনা। কিনতে হলে কার্টন ধরেই কিনতে হবে।"
এবারে আমার হাঁ হবার পালা। বলে কি? আমাকে কি এখন গোটা কার্টনটাই কিনতে হবে নাকি? আমি সারা জীবনে একটা গোটা প্যাকেট কোনদিন কিনিনি, আর এখন কিনা আমাকে পুরো এক কার্টন কিনতে হবে?
কিন্তু কি আর করা? নেশার জিনিস বলে কথা। ভাতের পয়সা না থাকলেও নেশার জিনিসের পয়সা তো যোগাতেই হবে।
বেজার মুখে জিজ্ঞেস করলাম,"ঠিক আছে। এক কার্টনই সই। তা দাম কতো?"
"নয় ডলার।"
ওরে সর্বনাশ! পকেটে আমার সাকুল্যে আছে দেড়শো ডলার, তার থেকে নয় ডলার দিয়ে সিগারেট কিনবো? নয় ডলারকে দেশি টাকায় কনভার্ট করে রীতিমতো শিউরে উঠি। এত টাকা দিয়ে সিগারেট কেনাটা কি ঠিক হবে?
একবার ভাবলাম দামাদামি করি। কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলের ওই রকম কঠিন মুখ দেখে আর সে পথ মাড়ালাম না।
অতএব মনে মনে কষে গালি দিলাম ব্যাটাচ্ছেলেকে। মনে মনে কষে গালি দিলাম ব্যাংকক এয়ারপোর্টকে। শালা এখন বুঝলাম কার পয়সা চুষে তোমরা এতো আলো ঝলমল করেছো জায়গাটিকে। একবার যদি তোদের ঢাকায় পেতাম তাহলে দেখিয়ে দিতাম কত ধানে কত চাল।
(পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছি যে পৃথিবীর যাবতীয় ডিউটিফ্রি দোকানেই সিগারেট কার্টন ধরেই বিক্রি হয়। আমিই গাধা বলে সেদিন বুঝতে পারিনি।)
অনেকক্ষণ বাদে একরাশ সিগারেট হাতে পেয়ে দেদারসে ধূমপান করি। তারপর একসময় প্লেনের ডাক আসে। বিদায় ব্যাংকক শহর। আবার কোনদিন দেখা হবে হয়তো বা।
প্লেনে উঠে সিট পেলাম একদম পিছনের দিকে। সে আমলে ধূমপায়ীদের জন্যে সে রকমই ব্যবস্থা ছিল। তাতে অসুবিধে নেই, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই যে আমার পিছনে বসেছে একজন থাই মহিলা। বয়েস পঞ্চাশের ঘরে। সাথে দুই কন্যা সম্ভতঃ। তারা তাদের নিজেদের ভাষায় প্রচন্ড কিচির-মিচির করছে, আর এক-দুই সেকেন্ড পর পর হিহি করে হেসে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে। বুঝতে পারলাম যে গোটা পথটি এরা আমার কানের পোকা বার করে দেবে।
কিন্তু এক রহস্যময় কারণে তাদের উপর আমার রাগ হচ্ছিল না। কেননা বয়সী মহিলাটিকে দেখে আমার বারবার মিনু খালার কথা মনে পড়ছিল।
মিনু খালা আমার মায়ের গ্রামতুতো বোন। আমরা নানাবাড়ীতে গেলেই তিনি দেখা করতে আসতেন আর সাথে আনতেন তার দুই যমজ কন্যাদুটিকে। এবং ঠিক এরকম ভাবেই মিনু খালা আর তার দুই মেয়ে কথায় কথায় হেসে উঠতো।
দেশ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এদের দেখে কিছুটা কমলো যেন। মনে মনে বললাম, "থাই খালাম্মা, ভালো আছেন? শরীর কেমন?"
(বাকী অংশ পরের পর্বে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

